ঢাকা, বাংলাদেশ   শুক্রবার ০১ মার্চ ২০২৪, ১৭ ফাল্গুন ১৪৩০

অগ্নিসন্ত্রাস রাজনীতি নয়- এটি সন্ত্রাসী কাণ্ড

মমতাজ লতিফ

প্রকাশিত: ২০:৫৩, ২৯ নভেম্বর ২০২৩

অগ্নিসন্ত্রাস রাজনীতি নয়- এটি সন্ত্রাসী কাণ্ড

দেশ স্বাধীন সার্বভৌম। এর ক্ষমতার উৎস জনগণ

দেশ স্বাধীন সার্বভৌম। এর ক্ষমতার উৎস জনগণ। সুতরাং গণতন্ত্রের রীতি অনুযায়ী নির্বাচনকে সরকার বদলের পন্থা হিসেবে মানতে হবে। বারবার নির্বাচনের সময় এলে একটি দল বেআইনি পন্থা ব্যবহার করে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করতে চায়। তারা যে পন্থাটি বারবার ব্যবহার করছেÑ তা হামলা-দৈহিক নির্যাতন চালিয়ে জনগণ অর্থাৎ সাধারণ ভোটারদের ভীতসন্ত্রস্ত করে নির্বাচনবিমুখ করা। তারা অগ্নিসন্ত্রাস নামক নতুন এক সন্ত্রাসী কায়দার উদ্ভাবক। তারা নব্য নাৎজিদের মতো নিজ দেশের সাধারণ মানুষ-বাস-ট্রাক, সিএনজি, রেলের চালক, হেলপার ও যাত্রীদের ওপর পেট্রলবোমা ছুড়ে তাদের অগ্নিদগ্ধ করে মৃত্যু ঘটানো ও অগ্নিদগ্ধ করছে।

এর ফল অবশ্যই জনগণের অবাধ চলাচল এবং ভোটদান অর্থাৎ ভোটকেন্দ্রে যাতায়াত বিঘ্নিত করা। জনগণ ২০০১-এর অক্টোবরের নির্বাচনকে ঘিরে সে সময়ের দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার, তার তথাকথিত ‘হোমওয়ার্ক’ নামের আড়ালে মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিযুদ্ধের আদর্শপন্থি সচিবদের বদলি করে বিএনপিপন্থি চার সচিবকে নির্বাচন কমিশনে নিয়ে আসা ছিল প্রথম ধাপ। এরপর নির্বাচনের আগে, নির্বাচনের দিন-রাত এবং নির্বাচনের পরে দীর্ঘ সময় যাবৎ সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ, আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতা-কর্মীদের ওপর পুলিশ-সেনা এবং ঐ দলের গুণ্ডা সন্ত্রাসীদের ভয়াবহ নির্যাতন, ধর্ষণ, লুট, বাড়িঘর, ব্যবসা-দোকান ভস্মীভূত করা চলেছিল, যা পুনঃস্মরণ করে মানুষ এখনো শিউরে ওঠে।

হাজার হাজার আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মী ঐ পাঁচ বছর স্ব-স্ব গ্রাম, বসতভিটা ত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিল। তারা ফিরেছিল ২০০৬-এর সরকারের ক্ষমতা শেষ হওয়ার পর। জনগণের মনে আছে, ঐ সময়ে শুধু সাংবাদিক হত্যা হয়েছিল পঞ্চাশের মতো। আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক নেতা-কর্মী হত্যার শিকার হয়েছিল প্রায় ২১ হাজার। সময়ে ২০০৪-এর ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা হয়েছিল ঐ দলের সন্ত্রাসী নেতা-নেত্রীর নির্দেশে বঙ্গবন্ধুকন্যা সে সময়ের বিরোধী নেত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যার লক্ষ্যে। সেদিন ২৪ নেতা-কর্মী হারিয়েছিল আওয়ামী লীগ। অন্য নেতারা স্পিøন্টার বিদ্ধ হয়ে প্রাণে বেঁচেছিলেন।

শেখ হাসিনা সেদিন গ্রেনেড হামলা থেকে প্রাণে বাঁচলেও তাঁকে হত্যার জন্য বন্দুকের যে গুলি গাড়ির দরজা বরাবর ছোড়া হয়, সেটিতে তাঁকে আগলে গাড়িতে তুলে দেওয়া তাঁর দেহরক্ষী মামুন নিহত হয়। অর্থাৎ মামুনের প্রাণের বিনিময়ে সেদিন বাঙালি আরেকবার বাংলাদেশকে সন্ত্রাসী, পাকিস্তানপন্থি ধর্মান্ধ মৌলবাদী রাজনীতির কবল থেকে বাঙালির অসাম্প্রদায়িক ধর্মনিরপেক্ষ রাজনৈতিক সংস্কৃতির ধারক আওয়ামী লীগ নেত্রী শেখ হাসিনাকে জীবিত ফিরে পেয়েছে। মামুন গাড়িতে ওঠার দরজার কাছে না থাকলে সেদিন সেই গুলিটি শেখ হাসিনার গায়ে লাগত। দেহরক্ষী প্রকৃতই দেহরক্ষী হয়ে জীবন উৎসর্গ করে জাতিকে জননেত্রীর জীবন দান করেছিল। আজও অনেক আত্মদানের সঙ্গে মামুনের আত্মত্যাগের মূল্য উপলব্ধি করে তার রেখে যাওয়া স্ত্রী ও সন্তানদের সুখী জীবন কামনা করে চোখ ভিজে যায়।
যা হোক, বাঙালি কখন এই অগ্নিসন্ত্রাসী, স্বজাতির খুনি, সন্ত্রাসীদের হাত থেকে রক্ষা পাবে, জানি না। তবে, আশা হয় প্রযুক্তি, তথ্য এবং জ্ঞান অর্জন করা তরুণ প্রজন্ম নিশ্চয় এই অগ্নিসন্ত্রাসীদের রাজনীতির নামে অপরাজনীতি, সন্ত্রাসী কর্মকা-কে ছুড়ে ফেলে দেবে এ যুগের বর্জ্য গণ্য করে। জাতিকে এই বর্জ্য সহ্য করতে হবে কেন? এটি কোনোভাবেই রাজনীতির কোনো রূপ হতে পারে না। বহির্বিশ্বের মানবাধিকারের প্রবক্তারা কেন ২০০১-৬’-এর মানবতাবিরোধি, ২০১৪-এর নির্বাচনকালীন অগ্নিসন্ত্রাস বিষয়ে এসব সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের হোতাকে নিষেধাজ্ঞা দিচ্ছে না? কেন তারা শান্ত, অসাম্প্রদায়িক বাঙালির মূল অসাম্প্রদায়িক সংস্কৃতিকে সমর্থন দিয়ে এদের প্রকৃত সন্ত্রাসী কর্মের জন্য অপরাধী সাব্যস্ত করে যথোপযুক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করে না? প্রশ্ন ওঠে- মানবাধিকার সমর্থক সংস্থা, গোষ্ঠীর নীরবতার বিরুদ্ধে তাদের আচরণ সরকারের প্রতি, আগুন-সন্ত্রাসীদের প্রতি বিপরীত হয় কেন? আগুন সন্ত্রাসীরা কেন তাদের নীরবতার মাধ্যমে বারবার প্রশ্রয় পায়। এ প্রশ্রয় কেন? এর উদ্দেশ্য কী?
জনগণ দীর্ঘকাল ধরে চলা রাজনীতির নামে সন্ত্রাসী নেতাদের বহৃ্যুৎসব অর্থাৎ আগুন সন্ত্রাসকে কেন্দ্র করে কোনো মন্তব্য-ভর্ৎসনা-নিন্দার ঝড় তুলতে দেশী-বিদেশী কোনো সুশীল গোষ্ঠীর মুখে শোনেনি। কেন নিন্দা শোনা গেল না তা ভেবে জনগণ আশ্চর্যান্বিত হচ্ছে। সবার মুখেই সুষ্ঠু নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের কথা শোনা যাচ্ছে। সে ক্ষেত্রে সুষ্ঠু শান্তিপূর্ণ নিরপেক্ষ নির্বাচনকে এই আগুন সন্ত্রাস, গাড়ি ভাঙচুর, চালক-যাত্রীদের দগ্ধ করা তো জনগণকে নির্বাচনের প্রতি, ভোটদানে ভীতসন্ত্রস্ত করার পন্থা, যা চালিয়ে যাচ্ছে ২০১৪-এর আদলে।

সেসময় অগ্নিসন্ত্রাসের তুলনামূলক বিবেচনায় বর্তমানে ঐ একই সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর মানবতাবিরোধী চরম বর্বর অমানবিক ঘটনা সংখ্যায় এখনো কিছু কম। কিন্তু, সেসময় প্রায় ২০০’র বেশি চালক-হেলপার-যাত্রী অগ্নিসন্ত্রাসে অত্যন্ত কষ্টকর মৃত্যুবরণ করা সত্ত্বেও তখনও মানবাধিকার-প্রবক্তাদের নীরবতা বিস্মিত করেছিল জনগণকে। এখনো ঐ গোষ্ঠী একই পুরনো পন্থার অপরাজনীতি করা সত্ত্বেও ক’দিন আগেই পশ্চিমারা সরকারের মানবাধিকার চর্চার মানের পরীক্ষা গ্রহণ করেছিল! কি বিচিত্র এই ‘পশ্চিমা’ মানবতার প্রকৃতি!
আগুন সন্ত্রাসীদের মা-বাবারা কেন দুষ্ট সন্তানদের এত আস্কারা দেয়- এটিও জনগণের প্রশ্ন। দেশের বাজার ব্যবস্থাকে দেশদ্রোহী পণ্য সিন্ডিকেট ব্যবসায়ী গোষ্ঠী সরকারকে ভয়াবহ বিপদের মুখে ঠেলে দিয়েছিল। তাহলে তো ধার নিতে হয় যে, এরা আর ওরা একই দেশবিরোধী শক্তি। এরা দুই গোষ্ঠী জনগণকে দুই পন্থায় জিম্মি করে রেখেছিল। জনমানুষের অবর্ণনীয় দুঃখ-কষ্ট পণ্য সিন্ডিকেটকারীদের সহানুভূতি কোনোমতেই আদায় করতে পারেনি। টিভি চ্যানেলে মানুষগুলো সংসারের প্রয়োজনীয় পণ্য অর্ধেক কিনেছে, আমিষ, ডিম-দুধ-ব্রয়লার মুরগি- এসব কেউ কেউ তিন ভাগের এক ভাগ কিনছিল। এসব দেখে শুনেও এরা জনগণের পকেট মেরেছে।

এরা যেন ‘ছিঁচকে পকেটমারে’ পরিণত হয়েছে। কি হাস্যকর। হাজার কোটি টাকা জনগণের পকেট কেটে লুটে নিয়ে এরা ‘ব্যবসায়ী’ নামটাকে ‘পকেট মারে’ পরিণত করেছে। অপরদিকে আগুন সন্ত্রাসীদের মা-বাবারা সন্ত্রাসী, খুনি নামাঙ্কিত হয়ে গেছে। গাড়িতে আগুন দিয়ে সন্ত্রাসীরা সে ছবি তুলে বিদেশে তাদের নেতাদের কাছে পাঠাচ্ছে। নতুবা তারা কাজের পাওনা টাকা পাবে না। আরও জানা যাচ্ছে, আগুন দেওয়ার জন্য বাস দাঁড় করিয়ে রাখতে চালককে অর্থ দেওয়া হয়। আবার ঐ আগুন দেওয়ার মালিকানা স্বত্ব অন্য গোষ্ঠী যাতে হাইজ্যাক করে নিতে না পারে, অর্থাৎ আগেই ফটো তুলে পাঠিয়ে দিতে না পারে, সেজন্য পাহারা দিতে হয়।

যতই হাস্যকর মনে হোক না কেন, এই আগুন-সন্ত্রাসের শিকার চালক-হেলপার- যাত্রী, অগ্নিদগ্ধ হয়ে তারা যে পরিমাণ ভয়াবহ কষ্ট-যন্ত্রণা ভোগ করে কেউ মারা যায়, কেউ পঙ্গু হয়ে বেঁচে থাকে, তা মেনে নেওয়া অসম্ভব। সুস্থ একজন মানুষ এমন বর্বরতার শিকার অন্য কোনো দেশে কখনো হয়নি। এমন বর্বরতার পরিকল্পনা যার মাথায় আসে, তাকে নরপিশাচ ছাড়া অন্য কিছু বলা যায় না, মানুষ তো নয়ই। 
এদের প্রতিহত করার কথা পুলিশ ও জনগণের জানমাল রক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত নিরাপত্তা বাহিনীর। পুলিশ ও গোয়েন্দা সদস্যদের তাদের অবস্থান চিহ্নিত করে গ্রেপ্তার করতে হয়। তারা তাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন করছে। অনেক সন্ত্রাসী বিস্ফোরক দ্রব্যসহ গ্রেপ্তারও হচ্ছে। এ কারণে সম্ভবত সারাদেশে বিগত সময়ের চেয়ে কম সংখ্যক ঘটনা ঘটছে এখনো। যদিও সারাদেশে এখন পর্যন্ত আগুনে দগ্ধ হয়েছে প্রায় তিনশ’র কাছাকাছি যানবাহন। এ সংখ্যাকেও কম বলা যায় না।
একটা প্রশ্ন জনগণের মনে বারবার উঠে আসছে- ঐ আগুন সন্ত্রাসের নির্দেশদাতাদের বর্জন করে এই দলটির শিক্ষিত গণতন্ত্রমনা নেতা-নেত্রীরা অন্তত একবার নিজেদের গণতান্ত্রিক বৈশিষ্ট্যকে ধারণ করে নতুনভাবে পথ চলা শুরু করে না কেন? কেন, আগামাথাহীন কতক মিথ্যা বক্তব্য আওড়াচ্ছেন তারা? মুখে যেসব বক্তব্য রাখছেন- যেমন, ‘সরকারি দলের সদস্যরা আগুন দিয়ে আমাদের দলের সদস্যদের নাম দিচ্ছে।’ এসব ভড়ং, মিথ্যার অতি ব্যবহার তাদের সম্মানহানির যথেষ্ট বড় কারণ হচ্ছে। এটি যে বুঝতে পারছেন না, তা হতে পারে না। বুঝেশুনেও তারা না বোঝার ভান করছে কেন? নাকি অগ্নিসন্ত্রাসের পরিকল্পক-নির্দেশকের গুপ্ত খুনিদের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য তারা এসব মিথ্যাচার প্রতিদিন করে চলেছেন।

শয়তানের মগজ-জাত বর্বরতা, নাশকতার মধ্যে তারা আনন্দ পাচ্ছে। এদেরকে শয়তানের চর বললে ভুল বলা হবে না। এদের সৌভাগ্য, এদেরকে চরম সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের জন্য কোনো পরীক্ষা দিতে হয় না। এমনকি ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার প্রমাণিত তথ্য থাকা সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্রের এফবিআই কোনো প্রতিবেদন না দিয়ে ফিরে গিয়েছিল। আশ্চর্য ঘটনা। এরা, এদের মানবাধিকার সংস্থাগুলো ঐ সময়ের সরকারের বা ঐ দলের মানবাধিকারের মানের কোনো পরীক্ষা নেয়নি। অথচ মুক্তিযুদ্ধপন্থি সরকারের নানা বিষয়ে তারা পরীক্ষা নিয়েই চলেছে। একেই কি বলে বিমাতাসুলভ আচরণ? 
লেখক : শিক্ষাবিদ

×