ঢাকা, বাংলাদেশ   শুক্রবার ১৯ জুলাই ২০২৪, ৪ শ্রাবণ ১৪৩১

হারিয়ে গেছে শৈশব

প্রকাশিত: ২০:২৭, ৩ অক্টোবর ২০২৩

হারিয়ে গেছে শৈশব

সম্পাদকীয়

এক সময় স্কুলে পরীক্ষার্থীদের পরীক্ষায় প্রায়ই রচনা লিখতে দেওয়া হতো শৈশব স্মৃতি, নৌ-ভ্রমণ কিংবা রেলভ্রমণ সম্পর্কে। এখন সম্ভবত শিশু শিক্ষার্থীদের এসব পড়ানো বা শেখানো হয় না, পরীক্ষা তো দূরের কথা। কেননা, দিনবদলের সঙ্গে সঙ্গে বদলে গেছে পাঠ্যক্রম। এমনকি শিশুদের শৈশবের স্মৃতি ও অভিজ্ঞতাও প্রায় হারিয়ে যেতে বসেছে ঘরে বসে থেকে কিংবা স্কুলবন্দি অবস্থায়। রাজধানীসহ দেশের সর্বত্র দ্রুতগতিতে ঘটছে নগরায়ণ-শিল্পায়ন। রাস্তার দুইপাশে প্রায় সর্বত্র গড়ে উঠেছে ছোট-বড় শিল্প-কারখানা, হাট-বাজার, মাল্টিকমপ্লেক্স, সুপারশপ ইত্যাদি।

কলকারখানা ও ইটভাঁটির কালো ধোঁয়ায় রাজধানী থেকে বেরিয়ে তা সে যে মাধ্যমেই হোক না কেন, আবহমান গ্রাম-বাংলার চিরায়ত রূপ ও সৌন্দর্য, অবারিত স্বচ্ছ নীল আকাশ, সবুজ মাঠ, ক্ষেত-খামার, আদিগন্ত প্রান্তর কিংবা নয়ানজুলি প্রায় চোখেই পড়ে না। সেই ক্ষেত্রে শিশুরা দেখবে কি বা কি শিখবে! দেশের গ্রামাঞ্চলেও ঘটছে দ্রুত নগরায়ণ। গ্রামগুলো গড়ে উঠেছে আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সংবলিত শহর হিসেবে। প্রকৃতি ও পরিবেশ নিয়মিত দখল-দূষণে হচ্ছে জর্জরিত। ঢাকায় তো দূরের কথা, গ্রামগঞ্জের স্কুলগুলোতেও আজকাল আর খেলার মাঠ বলতে কিছু অবশিষ্ট নেই। গরু-ছাগল-ভেড়া চরার উপযোগী সবুজ ঘাসের প্রান্তর কোথায়।

সর্বত্রই চোখে পড়ে বড় বড় মোবাইল এন্টেনার টাওয়ার, ডিস এন্টেনা, ইন্টারনেট সংযোগ ইত্যাদি। অধিকাংশ শিক্ষার্থীর হাতে দেখা যায় স্মার্ট ফোন, নিদেনপক্ষে মোবাইল। করোনা অতিমারিতে এর পরিমাণ বেড়েছে বহুগুণ। ফলে, শিক্ষার্থীরা হয়ে পড়েছে মোবাইল ফোন, স্মার্টফোনে আসক্ত, গেম খেলতে অভ্যস্ত। সর্বোপরি প্রায় সবার সময় কাটে টিভিতে কার্টুন দেখে। দেশীয় ঐতিহ্য সংবলিত সংস্কৃতি, খেলাধুলা দেশে বর্তমানে প্রায় নির্বাসনে। ফলে, হারিয়ে গেছে শিক্ষার্থীদের শৈশবের ধূলিমাখা সুমধুর স্মৃতি। 
শিশু-কিশোরদের সৃষ্টিশীল মনমানসিকতা তথা সৃজনশীলতার প্রকাশ ঘটে থাকে শৈশবে। আগে ছেলেবেলায় শিশুরা কাগজ নিয়ে নৌকা, উড়োজাহাজ, পাখিসহ নানা আকর্ষণীয় ও দৃষ্টিনন্দন খেলনা তৈরি করতে অভ্যস্ত ছিল। মেঘমেদুর দিনে নবধারাজলে খানাখন্দ কিংবা বাড়ির আঙ্গিনায় সামান্য বৃষ্টির পানি জমলেই ছোট বড় নানা রঙের কাগজের নৌকা ভাসিয়ে দিত তাতে। কাগজ দিয়ে উড়োজাহাজ অথবা পাখি বানিয়ে বাতাসে ভাসিয়ে দেওয়া ছিল মজার খেলা। হায়, সেসব এখন শুধুই স্মৃতি-বিস্মৃতির আড়ালে। আজকালকার শিশু-কিশোররা সেসব কলাকৌশল জানে না বললেই চলে। তারা এমনকি মাঠেও যায় না খেলাধুলা করতে। ফাঁকা মাঠ প্রায় নেই বললেই চলে। ফলে, ব্যাহত হচ্ছে শিশু-কিশোরদের মেধার বিকাশ, সৃজনশীলতা ও সৃষ্টিশীলতা। 
একটি জাতিকে সুস্থ ও স্বাভাবিকভাবে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হলে তরুণ প্রজন্মের জন্য সংস্কৃতি চর্চা ও খেলাধুলা অপরিহার্য। খেলাধুলা ও শিল্প সংস্কৃতি শুধু শরীর ও মনের সুস্থতা নিশ্চিত করে না; এটি একটি দেশের তরুণ প্রজন্মকে বিপথগামিতার হাত থেকেও রক্ষা করে। আগামী প্রজন্ম খেলাধুলা ও সংস্কৃতি চর্চা করার মতো পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা থেকে প্রায় বঞ্চিতই হচ্ছে। যুক্ত হয়েছে নতুন বিড়ম্বনা। খেলার মাঠে আয়োজন করা হচ্ছে মেলাসহ বিভিন্ন রকমের সামাজিক ও রাজনৈতিক অনুষ্ঠানের। এসব অনুষ্ঠানের পর খোঁড়াখুঁড়ি ও নানা অব্যবস্থাপনার দরুন মাঠ হারাচ্ছে খেলাধুলার উপযুক্ততা। তরুণ প্রজন্মকে বিপথগামিতার হাত থেকে রক্ষা করে খেলার মাঠে ফিরিয়ে আনতে হলে খেলার মাঠগুলোর উদ্ধার ও পরিচর্যা এবং নিয়মিত সংস্কৃতি চর্চা করার বিকল্প নেই।

×