ঢাকা, বাংলাদেশ   শনিবার ২০ এপ্রিল ২০২৪, ৬ বৈশাখ ১৪৩১

নোবেলের দেশ থেকে

সুইডেনের ইংমার বার্গম্যান ও চলচ্চিত্র

দেলওয়ার হোসেন

প্রকাশিত: ২১:৩৭, ৮ জুন ২০২৩

সুইডেনের ইংমার বার্গম্যান ও চলচ্চিত্র

ইংমার বার্গম্যান

আজ লিখতে বসেছি- সুইডেনের মাটিতে জন্ম এমন অন্যতম এক গুণীজন সম্পর্কে, যিনি নিজের অসাধারণ কর্ম দিয়ে বিশ্বখ্যাত হয়েছেন  প্রাতঃস্মরণীয় রূপে। সমকালীন আধুনিক চলচ্চিত্রের ইতিহাসে বিশ্ব বরেণ্য যে কজন চলচ্চিত্রকারের নাম তালিকার শীর্ষ স্থানে আপন মহীমায় চলে আসে, তার মধ্যে ইংমার বার্গম্যান (ওহমসধৎ ইবৎমসধহ)-এর নামটি প্রথমেই যে উচ্চারিত হতে পারে, তা নিয়ে কারও দ্বিধা আছে বলে মনে হয় না। চলচ্চিত্র প্রেমী ও বোদ্ধাদের কাছে তার নামটি এতটাই সুবিশাল যে, চলচ্চিত্রের জগতে তিনি এমন এক বিশ্বখ্যাত ও নন্দিত  মানুষ যিনি তার নিমগ্ন জগতটিকে পরিপূর্ণ ও মহিমা মণ্ডিত করেছেন অসাধারণ চলচ্চিত্র ও নাটক নির্মাণ, পরিচালনা ও রচনা করে।

তিনি কালোত্তীর্ণ ও অবিস্মরণীয় এক নির্মাতা। শত বছর পরেও বিশ্ব চলচ্চিত্রের উপাখ্যানে তার নাম থাকবে দেদীপ্যমান- অম্লান নক্ষত্রের মতো, এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায়। জীবদ্দশায় স্টকহোমে এই মহান চলচ্চিত্রকারের সঙ্গে আমার দেখা ও তার একটি সাক্ষাৎকার গ্রহণের সুযোগ হয়েছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে সেই রেকর্ডটি হারিয়ে যায়।
এই মহান মানুষটির পুরো নাম আর্নস্ট ইংমার বার্গম্যান (Ernst Ingmar Bergman) হলেও গোটা পৃথিবীর মানুষ তাকে চেনে ইংমার বার্গম্যান নামে। সুইডিশ এই নাগরিকের নামটি সুইডেনে উচ্চারিত হয় বারিম্যান বলে। তিনি সুইডেনে উপসালা শহরে জন্মেছেন ১৪ জুলাই ১৯১৮ সালে এবং মারা যান- ৩০ জুলাই ২০০৭ সালে। বাবা এরিক বার্গম্যান ছিলেন লুথারিয়ান মিনিস্টার এবং পরবর্তীকালে যাজক। মা করিন ওকারব্লুম ছিলেন পেশায় একজন নার্স। বহুমাত্রিক প্রতিভার অধিকারী ইংমার ছিলেন একাধারে চলচ্চিত্র পরিচালক, চিত্রনাট্যকার, মঞ্চ পরিচালক ও নির্দেশক। বিখ্যাত মার্কিন চলচ্চিত্রকার উডি অ্যালেনের মতে, এ যাবত যত চলচ্চিত্রকার জন্ম নিয়েছেন, তাদের সবার সেরা তিনি। ২০০২ সালে সাইট অ্যান্ড সাউন্ড পরিচালিত জরিপ ভোটে ডাইরেক্টর অব অল টাইমের সম্মাননায় ভূষিত হওয়ার গৌরব অর্জন করেন ইংমার।
চলচ্চিত্র, টেলিভিশন, রেডিও এবং থিয়েটারের মতো সকল মাধ্যমেই তিনি কাজ করেছেন সদর্পে এবং সফলভাবে। বিনোদন জগতে বহুমুখী সৃজনশীল কাজে আমৃত্যু নিরলস আত্মমগ্ন তিনি যে কত বেশুমার কাজ করেছেন তার তালিকা দুই-এক পাতায় উল্লেখ করা যাবে না। পড়তে গেলে পাঠকের ঘটবে ধৈর্যচ্যুতি। তাই হাতে গোনা উল্লেখযোগ্য অসাধারণ কিছু কর্মের নমুনার কথাই বলবো। সেগুলোর মধ্যে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সাড়া জাগানো সবচেয়ে জনপ্রিয়তা পায় তার- দ্য সেভেন্থ সিল (১৯৫৭), ওয়াইল্ড স্ট্রবেরিস (১৯৫৭), থ্রু আ গ্লাস, ডার্কলি (১৯৬১), উইন্টার লাইট (১৯৬১), দ্য সাইলেন্স (১৯৬৩) এবং ক্রাইস অ্যান্ড হুইস্পারস (১৯৭২) ও পারসোনার (১৯৬৬) মতো বিশ্ব নন্দিত  সিনেমাগুলো। তবে ১৯৫৫ সালে তার স্মাইল অব সামার নাইট মুক্তি পাওয়ার পর তিনি নজর কাড়েন চলচ্চিত্রামোদী মহলে এবং কান চলচ্চিত্র উৎসবে মনোনীত হন পুরস্কারের জন্য।
এগুলোর মধ্যে স্বল্প পরিসরে পারসোনা ছবিটি নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে। এটি বিশ্বনন্দিত চলচ্চিত্র পরিচালক ও নির্মাতা ইংমার বার্গম্যান পরিচালিত একটি মনোজাগতিক বিশ্লেষণমূলক চলচ্চিত্র। ছবিটি এতটাই জনপ্রিয় হয় যে, বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায়ও বহুল আলোচিত-সমালোচিত একটি বিউটি পার্লারের নাম করা হয় পারসোনা। সুইডেনে সুইডিশ ভাষার এই ছবিটি মুক্তি পায় ১৯৬৬ সালে। বার্গম্যান নিজের লেখা এই ছবিটিকে তার সব ছবির মধ্যে জীবনের অন্যতম একটি  ভালো ছবি বলে বর্ণনা করেন।
এই ছবির প্রধান দুটি চরিত্র হচ্ছে অভিনেত্রী এলিসাবেথ ও সেবিকা আলমা। এলিসাবেথ মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ায় হাসপাতালে ভর্তি হন আর তার দেখভালের দায়িত্ব পড়ে আলমার ওপর। একসঙ্গে থাকা ও কথাবার্তা বলতে গিয়ে তারা একে অপরের সত্তার মধ্যে বিলীন হয়ে যান। পর্তুগিজ ও স্পেনীয় ভাষায় আলমা শব্দের অর্থ আত্মা। হতেই পারে আলমা আসলে এলিসাবেথেরই আরেক প্রতিচ্ছবি। সমালোচক ও গবেষকরা এই ছবিটির উৎস খুঁজে পান সুইডেনে আরেক বিশ্বখ্যাত নাট্যকার অগাস্ট স্ট্রিন্ডবার্গের  (২২ জানু, ১৮৪৯-১৪ মে, ১৯১২)  নাটক ‘দ্য স্ট্রংগার’ থেকে।

চলচ্চিত্র নির্মাতা এবং সমালোচকদের মতে পারসোনা- চলচ্চিত্র জগতে অতুলনীয় শৈল্পিক আবেদন সমৃদ্ধ একটি অসাধারণ সৃষ্টি। বিমুগ্ধ  প্রাবন্ধিক ও সমালোচক সুসান সোনটাগ এই ছবিটি সম্পর্কে লিখেছেন সবচেয়ে বেশি। তার মতে এটি বার্গম্যানের জীবনে করা ছায়াছবিগুলোর মধ্যে মাস্টারপিস হবার দাবি রাখে। অন্য অনেক সমালোচকের মতে, এটি শতাব্দীর সেরা শিল্পমান সমৃদ্ধ অনন্য সৃষ্টির এক উপমা। ১৯৭২ সালে ব্রিটিশ মাসিক চলচ্চিত্র বিষয়ক সাময়িকী সাইট অ্যান্ড সাউন্ড বিশ্বের সেরা ১০টি চলচ্চিত্রের তালিকা প্রণয়নের জন্য ভোট গ্রহণ করে। সেই তালিকায় পারসোনা ৫ম স্থান অধিকার করে।
মঞ্চ অভিনেত্রী এলিসাবেথের চিকিৎসার দায়িত্ব দেওয়া হয় আলমা নামের এক নার্সের ওপর। ডাক্তার অবশ্য জানান, এলিসাবেথের কোনোরকম শারীরিক বা মানসিক অসুস্থতা নেই। সমস্যাটি ঠিক ধরা যাচ্ছিল না। তিনি কারও সঙ্গে কথা বলেন না। অবস্থার পরিবর্তনের জন্য এলিসাবেথ ও আলমাকে উপকূলবর্তী এক মোটেলে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। মোটেলে কেবল এলিসাবেথ এবং আলমা। আলমা কেবল কথা বলে, আর এলিসাবেথ শুনে। সারাক্ষণ মূক হয়ে থাকে। তার মুখের অভিব্যক্তি দেখে তার ভাষা ও অবস্থা বুঝে নিতে হয়।
এভাবে একসঙ্গে থাকতে থাকতে কখন যে এলিসাবেথের সত্তার ভেতর নিজের সত্তা বিলীন হয়ে যায়, আলমা তা বুঝে উঠতে পারেনি। ছবির দর্শকদের কাছেও তা উপলব্ধির বাইরে ছিল। বোঝা যায়, হাসপাতালের ডাক্তারের কাছে লেখা একটি চিঠি থেকে।
আলমার দায়িত্ব তা পোস্ট অফিসে পোস্ট করা। তা করতে গিয়ে আর স্থির থাকতে পারেনি আলমা। পড়ে ফেলে চিঠিটি। চিঠিতে লেখা, কিভাবে আলমা এলিসাবেথের সত্তার সঙ্গে বিলীন হয়ে যাচ্ছে নিজের অজান্তেই। এলিসাবেথ তা বুঝতে পারছে। সে কথা ডাক্তারকে লিখে জানাচ্ছে। এই অবস্থা আলমার নিজের জন্য যেমন অস্বস্তিকর এবং পেশার জন্য বিপজ্জনক। আলমা ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। চিঠিটি পোস্ট না করে ফিরে এসে এলিসাবেথকে টর্চার শুরু করে নানাভাবে। মেঝেতে ব্লেড গেঁথে রাখে। এক পর্যায়ে তার শরীরে গরম পানি ঢেলে দেওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু তখনই প্রথম এলিসাবেথ কথা বলে ওঠে। তাই আহত করার উদ্দেশ্যে তার গায়ে আর পানি ঢালা হয়ে ওঠে না।

সে রাতেই প্রথম দুজনের সত্তার একীভূত হওয়ার বিষয়টি পরিচালক দর্শকদের কাছে উপস্থাপন করেন। এটি করতে গিয়ে এখানে অসাধারণ সিনেমাটোগ্রাফি ব্যবহার করেন পরিচালক। সিনেমা বোদ্ধা না হলে তা উপলব্ধি করা যাবে না। শেষে তারা এক সত্তায় মিশে অভিন্ন রূপ ধারণ করে। কে আলমা আর কে এলিসাবেথ তা বোঝা কঠিন হয়ে পড়ে। তবে এলিসাবেথ আগের মতোই নিশ্চুপ। এমন পর্যায়ে এলিসাবেথের অন্ধ স্বামী এসে আলমাকে নিজের স্ত্রী বলে দাবি করে বসে। এলিসাবেথও মেনে নেয়। কারণ সে নিজেও আলমার সত্তায় বিলীন হয়ে গেছে। বেশ কিছুদিন পর তারা হাসপাতালে ফিরে আসে। হাসপাতালে যে ধরনের সিনেমাটোগ্রাফির আশ্রয় নেওয়া হয় তা থেকে প্রতিভাত হয়েছে আলমা ও এলিসাবেথ আসলে একই ব্যক্তি। 
অনন্য সাধারণ চিত্রগ্রহণ ও নির্মাণশৈলীর অভূতপূর্ব মুন্সিয়ানার  মাধ্যমে ইংমার মানুষের নিঃসঙ্গতা, অসহায়ত্ব ও কষ্টবোধের চিত্রকে জীবন্ত রূপে পর্দায় ও মঞ্চে ফুটিয়ে তুলেছেন। চলচ্চিত্র ও টেলিভিশনের জন্য তিনি ৬০টিরও বেশি চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন যেগুলোর লেখক ও পরিচালক ছিলেন তিনি। এছাড়া পরিচালনা করেছেন ১৫০ টিরও বেশি মঞ্চনাটক। বানিয়েছেন অনবদ্য ডকুমেন্টারি ফিল্ম। তাকে ঘিরে অভিনেতা-অভিনেত্রী ও কলাকুশলীর একটি বিশাল দল গড়ে ওঠে। এদের মধ্যে আছেন হারিয়েত আন্দারসন, লিভ উলমান, গুনার বিয়র্ন স্ত্রান্দ, বিবি আন্দারসন, এর্লান্দ ইয়োসেফসন, ইনগ্রিদ থুলিন ও মাক্স ভন সিদো। 
১৯৪৪ সালে শুরু করা মহান এই ব্যক্তির ক্যারিয়ার ২০০৫ সালে এসে থেমে যায়। ছবি ও থিয়েটারের কাজ করতে তিনি ১৯৮২ সালে যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানির প্রবাস জীবন ফেলে জন্মভূমি সুইডেনে এসে স্থিরভাবে থেকে যাওয়ার চিন্তা করলেও বসে থাকেননি অলসভাবে। কাজ চালিয়ে  গেছেন সমান তালে। চিত্রজগত থেকে ২০০৩ সালে হাত গুটিয়ে নিয়ে থিয়েটারের কাজে মনোযোগ দেন। এই বছর তার শেষ নাটকটি ছিল সারাব্যান্ড। ২০০৫ সালে অসুস্থ হয়ে পড়েন। ২০০৬ সালে শরীরে অস্ত্রোপচারের পর আর স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে পারেননি। স্টকহোম থেকে দূরে ফোরও নামের একটি নির্জন দ্বীপের বাড়িতে ৮৯ বছর বয়সে ঘুমের মধ্যে মৃত্যুবরণ করেন ২০০৭ সালের ৩০ জুলাই।
এখানে লিভ উলম্যান সম্পর্কে কিছু কথাÑ বিমান প্রকৌশলী হিসেবে কর্মরত বাবার জাপানে থাকার সুবাদে তার জন্ম টোকিওতে ১৯৩৮ সালের ১৬ ডিসেম্বর। তিনি একজন নরওয়েজিয়ান। বিশ্ব নন্দিত চলচ্চিত্র অভিনেত্রী ও চিত্র পরিচালক, নাটক ও ডকুমেন্টারি নির্মাতা এবং একজন বড় মাপের লেখক। জীবনের একটি বড় সময় কাটিয়েছেন কানাডা ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। তাকে বলা হয় ইউরোপের একজন সর্বকালীন জনপ্রিয় অভিনেত্রী। দীর্ঘদিন কাজ করেছেন  বিশ্ব চলচ্চিত্রের প্রাণ পুরুষ ইংমার বার্গম্যানের সঙ্গে। তার ১০টি সাড়া জাগানো ছবিতে অভিনয় এবং পরিচালনায় সহযোগী হিসেবে কাজ করেছেন। নিজেও চলচ্চিত্রে ও থিয়েটারে ছবি, নাটক ও ডকুমেন্টারি নির্মাণ, পরিচালনা এবং চুটিয়ে অভিনয় করেছেন।
১৯৬৫-৭০ সাল পর্যন্ত বাস করেছেন ইংমার বার্গম্যানের সঙ্গে। তাদের এক কন্যা সন্তান লিন উলমান জন্ম নেয় ১৯৬৬ সালে। তিনি এখন লেখক হিসেবে স্বনামধন্য। ইংমারের ইভা বার্গম্যান নামে আরেক কন্যা সন্তানের জন্ম হয়  ১৯৪৫ সালে অন্য এক নারীর গর্ভে। তিনি এখন খ্যাতিমান চলচ্চিত্র, টিভি ও নাট্য পরিচালক ও নির্মাতা। 
লিভ উলম্যান তার অসাধারণ কর্মের স্বীকৃতিস্বরূপ পেয়েছেন আজীবন অস্কার সম্মাননা। বর্তমানে তিনি লেখালেখি নিয়ে ব্যস্ত। লিভ উলম্যান বিশ্ব খ্যাত নরওয়েজিয়ান নাট্যকার হেনরিক ইবসেনের অনেক নাটকে অভিনয় করে খ্যাতির শীর্ষে উঠেন। ইবসেনের বিখ্যাত নাটক এ ডলস হাউসে নোরা চরিত্রে অভিনয় করে বিশ্বব্যাপী নন্দিত হন লিভ উলম্যান।
স্টকহোম, ৮ জুন, ২০২৩
লেখক : সুইডেন প্রবাসী সাংবাদিক

[email protected]

×