ঢাকা, বাংলাদেশ   রোববার ২৩ জুন ২০২৪, ৯ আষাঢ় ১৪৩১

বাঙালির মুক্তির সনদ

ড. শাহজাহান মন্ডল

প্রকাশিত: ২১:১৭, ৬ জুন ২০২৩

বাঙালির মুক্তির সনদ

একজন পরিশ্রমী মানুষ তার মেধা-মনন-সময়-অর্থ ব্যয় করে তার সন্তানাদি ও পরবর্তী প্রজন্মের জন্য

একজন পরিশ্রমী মানুষ তার মেধা-মনন-সময়-অর্থ ব্যয় করে তার সন্তানাদি ও পরবর্তী প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ আশ্রয় বানাতে চায়। যদি বাপ-দাদার তৈরি বাড়ি থাকে, তাহলে তাতেই পরবর্তী প্রজন্ম টিকে থাকতে পারে। তবে বিমাতা থাকলে স্বভাবতই ঐ বিমাতা বাড়িটিকে নরক বানিয়ে ফেলে। আগুনের লেলিহান শিখা মানুষটিকে বাধ্য করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেতে। নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজ করতে। এরকম আগুন ও নির্যাতনের প্রেক্ষাপট থাকলে একটি নিরাপদ ও স্বাধীন বাড়ির স্বপ্ন দেখতে থাকে নির্যাতিত মানুষটি। ১৯৪৭ সালে ইংরেজ ঔপনিবেশিক শাসকরা তাড়া খেয়ে ভারত ত্যাগের সময় ‘পাকিস্তান’ নামক এরকম এক অগ্নিগর্ভ বাড়ি বানিয়ে রেখে যায়।

মূল ক্ষমতা দিয়ে যায় অত্যাচারী-শোষক পশ্চিম পাকিস্তানিদের হাতে। তারা যথারীতি ৯৮% বাঙালি জনগোষ্ঠী-অধ্যুষিত পূর্ব-পাকিস্তানিদের ওপর শুরু করে দেয় নির্যাতন-নিপীড়ন। এক বছরের মধ্যেই পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠী (৫৬%) বাঙালির বাংলাভাষাকে সংবিধানে স্বীকৃতি দিতে নারাজি ঘোষণা দেয়। মাত্র ৭% লোকের উর্দু ভাষাকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হিসেবে সংবিধানে ঠাঁই দেওয়া হবে বলে সদর্পে হুঙ্কার দেন পাকিস্তানের জাতির পিতা খ্যাত গভর্নর কায়েদে আযম মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ। কারণ, পাকি নেতারা ছিলেন উর্দুভাষী। এটি ছিল পৃথিবীর এক বিচিত্র ঘটনা- সংখ্যাগুরুর ওপর সংখ্যালঘুর অত্যাচার। এ হুঙ্কারে এতটুকুও বিচলিত না হয়ে অনড় প্রতিবাদী হিসেবে যে কজন বাঙালী অসম সাহস নিয়ে বাধা হয়ে দাঁড়ান, তাঁদের প্রধান শেখ মুজিবুর রহমান।

তখন থেকেই তিনি উপলব্ধি করেন অগ্নিবাড়ির উত্তাপ। দার্শনিকের মতো এ-ও বুঝতে পারেন যে, এ উত্তাপ শুধু ভাষাকেন্দ্রিক নিপীড়ন ও বঞ্চনায় সীমাবদ্ধ থাকবে না, আরও শাখা-প্রশাখা ছড়াবে। বস্তুত হয়েছিল তাই। পরবর্তীতে কয়েকটি ঘটনা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবসহ আওয়ামী লীগকে ঠেলে দেয় ছয় দফা আন্দোলনের দিকে।
বায়ান্নর ২১ ফেব্রুয়ারি যখন আওয়ামী লীগ নেতা শেখ মুজিবুর রহমান জেলবন্দী ছিলেন, তখন সালাম-জব্বার-বরকতদের মিছিলে গুলিবর্ষণ করে হত্যা করে পাক-সরকার। এর ধারাবাহিকতায় ১৯৫৬ সালের ২৩ মার্চ পাকিস্তানের প্রথম সংবিধানে উর্দুর সঙ্গে বাংলাও স্বীকৃতি পায় রাষ্ট্রভাষার। তৎপূর্বে ১৯৫৩ সালের ৪ ডিসেম্বর শেখ মুজিবুর রহমানের দূরদর্শী ও আদর্শিক কৌশলে আওয়ামী মুসলিম লীগের সঙ্গে কৃষক-শ্রমিক পার্টি, পাকিস্তান গণতান্ত্রিক দল ও পাকিস্তান খেলাফত পার্টি যুক্ত হয়ে ‘যুক্তফ্রন্ট’ নামে রাজনৈতিক জোট তৈরি হয়। ১৯৫৪ সালের মার্চের ৮-১২ তারিখে অনুষ্ঠিত পূর্ব-পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনে ২৩৭টি আসনের মধ্যে ২২৩টি পায় যুক্ত ফ্রন্ট (প্রধান দল আওয়ামী মুসলিম লীগ পায় ১৪৩টি)। সাম্প্রদায়িক দল মুসলিম লীগ পায় মাত্র ৯টি।

এরপর আটান্নতে স্বঘোষিত ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খানের মার্শাল ল ঘোষণার মাধ্যমে ছাপ্পান্নর সংবিধান বা পাকিস্তানের প্রথম সংবিধান স্থগিত করা হয়। এর অর্থ ছিল সংবিধানে উল্লিখিত জনগণের মৌলিক অধিকারসমূহ হরণ। বাষট্টিতে  আইয়ুব খান ‘মৌলিক গণতন্ত্র’ নামের বায়বীয় এক নির্বাচন পদ্ধতি সংবলিত সংবিধান চালু করে। এর অর্থ, প্রতি ইউনিয়ন পরিষদের মাত্র ১০ জন লোক (৯ জন মেম্বার ও ১ জন চেয়ারম্যান) ভোট দিয়ে প্রেসিডেন্ট ও অন্যান্য প্রতিনিধিকে নির্বাচিত করবে। জনগণ সরাসরি ভোট দিতে পারবে না। এরপর ঘটে সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ঘটনা। ১৯৬৫ সালে পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যে যে যুদ্ধ হয়, তাতে পূর্ব-পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের সীমান্ত সম্পূর্ণ অরক্ষিত রাখে পাকিসরকার। সৈন্য মোতায়েন করে কেবল পশ্চিম পাকিস্তানের পাক-ভারত সীমান্তে। অথচ পুরো পাকিস্তানের ৬০% সামরিক ব্যয়ভার বহন করা হতো পূর্ব-পাকিস্তানের টাকায়।  এ সমস্ত ঘটনা বাঙালিকে ঠেলে দেয় ছয় দফার দিকে।
১৯৬৬ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি লাহোরে বিরোধী দলসমূহের কনভেনশনে তরুণ অথচ প্রাজ্ঞ নেতা শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালিদের ওপর সাতচল্লিশ থেকে শুরু হওয়া পাকিস্তানি অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে উত্থাপন করতে বাধ্য হন ৬ দফা দাবি, যা ছিল বাঙালির মুক্তির সনদ বা ম্যাগনাকার্টা। এগুলো হলোÑ (১) পাকিস্তান হবে ফেডারেল রাষ্ট্র, প্রদেশের থাকবে স্বায়ত্তশাসন, (২) দেশরক্ষা ও বৈদেশিক সম্পর্ক থাকবে কেন্দ্রের হাতে, অন্যান্য বিষয় থাকবে প্রদেশের হাতে, (৩) দুই প্রদেশের থাকবে দুটো পৃথক মুদ্রা, অথবা এক মুদ্রা হলে দুই প্রদেশে দুটি পৃথক রিজার্ভ ব্যাংক (যাতে এ প্রদেশের মুদ্রা ঐ প্রদেশে পাচার না হয়), (৪) রাজস্ব, কর বা শুল্ক আরোপ ইত্যাদি থাকবে প্রদেশের হাতে, (৫) প্রদেশগুলো নিজের উপার্জিত বৈদেশিক মুদ্রার মালিক হবে, তবে একটি নির্দিষ্ট অংশ দেবে কেন্দ্রকে, এবং (৬) আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য প্রদেশের থাকবে নিজস্ব সামরিক বা আধা সামরিক বাহিনী। আওয়ামী লীগের নির্বাহী কমিটি ও কাউন্সিল হয়ে এটি চূড়ান্তভাবে ঘোষিত হয় ২৩ মার্চ। এর সপক্ষে ৭ জুন পূর্ব-বাংলায় সর্বাত্মক হরতাল পালিত হয়।

সরকারী ঘাতকের বুলেট গর্জে ওঠে ৬ দফার পক্ষের মিছিলে। প্রাণ ঝরে পড়ে তেজগাঁওয়ের শ্রমিক মনু মিয়াসহ ১২ বাঙালির। ৬ দফা ঘোষণার পর আইয়ুব খান বঙ্গবন্ধুকে চিহ্নিত করেন ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী’ হিসেবে। সরকার বঙ্গবন্ধুসহ ৩৪ জনের বিরুদ্ধে দায়ের করে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা, যা জনগণের চাপে প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়। এর ধারাবাহিকতা ও প্রভাবে ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান ও সত্তরের নির্বাচনে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় পার্লামেন্টের ৩১৩ আসনের মধ্যে আওয়ামী লীগ লাভ করে ১৬৭ আসন। সংখ্যাঘরিষ্ঠ অর্জন সত্ত্বেও আওয়ামী লীগের হাতে ক্ষমতার্পণ না করা ও বাঙালির ওপর পাক-বাহিনীর ইতিহাসের জঘন্যতম নৃশংস গণহত্যা বঙ্গবন্ধুকে বাধ্য করে একাত্তরের ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করতে।

এরপর নয় মাসের সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ, ৩০ লক্ষ মানুষের জীবনদান, ৩ লক্ষ মা-বোনের স্বর্গীয় সম্ভ্রমহানি, অগণিত মুক্তিযোদ্ধা আহত ও পঙ্গুত্ববরণ এবং বাঙালির চূড়ান্ত বিজয়। ঘটনার পরম্পরায় প্রমাণিত হয় যে, স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশের চূড়ান্ত বিজয়ের পেছনে মূল চালিকাশক্তি ছিল বঙ্গবন্ধু কর্তৃক প্রচ- দুঃসাহসিক দূরদর্শী ৬ দফা দাবির যথাযথ ঘোষণা ও বাস্তবায়ন। 
১২১৫ সালে ইংরেজ জনগণের এলিট শ্রেণি ব্যারনদের (বা জমিদারদের) সঙ্গে রাজা জন টেমস্ নদীর তীরে রাণীমেডের সবুজ তৃণক্ষেত্রে যে চুক্তি সই করতে বাধ্য হন, তা ইতিহাসে ম্যাগনাকার্টা বা মহামুক্তির সনদ হিসেবে পরিচিত। এর মাধ্যমে অনেক নাগরিক-রাজনৈতিক অধিকার ও নিশ্চয়তা ব্যারনরা আদায় করে নিয়েছিল, যার অনেকটাই বঙ্গবন্ধুর ৬ দফার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। যেমন- জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাউন্সিলের পূর্বানুমতি ছাড়া খামখেয়ালিভাবে জনগণের ওপর কর আরোপ করা যাবে না, রাজকর্মকর্তারা যথেচ্ছভাবে জনগণের ভূ-সম্পত্তি অধিগ্রহণ করতে পারবে না, ব্যবসায়ীরা রাজ্যমধ্যে ইচ্ছেমত একস্থান থেকে অন্যস্থানে চলাফেরা করতে পারবে, কোনো স্বাধীন মানুষকে খামখেয়ালিভাবে গ্রেপ্তার, কারারুদ্ধ, সম্পত্তিচ্যুত, আইনবহির্ভূত (outlaw), দ্বীপান্তরিত বা নির্বাসিত কিংবা হয়রানির শিকার করা যাবে না। পরে এ অধিকার ও নিশ্চয়তাগুলো দ্বারা সাধারণ মানুষও অধিকারসচেতন হয়ে পড়ে, অধিকার চেয়ে বসে, লড়াই করে এবং শেষে অর্জন করে। ঘটনাসমূহে আলোকিত হয় ফ্রান্স ও আমেরিকার জনগণ, অতঃপর বিশ্বজনগণ এবং বঙ্গবন্ধুর দূরদর্শিতা-প্রত্যাশা-নেতৃত্বে পূর্ববাংলার জনগণ। 
বঙ্গবন্ধুকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, একটিমাত্র দাবি তোলা হলো না কেন। ইঙ্গিতে তিনি দুহাতের ছয়টি আঙুল তুলে এক হাতের মুষ্টি বন্ধ করে মাত্র একটি উঁচিয়ে দেখান এবং বলেন, ছয় মূলত এক। অতঃপর সেটিই হয়ে ওঠে বঙ্গবন্ধুর তর্জনি, যার তেজস্বিতা একাত্তরের ৭ মার্চ ঢাকার রেসকোর্সে বিশ্বের এযাবৎকালের সর্ববৃহৎ জনসভায় ১০ লক্ষ মানুষের সামনে  দ্ব্যর্থহীনভাবে বলে ওঠে ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম//এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’। আর এনে দেয় বাঙালি জাতির প্রাণ প্রিয় স্বাধীনতা। লক্ষ্য ছিল পাকিস্তানি শাসকদের বিমাতাসুলভ আচরণের অগ্নিগালফ থেকে সাড়ে সাত কোটি বাঙালিকে মুক্ত করা। ৬ দফা যেন ছিল ৬টি পিলার বা স্তম্ভ যা দিয়ে বঙ্গবন্ধু তাদের জন্য নিরাপদ ও স্বাধীন একটি দেশ তৈরি করে দেন, যার নাম বাংলাদেশ। 
বর্তমানেও পরাজিত পাকি আত্মারা বিএনপি-জামায়াত রূপধারণ করে প্রচ- সক্রিয়। কোটি ডলার ব্যয় করে ইউরোপ-আমেরিকার ক্ষমতাধর লবিস্ট-দূত-সংবাদমাধ্যম ও রাষ্ট্রনেতাদের মাধ্যমে তারা নারকীয় ক্ষমতা দেখাতে অপতৎপর। স্বাধীনতা ধ্বংস করতে উদ্যত। কারণ, তারা ছয় দফার মাধ্যমে আসা স্বাধীনতা চায়নি। শান্তিপূর্ণ বাংলাদেশকে আবার অগ্নিগর্ভ বানিয়ে ২০২৬-এ মধ্যম আয়ের দেশ হওয়া এবং ২০৪১-এ উন্নত রাষ্ট্র হওয়া, এমনকি বাংলাদেশের টিকে থাকাও তারা চায় না। এমতাবস্থায় আগামী দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে মনে রেখে বঙ্গবন্ধুকন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনার প্রতিটি বক্তব্য ও সিদ্ধান্ত হতে হবে ভীষণভাবে যথাযথ। তাহলেই টিকে যাবে আঠারো কোটি বাঙালির ৬ স্তম্ভের স্বাধীন সার্বভৌম বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ।


লেখক : সাবেক ডিন, আইন অনুষদ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় কুষ্টিয়া এবং কেন্দ্রীয় আইন বিষয়ক সম্পাদক, বঙ্গবন্ধু পরিষদ

×