ঢাকা, বাংলাদেশ   বৃহস্পতিবার ২৫ জুলাই ২০২৪, ১০ শ্রাবণ ১৪৩১

সডিনরি মলেব্যাগ

প্রশান্ত মহাসাগরের পাড়ে শিক্ষা বিস্তার

অজয় দাশগুপ্ত

প্রকাশিত: ২১:১৫, ৫ জুন ২০২৩

প্রশান্ত মহাসাগরের পাড়ে শিক্ষা বিস্তার

বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে অস্ট্রেলিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর যৌথভাবে কাজ করার এখনই উপযুক্ত সময়

অমিত চাকমা বলেন, বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে অস্ট্রেলিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর যৌথভাবে কাজ করার এখনই উপযুক্ত সময়। প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের মাধ্যমে দুই দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যৌথ গবেষণা কার্যক্রম, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রাম, যৌথ একাডেমিক প্রোগ্রাম ও পিএইচডি ডিগ্রি প্রদানের পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারে। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ ও বাস্তবায়নে তিনি ইউজিসির সহযোগিতা কামনা করেন। অমিত চাকমা যৌথ সহযোগিতামূলক পদক্ষেপ এগিয়ে নিতে ব্যক্তিগত পর্যায় থেকে উদ্যোগ গ্রহণ করবেন বলেও অবহিত করেন।
কে এই অমিত চাকমা? আমরা তাকে জানি না। কেন চিনি না? কারণ, আমাদের দেশে নেতা অভিনেতাদের যতটা দাম যতটা নাম তার সিকিভাগও পান না লেখাপড়ার সঙ্গে থাকা মানুষজন। অমিত চাকমা প্রশান্ত পারের সেই স্বদেশী, যার নামডাক এখন শীর্ষে। অস্ট্রেলিয়ার মতো একটি বহুজাতিক দেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর হওয়াটা চাট্টিখানি কথা না। তিনি কেবল ক্যারিয়ারের জন্য তা করলে নিশ্চয়ই দেশে গিয়ে শিক্ষা বিস্তারের জন্য এসব কাজে অংশ নিতেন না। সরকারিভাবে অস্ট্রেলিয়াকে রাজি করানো এবং এর সুফল ঘরে তোলার কাজ শুরু করায় তাকে অভিনন্দন। 
উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়নে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন এবং দেশের পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে যৌথ সহযোগিতামূলক কার্যক্রম বাস্তবায়নে আগ্রহ প্রকাশ করেছে গভর্নমেন্ট অব ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়া। কার্যক্রমের মধ্যে দুই দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যৌথ গবেষণামূলক প্রকল্প গ্রহণ, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের জন্য এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রাম, যৌথ একাডেমিক প্রোগ্রাম এবং পিএইচডি ডিগ্রিসহ শিক্ষা ও গবেষণার অন্যান্য ক্ষেত্রগুলো অন্তর্ভুক্তকরণে একমত পোষণ করেছেন ইউজিসি ও গভর্নমেন্ট অব ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়ার প্রতিনিধি দলের সদস্যরা। এসব কার্যক্রম বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করতে সম্মত হয়েছে দুই পক্ষ।

গভর্নমেন্ট অব ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়া ও ইউজিসির মধ্যে উচ্চশিক্ষার গুণগত মানোন্নয়নবিষয়ক এক গোলটেবিল আলোচনায় যৌথ সহযোগিতার বিষয়গুলো আলোচিত হয়। গভর্নমেন্ট অব ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়ার সংস্কৃতি ও কলা, ক্রীড়া ও বিনোদন, অভ্যন্তরীণ শিক্ষা এবং ঐতিহ্যবিষয়ক মন্ত্রী ডেভিড ট্যাম্পলম্যানের পক্ষে ১১ সদস্যের অস্ট্রেলীয় প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন ইউনিভার্সিটি অব ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়ার ভাইস চ্যান্সেলর অমিত চাকমা।

কিছুদিন আগে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এসেছিলেন সিডনি। তাঁর কথা উল্লেখ করছি এই কারণে নিন্দা বা সমালোচনা যাই করি না কেন, ভারতীয়দের কাছ থেকে শেখার আছে অনেক। যেমন- এদেশের প্রধানমন্ত্রী আলবেনিজি স্বয়ং বললেন, মোদি ইজ দ্য বস। এই বস ডাকার কারণ যতটা রাজনৈতিক তারচেয়ে অধিক অর্থনৈতিক ও শিক্ষা। বানের পানির মতো হুড়মুড় করে ঢুকছে ভারতের ছাত্রছাত্রীরা। আমি যেহেতু শিক্ষার সঙ্গে জড়িত, দেখছি ইদানীং পাকিস্তানি ছাত্রছাত্রীদের আনাগোনাও বেড়েছে। সে তুলনায় আমাদের দেশের ছাত্র-ছাত্রীদের আগমন সীমিত। এর মূল কারণ আমরা সবাই জানি।

খেয়াল করে দেখেন দেশের মিডিয়া বা সমাজে রাজনীতি ভোট আমেরিকার বিধিনিষেধ কালো টাকা সাদা করা নিয়ে যতটা আগ্রহ, তার এক শতাংশও নেই শিক্ষা বিষয়ে। দেশের সবচেয়ে বড় ও সেরা নামে পরিচিত বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের কথা শুনলে লজ্জা লাগে। 
যাক সে কথা। আমাদের সামনে এখন ভবিষ্যতের হাতছানি। ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদি এদেশে এসে বারবার তাঁর জনগণকে প্রমোট করে যান। এ দেশের সরকারের সঙ্গে প্রশাসনের সঙ্গে এমন একটা সম্পর্ক করে যান, যার ফায়দা পায়। আমাদের দেশের মন্ত্রী মিনিস্টাররা আসেন বেড়ান কেনাকাটা করেন আর ফিরে যান। এই যে এখন সুযোগটা এলো এর দিকে নজর দেওয়ার দরকার। তা না হলে সুযোগ হাতছাড়া হয়ে গেলে আর ফিরে আসবে না। গত কয়েক বছর ধরে সিডনিতে নেপালিদের আগমন চোখে পড়ার মতো। তারা শুধু এসেই থেমে থাকেনি। অনেক এলাকায় নিজেদের আধিপত্য বিস্তার করেছে তারা। খুব পরিশ্রমী। বিশ্বস্ত আর সুযোগের সঠিক ব্যবহার করতে জানে। তাই তারা সার্থক।
বাংলাদেশের ছাত্রছাত্রীরা নিয়মকানুনসহ মেধায় এগিয়ে আছে। তাদের রেকর্ড সবসময় ভালো। তারপরও সংখ্যায় বাড়তে না পারার কারণ হয় রাজনৈতিক, নয়তো প্রশাসনিক। এই বাধা-বিপত্তি বা নিষেধের মূল কারণ জটিলতা, মনোযোগের অভাব। সরকারের ধারণা, বিদেশে শ্রমিক বা কর্মী পাঠানোই সরকারের কাজ। কারণ, তারা টাকা পাঠায়। যে রেমিটেন্সের ওপর দেশের সরকার ও জনগণের ভাগ্য নির্ভরশীল, তাতে বিদেশে পড়ালেখা করা ছাত্রছাত্রীদেরও অংশ আছে। তারা যতটুকু সময় পায় তাকে কাজে লাগিয়ে কাজ করে দেশে টাকা পাঠায়। এই কথা ভুলে গেলে চলবে না। সবচেয়ে বড় বিষয়, আমরা কি একটি সভ্য আর মেধাবী জাতি চাই কি-না?
এটা স্বীকার করতে হবে যে, সরকারের মনোযোগ এদিকে কম। এই যে অমিত চাকমা উদ্যোগী হয়ে এগিয়ে এলেন, এমন আরও অনেকে আছেন যারা এসব কাজ করতে চায়, কিন্তু কূল খুঁজে পায় না। কূলকিনারাহীন সমাজ দেশের শিক্ষাব্যবস্থার হদিস রাখে না। অথচ এটাই হচ্ছে মেরুদ-। শিরদাঁড়া সোজা রাখা এবং মাথা উঁচু করে বাঁচার জন্য এর চেয়ে ভালো আর বড় কোনো পথ নেই। উন্নয়ন আর এগিয়ে চলা সমার্থক করতে হলে এর দিকে নজর দেওয়ার বিকল্প নেই।
সুযোগ সবসময় আসে না। ধীরে ধীরে বাংলাদেশ মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে। এ দেশের মূল সম্ভাবনা তরুণ-তরুণীর দল। রাজনৈতিক নেতা বা প্রতাপশালীদের সন্তানরা দেশে থাকে না। তারা ঠিকই বিদেশে চলে যায়। আমরা যারা প্রবাসী আমাদের সন্তানরাও সেদিক থেকে সুবিধাভোগী। এখন এই বিশ্ববলয়ে মানুষ পাখির মতো। তার ঠিকানা আকাশ। তার নিবাস যে কোনো দেশে। তাই গ্লোবাল ভিলেজে আমাদের সন্তানরা দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে পড়বে, এটাই স্বাভাবিক। আগেই বলেছি, মেধা ও শ্রমে আমাদের জায়গা বা অবস্থান শক্তপোক্ত।

এখন দরকার উদ্যোগ আর শুভ ইচ্ছা। সেটা হলেই দরজা খুলবে। অস্ট্রেলিয়ার ভিসা বা শিক্ষা বিষয়ে আগমনের জন্য পর্যাপ্ত তথ্য আর সুবিধা যেন সহজলভ্য হয়। যেন হয়রানির শিকার না হয় ছাত্রছাত্রীরা। আর এলেই সব সমস্যার সমাধান হবে ভাবলে চলবে না। এসব দেশ হচ্ছে শ্রম আর অধ্যবসায়ের দেশ। এখানে মামা-কাকা নেই। টাকার জোরও তেমন কাজ করে না। তাই মেধা আর বুদ্ধিতে শান দিয়ে যারা আসবে, তারাই একদিন দেশের মুখ উজ্জ্বল করবে। [email protected]

×