ঢাকা, বাংলাদেশ   শুক্রবার ০২ জুন ২০২৩, ১৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩০

হজরত সাদ বিন মায়াজের (রা.) জন্য মহানবীর (স.) প্রশংসা

মনিরুল ইসলাম রফিক

প্রকাশিত: ২৩:২৩, ২৫ মে ২০২৩

হজরত সাদ বিন মায়াজের (রা.) জন্য মহানবীর (স.) প্রশংসা

.

মহানবী হজরত মুহাম্মদ (.) এর খুবই আত্মঘনিষ্ঠ সাহাবী ছিলেন হজরত সাদ বিন মায়াজ (রা.) উপরন্তু তিনি ছিলেন প্রাচীন মদিনার ঐতিহ্যবাহী আউস গোত্র জোটের শীর্ষ ব্যক্তিত্ব। আউস গোত্র জোটেরআশহালশাখার সন্তান তিনি। বংশ সম্পর্কে মহানবী (.) অতি উঁচু ধারণা পোষণ করতেন। তিনি একবার বলেছিলেন: ‘আনসারদের সর্বোৎকৃষ্ট গোত্র হলো বনু নাজ্জার, এর পরবর্তী স্থান হলো আবদুল আশহাল গোত্রের।’ 

হজরত সাদের জীবনকাল বেশি দীর্ঘ ছিল না। বেশিদিন তিনি মহানবীর (.) সাহচর্যও পাননি। তবুও যেটুকু পেয়েছেন তা কাজে লাগিয়েছেন সযত্নে পঞ্চম হিজরি সনের জিলকদ মাসে ইতিহাসের সময়ে তিনি ইন্তেকাল করেন। তখন তার বয়স হয়েছিল মাত্র ৩৭ বছর। হুজুর আকরাম (.)-এঁর সঙ্গে তার জীবনের বহু ঘটনা আমাদের জন্য স্মরণীয় শিক্ষণীয় হয়ে আছে। তার প্রকৃত নাম সাদ। পিতার নাম মায়াজ। ডাকনাম আবু আমর। উপাধি সায়্যিদুল আউস বা আউস গোত্রপতি। রাসুলুল্লাহ (.) তখনও মদিনায় হিজরত করেননি। সেখানে মহানবীর (.) পক্ষ হয়ে তবলিগ ইশাআতে দ্বীনের কাজ করতেন বিখ্যাত সাহাবী মুসআব ইবনে উমাইর (রা.) হজরত মুসআবের হাতেই সাদ ইসলামের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন। পরবর্তীতে বিপদ কঠিন দিনগুলোতে হজরত সাদ হুজুর (.)-এঁর পদে পদে ছায়ার মতো অবস্থান করতেন। তার মা ফাবাশা বিনতে রাফি (রা.) সর্বদা ছেলের সৎ ন্যায়সঙ্গত কর্মকান্ডে জন্য অনুপ্রেরণা জোগাতেন। আসলে যে কোনো সন্তানের জীবনে পিতা-মাতার প্রভাবই অধিক কার্যকরী হয়ে থাকে। ক্ষেত্রে মায়ের প্রভাব অগ্রগণ্য। তার অসিলায় বনু আবদুল আশহাল গোত্রের সব নারী-পুরুষ ইসলাম গ্রহণ করেছেন।

তিনি বদর, ওহুদ খন্দক যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন। পঞ্চম হিজরিতে সংঘটিত খন্দকের যুদ্ধে শত্রুদলের হিব্বান ইবনে আরিক্বাহর নিক্ষিপ্ত একটি তীর তার দেহে বিদ্ধ হয়। আহত অবস্থায় তিনি মহান আল্লাহর কাছে এই মর্মে দোয়া করেন যে, তিনি যেন তাকে বনু কুরাইজার বিচার পর্যন্ত হায়াত দান করেন। কারণ, বনু কুরাইজা খন্দকের যুদ্ধে মুসলমানদের সঙ্গে চরম গাদ্দারি করে। মুসলমানদের সঙ্গে সম্পাদিত মৈত্রী চুক্তি ভঙ্গ করে মক্কার মুশরিকদের গোপনে সহায়তা করে। মহান আল্লাহ তার দোয়া কবুল করেন। পরবর্তীকালে আঘাতের অসুস্থতায় তার মৃত্যু ত্বরান্বিত হয়। তিনি যতদিন অসুস্থ ছিলেন মহানবী তাকে দেখতে যেতেন। অসুস্থ-পীড়িতদের দেখতে যাওয়া, খোঁজখবর নেওয়া হজরতের রাসুল (.)  সুন্নত মুসলমান পরম্পরায় অন্যতম হক। দীর্ঘ এক মাস তার ক্ষত ভালো হয়নি। খন্দক যুদ্ধের পরপরই রাসুল (.) বনু কুরাইজার বিরুদ্ধে অভিযান চালান। তাদের দুর্গ অবরোধ করে রাখেন। অবশেষে তারা সাদ ইবনে মুয়াজ (রা.)-এর ফয়সালার ওপর রাজি হয়ে দুর্গ থেকে বেরিয়ে আসে। তাদের ধারণা ছিল সাদ (রা.) তাদের পক্ষে ইতিবাচক ফয়সালা করবেন। কেননা সাদ (রা.) ছিলেন আউস গোত্রের নেতা। তার গোত্রের সঙ্গে বনু কুরাইজার ছিল মৈত্রী সম্পর্ক। কিন্তু সাদ (রা.) ইসলামের স্বার্থে এক চুল পরিমাণও ছাড় দিতে রাজি হননি।

অসুস্থ অবস্থায় তিনি মসজিদ--নববীর অন্দরে একটি তাঁবুতে অবস্থান করছিলেন। রাসুল (.) তাকে ময়দানে নিয়ে আসতে বলেন। বিশেষ ব্যবস্থাপনায় একটি ঘোড়ায় উঠিয়ে তাকে রাসুল (.)-এর কাছে আনা হয়। তার বাহন রাসুল (.)-এর তাঁবুর কাছাকাছি এলে তিনি আনসারদের বলেন, ‘তোমাদের নেতার সাহায্যের জন্য উঠ। তাকে বাহন থেকে সযতত্নে নামিয়ে নাও।অতঃপর রাসুল (.) তাকে বলেন, এরা (ইহুদিরা) তোমার ফয়সালার ওপর রাজি হয়ে আত্মসমর্পণ করেছে। কিন্তু সাদ (রা.) ইসলামের স্বার্থে এক চুল পরিমাণও ছাড় দিতে রাজি হননি। তিনি তাদের অতীত নিষ্ঠুর মুনাফিকীগুলো ছাড় দিতে রাজি হননি। দলবদ্ধভাবে ইসলামের ক্ষতি করা, সাহাবীদের হত্যা করার বিষয়গুলো সামনে এনেছেন। তাই নারী-পুরুষের মধ্যে যার যে প্রায়শ্চিত্ত তা প্রদানের পক্ষে মত দিয়েছেন।

রাসুল (সা.) বলেন, ‘তুমি আল্লাহর হুকুম অনুযায়ী ফয়সালা করেছ।ফয়সালার পরপরই তার জখম থেকে রক্তক্ষরণ শুরু হয়। অল্প সময়ের মধ্যে তিনি শাহাদাতের অমিয় সুধা পান করেন। (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া : /১২৬-১২৭) হজরত সাদের অসুস্থতা বৃদ্ধির খবর পেয়ে মহানবী (.) দ্রুত তার নিকট রওনা দেন। কিন্তু ততক্ষণে হজরত সাদ শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। হুজুর (.) তার লাশ আপন কোলে তুলে নেন। বয়োবৃদ্ধ সাহাবী আবু বকর (রা.) সাদের মৃত্যুতে ভেঙে পড়েন। তিনি বলেন, সাদের তিরোধানে যেন আমার কোমর ভেঙে গেল। হুজুর (.) তাকে সান্ত¦না দিয়ে বললেন: ‘এমন বলতে নেই।হজরত উমর (রা.) কান্নাজড়িত কণ্ঠে বললেন, ‘ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। আমরা সবাই তো আল্লাহরই সৃষ্টি, তাঁরই দিকে সবাইকে ফিরে যেতে হবে।তার দুঃখিনী মা বলে বিলাপ করতে লাগলেন যে, ‘সাদের জননীর সর্বনাশ হলেও বীরত্ব, ধৈর্য দৃঢ়তার মাধ্যমে সাদ সৌভাগ্যশালী হয়েছেন।

প্রিয় নবী (.) মন্তব্য করলেন, ‘অন্য ক্রন্দনকারিণীগণ মিথ্যা বলে, কিন্তু এই মহিলা সত্যই বলছেন।সাধারণত লাশের পাশে কান্নাকাটি করতে নেই। নীরবে দোয়া দরুদ তিলাওয়াতের অনুমতি রয়েছে। যতক্ষণ না দাফনের আয়োজন সম্পন্ন হয়। কান্নাকাটির মাধ্যমে অনেক সময় অযাচিত কথা বের হয়। যা মুর্দার জন্য হয়ত অকল্যাণকর। আর এমনি পরিবেশে উচ্চ নারীকণ্ঠ শোভনীয় নয়। কিন্তু সাদের মা যিনি কিনা একজন পাক্কা আশেকে রাসুল মুসলিম, তিনি কান্নার মাধ্যমে যে ঈমানী এবং সত্যদীপ্ত উচ্চারণ করেছেন, তাতে প্রিয় নবী (.) প্রশংসা না করে পারেননি। পরে হুজুর (.) স্বয়ং সাদের জানাজার নামাজে ইমামতি করলেন। এমনিতেই হজরত সাদ নবীজীর প্রিয়পাত্র হওয়ার কারণে নাজাতপ্রাপ্তদের একজন। সেখানে যখন পেয়ারা নবী স্বয়ং তার জানাজার নামাজে ইমামতি করলেন তখন তার ব্যাপক উচ্চ মর্যাদার কথা বলাই বাহুল্য।

মহানবী (.) এর অসংখ্য সাহাবা তাঁর পবিত্র হাদিস বা বাণী বর্ণনা করে ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছেন। কিন্তু সাদের পক্ষে তা সম্ভব হয়নি। কেননা, মহানবীর (.)  তিরোধানের পরেই হাদিস বর্ণনার কাজ শুরু হয়েছিল। অথচ সাদ বহু আগে মৃত্যুবরণ করেন। তবুও দুএকটি হাদিসে তার উদ্ধৃতি পাওয়া যায়। বুখারী শরীফে হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)  কর্তৃক এক বর্ণনায় তার ওমরা পালনের কথা আলোচিত হয়েছে। নৈতিকতার মানদন্ডে হজরত সাদ খুব উঁচু স্তরের লোক ছিলেন। হুজুরে আকরাম (.)-এর পত্নী হজরত আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেছেন, রাসুল (.) বলেছেন, ‘আশহাল গোত্রের তিন ব্যক্তি সবচেয়ে বেশি উঁচু মর্তবার ছিলÑ তার মধ্যে সাদ ইবনে মায়াজ, উসাইদ ইবনে হুজাইর এবং উবাদা ইবনে বাশার (রা.)তাকে আনসার সম্প্রদায়েরসিদ্দিকে আকবর’ (শ্রেষ্ঠতম সত্যবাদী) হিসেবে পরিগণিত করা হতো। হজরত সাদ স্বয়ং বলতেন, ‘এমনিতেই আমি একজন সাধারণ মানুষ। কিন্তু তিনটি বিষয়ে আমি মানুষের যে স্তরে পৌঁছানো উচিত, সে স্তরে পৌঁছেছি। () আমি রাসুলুল্লাহকে (.) যে হাদিস বর্ণনা করতে শুনি তা প্রভুর পক্ষ থেকে আসে বলে বিশ্বাস করি। () নামাজের মধ্যে আমার অন্তরে অন্য কোনো ধারণা সৃষ্টি হয় না। () যখন কারও লাশের পেছনে চলি তখন কবরের ফেরেশতা মুনকার নকিরের নানা প্রশ্নের স্মরণে ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ি।এখান থেকে প্রিয় নবীর সাহাবী হজরত সাদের ধর্মনিষ্ঠা জবাবদিহিতার মনোভাব আঁচ করা যায়।

হাদিসে এসেছে, ‘দাফনের পর কবরের আজাব চাপ হতে কেউ যদি সত্যিই পরিত্রাণ পেত, তাহলে সাদ ইবনে মায়াজই পেত।’-(আহমদ, বায়হাকী- হজরত আয়েশার বর্ণনা) মহানবী (.) বিভিন্নভাবে হজরত সাদ ইবনে মায়াজের প্রশংসা পরকালীন পুরস্কারের কথা বলেছেন। আর তার বিষয়ে পুরস্কারের কথা বলা এবং উচ্চ ধারণা পোষণ করার সঙ্গত কারণও রয়েছে। সত্যি সত্যি যে তিনটি কারণে মানুষ দুনিয়াতে নিষ্কলুষ জীবন ধারণের অনুপ্রেরণা পায় এবং পরকালে নাজাতপ্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত হয়, হজরত সাদ প্রিয় নবী হজরত রাসুলে কারীমের (.) পূতসান্নিধ্যে এসে সে তিনটি মণিমুক্তো নিজের দেহমনে ধারণ করতে পেরেছিলেন। তাই হজরত সাদ সার্থক, ধন্য। তার আদর্শ দুনিয়ার আদর্শ অন্বেষী মানুষের। আমরা সে তিনটি বিশ্বাস চরিত্রকে এখানে আবার তুলে ধরছি।

. মহানবী হজরত মুহাম্মদ (.) তাঁর বাণীকে পূর্ণ ভক্তি, আস্থা বিশ্বাসের সঙ্গে গ্রহণ।  . নামাজের মধ্যে পূর্ণ একাগ্রতা। যাকে ধর্মীয় পরিভাষায় বলা হয় খুযুখুশু। যা আজ খুব কম নামাজীর মধ্যে পরিলক্ষিত হয়।  . কবর দেখলে কবর আযাব পরকালীন চিন্তায় সন্ত্রস্ত হওয়া।

মদিনার প্রাচীনতম পবিত্রতম কবরস্থানজান্নাতুল বাকীতে তিনি চিরশায়িত আছেন। -(মিশকাত) তার ইন্তেকালের পর জিবরাঈল (.) রেশমি পাগড়ি পরিধান করে রাসুল (.)-এঁর দরবারে উপস্থিত হয়ে বলেন, কে মৃত্যুবরণ করেছে, যার জন্য আসমানের দরজাগুলো খুলে দেওয়া হয়েছে এবং যার কারণে আরশে কম্পন সৃষ্টি হয়েছে? রাসুল (.) দৌড়ে যান সাদ (রা.)-এর কাছে। গিয়ে দেখেন তিনি আর বেঁচে নেই। (বুখারি, হাদিস : ৩৮০৩; মুসলিম, হাদিস : ২৪৬৬) আসুন, আমরা রাসুলের (.) মহান সাহাবীর ওফাত মৌসুমে তাকে স্মরণ করি এবং তার আদর্শে নতুনভাবে উজ্জীবিত অনুরণিত হই।

লেখকঅধ্যাপক, টিভি উপস্থাপক জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত খতীব

[email protected]