ঢাকা, বাংলাদেশ   মঙ্গলবার ১৮ জুন ২০২৪, ৪ আষাঢ় ১৪৩১

আওয়ামী লীগ নেতা, সাবেক মন্ত্রী, প্রয়াত মোহাম্মদ নাসিমের ৭৫তম জন্মদিন আজ

রাজনীতির আকাশে উজ্জ্বল নক্ষত্র

ওবায়দুল কবির

প্রকাশিত: ২০:২৭, ১ এপ্রিল ২০২৩

রাজনীতির আকাশে উজ্জ্বল নক্ষত্র

মোহাম্মদ নাসিমের ৭৫তম জন্মদিন আজ

২০০২ সালের ২৬ ডিসেম্বর আওয়ামী লীগের ১৭তম সম্মেলনের পরদিন একটি জাতীয় পত্রিকার শিরোনাম ছিল ‘একটি নক্ষত্রের পতন’। শিরোনামের দুটি শব্দের মধ্যে একটি ছিল সঠিক, অপরটি নয়। সেদিন ‘নক্ষত্র’ হিসেবে বলা হয়েছিল আওয়ামী লীগ নেতা মোহাম্মদ নাসিমকে। বাস্তবে সেদিন নক্ষত্রের ‘পতন’ হয়নি। পত্রিকাটি একটু আগেই রিপোর্টটি করে ফেলেছিল। রাজনীতির উত্থান পতনে সেদিন নক্ষত্রটি একটু হোঁচট খেয়েছিলেন মাত্র। পরে আবার মাথা উঁচু করে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে প্রমাণ করেছিলেন, নক্ষত্রের পতন ঘটেনি।

তিনি তাঁর যোগ্যতা, দক্ষতা এবং কর্মনিষ্ঠায় দাঁড়াতে পেরেছিলেন সোজা হয়ে। যতদিন বেঁচেছিলেন, মাথা সোজা করেই বিচরণ করেছেন রাজনীতির মাঠে। তিনি আওয়ামী লীগের সাবেক প্রেসিডিয়াম সদস্য, সাবেক স্বরাষ্ট্র, স্বাস্থ্য, পূর্ত, ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী এবং জাতীয় চার নেতার অন্যতম ক্যাপ্টেন মনসুর আলীর সুযোগ্য উত্তরসূরি মোহাম্মদ নাসিম। করোনার করাল গ্রাস তাঁকে সবার কাছ থেকে কেড়ে নিয়েছিল ২০২১ সালের ১৩ জুন। আজ সেই মহান নেতার ৭৫তম জন্মদিন। শুভ জন্মদিন আমাদের প্রিয় নাসিম ভাই।     
আওয়ামী লীগের ১৭তম জাতীয় সম্মেলন হচ্ছিল আউটার স্টেডিয়ামে (সাবেক পল্টন মাঠ)। ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াত জোট দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় বসেই রুদ্রমূর্তি ধারণ করে। সদ্য ক্ষমতা থেকে বিদায় নেওয়া দলটির নেতা-কর্মীরা ক্ষমতাসীনদের নির্যাতনে প্রায় দিশেহারা। শক্ত হাতে হাল ধরেছিলেন দলীয় প্রধান শেখ হাসিনা। সারাদেশ চষে বেড়িয়েছেন তিনি। নির্যাতিত নেতা-কর্মীদের পাশে দাঁড়িয়েছেন সশরীরে। তাঁর প্রায় প্রতিটি সফরের সঙ্গী ছিলাম আমি। প্রত্যক্ষ করেছি নির্যাতনের চিত্র।

পত্রিকার পাতায় তুলে ধরেছি ভয়াবহ সেই নির্মমতা। এমন একটি সময় দলের সম্মেলন ডাকা হয়। অনেক জল্পনা-কল্পনা ছিল এই কঠিন সময় কে হচ্ছেন শেখ হাসিনার কর্মসারথি, দলের সাধারণ সম্পাদক। তিনি বেছে নিলেন দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য আবদুল জলিলকে। সম্মেলনের আগে পর্যন্ত দলের সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন মোহাম্মদ নাসিম। 
সম্মেলনে ধারণা করা হয়েছিল, মোহাম্মদ নাসিমকে দলের সাধারণ সম্পাদক করা না হলেও প্রেসিডিয়াম পদে নির্বাচন করা হবে। প্রথম দিন আবদুল জলিলকে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচন করা হয় এবং ঘোষণা করা হয় দলের প্রেসিডিয়াম সদস্যদের নাম। সেখানে মোহাম্মদ নাসিমের নাম ছিল না। সত্যিকার অর্থে সেদিন পর্যন্ত ঘোষিত কমিটিতে মোহাম্মদ নাসিমের নাম কোথাও ছিল না। এ কারণেই প্রত্রিকাটির শিরোনাম হয়েছিল ‘একটি নক্ষত্রের পতন’।

কয়েকদিন পরে অবশ্য পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা হলে দেখা যায়, তাঁকে দলের কার্যনির্বাহী কমিটির এক নম্বর সদস্য রাখা হয়। ২০০৮ সালের অনুষ্ঠিত সম্মেলনেও তাঁকে কার্যনির্বাহী কমিটির প্রথম সদস্য করা হয়েছিল। ২০১২ সালের সম্মেলনে তাঁকে প্রেসিডিয়াম সদস্য পদে নির্বাচন করা হয়। আমৃত্যু তিনি সেই পদেই বহাল ছিলেন। 
তাঁর সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত সম্পর্ক পারিবারিক পর্যায় পর্যন্ত গড়িয়েছিল। সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্নায় তাঁকে পেয়েছিলাম অভিভাবকের মতো। শুধু আমি নয়, এমন অনেক সাংবাদিকের সঙ্গেই তাঁর ব্যক্তিগত সম্পর্ক ছিল খুবই গভীর। ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান মোহাম্মদ নাসিম বরাবরই ‘মিডিয়া বান্ধব’। নিজে প্রচার পছন্দ করতেন, তাই মিডিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষা করে চলতেন সব সময়। মিডিয়াও তাঁকে দিয়েছে অনেক। নেতৃত্বের পূর্ণতা দিয়ে তাঁকে নক্ষত্র তৈরির পিছনে তাঁর পরিশ্রম, নিষ্ঠা, দক্ষতা ছাড়াও ছিল মিডিয়ার ভূমিকা। এছাড়া তিনি সর্বোচ্চ ত্যাগের মাধ্যমে দলীয় প্রধান শেখ হাসিনার বিশ্বাস অর্জন করতে পেরেছিলেন।

১৯৭৫ সালে বেইমান মোস্তাককে প্রত্যাখ্যান করে ক্যাপ্টেন মনসুর আলী বলেছিলেন, ‘মৃত্যুকে আলিঙ্গন করব, কিন্তু বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে বেইমানী করব না।’ তিনি করেছিলেনও তাই। জীবন দিয়ে তিনি তাঁর কথা রক্ষা করেছিলেন। ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় সেনাবাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন মোহাম্মদ নাসিম। তাঁর উত্তরসূরির মতোই সরকারের সকল প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে মাথা উঁচু করে বলেছিলেন, ‘মৃত্যুকে আলিঙ্গন করব, কিন্তু বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার সঙ্গে বেইমানী করতে পারব না।’ জীবন দিতে না হলেও দুই বছর সেনাশাসিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অত্যাচার নির্যাতন সহ্য করে পঙ্গু হয়ে তাঁকে জেল থেকে বের হতে হয়েছিল।    
’৮১ সালে দেশে ফিরে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগের হাল ধরেন। এরপর থেকেই বিশ্বস্ততার সঙ্গে তাঁর সঙ্গে থেকেছেন মোহাম্মদ নাসিম। শহীদ পরিবারের সন্তান হিসেবে শেখ হাসিনাও তাঁকে আস্থা ও বিশ্বাসে কাছে টেনে নিয়েছিলেন। সেই মর্যাদাও রেখেছেন তিনি। দলের দুর্দিনে, রাজনৈতিক বিভাজনে অন্ধভাবেই সমর্থ জানিয়েছিলেন তাঁর প্রিয় নেত্রীকে। ১৯৯৩ সালে দলের সঙ্গে ড. কামাল হোসেনের টানাপোড়েন তৈরি হলে যে ক’জন নেতা দৃঢ়তার সঙ্গে শেখ হাসিনার পাশে দাঁড়িয়েছিলেন তাঁদের মধ্যে মোহাম্মদ নাসিম অন্যতম।

২০০১ সালের পর ঘটনাক্রমে নেত্রীর সঙ্গে কিছুটা দূরত্ব  তৈরি হলেও তিনি আস্থা হারাননি কখনো। খুব কাছ থেকে দেখেছি তাঁর এই অগাধ আস্থা-বিশ^াস। হতাশা থাকলেও বিশ^াসে চিড় ধরেনি কখনো। ভুলেও তিনি তাঁর প্রিয় নেত্রী সম্পর্কে প্রকাশ্যে কিংবা গোপনে একটি নেতিবাচক শব্দও উচ্চারণ করেননি কখনো। তিনি বিশ^াস করতেন, নেত্রী ঠিক তাঁকে একদিন কাছে টেনে নেবেন। হয়েছিলও তাই। এ কারণে তিনি আবার দলের মূল স্রোতে ফিরতে পেরেছিলেন দাপটের সঙ্গে। নক্ষত্রের পতন স্থায়ী হয়নি খুব বেশিদিন।  
মোহাম্মদ নাসিম ১৮৪৮ সালের ২ এপ্রিল তৎকালীন পাবনা জেলার কাজিপুর থানায় জন্মগ্রহণ করেন। ছাত্রজীবনে পাবনা অঞ্চলের বিখ্যাত ভুট্টা আন্দোলনে যোগ দিয়ে তিনি তাঁর পিতা মনসুর আলীর সঙ্গে প্রথম কারাবরণ করেছিলেন। কারাগারে বসে পরীক্ষা দিয়েই তিনি আইএ পাস করেন। ১৯৬৭ সালে তিনি পাবনা অ্যাডওয়ার্ড কলেজ ছাত্র সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন। পুরো প্যানেলে একমাত্র তিনিই ছাত্রলীগ থেকে বিজয়ী হয়েছিলেন।

১৯৭১ সালে তিনি যোগ দেন মুক্তিযুদ্ধে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর  দেশে ফিরে লেখাপড়ার পাশাপাশি রাজনীতিতে সক্রিয় হন এবং যুবলীগে যোগ দেন এবং কেন্দ্রীয় যুব লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য পদে নির্বাচিত হন। জগন্নাথ বিশ^বিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করে তিনি যোগ দেন আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে। ১৯৭৪ সালে তিনি পাবনা জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ’৭৫ সালে তিনি বাকশালের পাবনা জেলার গভর্নর নির্বাচিত হন। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর তাঁর পিতাসহ চার জাতীয় নেতাকে কারাগারে হত্যা করা হয়। মোহাম্মদ নাসিম তখন প্রতিরোধ গড়ে তোলার লক্ষ্যে একদল মুক্তিযোদ্ধাকে সঙ্গে নিয়ে ভারতে চলে যান।

ভারতে থেকে তিনি বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় চার নেতা হত্যার বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলার চেষ্টা করেন। ১৯৮০ সালে তিনি দেশে ফিরলে বিমানবন্দরেই তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। এক বছর কারাবাসের পর দলীয় সভানেত্রী শেখ হাসিনার দেশে ফেরার কিছুদিন আগে তিনি জেল থেকে মুক্তি পান। 
১৯৮১ সালে আওয়ামী লীগের জাতীয় সম্মেলনে ভারতে প্রবাসী শেখ হাসিনাকে দলের সভাপতি নির্বাচন করা হয়। এই কমিটিতে মোহাম্মদ নাসিমকে করা হয় দলের যুব বিষয়ক সম্পাদক। রাষ্ট্রীয় বাধা পেরিয়ে শেখ হাসিনা দেশে  ফেরার পর মোহাম্মদ নাসিম তাঁর সার্বক্ষণিক সঙ্গী ও সহকর্মী হিসেবে সাহস ও বিশ^স্ততার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে যান। হাতে গোনা যে কয়েকজনকে শেখ হাসিনা বিশ^াস করতেন, আস্থা রাখতেন তাদের মধ্যে অন্যতম হয়ে ওঠেন মোহাম্মদ নাসিম। আমৃত্যুও তিনি নেত্রীর এই আস্থা বিশ্বাসের মর্যাদা দিয়েছেন।
১৯৮৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি সিরাজগঞ্জ-১ আসন থেকে প্রথম সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৮৭ সালের জাতীয় সম্মেলনে তাঁকে দলের প্রচার সম্পাদক করা হয়। ’৯২ এবং ’৯৭ সালের সম্মেলনে তিনি দলের সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্ব পান। তখন দলের সাংগঠনিক সম্পাদক পদ ছিল একটি। তাঁর আগে দলের সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন তোফায়েল আহমেদ। ২০০২ সালে সাংগঠনিক সম্পাদকের পদ বাড়িয়ে করা হয় পাঁচটি। ২০০২ এবং ২০০৮ সালের সম্মেলনে তাঁকে দলের কার্যনির্বাহী সংসদের এক নম্বর সদস্য করা হয়।

২০১২ সালের কাউন্সিলে তাঁকে দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য পদে নির্বাচিত করা হয় এবং আমৃত্যু তিনি এই পদেই বহাল ছিলেন। ’৮৬ সালের পর তিনি ১৯৯১, ২০০১, ২০১৪, ২০১৮ সালে মোট পাঁচবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। ’৯১ সালের সংসদে তিনি ছিলেন সংসদে বিরোধী দলের চীফ হুইপ। ’৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করলে তিনি প্রথমে ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয় এবং পরে এক সঙ্গে গণপূর্ত ও পরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী থাকার সময় দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বহু বছরের সমস্যা নিষিদ্ধ ঘোষিত সর্বহারা পার্টির তৎপরতা বন্ধ করে ইতিহাস রচনা করেছিলেন। এ কারণে তাঁকে বাংলাদেশের সবচেয়ে সফল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলা হয়।
দৈনিক জনকণ্ঠ পত্রিকায় যোগদান করেই আওয়ামী লীগ বিটে কাজ করার সুবাদে তাঁর সঙ্গে আমার পরিচয় ৯৩ সালে। তিনি তখন সংসদে বিরোধী দলের চীফ হুইপ এবং আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক। এরপর থেকে নিয়মিতই তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আন্দোলন জোরদার হলে জাতীয় পার্টি এবং জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে যুগপৎভাবে কর্মসূচি দেওয়া হতো। তিন দলের লিয়াঁজো কমিটির মুখপাত্র হিসেবে সাংবাদিকদের ব্রিফিং করতেন তিনি। তাঁর এই প্রেস ব্রিফিং এতটাই সমৃদ্ধ হতো যা কোনো কাটছাঁট না করেই পত্রিকায় ছেপে দেওয়া যেত।
’৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করলে গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান মোহাম্মদ নাসিম। আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে যুক্ত আমরা কয়েকজন রিপোর্টার তখন কিছুটা বেকার হয়ে যাই। নিরাপত্তা এবং নানা রাষ্ট্রীয় আনুষ্ঠানিকতার কারণে সার্বক্ষণিক প্রধানমন্ত্রীর আশপাশে থাকা সম্ভব ছিল না। আওয়ামী লীগ বিটের প্রায় সব রিপোর্টারের স্থান হয় তখন মোহাম্মদ নাসিমের কার্যালয়ে। সাংবাদিকপ্রিয় নাসিম তাদের কাছে টেনে নেন।

’৯৯ সালের দিকে তিনি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে অনেক পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে নিষিদ্ধ ঘোষিত চরমপন্থি সংগঠনগুলোর সন্ত্রাসী তৎপরতা বন্ধ করা। স্বাধীনতার পর থেকেই সংগঠনগুলো এই অঞ্চলে ঘাঁটি বানিয়ে বসে। তাদের দাপটে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ১০ জেলার মানুষ চরম আতঙ্কে জীবন যাপন করতেন। প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও খুন, অপহরণ, থানা লুট, ডাকাতি ইত্যাদি লেগেই থাকত। সন্ধ্যার পর মানুষ ঘর থেকে বের হতে সাহস পেত না।

নতুন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন। দশ জেলায় কম্বিং অপারেশনের ঘোষণা দিয়ে শুরু করেন একের পর এক জনসভা। এর উদ্দেশ্য ছিল মানুষকে সচেতন ও সাহসী করে তোলা। জনসভাগুলোতে ক্রমশ উজ্জীবিত মানুষের উপস্থিতি বাড়তে থাকে এবং বিশাল আকার ধারণ করে। একদল রিপোর্টার সঙ্গে নিয়ে হ্যালিকপ্টারে করে দশ জেলা চষে বেড়ান তিনি। প্রত্যন্ত অঞ্চলে লাখো মানুষের সমাবেশে গর্জে ওঠে তাঁর বজ্রকণ্ঠ।

সন্ত্রাসীদের জন্য সাধারণ ক্ষমা এবং পুনর্বাসনের ঘোষণা দিয়ে তিনি আত্মসমর্পণের আহ্বান জানান। সকল সংবাদ মাধ্যমে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য ও কঠোর হুঁশিয়ারির কথা ফলাও করে প্রকাশ হয়। তাঁর বলিষ্ঠ বক্তৃতায় সাধারণ মানুষের মনে সাহসের সৃষ্টি হয়। শুরু হয় সামাজিক প্রতিরোধ। সামাজিক ও প্রশাসনিক চাপে সন্ত্রাসীরা ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে দলে দলে অস্ত্রসহ আত্মসমর্পণ শুরু করে। অনেক আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে সাংবাদিকসহ মন্ত্রী নিজেও উপস্থিত ছিলেন। অনেক কুখ্যাত সন্ত্রাসী ঢাকায় এসে আত্মসমর্পণ করেছে। মাত্র কয়েক মাসে দক্ষিণাঞ্চলের দশ জেলায় শান্তি ফিরে আসে।  সেই সময় খুলনায় এরশাদ সিকদার গ্রেপ্তারের ঘটনা ছিল রীতিমতো রোমহর্ষক।

এরপর আর এসব এলাকায় নিষিদ্ধ ঘোষিত সন্ত্রাসীরা মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারেনি। শেষ দিকে জনসভাগুলোতে হাজার হাজার মানুষ তাদের মুক্তির ত্রাতা হিসেবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমের জন্য দুই হাত তুলে আল্লাহর কাছে দোয়া করেন।
মোহাম্মদ নাসিম ছিলেন একজন পরিপূর্ণ রাজনীতিক। সংসার, সন্তান এবং সামাজিকতার দায়-দায়িত্ব প্রিয়তমা স্ত্রী লায়লা আরজুমান্দ (বিথি) এর ওপর ছেড়ে দিয়ে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত রাজনীতি নিয়েই থেকেছেন। শুধু সংসার পরিচালনা নয়, স্বামীর রাজনৈতিক কর্মকা-ে সক্রিয় সহযোগিতা, প্রতিদিন নির্বাচনী এলাকার শত শত মানুষ, দলীয় নেতাকর্মী এবং সংশ্লিষ্ট সকলের আপ্যায়ন ও দেখাশোনার দায়িত্বও তিনি পালন করতেন হাসিমুখে। স্ত্রীর আন্তরিক সমর্থন ও সহযোগিতায় তাঁকে পূর্ণাঙ্গ রাজনীতিক হতে বড় ভূমিকা পালন করেছে।

পরিচয় হওয়ার পর থেকে মোহাম্মদ নাসিমের সঙ্গে আমার যোগাযোগ কখনোই বিচ্ছিন্ন হয়নি। ওয়ান ইলেভেনের সময় গ্রেপ্তার হয়ে ঐ রাতেই নিরাপত্তা রক্ষীর ফোন থেকে আমাকে ফোন করেছিলেন। প্রায় দুই বছর কারাবাসে নিয়মিত নিরাপত্তা রক্ষীদের ফোনে কথা হতো। গ্রেপ্তার অবস্থায় যেদিন স্ট্রোক করে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন, সেই রাতেও তিনি আমার সঙ্গে কথা বলেছিলেন। আমি তাঁর একটি কথাও বুঝতে পারিনি, শুধু জড়িয়ে যাওয়া কিছু অসংলগ্ন শব্দই শুনতে পেয়েছিলাম।
করোনা মহামারির ভয়ঙ্কর সময় ২০২১ সালের মে মাসের শেষ দিকে প্রচণ্ড বৃষ্টি হচ্ছিল। রাতে সিরাজগঞ্জ থেকে তিনি ফোন করেন। কিছুটা রাগ করেই তাঁকে আমি বলেছিলাম, এই সময় আপনার সিরাজগঞ্জ না গেলে চলছিল না? সেদিন সিরাজগঞ্জ হাসপাতালে করোনা পরীক্ষার আরটিপিসিআর মেশিন উদ্বোধনের জন্য তিনি ওখানে গিয়েছিলেন। বললেন, এত ভয় পেলে চলবে? বিপদের সময় সাধারণ মানুষের পাশে না থাকলে আমি কিসের নেতা হলাম।

এটিই ছিল তাঁর সঙ্গে আমার শেষ কথা। করোনার উপসর্গ নিয়ে তিনি ১ জুন রাজধানীর একটি হাসপাতালে ভর্তি হন। তাঁকে রাখা হয় আইসিইউতে। ৫ জুন তাঁকে কেবিনে স্থানান্তরের পরিকল্পনা থাকলেও ওই দিন তিনি স্ট্রোক করেন। জরুরি অস্ত্রোপচার করা হয় তাঁর ব্রেনে। এরপর তিনি গভীর  কোমায় চলে যান, লাইফ সাপোর্টে রাখা হয় তাঁকে। গঠন করা হয় ১০ সদস্যের মেডিক্যাল বোর্ড। এর মধ্যে ৮, ৯ ও ১০ জুন তাঁর নমুনা পরীক্ষা করা হলেও করোনাভাইরাস পাওয়া যায়নি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সার্বক্ষণিকভাবে তাঁর চিকিৎসার খোঁজখবর নিচ্ছিলেন।

প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে তাকে বিদেশে নেওয়ার প্রস্তুতি শুরু করে পরিবার। ১১ জুন অবস্থার অবনতি হলে সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেন সবাই। ১২ জুন অবস্থার আরও অবনতি ঘটে। হৃদযন্ত্রে জটিলতা দেখা দেয়। ১৩ জুন বেলা ১১টা ১০ মিনিটে চিকিৎসকরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।  শৈশবে ছাত্র রাজনীতির মাধ্যমে তিনি মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন, জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত তিনি মানুষের পাশেই ছিলেন। গণমুখী রাজনীতিই তাঁকে রাজনীতির আকাশে নক্ষত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছিল। আজ তাঁর জন্মদিনে পরম করুণাময়ের কাছে প্রার্থনা, আজীবন মানুষের পাশে থাকা এই মানুষটিকে তুমি জান্নাত দান করো।

লেখক : নির্বাহী সম্পাদক, জনকণ্ঠ

×