ঢাকা, বাংলাদেশ   শুক্রবার ১৪ জুন ২০২৪, ৩০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১

প্রসঙ্গ ইসলাম

এ মাসে আমরা হারিয়েছি খলিফা আলী (রা.)কে

মনিরুল ইসলাম রফিক

প্রকাশিত: ২০:৩৪, ৩০ মার্চ ২০২৩

এ মাসে আমরা হারিয়েছি খলিফা আলী (রা.)কে

প্রসঙ্গ ইসলাম

মাহে রমজান সিয়াম সাধনার, শিক্ষা ও উপলব্ধি অর্জনের। এ মাস আমাদের অতীত ও ঐতিহ্য স্মরণের। এ মাসে আমরা হারিয়েছি বহু গুণী মনিষীদের। তাদের মধ্যে হযরত আলী (রা.) এর নাম বিশেষভাবে স্মরণীয়। হযরত আলী (রা.) ছিলেন নবী খান্দানের সদস্য, যিনি নবীজীর প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে শিক্ষা লাভ করেন। প্রিয় নবী হযরত রাসূলে করীম (স.) বলেছেন- আনা মাদীনাতুল ইলম ওয়া আলী বাবুহা- আমি জ্ঞানের নগরী আর আলী সেই নগরীর প্রবেশদ্বার।

তিনি ছিলেন কুরআনে হাফিজ এবং একজন   শ্রেষ্ঠ মুফাসসির। তিনি রাসূল (স.) এর বহু হাদিস বর্ণনা করেছেন। পূর্ববর্তী খলিফাদের যুগে মুহাজিরদের মধ্য হতে তিনজন ও আনসারদের তিনজন আইনবিষয়ক ফতোয়া দিতেন। যথা : উমর, উসমান, আলী, উবাই বিন কা’ব, মুয়াজ বিন জাবাল ও যায়িদ বিন সাবিত (রা.)। এদিক দিয়েও হযরত আলী (রা.) বিশেষ মর্যদার অধিকারী। 
রাসূলে খোদা হযরত মুহাম্মদ (স.) এর প্রিয় সাহাবী ও খলীফা হযরত আলী (রা.) ইসলামের ইতিহাসে একজন মহান বীর ও সাধক হিসেবে কিংবদন্তি হয়ে আছেন।

অসি ও মসি দু’ধারায় তিনি আজীবন ইসলামের সেবা করে গেছেন।  রাসূলে করীম (স.) এর যুগের সকল যুদ্ধে সবচেয়ে বেশি সাহসিকতা ও বীরত্বের পরিচয় তিনিই দেন। এ কারণেই হুজুর (স.) তাকে ‘হায়দার’ উপাধিসহ ‘যুল ফিকার ’ নামক একখানা তরবারি দান করেন। একমাত্র তাবুক অভিযান ছাড়া সকল যুদ্ধেই তিনি অংশগ্রহণ করেন। 
সপ্তম হিজরীতে খাইবার অভিযান চালানো হয়। সেখানে ইয়াহুদীদের কয়েকটি সুদৃঢ় কিল্লা ছিল। প্রথমে সিদ্দীকে আকবর, পরে ফারুকে আজমকে কিল্লাগুলো পদানত করার দায়িত্ব দেওয়া হয়। কিন্তু তারা কেউ সফলকাম হতে পারলেন না। নবী (স.) ঘোষণা করলেন : কাল আমি এমন এক বীরের হাতে ঝা-া তুলে দেব, যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রিয় পাত্র। তারই হাতে কিল্লাগুলো পতন হবে। পরদিন সকালে সাহাবীদের সকলেই আশা করেছিলেন এই গৌরব অর্জন করার।

হঠাৎ আলী (রা.) এর ডাক পড়ল। তারই হাতে খায়বরের সেই দুর্জয় কিল্লাগুলো পতন হয়। পরবর্তীকালে প্রথম তিন খলিফার আমলে তিনি উপদেষ্টার ভূমিকা পালন করেন। ৬৫৬ খ্রিস্টাব্দে তিনি মুসলিম জাহানের খিলাফত পরিচালনার দায়িত্ব প্রাপ্ত হন। এ পদে পাঁচ বছরের কাছাকাছি অধিষ্ঠিত ছিলেন। ৬৬১ খ্রি. মুতাবেক হিজরী ৪০ সালের ১৬ রমযান ফজরের সময় হযরত আলী (রা.) অভ্যাসমত আস-সালাত বলে মানুষকে নামাজের জন্য ডাকতে ডাকতে যখন মসজিদের দিকে যাচ্ছিলেন, তখন ইসলামী ঐক্য ধ্বংসের চক্রান্তে লিপ্ত জনৈক পাপাত্মা ইবনে মুলজিম শাণিত তরবারী নিয়ে তাকে আহত করে।

পরদিন ১৭ রমজান শনিবার তিনি কুফায় শাহাদাত বরণ করেন। কোন কোন ঐতিহাসিক তার ওফাতের তারিখ ২১ রমজান বলেছেন। হযরত ওসমান (রা.)-এর পর তিনি মুসলিম জাহানের খিলাফতের দায়িত্ব পালন করেন। খ্রিঃ ৬৫৬-৬৬১ সাল। চার বছর নয় মাস খিলাফত পরিচালনার পর হিজরী ৪০ সালের ১৭ রমজান কুফায় তিনি শহীদ হন। তার বয়স হয়েছিল ৬৩ বছর। তিনি পেয়েছিলেন নূরনবী (স.) ও আবু বকর (রা.) কে। উল্লেখ্য, তার আহত অবস্থায় আততায়ী ইবনে মুলজিমকে ধরে আনা হলে আলী (রা.) নির্দেশ দেন- সে কয়েদী। তার থাকা খাওয়ার সুব্যবস্থা কর।

আমি বেঁচে গেলে তাকে হত্যা বা ক্ষমা করতে পারি। যদি আমি মারা যাই, তোমরা ঠিক ততটুকু আঘাত করবে যতটুকু ঠিক সে আমাকে করেছে। তোমরা বাড়াবাড়ি করো না। আর যারা বাড়াবাড়ি করে আল্লাহ তাদেরকে ভালোবাসেন না। (তাবাকাত ৩/৩৫)। জীবনের শেষ মুহূর্তেও ন্যায় ইনসাফের কথা এবং অন্যের হক নষ্ট না করার কথা ও শত্রুকেও জুলুমে নিপতিত না করার কথা বলে গেলেন নবীজীর (স.) এ মহান আদর্শের সৈনিক। 
অনেক উত্তম গুণ বৈশিষ্ট্যের অধিকারী ও বেহেশতের বিশেষ দশজন সুসংবাদপ্রাপ্ত আশরায়ে মুবাশশারার একজন ছিলেন তিনি। ছিলেন একজন সুবক্তা, ভালো কবিও। তার কবিতার একটি দিওয়ান আমরা পেয়ে থাকি। তাতে অনেক কবিতার মোট ১৪০০ শ্লোক আছে। তিনি ছিলেন আরবী কাব্য জগতের বিশিষ্ট দিকপাল, তাতে প-িতদের কোনো সংশয় নেই। নাহজুল বালাগা নামে তার বক্তৃতার একটি সংকলন আছে, যা তার অতুলনীয় বাগ্মীতার স্বাক্ষর বহন করে চলছে। 
খাতুনে জান্নাত নবী কন্যা হযরত ফাতিমা (রা.) এর সঙ্গে তার বিয়ে হয়। ঐতিহাসিক ওয়াকিদীর বর্ণনা মতে, মাত্র পাঁচ ছেলে হাসান, হুসাইন, মুহাম্মদ (ইবনুল হানাফিয়া), আব্বাস এবং উমর থেকে এর বংশধারা চলছে। ইমাম আহমাদ (রহঃ) বলেন, আলী (রা.) এর মর্যাদা ও ফজিলত সম্পর্কে রাসূলুলাহ (স.) থেকে যত কথা বর্ণিত হয়েছে, অন্য কোনো সাহাবী সম্পর্কে তা হয়নি। ইতিহাসে তার যত গুণাবলী বর্ণিত হয়েছে সংক্ষিপ্ত পরিসরে তার কিয়দংশও তুলে ধরা সম্ভব নয়। রাসূল (স.) অসংখ্যবার তার জন্য ও তার সন্তানদের জন্য দোয়া করেছেন। রাসূল (স.) বলেছেন: একমাত্র মুমিনরা ছাড়া তোমাকে কেউ ভালোবাসবে না এবং একমাত্র  মুনাফিক ছাড়া কেউ তোমাকে হিংসা করবে না।
বিশাল ব্যক্তিত্বের অধিকারী হয়েও আলী (রা.) নিজেকে একজন সাধারণ মুসলমানসম মনে করতেন। একবার স্মৃতিচারণ করে বলেছিলেন, রাসূল (স.) এর সময়ে ক্ষুধার জ্বালায় পেটে পাথর বেঁধে থেকেছি। (হোয়াতুস সাহারাঃ ৩/৩১২)। খলিফা হওয়ার পরও ক্ষুধা ও দারিদ্র্যের সঙ্গে তাকে লড়তে হয়েছে। তবে তার অন্তরটি ছিল অত্যন্ত প্রশস্ত। কোনো অভাবীকে তিনি ফিরাতেন না। এ জন্য তাকে অনেক সময় সপরিবারে অভুক্ত থাকতে হয়েছে। তিনি ছিলেন দারুণ বিনয়ী।

নিজের হাতেই ঘর-গৃহস্থালির সব কাজ করতেন। সর্বদা মোটা পোশাক পরতেন। তাও ছেঁড়া। তালি লাগানো। তিনি ছিলেন জ্ঞানের দরজা। দূর-দূরান্ত থেকে জ্ঞানার্জনের জন্য ভক্তরা তার কাছে এসে দেখতে পেত তিনি উটের রাখালী করছেন, ভূমি কুপিয়ে খেত তৈরি করছেন। তিনি এতই অনাড়ম্বর ছিলেন যে, সময় সময় তিনি মাঠের ওপর শুয়ে যেতেন। একবার তাকে রাসূল (স.) এভাবে দেখে সম্বোধন করেছিলেন, ‘ইয়া আবা তুরাব’- ওহে মাঠের অধিবাসী প্রকৃতজন।’ তাই তিনি পেয়েছিলেন, ‘আবু তুরাব’ লকবটি। খলিফা হওয়ার পরও তার এ সরল জীবন অব্যাহত থাকে।

হযরত ওমরের (রা.) মতো সব সময় একটি দুররা ছড়ি হাতে নিয়ে চলতেন, লোকদের উপদেশ দিতেন। (আল-ফিতনা-তুল কুর্বরা)। হযরত আলীর সাথী দুরার আল কিলানী একবার আলীর প্রতি চরম বিদ্বেষ ভাবাপন্না মুয়াবিয়ার কাছে বেড়াতে এসেছিলেন। হযরত মুয়াবিয়া তাকে হযরত আলী (রা.) গুণাবলী বর্ণনা করতে বললেন। প্রথমে তিনি অস্বীকার করেন। কিন্তু মুয়াবিয়ার চাপাচাপিতে দীর্ঘ এক বর্ণনা পেশ করেন। এতে আলী সম্পর্কে এক চমৎকার বর্ণনা ফুটে ওঠে। এ বর্ণনা শুনে মুয়াবিয়াসহ বৈঠকে সকলে কান্নায় ভেঙে পড়েন। অতঃপর মুয়াবিয়া মন্তব্য করেন : আল্লাহর কসম! আসলে আবুল হাসান (হাসানের পিতা, আলী) এমনই ছিলেন।
আমরা যেন হযরত আলী (রা.) এর জীবনের অপরিমেয় ত্যাগ, আদর্শ, নবীপ্রেম ও শিক্ষার আলোকধারায় নিজের জীবন গড়ে তুলি। আল্লাহ আমাদের তাওফিক দান করুন। আমীন।
 
লেখক : অধ্যাপক, টিভি উপস্থাপক ও জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত খতিব

[email protected]

×