ঢাকা, বাংলাদেশ   শনিবার ০২ মার্চ ২০২৪, ১৭ ফাল্গুন ১৪৩০

প্রসঙ্গ ইসলাম

আত্মজাগানিয়া মাস রমজানুল মোবারক

মনিরুল ইসলাম রফিক

প্রকাশিত: ২১:৫৮, ২৩ মার্চ ২০২৩

আত্মজাগানিয়া মাস রমজানুল মোবারক

আলহামদুলিল্লাহ! আমরা সন্তরণ শুরু করেছি রহমত-মাগফিরাত ও নাজাতের বার্তাবাহী পবিত্র মাহে রমজানে

আলহামদুলিল্লাহ! আমরা সন্তরণ শুরু করেছি রহমত-মাগফিরাত ও নাজাতের বার্তাবাহী পবিত্র মাহে রমজানে। কবির ভাষায়- এ যে মাহে রমজান রহমতের দরিয়া 
এ দরিয়ায় কাটলে সাঁতার গুনাহ যাবে ঝরিয়া। 
আত্মশুদ্ধির মাস, আত্মপোলব্ধির মাস, কৃচ্ছ্রসাধনের মাস রমজান। আরবি ‘রমজ’ থেকে ‘রমজান’ শব্দের উৎপত্তি। এর অর্থ দহন বা পোড়ানো। এ মাসে সিয়াম সাধনার মাধ্যমে মানুষ নিজের সমুদয় দুনিয়াবি কামনা-বাসনাকে বিসর্জন দিয়ে ষড়ঋপু দমন করে মহান স্রষ্টা আল্লাহ পাকের একনিষ্ঠ অনুগত হওয়ার শক্তি সঞ্চয় করে।

এ মাস মানুষের সমস্ত আমিত্ব, কুপ্রবৃত্তি, খোদাদ্রোহিতা ও নফসের দাসত্ব জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে ছারখার করে দেয় বলে এ মাসের নাম হয়েছে ‘রমজান’। ‘সিয়াম’ অর্থ বিরত থাকা বা পরিত্যাগ করা। ইসলামী শরিয়তের পরিভাষায় সিয়াম মানে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের (স.) নির্দেশ মোতাবেক সুবহ সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত নিয়তসহ যাবতীয় পানাহার ও যৌন ক্রিয়াকর্ম থেকে বিরত থাকা।’ অবশ্য এটা হলো রোজা বা সিয়ামের দৈহিক দিক। আরও ব্যাপক অর্থে- যাবতীয় অবৈধ কাজ হতে বিরত থাকা ও অসৎ ভাবনা হতে মুক্ত থাকা হলো রূহের সিয়াম সাধনা। এরও ঊর্ধ্বে রয়েছে সিয়ামের আরেক পর্যায়।

তা হলো একমাত্র আল্লাহ ব্যতীত আর সবকিছু হতে হৃদয়-মন মুক্ত রাখা। অন্তরে একমাত্র অন্তরজামিকে স্মরণ করতে হবে। অন্য কিছুর স্থান থাকবে না। আল্লাহ ব্যতীত আর কিছুর প্রতি মন যাবে না। এরূপ সিয়াম পালন হলো আল্লাহর খাস বান্দাদের বৈশিষ্ট্য। রোজার এ তাত্ত্বিক ব্যাপারে ইশারা করতে গিয়েই মহানবী (স.) ইরশাদ করেছেন- যে ব্যক্তি রমজানে রোজা পালন করতে গিয়ে রোজার সীমারেখা বুঝে নেবে এবং যে কর্তব্য রোজার ভেতর পালন করা বাঞ্ছনীয় তা সুচারুরূপে পালন করে চলবে, তার এরূপ রোজা তার বিগত গুনাহের ক্ষমার কাফফারা হবে।-(বাইহাকি- ৪/৩০৪)।

অন্য এক হাদিসে বলা হয়েছেÑ মান সোয়ামা রমাজানা ওয়া ক্বা মাহু ঈমানান ওয়া ইহতিসাবা গুফিরা লাহু মা তাক্বাদ্দামা মিন জামবিহি অর্থাৎ যে ব্যক্তি রমজানে রোজা এবং এর রাতে নামাজ আদায় করবে পরিপূর্ণ বিশ্বাস রেখে এবং আত্মসমালোচনার মাধ্যমে পুণ্যলাভের প্রত্যয়ে, তার অতীতের গুনাহ মাফ করে দেওয়া হবে।’ (তিরমিজি ৩/৭৬)।
এখন এ গুরুত্বপূর্ণ জীবন গড়ার মাস আমরা পেলাম, অথচ এর হক ও করণীয়গুলোর ব্যাপারে আমরা ঔদাসীন্য প্রদর্শন করলাম তা অত্যন্ত দুঃখজনক। একজন প্রকৃত আল্লাহর বান্দা খালিস দিলের মুসলমানের উচিত এটাকে সদ্ব্যবহার করা এবং এর যথার্থ কল্যাণ হাসিল করে নিজের জীবন-মন ধন্য করা।

আর এ জন্যই আমাদের রমজানের প্রথম থেকেই সজাগ সচেতন হতে হবে। রাসূলে মাকবুল (স.) শাবানের শেষের দিকে সাধারণ মানুষকে রমজান মাসের করণীয় ও পালনীয় সম্পর্কে সজাগ ও উৎসাহিত করে তুলতেন। রমজানের আসল মাকসুদ যাতে আমাদের ব্যক্তি জীবন ও সমাজ জীবনে প্রতিফলিত হতে পারে সেদিকে আমাদের সকলকে হতে হবে আন্তরিক। এ ব্যাপারে জাতি-ধর্ম-প্রশাসন সবার সমান দায়িত্ব ও কর্তব্য রয়েছে। 

রমজান মাসকে সফল ও সার্থক করে নিতে হলে আমাদেরকে প্রতিদিনের চব্বিশটি ঘণ্টাকেই একটা নিয়মের মধ্যে ফেলতে হবে। শুধু উপোষ থাকার ব্যবস্থা করলাম অথচ ধর্মের অন্যান্য কাজ যেমন- নামাজ ঠিকমতো পড়লাম না, যাকাত যথানিয়মে দিলাম না। বাকি এগারো মাসের মতোই অন্যায়, অসামাজিক কার্যকলাপে লিপ্ত থাকলাম, ব্যবসা-বাণিজ্যে, লেনদেনে মানুষকে ঠকানো কিংবা কষ্ট দেওয়া থেকে বিরত থাকলাম না। তাহলে এ রোজা পালন যথার্থ নয়। রাসূলুল্লাহ (স.) স্পষ্টই বলে দিয়েছেনÑ যে ব্যক্তি রোজা রেখে মিথ্যা বলা ও খারাপ হতে বিরত থাকে না, আল্লাহ তাকে ভুখা রেখে অনাহারে রেখে কোনরূপ কষ্ট দেওয়ার প্রয়োজন মনে করেন না।
মহান আল্লাহ মানব জাতিকে আশরাফুল মাখলুকাত বা সৃষ্টির সেরা জীব হিসেবে সৃষ্টি করেছেন। দুনিয়ার এমন কোনো সৃষ্টি নেই যারা-স্ব-স্ব ভাষায় আল্লাহর ইবাদত বন্দেগি, জিকির-আজকার করে না। কুরআনের বর্ণনা অনুযায়ী সবাই আল্লাহর প্রশংসা ও গুণগান প্রকাশ করে এবং বিচরণ করে প্রকৃতির ধরাবাধা নিয়মে। পক্ষান্তরে এ নিয়ম শৃঙ্খলার ব্যতিক্রম ঘটে মানুষের জীবনে।

মানুষের মধ্যে বিবেক-বুদ্ধি, জ্ঞান-গরিমা, শক্তি-সামর্থ্য সব দেওয়া সত্ত্বেও দুনিয়ার লোভ-লালসায় পতিত হয়ে মানুষ হারিয়ে ফেলে মনুষ্যত্ব; নিয়ম-শৃঙ্খলার তোয়াক্কা করে না; ধনী-গরিবের ব্যবধান টানে। মানুষে-মানুষে যে দায়িত্ব কর্তব্যবোধ তা ভুলে যায়। আল্লাহর আনুগত্যে প্রদর্শন করে শিথিলতা। সেজন্য বছরান্তে পরিশুদ্ধ অত্মসচেতন ও যোগ্য বান্দা হিসেবে গড়ে তোলার জন্য মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে এ সিয়াম সাধনা। এখানে আছে খিদের জ্বালার মর্মপীড়া, নানা প্রবৃত্তির নিষ্পেষণ, খাওয়া-পরার অভিন্ন সামাজিক নিয়ম, রুকু-সিজদা-তারাবিহ-তাসবিহ-তাহলিলের অতিরিক্ত তাগিদ ও উৎসাহ প্রদান। এতসব কর্মসূচির বাস্তবায়ন থাকলে মানুষ শৃঙ্খলাবোধে না এসে পারে না। দৃশ্যত এ এক ট্রেনিং  পিরিয়ড। যুগে যুগে যে কোনো জাতিকে খোদাপ্রাপ্তির পথে সুশৃঙ্খলভাবে গড়ে নেওয়ার জন্য মহান আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা সিয়াম সাধনাকে ফরজ করে দিয়েছেন। আল কুরআনের ভাষায়Ñ হে মুমিনগণ! তোমাদের জন্য সিয়ামের বিধান দেওয়া হলো যেমন বিধান তোমাদের পূর্ববর্তীগণের ওপর দেওয়া হয়েছিল যাতে তোমরা পরহেজগার (শুদ্ধচিত্ত) হতে পার। (২:১৮৩)। 
আঁ হযরত (স.) বলেছেনÑ যে ব্যক্তি চল্লিশ দিন অর্থাৎ দীর্ঘদিন যাবত খাদ্যদ্রব্য মজুদ করল এমনভাবে যাতে বাজারে দুষ্প্রাপ্যতা সৃষ্টি হয়। তার ইচ্ছে হলো দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি করা। এমন ব্যক্তিকে আল্লাহ নিজ দায়িত্ব হতে ছেড়ে দেন।’ মজুতদারদের জন্য এটা নিঃসন্দেহে একটি মারাত্মক দুঃসংবাদ। কারণ, আল্লাহ যাকে নিজ দায়িত্ব থেকে ছেড়ে দেন তার পরিণাম হয় নির্জন গহীন সাগরে এক অসহায় মানুষের হাবুডুবু খাওয়ার মতো। যেখানে কোনো ধরনের আশ্রয়স্থল থাকে না। 
বস্তুত রমজান এমন এক প্রশিক্ষণের মাস- আমাদের প্রত্যেকটি কুপ্রবৃত্তি, অসৎ মনোভাব অবদমিত হচ্ছে কিনা সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। যে যে ক্ষেত্র বা পেশায় নিয়োজিত তাতে অবস্থান করে নিজের আত্মসমালোচনা করতে হবে। যদি মনে করা হয় যে, কোনো রোজাদার দিন দিন শুদ্ধির পথে, অনুশোচনার পথে, কল্যাণের পথে ধাবমান, তাহলে বুঝতে হবে রোজা তার মনে খোদাভীতি আত্মপোলব্ধি সৃষ্টি করতে পেরেছে। আর যদি দেখা যায় কোনো রোজাদার রোজাও রাখছে বরাবরের মতো কিন্তু মানুষকে ঠকানো পরিত্যাগ করেনি, ঘুষ-দুর্নীতি হতে মুক্ত হতে পারেনি তবে বুঝতে হবে রোজার মর্মবাণী হতে সে অনেক দূরে। দুর্ভাগ্য তাদের জন্য, যারা এ বরকতের মাস পেয়েও নিজেকে পরিশুদ্ধ করতে পারে না, নিজের গুনাহ মাফ করে নিতে পারে না। এ রমজানের বরকত তারই জন্য যে ইবাদত বন্দেগিতে দিনগুজরান করতে চায়, নিজে নিষ্কলুষ চরিত্রের অধিকারী হওয়ার জন্য আল্লাহর সাহায্য কামনা করে এবং পরকালে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনে আগ্রহী হয়। আল্লাহ পাক পবিত্র রমজান মাস সম্পর্কে বলেছেন- ‘রমজান মাস-এতে মানুষের দিশারী এবং সৎপথের সুস্পষ্ট নিদর্শন ও সত্য-মিথ্যার পার্থক্যকারীরূপে কুরআন অবতীর্ণ করা হয়েছে। সুতরাং তোমাদের মধ্যে যারা এ মাস পাবে তারা যেন এ মাসে সিয়াম পালন করে। (আল-কুরআন ২:১৮৫)।
 হাদিসে এসেছেÑ চার ধরনের লোকের দোয়া ফেরত দেওয়া হয় না। তাদের জন্য আসমানের দ্বারগুলো খুলে দেওয়া হয় এবং দোয়াসমূহ আল্লাহর আরশ পর্যন্ত পৌঁছে যায়। তারা হলেন- ১. মা-বাবার দোয়া নিজ সন্তানের জন্য, ২. কোনো মজলুমের দোয়া- যিনি নির্যাতনে নিপতিত, ৩. ওমরা হজ পালনকারী, যতক্ষণ পর্যন্ত তিনি না ফেরেন, ৪. রোজাদার- যতক্ষণ না তিনি ইফতার করেন। যে ব্যক্তি এ মাসে একটি ফরজ ইবাদত আদায় করবে অন্য মাসের তুলনায় তাকে সত্তরটি ফরজ ইবাদত আদায় করার সমমান সওয়াব প্রদান করা হবে। এ মহান মাস ধৈর্য ও সংযমের মাস। ধৈর্যের বিনিময়ে একমাত্র বেহেস্ত। এ মহান মাস পরোপকারের মাস। এ মাসে বিশেষ করে মুমিন বান্দাদের খাদ্য বৃদ্ধি করা হয়। যে ব্যক্তি কোনো একজন রোজাদারের ইফতারের ব্যবস্থা করবে আল্লাহ পাক তার গুনাহরাজি ক্ষমা করে দেবেন, তাকে দোজখ থেকে রেহাই দেবেন এবং রোজাদারের রোজার অনুরূপ তাকে সওয়াব দান করা হবে। তবে এ ব্যবস্থার জন্য কোনো বিশেষ আয়োজন করতে হবে না। যে ব্যক্তি কোনো রোজাদারের জন্য সাধারণ দুধ অথবা একটি খেজুর কিংবা অপারগতায় সামান্য পানি দিয়ে ইফতারের ব্যবস্থা করবে তাকেও আল্লাহ রাব্বুল আলামিন উপরোক্ত সওয়াব প্রদান করবেন। আর যে ব্যক্তি এ মাসে কোনো একজন রোজাদারকে পেট ভরে তৃপ্তি সহকারে খাবারের ব্যবস্থা করবে আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা তার জন্য পরকালে হাউজে কাউসার থেকে এমন শরবত পানের ব্যবস্থা করবেন-যার ফলে বেহেস্তে প্রবেশের পূর্ব পর্যন্ত তার আর কোনো পানির পিপাসা হবে ন। আল্লাহ যেন আমাদেরকে প্রকৃত রোজাদার হিসেবে গণ্য করেন এবং রোজাদারের মর্যাদা দেন। গোটা মাস যেন সিয়ামের যথার্থ হুকুম আহকামগুলো পালনপূর্বক রোজা আদায় করতে পারি। পবিত্র সিয়াম যেন আল্লাহর দরবারে আমাদের বিপক্ষে সাক্ষী না দেয়- প্রভুর কাছে এই মোনাজাত। 
কুরআন নাজিলের মাস, মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে রহমত-মাগফিরাত ও নাজাতের  বার্তাবাহী মাস পবিত্র মাহে রমজান আমাদের জীবনে অনাবিল সৌন্দর্য, মানবপ্রেম, খোদাভীতি ও ধর্মীয় অনুরাগ সৃষ্টিতে সহায়ক হোক। 

লেখক :  অধ্যাপক, টিভি উপস্থাপক ও জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত খতিব

[email protected]

×