ঢাকা, বাংলাদেশ   মঙ্গলবার ০৪ অক্টোবর ২০২২, ১৯ আশ্বিন ১৪২৯

ইতিহাসের অন্ধকারতম অধ্যায়

অধ্যাপক ডাঃ মোঃ শারফুদ্দিন আহমেদ

প্রকাশিত: ২১:০১, ১৫ আগস্ট ২০২২

ইতিহাসের অন্ধকারতম অধ্যায়

অধ্যাপক ডাঃ মোঃ শারফুদ্দিন আহমেদ

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করার পরই খন্দকার মোশতাক আহমেদ যিনি বঙ্গবন্ধুর মন্ত্রিসভার বাণিজ্যমন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন, সে নিজেকে রাষ্ট্রপতি ঘোষণা দেনখুনীদের বাঁচানোর জন্য ২৬ সেপ্টেম্বর ইনডেমনিটি (দায়মুক্তি) অধ্যাদেশ জারি করেনদি বাংলাদেশ গেজেট পাবলিশড বাই অথরিটিলেখা অধ্যাদেশটিতে খন্দকার মোশতাক আহমেদের স্বাক্ষর আছেঅধ্যাদেশটিতে দুটি ভাগ আছেপ্রথম অংশে বলা হয়েছে, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ভোরে বল্বত আইনের পরিপন্থী যা কিছুই ঘটুক না কেন, এ ব্যাপারে সুপ্রীমকোর্টসহ কোন আদালতে মামলা, অভিযোগ দায়ের বা কোন আইনী প্রক্রিয়ায় যাওয়া যাবে না

দ্বিতীয় অংশে বলা আছে, রাষ্ট্রপতি উল্লিখিত ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে যাদের প্রত্যয়ন করবেন তাদের দায়মুক্তি দেয়া হলোঅর্থা, তাদের বিরুদ্ধে কোন আদালতে মামলা, অভিযোগ দায়ের বা কোন আইনী প্রক্রিয়ায় যাওয়া যাবে নাএরপর ক্ষমতায় আসেন এক সামরিক শাসক মেজর জিয়াতিনি ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট থেকে ১৯৭৯ সালের ৯ এপ্রিল পর্যন্ত ইনডেমনিটি অধ্যাদেশসহ চার বছরে সামরিক আইনের আওতায় সব অধ্যাদেশ ঘোষণাকে সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে আইনী বৈধতা দেন

এরপর দীর্ঘ ২১ বছর সংগ্রামের মাধ্যমে ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার প্রক্রিয়া শুরু করার আইনী বাধা অপসারণের প্রক্রিয়া শুরু হয়সংবিধান বিশেষজ্ঞদের পরামর্শে ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ (রহিতকরণ) বিল, ১৯৯৬ সালে সপ্তম সংসদে উত্থাপন করা হয়১৯৯৬ সালের ১২ নবেম্বর সংসদে পাস হয় আইনটি১৪ নবেম্বর রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষরের পর এটি পরিপূর্ণভাবে আইনে পরিণত হয়ফলে মোশতাকের জারি করা এবং জিয়াউর রহমানের সময় বৈধতা পাওয়া ইনডেমনিটি অধ্যাদেশটি বিলুপ্ত বলে গণ্য হয়এরপরই শুরু হয় বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার কাজ

বিচারে নিস্র আদালত ঘাতকদের ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদ- প্রদান করেনপরবর্তীতে নিম্ন আদালতের এ রায় হাইকোর্টেও বহাল রাখেনকিন্তু ২০০১ সালে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর সুপ্রীমকোর্টে বিচারক নিয়োগ না দেয়াসহ নানা কারণে বিচারের পথে বেশকিছু প্রতিবন্ধকতা দেখা দেয়ফলে রায় কার্যকরে বিলম্ব হতে থাকে২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার গঠনের পর উচ্চ আদালত পর্যায়ের বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার উদ্যোগ নেয়সুপ্রীমকোর্টেও আপীল বিভাগ হাইকোর্টের রায় বহাল রাখা হয়অবশেষে দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর ২০১০ সালের ২৮ জানুয়ারি পাঁচ খুনীকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে রায় কার্যকর করা হয়

পাঁচজন হলো- লে. কর্নেল সৈয়দ ফারুক রহমান, লে. কর্নেল সুলতান শাহরিয়ার রশিদ খান, মেজর বজলুল হুদা, লে. কর্নেল মহিউদ্দিন আহমেদ (আর্টিলারি) এবং লে. কর্নেল একেএম মহিউদ্দিন আহমেদ (ল্যান্সার)২০০১ সালের ২ জুন লে. কর্নেল (অব.) আব্দুল আজিজ জিম্বাবুইয়েতে মারা যায় বলে কথিত আছে২০২০ সালের ৭ এপ্রিল ক্যাপ্টেন (অব.) আব্দুল মাজেদকে গ্রেফতার এবং ১২ এপ্রিল মৃত্যুদ- কার্যকর করা হয়আরেক খুনী রিসালদার মোসলেম উদ্দিন গত ১৯ এপ্রিল ভারতে গ্রেফতার হয়তবে তার গ্রেফতার নিয়ে এখনও ধোঁয়াশা আছেএখনও ১২ জনের মধ্যে চারজন বিদেশে পালিয়ে রয়েছেপলাতকরা হলোÑ কর্নেল খন্দকার আব্দুর রশিদ, লে. কর্নেল শরিফুল হক ডালিম, লে. কর্নেল এ এম রাশেদ চৌধুরী এবং লে. কর্নেল এস এইচ নূর চৌধুরী

বঙ্গবন্ধু হত্যার সকল দুরভিসন্ধির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক সাম্রাজ্যবাদী ও পাকিস্তানী চক্র এবং তাদের এ দেশীয় দালালদের গোপন আঁতাতের কথা আজ দেশর মানুষের কাছে পরিষ্কার হয়ে গেছেমানুষ বুঝতে পেরেছে বঙ্গবন্ধু হত্যার উদ্দেশ্য ছিল বাঙালী জাতিকে নিশ্চিহ্ন করে দিয়ে বাংলাদেশের নাম চিরতরে বিশ্বের মানচিত্র থেকে মুছে ফেলতে

কিন্তু তাদের সেই স্বপ্ন বাস্তবে রূপ লাভ করতে পারেনিজাতীয় শোককে শক্তিতে রূপান্তরিত করে বাংলার দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে এবং কাক্সিক্ষত অর্থনৈতিক মুক্তি এনে দিতে পারলেই জাতির জনকের বিদেহী আত্মা শান্তি পাবেআর এ লক্ষ্যেই দিনরাত কাজ করে চলেছেন মানবতার জননী বঙ্গবন্ধুকন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা

 

লেখক : উপাচার্য, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়