ঢাকা, বাংলাদেশ   শুক্রবার ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১৪ আশ্বিন ১৪২৯

কাজী সুফিয়া আখ্তার

মুক্তচিন্তার পতাকা বাহক নূরজাহান মুরশিদ

প্রকাশিত: ০৪:০১, ১ সেপ্টেম্বর ২০১৬

মুক্তচিন্তার পতাকা বাহক নূরজাহান মুরশিদ

স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা ছিল যাদের মরণপণ প্রতিজ্ঞা, নূরজাহান মুরশিদ তাদের একজন। নারী আন্দোলনের নেত্রী, মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ, শিক্ষাবিদ, সাহিত্যিক, নারী-পুরুষের সমতায় বিশ্বাসী ‘এদেশ-একাল’ সম্পাদক আমাদের শ্রদ্ধাভাজন ছিলেন। বরাবরই ছিলেন অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক চিন্তাভাবনায় সমৃদ্ধ, উদার রাজনীতিবিদ। বহুমুখী প্রতিভার অধিকারিনী এই নারী তার সমসাময়িকদের মনন, চিন্তাভাবনা ও কর্মকা-কে নিঃসন্দেহে প্রভাবিত করেছেন। তিনিই প্রথম মহিলা যিনি যুদ্ধোত্তর স্বাধীন, সার্বভৌম বাংলাদেশে ১৯৭৩ সালে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের স্বাস্থ্য ও সমাজকল্যাণ বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী হয়েছেন। আমার সুযোগ হয়েছিল বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের প্রচার ও প্রকাশনা উপ-পরিষদের সম্পাদিকা থাকাকালীন তার সঙ্গে কাজ করার। তিনি তখন এ সংগঠনের কেন্দ্রীয় কমিটির অন্যতম সহসভাপতি হিসেবে উক্ত উপ-পরিষদের দায়িত্বে ছিলেন। তখন দেখেছি তিনি কী রকম সুচারুভাবে পরিকল্পনা করে গুছিয়ে কাজ করেন। তার সম্পাদিত এদেশ-একাল পত্রিকায়ও আমি কিছুদিন কাজ করেছি, সেই সঙ্গে উপভোগ করেছি তার সুন্দর সাহচর্য। তাকে কখনও অগোছালো দেখেছি বলে মনে পড়ে না। বাড়িঘর, পোশাক-পরিচ্ছদ, কাজের ক্ষেত্র সর্বত্রই পরিপাটি, সুরুচির ছাপ। বিভিন্ন বিষয়ে তার চিন্তা ছিল সুসংহত ও গভীর। প্রচলিত প্রথা ভেঙ্গে পথ চলতে পছন্দ করতেন কিন্তু কখনও কোন উগ্রতা তার মধ্যে দেখিনি। সাহসী ছিলেন, স্পষ্টবাদী ছিলেন কিন্তু উচ্চৈঃস্বরে কথা বলতেন না। মিষ্টভাষী, আধুনিক এই ব্যক্তিত্বের সঙ্গে কোন বিষয়ে আলাপ-আলোচনা করতে কখনও সঙ্কোচ বোধ হতো না। বরাবরই ছিলেন সাম্প্রদায়িকতার উর্ধে, গণতান্ত্রিক চিন্তাভাবনায় সমৃদ্ধ, সুশিক্ষিত, সংস্কৃতিমনস্ক ও উদার রাজনীতিবিদ ব্যক্তিত্ব। গণতন্ত্র নিয়ে এ সময়ে বাংলাদেশে নানা বিতর্ক চলছে। এ প্রসঙ্গে নূরজাহান মুরশিদ লিখেছেন- ‘বহু রক্ত, বহু ক্ষয়, বহু ধ্বংসের বিনিময়ে দেশের স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছে। এ স্বাধীনতাকে রক্ষার জন্যও বহু রক্তপাত ঘটেছে। বহু মূল্যবান প্রাণ ঝরে গেছে। পাকিস্তান আমল থেকে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার যে সংগ্রাম করতে করতে আমাদের একটি যুদ্ধ মোকাবেলা করতে হলো, সেই গণতন্ত্রের সংগ্রাম আজও চলছে।’ এ গণতন্ত্রের লড়াই যে বারবার করতে হয়, হবে- তা তিনি জানতেন। বিএনপি সরকার এবং জাতীয় পার্টির সরকারের আমলে এ দেশের জনগণ তা করেছে। আবার যখন মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সরকার ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত, তখন যেন একটু স্বস্তি সবার মনে। ‘বাংলাদেশের মানুষ নিজের অধিকার আদায়ের জন্য দীর্ঘদিন সংগ্রাম করেছে। বর্তমানে বাংলাদেশ একটি স্বাধীন দেশ। এই স্বাধীন দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্যও আমাদের আন্দোলন করতে হয়েছে- গণতন্ত্রের পতাকাস্বরূপ নূর হোসেনকে গুলিবিদ্ধ হয়ে প্রাণ দিতে হয়েছে। সংগ্রাম ও প্রাণ বিসর্জনের এ কণ্টকাকীর্ণ পথ বেয়ে এসে বর্তমানে একটি গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এ সরকারের কাছে আমাদের অনেক প্রত্যাশা। জনকল্যাণের বিষয়টিকে সামনে রেখে অগ্রাধিকারভিত্তিতে সরকার কিছু কাজ হাতে নিয়ে জনমানুষের আস্থাভাজন হোক- এটা আমরা আশা করব। আগামী নির্বাচন পর্যন্ত আমরা ধৈর্যধারণ করতে প্রস্তুত। কিন্তু বিরোধী দলকে বসে থাকলে চলবে না। তারা ক্ষমতায় এলে কী কী কাজ করবে তার পরিষ্কার পরিকল্পনা এখনই তৈরি করতে হবে।’ ১৯৯২ সালে লন্ডন আওয়ামী লীগ আয়োজিত শহীদ দিবসে পঠিত ‘শহীদ দিবস’ প্রবন্ধে নূরজাহান মুরশিদ উল্লেখিত কথাগুলো লিখেছিলেন, যা আজও বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষিতে সমানভাবে প্রযোজ্য। বর্তমান সরকার মানবতাবিরোধী, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও শাস্তি কার্যকর করেছে ও করছে। নানা প্রতিকূলতা সত্ত্বেও প্রবৃদ্ধির হার বৃদ্ধি, কৃষিক্ষেত্রে উৎপাদন বাড়াতে সক্ষম হয়েছে। মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে বাংলাদেশকে বিশ্বের মানচিত্রে তুলে ধরার অব্যাহত প্রচেষ্টা, সাধারণ মানুষের দারিদ্র্য হ্রাস ও বাজেটে প্রতিবছর সাধারণ জনগণের স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে সামাজিক নিরাপত্তা বলয় খাতে বরাদ্দ বাড়িয়ে এবং সম্প্রতি জঙ্গী দমনে দ্রুত কার্যকর যে সাফল্য দেখিয়েছে, তাতে এ সরকারের প্রতি জনগণের আস্থাশীলতা বৃদ্ধি পেয়েছে। জনগণের কাছে সরকারের জনপ্রিয়তা, বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জনপ্রিয়তা বেড়েছে। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে বিরোধী দলের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক দল বিএনপি রাজনৈতিকভাবে মারাত্মক ভুল ও অমানবিক সিদ্ধান্তের কারণে (২১ আগস্ট আওয়ামী লীগের জনসভায় শক্তিশালী গ্রেনেড বিস্ফোরণের মাধ্যমে জননন্দিত নেত্রী শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের প্রথমসারির সকল নেতাকে হত্যা করার উদ্দেশ্যে এবং আওয়ামী লীগকে ধ্বংস করার লক্ষ্যে, প্রকাশ্য দিবালোকে সংঘটিত যে নৃশংস অমানবিক ঘটনায় প্রায় ৩০০ মানুষ আহত হয়েছেন, নেত্রী আইভী রহমানসহ মৃত্যুবরণ করেছেন ২৪ জন; যে ঘটনার বিচার দীর্ঘ ১২ বছরেও হয়নি! পরবর্তী সময়ে হরতাল-অবরোধের নামে শ্রমজীবী-কর্মজীবী মানুষকে পেট্রোলবোমা ছুড়ে পুড়িয়ে মারা, পঙ্গু করে দেয়া, জামায়াতে ইসলামী ও যুদ্ধাপরাধীদের আশ্রয়- প্রশ্রয় দেয়া, বাংলা ভাইয়ের অস্তিত্ব অস্বীকার করাসহ আরও অনেক দুর্নীতির ঘটনা, আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের হয়রানি, জেল-জুলুম) বর্তমানে দলীয় সদস্যদের নিয়ে জনবিচ্ছিন্ন কোণঠাসা হতে বাধ্য হয়েছে। এ রাজনৈতিক পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে বিএনপিকে অনেক ধৈর্যের সঙ্গে জনসম্পৃক্ত হয়ে বিতর্কহীন, জনকল্যাণকর ইস্যু নিয়ে এগোনোর পরিকল্পনা ও প্রয়াস নিতে হবে। তাদেরকে আজ নূরজাহান মুরশিদের ভাষাতেই বলি- ‘আজ কে মুসলমান, কে বাঙালী, কে বাংলাদেশী, কে স্বাধীনতার ঘোষক- এসব প্রশ্ন তুলে অর্থহীন দ্বন্দ্ব সৃষ্টি না করাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে। আজ আমাদের প্রমাণ করতে হবে যে, আমরা স্বাধীনতাবিরোধী এবং ধর্ম ব্যবসায়ী জামায়াতের চেয়ে বড় এবং ভাল মুসলমান; কেননা আমরা অমুসলিম নাগরিকের পূর্ণ অধিকারে বিশ্বাসী।’ বলাবাহুল্য বিএনপি এ ভুল বারবার করেছে। বারবার একই ভুল করলে তা আর ভুল থাকে না, অন্যায় বলে গণ্য হয়। বিএনপিকে এ সত্যটি মানতে হবে। আদর্শিক এবং নৈতিক বিবেচনায় তার দলের কর্মী ও নেতাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে বাজে মন্তব্য করার প্রবণতা, স্পর্ধা দূর করতে হবে। তাতে নিজেদের মঙ্গল, দশের কল্যাণ। নূরজাহান মুরশিদ লিখেছেন- ‘গণতন্ত্রের তিন প্রধান শত্রু- কালো টাকা, সন্ত্রাস ও ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতার প্রবল প্রতাপ আমরা গভীর উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ করছি।’ বাংলাদেশ সরকার কালো টাকার কুফল নিয়ন্ত্রণ এবং সন্ত্রাস দমনে যথাসাধ্য তৎপর। সন্ত্রাস দমনে প্রধানমন্ত্রী শূন্য সহনশীলতার নির্দেশ দিয়েছেন। ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতা রোধে বাংলাদেশের সকল মানবিক নাগরিক আজ সচেতনভাবে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনে অংশ নিচ্ছেন গণতন্ত্রের এই শত্রুদের ধ্বংস করতে। প্রেরণার উৎসে নূরজাহান মুরশিদ এবং তার কালের মানবতাবাদী রাজনীতিবিদ নায়করা আজও সহাস্যে, সস্নেহে দাঁড়িয়ে। নূরজাহান মুরশিদের ত্রয়োদশ মৃত্যুবার্ষিকী ১ সেপ্টেম্বর ২০১৬। তার মৃত্যুবার্ষিকীতে তাকে স্মরণে আমাদেরই কল্যাণ। নূরজাহান মুরশিদকে শ্রদ্ধাঞ্জলি।