ঢাকা, বাংলাদেশ   সোমবার ১৬ মার্চ ২০২৬, ১ চৈত্র ১৪৩২

অধিকাংশ অসম্পূর্ণ, কিছু ক্ষেত্রে শুরুই হয়নি কাজ

মুখ থুবড়ে পড়ছে এনবিআরের সংস্কার উদ্যোগ

জাহিদুল ইসলাম

প্রকাশিত: ২৩:৩৬, ১৫ মার্চ ২০২৬

মুখ থুবড়ে পড়ছে এনবিআরের সংস্কার উদ্যোগ

২০২৪ সালের ৫ আগস্টে সরকার পতনের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের জন্য প্রধান চ্যালেঞ্জ ছিল দেশের ভেঙে পড়া অর্থনীতিকে একটি স্থিতিশীল অবস্থায় নিয়ে আসা। এ লক্ষ্যে ব্যাংক খাতের মতো রাজস্ব খাতেও ডিজিটালাইজেশনসহ কিছু উল্লেখযোগ্য সংস্কার কার্যক্রম গ্রহণ করে অন্তর্বর্তী সরকার। এই পদক্ষেপগুলোর মধ্যে ভ্যাট ও আয়কর ব্যবস্থাকে অনলাইন প্ল্যাটফর্মে স্থানান্তর, প্রবাসীদের জন্য সহজ কর প্রদান পদ্ধতি এবং ট্রেড ফেসিলিটেশন বা বাণিজ্য সহজীকরণ অন্যতম। তবে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, অভ্যন্তরীণ বিরোধিতা এবং কারিগরি সীমাবদ্ধতার কারণে এনবিআর বিভাজন ও পূর্ণাঙ্গ অটোমেশনের মতো বড় প্রকল্পগুলো এখনো চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। এক্ষেত্রে রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বিত প্রয়োগ ছাড়া রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত বৃদ্ধি এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্জন করা কঠিন হবে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।
এনবিআরের তথ্যানুসারে, অন্তর্বর্তী সরকারের স্বল্প মেয়াদে রাজস্ব ব্যবস্থাপনার সংস্কার, ট্রেড ফেসিলিটেশন, ডিজিটাইজেশন এবং করের আওতা বৃদ্ধিতে  কিছু যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিয়েছিল। এর মধ্যে ভ্যাট খাতে অগ্রগতির জন্য অনলাইন সিস্টেমে নিবন্ধন, রিটার্ন দাখিল, ই-সহগ, ই-রিফান্ড, অনলাইন পেমেন্ট, স্মার্ট ভ্যাট চালান এবং ভ্যাট ফাঁকি রোধে ‘রিস্ক-বেসড’ অডিট সিস্টেম চালু অন্যতম।
আয়কর ব্যবস্থায় করদাতার কোনো ডকুমেন্ট অনলাইনে আপলোড না করেই শুধু আয়, ব্যয়, সম্পদ ও দায়ের প্রকৃত তথ্য ই-রিটার্ন সিস্টেমে এন্ট্রি করে ঘরে বসেই ডেবিট-ক্রেডিট কার্ড, ইন্টারনেট ব্যাংকিং বা মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে আয়কর পরিশোধের সুযোগ তৈরি করেছে। এমনকি প্রবাসী করদাতারাও বিদেশে অবস্থান করে সহজে কর দিতে পারছেন। এ প্রক্রিয়ায় এখন পর্যন্ত ৫ হাজারের বেশি প্রবাসী কর প্রদান করেছেন।  
তবে অংশীজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এনবিআরের দাবি করা সহজে রিটার্ন দাখিল আসলে সঠিক নয়। বরং এই পদ্ধতিতে সার্ভারে রেজিস্ট্রেশনসহ লগইন এবং নানা ধরনের তথ্যের জটিলতায় সাধারণ মানুষের মধ্যে ভোগান্তি তৈরি হয়েছে। ফলে, প্রথমবারের মতো ই-রিটার্ন দাখিলের সময়সীমা অতিরিক্ত ৪ মাস বাড়াতে হয়েছে সংস্থাটিকে। অথচ এরপরও রিটার্ন দাখিল করেছেন মাত্র ৪০ লাখ, যেখানে গত অর্থবছরের ফেব্রুয়ারিতে রিটার্ন দাখিলের পরিমাণ ছিল ৪৫ লাখ।
এছাড়া বিদেশি বিনিয়োগকারীদের দ্বৈত করারোপ পরিহার চুক্তির (ডিটিএএ) আওতায় সকল প্রকার সনদ সিঙ্গেল উইন্ডো (বিএসডব্লিউ) সিস্টেম থেকে অনলাইনে প্রদানের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এই সিস্টেমে সার্টিফিকেট, লাইসেন্স ও পারমিট ইস্যুকারী ১১টি সংস্থাকে ইতোমধ্যে যুক্ত করা হয়েছে এবং এখন পর্যন্ত এই সিস্টেমের মাধ্যমে প্রায় ৯ লাখ সার্টিফিকেট, লাইসেন্স ও পারমিট অনলাইনে ইস্যু করা হয়েছে। আবেদনের সর্বোচ্চ ১ দিনের মধ্যেই এসব সার্টিফিকেট, লাইসেন্স ও পারমিট ইস্যু করা হয়েছে বলে জানিয়েছে এনবিআর।
রপ্তানি বাণিজ্য সম্প্রসারণে ছোট ও মাঝারি রপ্তানিকারক শিল্প-প্রতিষ্ঠানকে ব্যাংক গ্যারান্টির বিপরীতে শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাঁচামাল আমদানির সুবিধা প্রদান করে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে। এর ফলে, যে সব রপ্তানিমুখী শিল্প-প্রতিষ্ঠানের বন্ডেড ওয়্যারহাউজ লাইসেন্স গ্রহণ সম্ভব হয় না, তাদের জন্য শুল্ক-করাদি পরিশোধ না করে কাঁচামাল বা পণ্য আমদানির সুবিধা দেওয়া হয়েছে।
এদিকে করের আওতা বৃদ্ধিতে স্পট অ্যাসেসমেন্ট কার্যক্রম শুরু করেছে। এর ফলে, যাদের করযোগ্য আয় এবং রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা আছে কিন্তু প্রদান করছেন না, তাদের ব্যবসা বা কর্মস্থলে উপস্থিত হয়ে সরাসরি সেবাপ্রদান করা হচ্ছে।
তবে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে যে সংস্কার পদক্ষেপটি ব্যবসায়ীদের সবচেয়ে বেশি সহায়তা করেছে, সেটি হলো কাস্টমস ব্যবস্থাপনার সংস্কার ও আধুনিকায়ন। সিঙ্গেল উইন্ডো (বিএসডব্লিউ) সিস্টেম এবং আংশিক রপ্তানিকারণ শিল্প-প্রতিষ্ঠানকে শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাঁচামাল আমদানির পাশাপাশি বন্ডেড প্রতিষ্ঠানের পণ্য খালাসে জটিলতা নিরসনে এইচএস কোডের প্রথম ৪টি ডিজিটের মিল থাকলে বন্ড লাইসেন্সে উক্ত এইচএস কোড বা পণ্যের বর্ণনা অঙ্গিকারনামা দাখিল করলেই খালাস করা হচ্ছে। এসাইকুডা ওয়ার্ল্ড সিস্টেমে ‘ট্রাক মুভমেন্ট’ নামে নতুন মডিউল তৈরির মাধ্যমে ভারত থেকে আসা পণ্যবাহী ট্রাকের প্রবেশ এবং খালি ট্রাক ফেরত যাওয়ার তথ্য ইলেকট্রনিকভাবে সংরক্ষণ করা হচ্ছে। দেশের অভ্যন্তরে সমুদ্র ও নৌবন্দরগুলোতে শিপিং এজেন্টদের জন্য স্বতন্ত্র শিপিং এজেন্ট লাইসেন্সিং বিধিমালা-২০২৫ জারি করেছে। আবার বৈশ্বিক প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশে আমদানি-রপ্তানিকারকদের সেবার মান বৃদ্ধির লক্ষ্যে কাস্টমস এজেন্ট লাইসেন্সিং বিধিমালা ২০২০ রহিত করেছে। এর পরিবর্তে কাস্টমস আইন ২০২৩ অনুসারে কাস্টমস ক্লিয়ারিং অ্যান্ড ফরোয়ার্ডিং (সিঅ্যান্ডএফ) এজেন্ট লাইসেন্সিং বিধিমালা ২০২৬ জারি করেছে। ইতোপূর্বে সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টদের কার্যক্রম সহজতর ও যুগোপযোগী করার জন্য স্বতন্ত্র কোনো বিধিমালা ছিল না। এছাড়া আমদানি-রপ্তানিকারকদের ইউটিলাইজেশন পারমিশন সংক্রান্ত সকল সেবা কাস্টমস বন্ড ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (সিবিএমএস) সফটওয়্যারের মাধ্যমে সম্পন্ন করা বাধ্যতামূলক করেছে। ফলে, রাজস্ব বোর্ডের সংশ্লিষ্ট অফিসে না গিয়েই অনলাইনে তথ্য আপলোড করে দ্রুত সনদ পাওয়া যাচ্ছে। এমনকি বন্ডেস ওয়্যারহাউজ লাইসেন্সধারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে সকল সেবা অনলাইনে দিতে সিবিএমএস সফটওয়্যারটিও গত বছরের ১ জানুয়ারি চালু করা হয়। এছাড়া আমদানি-রপ্তানির ক্ষেত্রে পেমেন্ট সংক্রান্ত তথ্য জানতে বাংলাদেশ ব্যাংকের ফরেন এক্সচেঞ্জ ট্রানজেকশন মনিটরিং সিস্টেমের সঙ্গে এনবিআরের এসাইকুডা ওয়ার্ল্ড সিস্টেমের সংযোগ স্থাপন করা হয়েছে।
সংস্থাটির মতে, মূল পরিবর্তন বা সংস্কার এসেছে ডিজিটাইজেশন, কর অব্যাহতির সংস্কৃতি এবং সাইবার নিরাপত্তাসহ কয়েকটি ক্ষেত্রে। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে এনবিআরের জন্য ১০ বছর মেয়াদি মিডিয়াম অ্যান্ড লং টার্ম রেভিনিউ স্ট্র্যাটেজি (এমএলটিআরএস) গ্রহণ করা হয়েছে। এ কৌশলের মাধ্যমে রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত বৃদ্ধি এবং রাজস্ব আহরণে কাঠামোগত সক্ষমতা জোরদারের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। ডিজিটাল রাজস্ব ব্যবস্থাপনার লক্ষ্যে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে স্ট্রেনদেনিং ডোমেস্টিক মোবিলাইজেশন প্রজেক্ট (এসডিআরএমপি) গ্রহণ করা হয়েছে, যার মাধ্যমে এনবিআরের সম্পূর্ণ কার্যক্রম ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তবে উল্লিখিত পদক্ষেপগুলো এখনো পুরোপুরি বাস্তবায়ন হয়নি বলে মনে করছেন খাত সংশ্লিষ্টরা। পাশাপাশি কিছু কিছু উদ্যোগ এখন পর্যন্ত শুরুই করা যায়নি। সংশ্লিষ্টদের মতে, এনবিআর (জাতীয় রাজস্ব বোর্ড) ভেঙে নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন বিভাগ পৃথকীকরণ, ভ্যাট ও আয়কর ব্যবস্থার পূর্ণাঙ্গ অটোমেশন এবং কর ফাঁকি রোধে সমন্বিত তথ্যভাণ্ডার তৈরির মতো বড় সংস্কার উদ্যোগগুলো মূলত বাধার মুখে বাস্তবায়ন হয়নি। এছাড়া করদাতা ও রাজস্ব আদায়কারীদের মধ্যে সক্ষমতার সঠিক পরিমাপ এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করার পরিকল্পনাগুলোও ঝুলে রয়েছে।
খাত সংশ্লিষ্টরা জানায়, এনবিআরকে নীতি প্রণয়ন (রেভিনিউ পলিসি) ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা (রেভিনিউ ম্যানেজমেন্ট) বিভাগে পৃথক করার উদ্যোগটি অনেক দূর এগিয়েও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও অভ্যন্তরীণ আন্দোলনে এখন পর্যন্ত বাস্তবায়ন হয়নি। তবে এ সংক্রান্ত একটি অধ্যাদেশ গত বছর জারি করা হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় নীতিপ্রণয়ন, স্টাফিং এবং প্রশাসনিক প্রস্তুতি অর্থাৎ সংশ্লিষ্ট নিয়োগ, স্টাফ অর্গানোগ্রাম অনুমোদন ও নিয়মনীতি এখনও সম্পন্ন না হওয়ায় মন্ত্রণালয় পর্যায়ে এই পরিবর্তন কার্যকরভাবে সম্পন্ন হয়নি। এছাড়াও এনবিআরের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের মধ্যে এই বিভাজনের বিরোধিতা ও আপত্তি বড় বাধা হিসেবে কাজ করেছে। কিছু স্তরে কর্মচারীরা প্রতিবাদ ও কর্মবিরতিও পালন করেছে।
এছাড়া এনবিআরে রাজস্বনীতি, ডিজিটালাইজেশন, আয়কর ও ভ্যাট রিটার্ন ই-সিস্টেম ইত্যাদির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এগুলো এখন পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গরূপে কার্যকর হয়নি। আমদানি-রপ্তানি সহজ করতে ২০১৭ সালে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বয়ে ন্যাশনাল সিঙ্গেল উইন্ডো (এনএসডব্লিউ) প্রকল্পের কাজে হাত দেয় তৎকালীন সরকার। এসব সংস্থা থেকে ৩২ ধরনের সনদ গ্রহণ করতে হয় আমদানি-রপ্তানিকারকদের। কিন্তু নানা চড়াই-উতরাইয়ের পরও তা বাস্তবায়ন করতে পারেনি। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে এই প্রকল্পটিই নাম পরিবর্তন করে বাংলাদেশ সিঙ্গেল উইন্ডো (বিএসডব্লিউ) করা হয়। এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে ৩৮টি সংস্থা জড়িত হওয়ার কথা থাকলেও এখন পর্যন্ত মাত্র ১১টি সংস্থা এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত হয়েছে।
এদিকে অনলাইনে ভ্যাট রিফান্ডের ক্ষেত্রে আরেক ভোগান্তির মুখোমুখি ব্যবসায়ীরা। সফটওয়্যার সমস্যার কারণে আইবাস সিস্টেমে যেমন রিফান্ড পেতে প্রয়োজনীয় দলিলাদি আপলোড করা যাচ্ছে না, অপরদিকে চাপ সামলাতে না পেরে প্রায়শই ‘হ্যাং’ করছে। এই সিস্টেম নিয়ে ব্যবসায়ীদের যে অভিযোগটি বড় হয়ে দেখা দিয়েছে তা হলো- ম্যানুয়েল পদ্ধতিতে যে ভাবে অতিরিক্ত ভ্যাট, সম্পূরক শুল্ক ও অগ্রিম আয়করের রিফান্ড আবেদন করা যেত, তা এখানে হচ্ছে না। শুধু আমদানি পর্যায়ে কেটে নেওয়া ২ শতাংশ অগ্রিম আয়করের জন্য আবেদন করা যাচ্ছে। ফলে, এ পর্যন্ত প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকার রিফান্ডের জন্য আবেদনই করা যায়নি।
ভ্যাট সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মোট আট খাতে রিফান্ড তৈরি হয়। এনবিআর শুধু অগ্রিম কর রিফান্ড দিচ্ছে। বাকি খাতগুলোর রিফান্ড না দেওয়ায় ব্যবসার মূলধন সংকুচিত হয়ে পড়ছে। যার প্রভাব পড়ছে সামগ্রিকভাবে দ্রব্যমূল্যে।
এদিকে ই-রিটার্ন নিয়েও সাধারণ মানুষের মধ্যে ভোগান্তি তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ই-রিটার্ন দাখিলে যে সব প্রয়োজনীয় তথ্য জমা দিতে হচ্ছে, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে- বেতন খাতের আয়ের দলিল, সিকিউরিটিজের ওপর সুদ আয়ের সনদ, ভাড়ার চুক্তিপত্র, পৌর করের রসিদ, বন্ধকি ঋণের সুদের সনদ, মূলধনি সম্পদের বিক্রয় কিংবা ক্রয়মূল্যের চুক্তিপত্র ও রসিদ, মূলধনি ব্যয়ের আনুষঙ্গিক প্রমাণপত্র, শেয়ারের লভ্যাংশ পাওয়ার ডিভিডেন্ড ওয়ারেন্ট, সুদের ওপর উৎসে কর কাটার সার্টিফিকেট।
আবার বিনিয়োগে কর রেয়াত পেতে যে সব তথ্য লাগে, তার মধ্যে রয়েছে জীবন বিমার কিস্তির প্রিমিয়াম রসিদ, ভবিষ্য তহবিলে দেওয়া চাঁদার সনদ, ঋণ বা ডিবেঞ্চার, সঞ্চয়পত্র, শেয়ারে বিনিয়োগের প্রমাণপত্র, ডিপোজিট পেনশন স্কিমে (ডিপিএস) চাঁদার সনদ, কল্যাণ তহবিলের চাঁদা ও গোষ্ঠী বিমার কিস্তির সনদ, জাকাত তহবিলে দেওয়া চাঁদার সনদ। এছাড়াও রয়েছে সফটওয়্যারে লগইনজনিত সমস্যা। ফলে, একজন সাধারণ গ্রাহকের কাছে এটা চরম মাত্রায় ভোগান্তি বলে তারা মনে করছেন। ফলশ্রুতিতে রিটার্ন দাখিলের সময়সীমা ৩১ নভেম্বর পর্যন্ত হলেও বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো রিটার্ন দাখিলের সময় অতিরিক্ত ৪ মাস বাড়িয়ে ৩১ মার্চ পর্যন্ত করা হয়েছে।
এনবিআরকে পেপারলেস তথা ডিজিটাইজেশনের কথা বলা হলেও এক্ষেত্রে বহু পিছিয়ে রয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। রাজস্ব ব্যবস্থা ডিজিটালাইজেশন করার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসারে ১৬টি শর্ত পূরণ করতে হয়। কিন্তু এখন পর্যন্ত এই শর্তগুলোর মাত্র তিনটি পূরণে সক্ষম হয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড।
এছাড়া অন্যান্য সংস্থার সহযোগিতা না পাওয়ায় এখনো যে সব বিষয়ে কাজ শুরু করা যায়নি, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে-
ভূমি নিবন্ধন অটোমেশন : ভূমি নিবন্ধন অফিসগুলো পুরোপুরি অটোমেশনের আওতায় না আসায় সম্পত্তির বিনিয়োগের সঠিক তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে, রাজস্ব বৃদ্ধি যেমন সম্ভব হচ্ছে না, তেমনি কর ফাঁকি কমানো এবং সম্পদ যাচাই করাও কঠিন।
সমন্বিত তথ্য ব্যবস্থা : বিভিন্ন সংস্থায় কর ফাঁকি রোধে ব্যাংক আমানতসহ অন্যান্য তথ্যের সঙ্গে এনবিআরের সমন্বিত ডিজিটাল তথ্য ব্যবস্থা (ইন্টিগ্রেটেড ইনফরমেশন সিস্টেম) গড়ে ওঠেনি।
কর অব্যাহতি কমানো : কর অব্যাহতি (ট্যাক্স এক্সাম্পশন) কমানোর নীতি বা ফ্রেমওয়ার্ক প্রণয়ন করা হলেও এর পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে।
পারফরম্যান্স পরিমাপ ব্যবস্থা : রাজস্ব আদায়কারী কর্মকর্তাদের কাজের সঠিক মূল্যায়ন বা পারফরম্যান্সের ওপর ভিত্তি করে ক্যারিয়ার উন্নয়নের সুনির্দিষ্ট কাঠামো তৈরির উদ্যোগটি সফল হয়নি।
অভিজ্ঞ নেতৃত্ব : এনবিআরের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে নিজস্ব ক্যাডার থেকে দীর্ঘমেয়াদি শীর্ষ কর্মকর্তা পদায়ন না হওয়া।
সার্বিকভাবে এনবিআরের সংস্কার উদ্যোগকে শুভ সূচনা বললেও এখনো অনেকদূর যেতে হবে বলে মনে করছেন দেশের অর্থনীতি বিশ্লেষকরা। পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশ চেয়ারম্যান ও সিইও মাশরুর রিয়াজ জনকণ্ঠকে বলেন, তারা অনেক কিছুই সংস্কার করবে বলেছে, কিন্তু এর মধ্যে সামান্যই প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। তার মতে, এনবিআর বাংলাদেশ সিঙ্গেল উইন্ডো চালু করেছে। আংশিক রপ্তানিকারক বন্ড চালু করেছে। ট্যাক্স অডিটের ক্ষেত্রে একটি নতুন ক্রাইটেরিয়া চালুর আগে পর্যন্ত স্থগিত রেখেছে। এ নিয়ে ব্যবসায়ীদের হয়রানির অভিযোগ ছিল। কিন্তু সামগ্রিকভাবে আমাদের রাজস্ব ব্যবস্থা এত দুর্বল যে ছোট ছোট সংস্কার দিয়ে খুব বড় পরিবর্তন আশা করা যায় না। এখানে ২-৩ বছরের জন্য সামগ্রিকভাবে রিফর্ম প্রোগ্রাম বা সংস্কার কর্মসূচি নেওয়া প্রয়োজন ছিল, যেটা নেওয়া হয়নি।
একই কথা বলেন গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিপিডির সহকারী গবেষণা পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খান। জনকণ্ঠের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, এনবিআর সংস্কারে কিছু কাজ হয়েছে। একেবারে যে হয়নি, তা বলা যাবে না। তবে এখনো অনেক লম্বা পথ বাকি আছে।
সংস্কারের ক্ষেত্রে নতুন সরকারকে পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, শুধু এই রিফর্ম দিয়ে তাদের যে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি তা পুরোপুরি পূরণ হবে না। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিতে জানিয়েছে, ট্যাক্সজিডিপি রেশিও ১৫ শতাংশে নেবেন। হিসেব করে দেখা গেছে, এই লক্ষ্যমাত্রা পূরণে বর্তমান সরকারের মেয়াদে ১৩ দশমিক ৫০ শতাংশ হারে বৃদ্ধি করতে হবে, যেটা এখন সাড়ে ৬ শতাংশ। আমরা বলেছি এক্ষেত্রে একটি সমন্বিত কর ব্যবস্থাপনা তৈরি করতে যেটা পুরোটাই ডিজিটালাইজড হবে। এখানে যে কোনো ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সব ধরনের সম্পদ এবং ইনকাম ট্যাক্স রিটার্ন সবই ইন্টিগ্রেটেড থাকবে।
তবে দেশের অর্থনৈতিক ভঙ্গুর পরিস্থিতিতে সরকারকে নিজেদের স্বার্থেই সংস্কার কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে হবে বলে জানিয়েছেন এই দুই অর্থনীতি বিশ্লেষক। মাশরুর রিয়াজের মতে, অন্তর্বর্তী সরকার যেখানে ব্যর্থ হয়েছে সেটা হলো বাস্তবায়ন। তারা অনেক সংস্কারের কথা বলেছে। দু’একটি হয়েছে, কিন্তু সার্বিকভাবে বাস্তবায়নে অগ্রগতি হয়নি। সরকারকে এটা করতেই হবে, কারণ রাজস্ব লাগবে। এমনকি তাদের নির্বাচনী ইশতেহারেও অনেক কর্মসূচি আছে, যেগুলো বাস্তবায়নে রাজস্ব লাগবে। অবশ্যই তাদের নিজেদের স্বার্থে এবং দেশের স্বার্থে এটা করতে হবে।
অপরদিকে তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, সরকারের যে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি আছে, সেটা পূরণ করতে পারবে না, যদি কর ব্যবস্থাপনার সংস্কারকে সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করতে না পারে। সরকারের খুবই বড় ধরনের আর্থিক সীমাবদ্ধতা তৈরি হবে। দ্বিতীয়ত, এই সংস্কার কার্যক্রমকে বাস্তবায়নে আগেও যেমন গোষ্ঠীস্বার্থ বাধা ছিল, এখনো তেমনই গোষ্ঠীস্বার্থই বাধা। সুতরাং রাজনৈতিক স্বদিচ্ছা ছাড়া এটাকে জোর দিয়ে আগায়ে নেওয়া যাবে না। এটা সরকারের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ, অর্থাৎ সংস্কার না করে টিকে থাকার কোনো সুযোগ নেই।

প্যানেল / জোবায়ের

×