ঢাকা, বাংলাদেশ   শনিবার ২২ জুন ২০২৪, ৮ আষাঢ় ১৪৩১

ঈর্ষার হ্যাঙ্গারে

অপূর্ব কুমার কুন্ডু

প্রকাশিত: ২২:৩৮, ৬ জুন ২০২৪; আপডেট: ২২:৪০, ৬ জুন ২০২৪

ঈর্ষার হ্যাঙ্গারে

.

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার ‘পনেরো-আনা’ প্রবন্ধে দেখিয়েছেন সংসার-পরিবার-সমাজে এক আনা মানুষ প্রয়োজনের দিক দিয়ে অনস্বীকার্য। অপরদিকে পনেরো আনা মানুষ বাহুল্য। অথচ এই বাহুল্য মানুষের দিকেই কবির টান। এতদসত্ত্বেও তিনি সতর্ক করেছেন, ‘যখন পনেরো-আনা এক-আনার মতোই অশান্ত ও আবশ্যক হইয়া উঠিবার উপক্রম করে, তখন জগতে আর কল্যাণ নাই।’ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বলে যাওয়া কথাটা যে কতটা প্রাসঙ্গিক এই বর্তমান জগতে তার বড় প্রমাণ ফেসবুক, ইউটিউবসহ অগণিত অ্যাপসের মাধ্যমে রাতারাতি মানুষের বিখ্যাত হবার প্রবণতা, বিখ্যাত হবার প্রচেষ্টায় প্রয়োজনে বিক্রিতির পথ বেছে নেয়। আর সেই পনেরো আনার মানুষের পথ ভ্রষ্টতা আর দেশের স্বনামধন্য নায়কের শ্বশুরের ফেসবুক লাইভে এসে আত্মহত্যা করার আলোকে সময়ের বর্তমান বাস্তবতাকে ঘিরে কবি-নাট্যকার আসাদুল ইসলাম তার সদ্য রচিত ও প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ ‘ঈর্ষার হ্যাঙ্গারে নারী নক্ষত্র’ এর ভাইরাল মৃত্যু কবিতায় লিখলেন,

 একটি ভাইরাল মৃত্যু

গ্যালারি ঠাসা গাড়ল দর্শকদের

একটি সাড়া জাগানো হিট উইকেট

চর্মচক্ষে দেখার সৌভাগ্যে

বুকের বায়ুমন্ডল চিরে

কণ্ঠ থেকে ক্ষণে ক্ষণে বেরিয়ে আসতে থাকলো

অপ্রাকৃত স্বরের আসমানি ধ্বনি

লাইক লাইক লাইক লাইক লাইক লাইক।

লাইক ডিজলাইকের অনেক ঊর্ধ্বে রাণী দ্বিতীয় এলিজাবেথ। তাঁর হিমালয়ের মতো প্রাজ্ঞ জীবনের অবসানে যে শূন্যতা যে বেদনা তাকে মরমীয় অনুভূতিতে কবি আসাদুল ইসলাম ফুটিয়ে তুললেন দ্বিতীয় এলিজাবেথ কবিতায়,

বিদায়

বিবিসিতে ঘোষিত হলো পৃথিবীর শেষ সম্রাজ্ঞীর বিদায়

পৃথিবীর এক এবং অদ্বিতীয়

দ্বিতীয় এলিজাবেথ

নিওলিবারেলিজমের দিনে

দুই হাজার বাইশ খ্রিস্টাব্দের আট সেপ্টেম্বর অবধি

যাঁর ছায়া ধারণ করেছিল সৌরজগতের সবুজ ও সুন্দরতম গ্রহ

বিদায় হে রাণী।

রাণী না বরং জীবদ্দশায় অবহেলা কিন্তু মৃত্যুর পরে তাকে দেবী-মহিয়সী কিংবা মিথ বানিয়ে তোলার তীব্র প্রহসন অন্যান্য অঙ্গনের মতো শিল্পাঙ্গনেও দৃশ্যমান। কবি আসাদুল ইসলাম কবির সমান্তরাল নাট্যকার-নির্দেশক-অভিনেতা ও দলপ্রধান। ফলে অভিনেত্রী ইশরাত নিশাতের জীবদ্দশায় অবস্থান কিন্তু মৃত্যুর পর নাটকীয় উত্থান একজন কবিকে ভাবাবে সেটাই স্বাভাবিক। অস্বাভাবিক মূল্যায়নের মাঝে নিরপেক্ষ মূল্যায়নের স্বার্থে কবি আসাদুল ইসলামের সত্যাশ্রায়ী যথাযথ বৈশিষ্ট্য তুলে ধরার প্রচেষ্টা ইশরাত নিশাত কবিতায় দৃশ্যমান,

আমাদের গল্পের সন্ধ্যা নদী

গানের গহিন কুয়াশায়  পাড়ি দেওয়া মন

ক্ষণে ক্ষণে ডেকে ওঠে আত্মার আঁতুড় ঘরে শালিক পাখি

ইশরাত নিশাত

ইশরাত নিশাত

গ্লানির  গভীর থেকে কাতর ধ্বনি কালো তরঙ্গের মতো বলে ওঠে

ইশ

রাত নেমে আসে

অসংখ্য ক্লান্তিকর রাত্রির দুর্বোধ্য ইশতেহার

ইশতেহার করেও তো থামানো যাচ্ছে না পথ দুর্ঘটনা-নৌ ডুবি-অগ্নিকান্ডের মতো ঘটনার পরমপরা। দুর্ঘটনা ঘটছে, মানুষ সর্বস্বান্ত হচ্ছে, দোষারোপের পালা চলছে তবুও সিস্টেম ডেভেলপ করা যাচ্ছে না। আর তাই কবি আসাদুল ইসলামের তীব্র উচ্চারণ হায় কবিতায়,

ভরদুপুরে নৌকায় নদী পার হতে গেলে মাকে মরে যেতে হবে

এর দায় নেবে কে

প্রশাসনিক পরিভাষায়

অনিবন্ধিত নৌযানের দায়দায়িত্ব কারো নয়

দায়িত্ব জ্ঞানহীন মৃত্যুর জন্য তবে মৃতরাই দায়ী হোক।

দায়ী হোক কিংবা না হোক প্রচ্ছদ শিল্পী ধ্রুবএষ ঈর্ষার হ্যাঙ্গারের বিভৎসতা ফুটাতে যতটা যত্নবান ততটা নয় নক্ষত্র রূপ নারীর আভা ফুটিয়ে তোলায়। ঐতিহ্য প্রকাশনা থেকে প্রকাশিত কবি আসাদুল ইসলামের সত্তরটি কবিতা নিয়ে প্রকাশিত গ্রন্থ নান্দনিক। কবি আসাদুল ইসলাম শ্রদ্ধাশীল কাব্য রচনায় ফলে তার কাব্যচর্চার পথ চলা হোক প্রাণবন্ত-জীবনঘনিষ্ঠ এবং নয়নাভিরাম বৈচিত্র্যময় স্বাদের কাব্য ব্যাঞ্জনায়।

 

 

×