ঢাকা, বাংলাদেশ   শুক্রবার ১৯ জুলাই ২০২৪, ৪ শ্রাবণ ১৪৩১

হেলাল হাফিজের পঞ্চসত্তা

আবু আফজাল সালেহ

প্রকাশিত: ২১:২৯, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৩

হেলাল হাফিজের পঞ্চসত্তা

হেলাল হাফিজের কবিতা একইসঙ্গে প্রেমের ও দ্রোহের কথা বলে

হেলাল হাফিজের কবিতা একইসঙ্গে প্রেমের ও দ্রোহের কথা বলে। আবার মানবতা-অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য সংগ্রামের কথা বলে। প্রেম-বিরহ-দ্রোহ-মানবতা-সংগ্রাম- এই পঞ্চসত্তার কবি হেলাল হাফিজের কবিতায় বিরাজমানÑ মাঝেমধ্যে একটি কবিতাতেই। এই সবকটা সত্তা সমানভাবে সক্রিয় রাখতে সক্ষম হয়েছেন। ‘এক অঙ্গে অনেক রূপ’ গুণ কবিকে অন্য কবিদের থেকে পৃথক করেছে। যা বিশ্বসাহিত্যেও কম লক্ষ্য করা যায়। নিঃসঙ্গতার সঙ্গে বসবাস করতে করতে হেলাল হাফিজ নিজেকে খাঁটি করেছেন। কবিতার জগতে সমৃদ্ধির সোপান নির্মিত হয়েছে। ভিজে ভিজে নিজেকে দাঁড়কাক করেই চলেছেন। নিঃসঙ্গতাকেই সঙ্গী করে অল্পকবিতা লিখেও আলোচিত হন প্রধান কবিদের একজন হিসাবে।  মর্যাদা পান প্রেম ও দ্রোহের কবি হিসাবে।
‘তোমার হাতে দিয়েছিলাম অথৈ সম্ভাবনা,
তুমি কি আর অসাধারণ? তোমার যে যন্ত্রণা
খুব মামুলী, বেশ করেছো চতুর সুদর্শনা
আমার সাথে চুকিয়ে ফেলে চিকন বিড়ম্বনা (সুদর্শনা)’-নারীর প্রতি ভালোবাসা, একইসঙ্গে অবিশ্বাস এ টানাপোড়েন হেলাল হাফিজের কবিতায় লক্ষ্য করা যায়। নিজের জীবনযাত্রায় আজীবন বোহেমিয়ান-যাযাবর। নিজস্ব বাসা নেই, সঙ্গী নেই। হোটেলেই কাটান অনেকদিন। নিঃসঙ্গতার মধ্যেই আবার স্বপ্ন দেখেন, স্বপ্ন দেখাতে চান।  ‘তুমি আমার নিঃসঙ্গতার সতীন হয়েছো! (সতীন)’ কবিতার মধ্যেই নিঃসঙ্গতার স্বরূপ প্রকাশিত হয়েছে বলে মনে করি। 
বিশ্বসাহিত্যের অন্যতম কবি হাইন। জার্মান এ কবি নিঃসঙ্গতাকে আগলে রেখেছেন। তাঁর মতোই ভিজে ভিজে দাঁড়কাক হয়েই রয়েছেন কবি হেলাল হাফিজ। যৌবন, প্রেম বা নারী আর যুদ্ধ- ত্রিসত্তায় কবিতা হয়ে উঠেছে প্রাণবন্ত। প্রেম আর যুদ্ধক্ষেত্রে কোনো নিয়ম মানে না, মানে না আইন।

হেলাল হাফিজ কিন্তু স্বাধীনতা অর্জন বা সত্তা টিকিয়ে রাখার জন্য প্রেমকে বা নারীকে পাশে রেখে যুদ্ধকেই সম্মুখে রেখেছেন। নারীর প্রেম, স্বাধীনতা, যুদ্ধ, গোলাপ ইত্যাদি মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে তার কবিতায়। একই কবিতায় রোমান্টিসিজম, ব্যক্তিত্ব ও যুদ্ধ প্রভৃতির অনুষঙ্গ একত্রেই পাওয়া যায়। এ গুণ বিরলই বটে। এমনকি বিশ্বসাহিত্যেও প্রায় বিরল।  
‘ব্যর্থ হয়ে থাকে যদি প্রণয়ের এতো আয়োজন,
আগামী মিছিলে এসো
স্লোগানে স্লোগানে হবে কথোপকথন।
আকালের এই কালে সাধ হলে পথে ভালোবেসো,
ধ্রুপদী পিপাসা নিয়ে আসো যদি 
লাল শাড়িটা তোমার পরে এসো। ’
(ঘরোয়া রাজনীতি)

‘মানুষ না বোঝে যদি আরেক মানুষ
আমি আহত হবো না, আহত হবো না।
কবিতার কসম খেলাম আমি শোধ নেবো সুদে ও আসলে,
এবার নিহত হবো
ওসবের কোনো কিছুতেই তবু শুধু আর আহত হবো না।’
(কবিতার কসম খেলাম)Ñ বলার মধ্যেই নিঃসঙ্গতার ব্যথার অনুভব বা কষ্ট আমরা অনুধাবন করতে পারি। বিষণœতা ও ব্যঙ্গময়তা জার্মান হাইনের কবিতার অন্যতম প্রবণতা। তাঁর কবিতায় রয়েছে রোমান্টিক চিহ্নবলি আবার রোমান্টিসিজমের বিরুদ্ধে যুদ্ধ, জার্মান রুচিকে বিরোধিতা করা। ব্যক্তিজীবনে প্রেমের প্রতি প্রগাঢ়তা, নারীর প্রতি লাবণ্যপিপাসা, প্রেমের বঞ্চনা, প্রবল দ্বৈততা, দীর্ঘ 
নিঃসঙ্গতা ছিল। কবিতার এসবের প্রতিফলন দেখতে পাওয়া যায়। হেলাল হাফিজের কবিতায়ও এসব প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। হাইন নারীর কাছ থেকেই কবিতার উপাদান সংগ্রহ করেছেন। হেলালও তাই। নারীকেন্দ্রিক কবিতাই বেশি। যুদ্ধ, নিসঃঙ্গতা, প্রেম একইসঙ্গে দেখা যায় তার কবিতায়। কবিতায় নারীর প্রতি আগ্রহ ও প্রগাঢ়তা দেখা দিলেও বাস্তবে হেলাল হাফিজ ছিলেন চিরকুমার। উভয় কবির কাছেই নারী যুগপৎ সুখ ও দুঃখের উৎস। উভয়ই নারীর সৌন্দর্য ও ছলনা নিয়ে কবিতার বুনন দিয়েছেন। প্রগাঢ় সংগ্রাম এবং সঙ্গে সঙ্গে নিঃসঙ্গতা হাইনের কবিতার একটি প্রবণতা। একই প্রবণতা আমরা দেখতে পাই বাঙালি কবি হেলাল হাফিজের কবিতায়।

হাইনের হৃদয়ে, একদিকে বর্বর অন্যদিকে সৌন্দর্য। তবে দুজনের ভাষা আলাদা। হাইন বিভিন্ন মিথ ব্যবহার করলেও হেলাল দেশজ ও চিরচেনা পরিবেশ থেকে শব্দ নিয়েছেন, গড়েছেন চিত্র বা কবিতার অবয়ব। The Mattress Grave বই দেখা যেতে পারে। হাইনের ভাষায়, এখনও গ্রীষ্ম পার হয়নি, কিন্তু আমার শস্য তোলা হিয়ে গেছে- প্রিয় ও মধুর সবকিছুই ছেড়ে যেতে হবে: Still flourishes the summer of my year/But I've already gathered all the crop(Mein Tag war heiter)

দুই কবির ক্ষেত্রেই স্মৃতি আর স্বপ্ন পাশাপাশি বহমান। হাইনের অনুভব হচ্ছে সকল সুন্দর মহান। কিন্তু ধীরে ধীরে হৃদয়ের মধ্যে সূর্যালোকের জন্য জীবন নিভে আসে। সবকিছু মৃত্যুতে পরিণত হয়। কখনও দেখা গেছে ব্যঙ্গাত্মক দৃষ্টিভঙ্গি।  হেলাল হাফিজের ক্ষেত্রেও দেখা যায়।  
(১) ‘আমি এখন অন্য মানুষ ভিন্ন ভাবে কথা বলি
কথার ভেতর অকথিত অনেক কথা জড়িয়ে ফেলি
এবং চলি পথ বেপথে যখন তখন।
...অপুষ্টিতে নষ্ট প্রাচীন প্রেমের কথা যত্রতত্র কীর্তন আমার
মাঝে মধ্যে প্রণয়বিহীন সভ্যতাকে কচি প্রেমের পত্র লিখি’
(তোমাকেই চাই)

(২) ‘তাকানোর মতো করে তাকালেই চিনবে আমাকে। 
...আমাকে চিনতেই হবে
তাকালেই চিনবে আমাকে।
আমাকে না চেনা মানে
...সকালের শিশির না চেনা, 
ঘাসফুল, রাজহাঁস, উদ্ভিদ না চেনা।’
(নাম ভূমিকায়)
হেলাল হাফিজের কবিতা প্রেম ও বাস্তব স¤পর্কে চোখ খুলে দেবে। ‘সময়’ কবির কাছে মুখ্য বিষয়। যুদ্ধের সময় প্রেম নিষ্ক্রিয় রাখার পক্ষপাতি তিনি। প্রেম-ভালোবাসা একান্তই নিজস্ব। এখানে কারও কর্তৃত্ব চান না তিনি। প্রেমের সময় একান্তই নিজের জগৎ সৃষ্টি করতে চান। সে জগতের রাজা তিনি নিজেই। এবং সে রাজ্যের সম্রাজ্ঞী করতে চান প্রেয়সীকে। 
‘ইচ্ছে ছিল রাজা হবো
তোমাকে সাম্রাজ্ঞী করে সাম্রাজ্য বাড়াবো,
আজ দেখি রাজ্য আছে
রাজা আছে
ইচ্ছে আছে,
শুধু তুমি অন্য ঘরে।’
(ইচ্ছে ছিলো)

নজরুল, সুকান্ত বা বায়রনের মতো সরাসরি বিপ্লবী নন তিনি। তবে হৃদয়ে ও বিবেকে মোচড় দেয় অন্যায্য, বঞ্চিত, অনাচারের বিরুদ্ধে কোমল ভাষার শব্দগুলো। এসব শব্দ বা শব্দশ্রেণি কুসুমের মতো নরম কিন্তু আগুনের মতো তেজস্বী। দ্রোহের পরিবেশে কবি মাঝেমধ্যে শ্লেষ, বক্রোক্তি ব্যবহার করেছেন। ব্যঙ্গময়তার আবহ এনেছেন কিছু কবিতায়। এ হিসাবে তিনি দ্রোহী। এ দ্রোহ সমাজের প্রতি, অত্যাচারী শাসকের প্রতি, অসংলগ্ন প্রেমের প্রতি। হেলাল হাফিজের কবিতা পাঠে এমন উপলব্ধি আসবে। তাঁর এ বিদ্রোহ শরতের নীল আকাশে কালোমেঘের মতো।
(১) আমার কষ্টেরা বেশ ভালোই আছেন,
প্রাত্যহিক সব কাজ ঠিক-ঠাক করে চলেছেন
খাচ্ছেন-দাচ্ছেন, অফিসে যাচ্ছেন,
প্রেসক্লাবে আড্ডাও দিচ্ছেন।
...আমার কষ্টেরা বেশ ভালোই আছেন, মোটামুটি সুখেই আছেন।
প্রিয় দেশবাসী;
আপনারা কেমন আছেন?
(ইদানীং জীবন যাপন)
(২) মানুষ না বোঝে যদি আরেক মানুষ
আমি আহত হবো না, আহত হবো না।
কবিতার কসম খেলাম আমি শোধ নেবো সুদে ও আসলে,
এবার নিহত হবো
ওসবের কোনো কিছুতেই তবু শুধু আর আহত হবো না।
(কবিতার কসম খেলাম)

(৩) পতন দিয়েই আমি পতন ফেরাবো বলে
মনে পড়ে একদিন জীবনের সবুজ সকালে
নদীর উলটো জলে সাঁতার দিয়েছিলাম।
(নিখুঁত স্ট্র্যাটেজী)
বাংলাদেশের প্রধান অর্জন মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জন। বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার পাশাপাশি কবি-লেখক অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন। যুদ্ধের সময়ের অবস্থা বিবেচনা করে হেলাল হাফিজ বলেন, ‘এরকম দুঃসময়ে আমি যদি মিছিলে না যাই,/ উত্তর পুরুষ ভীরু কাপুরুষের উপমা হবো (দুঃসময়ে আমার যৌবন)’। দেশের প্রতি, মানুষের প্রতি কবির অকৃত্রিম ভালোবাসা। দ্রোহের তীব্র বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে বিভিন্ন কবিতায়। এমন কিছু কবিতাংশ তুলে ধরছিÑ
(১) লাল কষ্ট নীল কষ্ট কাঁচা হলুদ রঙের কষ্ট
পাথর চাপা সবুজ ঘাসের সাদা কষ্ট,
আলোর মাঝে কালোর কষ্ট
‘মালটি-কালার’ কষ্ট আছে
কষ্ট নেবে কষ্ট ।
(ফেরীঅলা)
(২) কবিতা তো অবিকল মানুষের মত। কবিতা তো মানুষের কথাই বলে।
...কবিতা তো রূপান্তরিত শিলা, গবেষণাগারে নিয়ে
খুলে দেখো তার সব অণু-পরমাণু জুড়ে
কেবলি জড়িয়ে আছে মানুষের মৌলিক কাহিনী।
(উৎসর্গ)

(৩) দেশ ও জাতি আগে। যদিও তিনি মুখ্যত প্রেমের কবি। তারপরেও দেশের প্রয়োজনে প্রেম সরিয়ে রেখে অস্ত্র ধরার জন্য প্রস্তুত। অস্ত্র ধরেছেনও—
যদি কোনোদিন আসে আবার দুর্দিন,
যেদিন ফুরাবে প্রেম অথবা হবে না প্রেম মানুষে মানুষে
ভেঙে সেই কালো কারাগার
আবার প্রণয় হবে মারণাস্ত্র তোমার আমার।
(অস্ত্র সমর্পণ)

(৪) ইচ্ছাকৃত অত্যাচার বা বিবেকের অত্যাচার সবচেয়ে খারাপ। চোরে চুরি করলে সব নিয়ে যায় না, আগুনে পুড়ে গেলে কিছু থাকে- অন্তত ছাই থাকে। কিন্তু মানুষের পচন হলে, অবক্ষয় হলে বা 
অত্যাচারিত হলে কিছুই অবশিষ্ট থাকে না!-
আগুন আর কতোটুকু পোড়ে ?
সীমাবদ্ধ ক্ষয় তার সীমিত বিনাশ,
মানুষের মতো আর অতো নয় আগুনের সোনালি সন্ত্রাস
...মানুষে পোড়ালে আর কিছুই রাখে না
কিচ্ছু থাকে না,
(মানবানল)

(৫) পতাকা হচ্ছে প্রতীকী। স্বাধীনতা অর্জন করলে একটি পতাকা পাওয়া যায়, একটি দেশ পাওয়া 
যায়। স্বাধীনতা পেলে ইচ্ছেমতো কথা বলা যায়, ইচ্ছেমতো ভোগ করা যায়। জাতীয় সংগীতে শিহরন জাগে। পাতাকুড়োনিও শীতের ওম নেবে, অত্যাচার করবে না ভিন দেশের লোক, বাধ্য করবে না অন্যের ইচ্ছায় চলতে। যুদ্ধের মাধ্যমে, সম্মিলিত প্রচেষ্টায় মানচিত্র পেলে বিরাট ঐকতান গড়ে উঠবে :
কথা ছিলো একটি পতাকা পেলে
পাতা কুড়োনির মেয়ে শীতের সকালে
ওম নেবে জাতীয় সংগীত শুনে পাতার মর্মরে।
...কথা ছিলো একটি পতাকা পেলে
আমাদের সব দুঃখ জমা দেবো যৌথ-খামারে,
সম্মিলিত বৈজ্ঞানিক চাষাবাদে সমান সুখের ভাগ
সকলেই নিয়ে যাবো নিজের সংসারে।
(একটি পতাকা পেলে)

কবি হেলাল হাফিজ নারীকে শুধু রক্তমাংসের ভাবেননি, বিরাট শক্তির আধার ভেবেছেন। নারীকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন হিসাব মিলিয়ে নিতে চেয়েছেন। নারী কখনও বিনোদনের সঙ্গী, কখনও বা অভিযানের সারথি। আবার জীবনযন্ত্রণাকারীও ভেবেছেন। নারীর মধ্যে তিনি খুঁজে পান অপার সৌন্দর্য। হেলেন যেমন ট্রয়নগরী ধ্বংসের জন্য কারণ বলে মনে করা হয়। কবি হেলাল হাফিজ কিন্তু এ বাস্তবতাও মনে রেখেছেন। পুরুষজীবনে সৌন্দর্য বিলানো বা চলার সঙ্গী হিসাবে যেমন গৌরবময় হতে পারে, আবার ছলনার জালেও ফেলতে পারে- এ দ্বৈতসত্তা কবির কবিতায় উঠে এসেছে। আর এটাই কিন্তু বাস্তবতা। বাস্ততাকে অস্বীকার করে অতি আবেগ ঢেলে দেননি।

তার এ মানসচিন্তার প্রতিফলন তাকে অন্যদের চেয়ে আলাদা করেছে বলে মনে করি। সর্বানুভূতি ও সৌন্দর্যবোধের যুগল সমন্বয়ে এক নতুন প্রেমমূর্তিই নবজন্ম দান করেছে। অভিজ্ঞতা আর অনুভূতি ইত্যাদির মিশেলে প্রেমচেতনার বিভিন্ন স্তর পেরিয়ে পেরিয়ে কবিতায় এনেছেন বহুমুখীনতা। প্রেম, বিরহ ও বিদ্রোহের নানান স্তরভেদ করে গড়ে তুলেছেন এক সমৃদ্ধ কাব্যসম্ভার; যা পাঠককে করছে বিনোদিত ও প্রাজ্ঞ।

×