ঢাকা, বাংলাদেশ   শনিবার ০৩ ডিসেম্বর ২০২২, ১৮ অগ্রাহায়ণ ১৪২৯

monarchmart
monarchmart

ধল প্রহরের আলো

নাজনীন বেগম

প্রকাশিত: ২১:৪৬, ১০ নভেম্বর ২০২২

ধল প্রহরের আলো

ধল প্রহরের আলো

সত্তর দশকের নন্দিত কবি বিমল গুহের ‘ধল প্রহরের আলো’ গ্রন্থটি সমকালীন সমাজ আর্থ-রাজনৈতিক প্রতিবেশ, সামরিক শাসনের এক নায়কত্ব সব মিলিয়ে এক অনন্য চিন্তার সরোবর। লেখকের ঘরণী মীনা গুহকে উৎসর্গ করা বইটি প্রকাশের দায়িত্বে নান্দনিক প্রকাশনা টাঙ্গন। প্রচ্ছদ শিল্পী ধ্রুব এষ। ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনের অস্থির সময়ে জন্ম নেওয়া লেখক কি মাত্রায় অতি শেশব থেকে যাপিত জীবনকে বিড়ম্বিত হতে দেখেছেন তারই সুসংবদ্ধ লেখন এই ‘ধল প্রহরের আলো’। শুধু নিজের দেখা বৈচিত্র্যিক ঘটনাবলিই নয় অগ্রজদের মুখ থেকে শোনা অনেক ঐতিহাসিক, কিংবা দন্তিও লেখকের মনন শিল্পের অনুষঙ্গ হয়েছে। সেখানে জন্মস্থান নিজের গ্রাম বাজালিয়ার প্রসঙ্গটি এসেছে বহুবার। সাতকানিয়া থানার বাজালিয়া গ্রাম।

বন্দরনগরী চট্টগ্রামের স্বনামে পরিচিত এই সাতকানিয়া কাহিনী কথককেও বহুমাত্রায় উদ্বেলিত করতে নানাভাবে প্রাণিত করেছে। সঙ্গে উল্লেখিত আছে সাঙ্গ নদীর নির্মল ¯্রােতধারা। আসলে সাঙ্গু নয় অতি পরিচিতি শঙ্খনদী। নদীর উৎসারিত জলধারা শেষ অবধি বঙ্গোপাসাগরে মিলিত হওয়ার অনন্য স্মৃতি যেন বিমল বাবুকে মাতিয়ে দেয়া। পিতা প্রসন্নকুমার গুহের নাম বিভিন্নভাবে উচ্চারণ করতে অকুণ্ঠিতও দেখা যায়। শৈশবকালের কাহিনীর সঙ্গে কোনো পুত্রসন্তান তার পিতার সান্নিধ্যে যে মাত্রায় নিজেকে ঐশ্বর্যময় করে তোলে তার দাম যেন অমূল্য। পিতার হাত ধরে প্রথম গ্রাম থেকে বের হওয়ার উজ্জ্বল স্মৃতি আজও অম্লান।

সেই পিতামহের আমল থেকে একান্নবর্তী পরিবারে বড় হওয়ার সুখময় স্বপ্ন লেখককে আজো যেন বাস্তবের দোরগোড়ায়। অর্থাৎ কালের বিবর্তন আর আধুনিকতার নির্মাল্যে যৌথ পরিবার আপন বৈশিষ্ট্যে টিকে থাকার গল্প যেন নিকট অতীতের সম্ভাবনাময় জগৎ। শুধু কি পরিবার। সম্প্রদায়গত সৌহার্দ্যে বড় হওয়া লেখক নিজেকে মুক্ত মনের মানুষের মর্যাদয় অভিষিক্ত করতে দ্বিধাহীন। শিক্ষা জীবনের পাঠ সমাপ্ত করে দেশের হরেকরকম মতদ্বৈততা, আর্থ-সামাজিক অবস্থার বৈপ্লবিক মোড় আর বঙ্গবন্ধুর অভাবনীয় ব্যক্তিত্বের কথা শোনাও জীবনের পরম পাওয়া।

প্রসঙ্গক্রমে ১৯৫৮ সালে আইয়ুব খানের রাষ্ট্রক্ষমতা দখল নেয়ার পরিস্থিতিও বর্ণিত হয়েছে। শুধু কি তাই? মৌলিক গণতন্ত্রের নামে নতুন চমকপ্রদ শব্দ অনেকের মতো লেখককে বিচলিতই কেবল নয় বিড়ম্বিতও করেছে। কারণ তার অশুভ পদচারণায় অবিভক্ত পাকিস্তানের যে দুর্দশা তাও কাহিনীকারকে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় ফেলে দেওয়ার উপক্রম। অনেক কাঠ খড় পুড়িয়ে প্রথম চট্টগ্রামের ষোলশহর রেলস্টেশন দেখার স্মৃতিও কলমের টানে পাঠকদের বিহ্বল করে দেয়। বৈশাখ মাসের প্রচ- খরতাপে শঙ্ক নদী শুকিয়ে যাওয়ার চিত্রও লেখককে বিমর্ষ করে দিত। ১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্দুর ছয়দফা কর্মসূচিও অনবদ্য লেখনিতে স্থান করে নিয়েছে।

১৪ বছরের এক কিশোরের স্মৃতি অতখানি প্রখর না হলেও পরবর্তী উত্তাল সময়গুলো কি মাত্রায় হৃদয়ের নিভৃতে গেঁথে আছে তা শব্দের ছত্রে-ছত্রে নানাভাবে বর্ণিত এবং সমন্বিতও। ১৯৬৮ সালে মাধ্যমিক পরীক্ষা দেওয়ার ঘটনা আজও স্মৃতির পাতায় দেদিপ্যমান। এছাড়া ১৯৬৮ সালের তথাকথিত আগারতলা ষড়যন্ত্র মামলাও সে সময়ের এক অস্থির দুরবস্থা। সেখান থেকে সুসম্মানে বের হয়ে ‘বঙ্গবন্ধু’র উপাধি প্রাপ্তি জাতির জন্য অভাবনীয় এক মাইলফলক। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে গণিত বিভাগে ভর্তি হওয়াও জীবনের লক্ষ্য নির্বাচনে পরম আকাক্সিক্ষত বিষয়।

পরবর্তীতে ’৭০-এর নির্বাচনের উপর লেখককের বিজ্ঞচিত অভিমত গ্রন্থের সমৃদ্ধ আঙিনাকে আরও বেগবান করেছে। লেখক নিজেই রাজনীতি সচেতন। তবে ছাত্র জীবনে বাম ঘরানার মতবাদপুষ্ট বিমল বাবু পিতার নির্দেশ শিরোধার্য করে বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে সরাসরি রাজনীতিতে অংশ নেননি। কিন্তু বাঙালিয়ানার চিরায়ত সমৃদ্ধ চেতনায় আবর্তিত দেশাত্মবোধকে রাজনীতির অনুষঙ্গ হিসেবে বরাবরই বিবেচনায় আনতেন।
পর্যায়ক্রমিকভাবে বিধৃত হয় বঙ্গবন্ধু ৭ মার্চের ভাষণ। একজন উদীয়মান বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী স্বজাত্যবোধের প্রেরণায় বঙ্গবন্ধুকে যে মাত্রায় লালন ধারণ করেছেন তাও লেখকের সমৃদ্ধ ভাবনার অনমনীয় প্রত্যয়। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা সংগ্রামের বর্ণনায় শুধু যুদ্ধাক্রান্ত বাংলাদেশেই নয় ঘোর অমাবস্যায় বিভীষিকাময় দুঃসময় পার করাও এক বিক্ষুব্ধ অভিজ্ঞতার চরম ক্রান্তিকাল। ১৯৭৫ সালের নারকীয় হত্যাযজ্ঞ যা জাতির ইতিহাসে রক্তাক্ত কলঙ্ক তেমন দুর্ঘটনা বর্ণিত হয়েছে ক্ষোভে, দুঃখে, শোক আর পরিতাপে।

বিমল গুহের গ্রন্থটি শুধু সুখপাঠ্য নয়, বরং বিভিন্ন ঘটনা পরম্পরার বর্ণনা সাপেক্ষে দেশের আর্থ-সামাজিক রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক ইতিহাসের অনন্য দলিল বললে খুব বেশি বলা হবে না। গ্রন্থটি পাঠককে নিজ দেশ আর জাতিগত ইতিহাস ছাড়াও সময়ের প্রেক্ষাপটে বহু ঘটনার সম্মিলনকে পরিচয় করাবে। গ্রন্থটি পাঠকপ্রিয়তা পাবে নিঃসন্দেহে। বহুল প্রচারও কামনা করছি।

monarchmart
monarchmart