ঢাকা, বাংলাদেশ   শুক্রবার ০৭ অক্টোবর ২০২২, ২২ আশ্বিন ১৪২৯

পরীক্ষার্থীর কোলে সন্তান

অপরাজিতা প্রতিবেদন

প্রকাশিত: ০১:৫৫, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২২

পরীক্ষার্থীর কোলে সন্তান

সন্তান কোলে নিয়ে পরীক্ষা দিতে আসা উম্মে কলসুম ও উম্মে ফাতেমা

বাংলাদেশে সেই পুরনো বিধি বাল্যবিয়ে আজও ঠেকানো গেল না। বিশেষ করে করোনার চরম দুর্ভোগে বহু কিশোরী ছাত্রী অকাল বিয়ের শিকার হওয়ার চিত্র সত্যিই দুঃখজনক। বাল্যবিয়ে মানেই অকাল মাতৃত্ব। শুধু তাই নয় অপরিণত বিবাহ অত্যাচার তো বটেই। বর্তমানে শুরু হয়েছে মাধ্যমিক বোর্ড পরীক্ষা। ১৫ জুন থেকে পরীক্ষা আরম্ভ হওয়ার প্রথম দিনেই প্রায়ই ৩৪ হাজার শিক্ষার্থীর অনুপস্থিতি এক প্রকার দুঃসহ চিত্র।

ধারণা করা হচ্ছে মেয়ে শিক্ষার্থী বাল্যবিয়ের কবলে পড়েছে আর ছেলে শিক্ষার্থী হয়তোবা শিশুশ্রমে সম্পৃক্ত হতে বাধ্য হয় ঝরে পড়ার দৃশ্যে মেয়েদের পাল্টাটাই ভারি থাকে সবসময়। এটা নতুন কিছু নয়। সেই সামাজিক অভিশাপ এবং প্রাচীনতম সংস্কারে আটকে থাকে অপেক্ষাকৃত পিছিয়ে পড়া বালিকারা। যারা হরদম বিয়ের পিঁড়িতে বসতে এক প্রকার বাধ্যই হয়। অভাবের তাড়নায় নির্বিত্ত অসহায় পিতা অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েটিকে সংসার ধর্ম পালন করতে পরের বাড়িয়ে পাঠিয়ে দেয়। আর বালক-পুত্রদের শিশুশ্রমে সম্পৃক্ত করে  পারিবারিক আয় রোজগারের কথাও ভাবতে বসে।
এবারের মাধ্যমিক পরীক্ষার প্রথম দিনে সাড়া জাগানো এক তথ্য বিস্মিত আর হতবাক হওয়ারই মতো। বগুড়ার সারিয়াকান্দিতে পরীক্ষা হলে প্রবেশের আগে দুই যমজ বোন তাদের দু’মাসের শিশু সন্তানকে মা ও খালার কাছে রেখে পরীক্ষায় বসে। এমন চাঞ্চল্যকর ঘটনাটি সংশ্লিষ্ট এলাকায় ছড়িয়ে পড়তে সময়ও লাগেনি। উম্মে কলসুম এবং উম্মে ফাতেমা দুই যমজ বোন। করোনাকালে তারা নবম শ্রেণীর ছাত্রী ছিল। সে সময় প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা বন্ধ হয়ে যাওয়াও এক বিপদজ্জনক দুর্ভোগ। প্রযুক্তির বিশ্বে  শ্রেণী পাঠক্রম সবার জন্য সেভাবে অবারিতও হয়নি। বিশেষ করে গ্রামেগঞ্জে প্রত্যন্ত অঞ্চলে।

আবার সমস্ত দুর্যোগে সবার আগে  বিপত্তির আবর্তে পড়ে অসহায় কন্যা সন্তানরা। এই দুই যমজ কন্যাকে বিয়ে দিয়ে সংসার ধর্ম পালন করতে স্বামীর ঘরে পাঠানো হয়। পরবর্তীতে দুই বোনই মা হওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করলেও অকাল মাতৃত্ব কোনভাবেই কাক্সিক্ষত ছিল না। তবে দুই বোনই লেখাপড়া বন্ধ করেনি। বিয়ের পর সংসার করে মা হয়েও তারা নির্ধারিত মাধ্যমিক পরীক্ষায় বসতে সব বাধাবিঘœকে অতিক্রম করতে পারলো। অভিনন্দন দুই যমজ পরীক্ষার্থীকে। সাথে তাদের পরিবার পরিজনদেরও।

বিশেষ করে স্বামীর অপার সহযোগিতা ছাড়া তারা পরীক্ষার হল পর্যন্ত আসতে পারত কিনা বলা মুশকিল। তবে দুই বোনও সাহসী, উদ্যোমী এবং লেখাপড়ার প্রতি অদম্য মনোবলে এমন কঠিন ব্রত পালন করতে সক্ষম হয়েছে। প্রথম পরীক্ষার দিন ২ মাসের শিশু সন্তানদের নিয়ে কেন্দ্র পর্যন্ত চলে আসা অসম দুঃসাহসের ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত। সারিয়াকান্দি সরকারী উচ্চ বিদ্যালয়ে মা ও খালার কোলে সন্তানদের রেখে তারা পরীক্ষায় বসেন। তথ্যসূত্রে জানা যায় উপজেলার বড়ইকান্দি বিমানবন্দর পড়ার ক্ষুদে ব্যবসায়ী রঞ্জু মিয়ার যমজ মেয়ে তারা। অভাব অনটনে তাদের বিয়ে দিতে বাধ্য হন মা-বাবা।

পরীক্ষা শেষ করে দুবোনই তাদের শিশু সন্তানদের কোলে নিয়ে অনেকেরই প্রশ্নের মুখোমুখি হয়। তবে তারা নির্দ্বিধায় বলে শ্বশুরবাড়ির সবার সাহায্য সহযোগিতায়  তাদের মাধ্যমিক পরীক্ষা দেয়া সম্ভব হয়েছে। শুধু তাই  নয়, পরীক্ষা ভালভাবে দিতে পারাটাও তাদের জন্য অনেক বড় প্রাপ্তি। পরের পরীক্ষাগুলোও তারা নিরাপদে নির্বিঘেœ দিতে চায়। সবার দোয়াও প্রত্যাশা করছে দুই যমজ বোন।
অন্যদিকে ময়মনসিংহের ফুলপুর পরীক্ষা কেন্দ্রে জিনিয়া আক্তার (১৭ বছর) তার ৭ দিনের বাচ্চা অন্যজনের কোলে রেখে পরীক্ষার হলে ঢোকে। সত্যিই অভাবনীয় এক দৃষ্টান্ত অদম্য লড়াকু মায়ের।
মাত্র ৭ দিনের এক নবজাতক। অকাল মাতৃত্বে মারও সুস্থ থাকার কথা নয়। হরেকরকম জটিলতায় আক্রান্ত হয় অপরিণত মাতৃত্ব। তবে সদ্য মা হওয়া এই ছাত্রী পরীক্ষার হল পর্যন্ত সন্তান কোলে নিয়ে চলে আসে। এমন ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত সংশ্লিষ্ট শিক্ষক ও কেন্দ্রে নিয়োজিত অন্য কর্মকর্তাদের নজরে আসে। সবাই মিলে শিশু সন্তানটিকে পরীক্ষার্থীর সঙ্গে আসা স্বজনের কোলে তুলে দেয়। পাশের ঘরে রাখার ব্যবস্থাও করে। তবে বাল্যবিয়ে কোনভাবেই প্রত্যাশিত নয়। কিন্তু এক কিশোরী মা তার সন্তানকে নিয়ে দুঃসাহসিক মনোবলে শুধু পরীক্ষার প্রস্তুতি নেয়াই নয় তার চেয়ে বেশি অদম্য চেতনায় পরীক্ষা দিতে আসাও এক অপরিণত লড়াকু কিশোরির অনমনীয়বোধ।

জিনিয়ারও নবম শ্রেণীতে থাকা অবস্থায় বিয়ের পিড়িতে বসতে হয়। পিতা অনেক আগেই খুন হওয়ার অসহনীয় ঘটনাও দুঃখজনক। আত্মপ্রত্যয়ী জিনিয়া মায়ের সহযোগিতায় সন্তান ধারণ করার পরও পড়াশোনায় ছেদ টানেনি। বরং সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার ৭ দিনের মাথায় পরীক্ষার হল পর্যন্ত চলে আসে সদ্যজাত শিশুটিকে নিয়ে। নিজের ওপর পরম আস্থায় সে পড়াশোনার শেষ পর্যন্ত যেতে চায়। তার কোলের শিশুকে সযতœ পরিচর্যা আর আদরে মমতায় ভরিয়ে রেখেও। বিসিএস পরীক্ষা দিয়ে সরকারী চাকরি খুঁজে নেওয়ার স্বপ্ন দেখছে জিনিয়া।

অদম্য, সাহসী জিনিয়া তার সন্তানটিকে যথার্থ মানুষ হিসেবে গড়েও তুলতে চায়। সংশ্লিষ্ট শিক্ষক ও উর্ধতন কর্মকর্তারা আশা করছেন শত প্রতিবন্ধকতাকে অতিক্রম করে এগিয়ে চলা এমন দুঃসাহসিক শিক্ষার্থীরাই হবে আগামীর বাংলাদেশের যোগ্য উত্তরসূরীÑ নতুন বাংলাদেশ গড়ারও সংগ্রামী স্থপতি। বাল্যবিয়ের পরেও সন্তানের মা হওয়ার কৃতিত্ব দেখানো এই তিন লড়াকু ছাত্রী যেন আরও অনেকের দৃষ্টান্ত হয়ে শুধু সামনের দিকে বাংলাদেশকে ক্রমশ এগিয়েই নিয়ে যাবে এমন প্রত্যাশা আপামর শুভকাক্সক্ষীদের।
অপরাজিতা প্রতিবেদন