ঢাকা, বাংলাদেশ   বৃহস্পতিবার ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১৩ আশ্বিন ১৪২৯

লাল রঙের বাস বিচিত্র বর্ণিল বসবাস

মেহেরাবুল ইসলাম

প্রকাশিত: ০১:৫২, ২১ আগস্ট ২০২২

লাল রঙের বাস বিচিত্র বর্ণিল বসবাস

লাল রঙের বাস বিচিত্র বর্ণিল বসবাস

মামা, দুই মিনিট দাঁড়ান’- এ যেন নিত্যদিনের নিয়মিত কথাবলছিলাম প্রতিদিন সকালে ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসের চালকদের এমন রোজকারের কথোপকথনজগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় অনাবাসিক হওয়ায় শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ক্যাম্পাসের প্রথম স্মৃতি হয়ে ওঠে বিশ্ববিদ্যালয়ের লাল বাসআর সেটি যদি হয় ভালবাসার প্রজন্মতবে তো কোন কথাই নেইজগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার শুরু থেকে প্রায় ১৭ বছর ধরে ক্যাম্পাস থেকে খিলগাঁও রুটে চলছে দ্বিতল লাল বাস প্রজন্ম

ক্লাস-পরীক্ষা কিংবা প্রেজেন্টেশন যাই হোক না কেন এক ঝাঁক তরুণ শিক্ষার্থীদের নিয়ে প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে ক্যাম্পাসে পৌঁছে দেয় ভালবাসার এই লাল বাস প্রজন্মপ্রতিদিন সকালে শিক্ষার্থীরা বৌদ্ধ মন্দির, বাসাবো আর খিলগাঁও রেলগেটে বাসের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকেআর ক্যাম্পাসের দ্বিতীয় ফটকে বাস থেকে নেমে অনেকেই আড্ডায় মেতে ওঠেনবাসে চলে তুমুল আড্ডাকেউ বা সিগারেট হাতে কেউ বা গিটার আবার কেউ কেউ খালি গলায় গানের আসর বসায়

বাসের ভেতর বসে বসে কেউ ঝালমুড়ি খান, চলে জম্পেশ আড্ডা, কেউ-বা বাসে জায়গা রেখে ফুটপাথে নেমে গল্পে মেতে ওঠেনএকই স্টপেজ থেকে বাসে উঠতে উঠতে পরিচিতজন একসময় হয়ে ওঠেন বন্ধুজনঝড়বৃষ্টি ভেজা পথই হোক আর তীব্র গরমে সিদ্ধ দিনই হোক, শিক্ষার্থীদের আসা-যাওয়ার নিত্যসঙ্গী প্রিয় এই লাল বাস প্রজন্মএটি হাজারো স্বপ্ন বয়ে চলা আবেগের লাল বাহন

ক্যাম্পাসে আনা-নেয়ার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ নিজস্ব বাসের পাশাপাশি বিআরটিসির ভাড়া বাসেরও ব্যবস্থা করেছেপ্রতিদিন সকালে এসব বাসে ঠাসাঠাসি-গাদাগাদি করে দাঁড়িয়ে-বসে আর বাদুড়ঝোলা হয়ে ক্যাম্পাসে আসা-যাওয়া করেন শিক্ষার্থীরাবিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় ফটকে প্রতিদিন সকালে এসে পাড়ি জমায় লাল বাসের সারি

তাদের রয়েছে বাহারি সব নাম, আলাদা পরিচয়! উত্তরণ, দুর্জয়, চন্দ্রমুখী, উল্কা, বংশী আরও কত কি! মজার ব্যাপার হলো, কর্তৃপক্ষ নয়, শিক্ষার্থীরাই এসব নামকরণের মাধ্যমে লাল বাসগুলোকে আরও রাঙিয়ে তোলেনিজেরাই বাসে লাগায় স্টিকার আর সাইনবোর্ডআকর্ষণীয় করে তুলে পুরো বাসকে আর পরিচয় করিয়ে দেয় পুরো জাতিকেলাল রঙা এই প্রজন্মবাসের সদস্যরা এক একজনক একটি পরিবারের মধ্যে আবদ্ধ হয়ে ওঠেক্যাম্পাসের শিক্ষার্থীরা নামকরণের মাধ্যমে লাল বাসগুলোকে পরবর্তীতে আরেকপ্রস্থ রঙিন করে তোলেবাসের ভেতরে গড়ে ওঠে বৈচিত্র্যময় পারিবারিক সম্পর্কপ্রতিটি বাসেই গড়ে তোলা হয় বিভিন্ন মেয়াদের কমিটিনিয়মিত যাতায়াতকারী শিক্ষার্থীরা নিজেদের স্বার্থেই গড়ে তুলেছেন বিভিন্ন রুটের বাস কমিটি

ফেসবুকেও সক্রিয় বাস এই কমিটিকোন কারণে বাসের সময়সূচী পরিবর্তন করা হলে ফেসবুক গ্রুপ কিংবা পেজে তা জানিয়ে দেয়া হয়বাস কমিটির সদস্য শিক্ষার্থীরা এ দায়িত্ব নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করে আসছেন নিজেদের স্বার্থেইবাসের সময়সূচীতে পরিবর্তন জানানো থেকে শুরু করে প্রতিটি কমিটির আয়োজনে বার্ষিক বনভোজন, নবীনবরণ, ইফতার পার্টি এমনকি বাসের কোন শিক্ষার্থীর জন্য রক্ত বা অর্থ সাহায্যের প্রয়োজনেও সর্বদা সক্রিয় এই বাসে যাতায়াত করা শিক্ষার্থীরাএসব কমিটি পরিবারের মতো, যে পরিবার শক্ত বাঁধনে বেঁধে রেখেছে যাত্রীদের সবাইকে

বিশ্ববিদ্যালয়ের লাল বাসকে ঘিরে ছাত্রছাত্রীদের জীবনে প্রতিদিনই রচিত হয় আনন্দ-বেদনার কত কাব্যবাসে সিট রাখা নিয়ে হাতাহাতি-মারামারি প্রাত্যহিক ঘটনানিজেদের মধ্যে এই ঝগড়াঝাঁটি মিটমাট করে নেয়াও সাধারণ ঘটনাবাসে আসা-যাওয়া করতে করতে শিক্ষার্থী দুই ছাত্রছাত্রীর মধ্যে সখ্য গড়ে ওঠার ঘটনাও বিরল কিছু নয়

শিক্ষাজীবন শেষে যৌথ জীবনের দিকেও পা বাড়ান অনেক জুটিএক বুক স্বপ্ন, রোমাঞ্চ আর উদ্দীপনা নিয়ে প্রথম বর্ষে বিশ্ববিদ্যালয় আঙিনায় পা রাখে শিক্ষার্থীরাসময়ের পরিক্রমায় ক্লাসরুম থেকে শুরু করে পুরো ক্যাম্পাস আর লাল বাস হয়ে ওঠে তাদের জীবনের অংশবিশ্ববিদ্যালয়ের ভাড়াকৃত লাল বাসগুলোর সংখ্যা দিন দিন কমে আসছেনিজস্ব কেনা বাসের দিকে ঝুঁকছে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন পুল

প্রজন্ম বাসের সিটগুলোর মতোই গেটও উপচে থাকে শিক্ষার্থীদের দ্বারাতারা গেটে দাঁড়িয়ে কোনদিক থেকে দ্রুত যাওয়া যাবে সেদিকে লক্ষ্য রাখেন, কখনও বা ট্রাফিক পুলিশকে সিগন্যাল ছাড়ানোর অনুরোধ করেনঢাকা শহরে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসের ভেতরে শিক্ষার্থীদের সবচেয়ে নিরাপদ লাগেতাছাড়া জ্যামের একঘেয়েমি কাটাতে সবাই মিলে বাসের গেটে গান ধরেন, হোক সেটা সুরো কিংবা বেসুরো গলায়, তখন আর কারোরই ক্লান্তিবোধটা থাকে নাভার্সিটি লাইফ শেষে প্রত্যেকেই ব্যাপারগুলো খুব মিস করেআর এসব দৃশ্য দেখে রাস্তার লোকেরা সবাই অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকেএ যেন এক অন্যরকম মনোমুগ্ধকর পরিবেশের সৃষ্টি করে

বাসের এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘প্রথম এই লাল বাসে যেদিন উঠি, সেদিনের অনুভূতি ছিল অন্যরকমএই লাল বাসটা বাস্তবে শুধুই একটা বাহন, কিন্তু আমার কাছে আশা আর উসাহ হিসেবে কাজ করেছেলাল বাসে চড়ার স্বপ্ন আমাকে ঘুমোতে দেয়নিএক নারী শিক্ষার্থী বলেন, ‘গণপরিবহনে উঠলে দুর্ঘটনার ভয় সবসময় কাজ করে, আর হ্যারেজমেন্টের ব্যাপারটা তো আছেইকিন্তু এই লাল বাসে নিজেকে কেন জানি খুব নিরাপদ মনে হয়

নিয়মিত যাতায়াত করার আরেক শিক্ষার্থী বলেন, ‘দই-এক মিনিটের জন্য কতবার যে বাস মিস করেছি, তার কোন ইয়ত্তা নেই! এই লাল বাসের সঙ্গে রেস প্রতিযোগিতায় আমি কখন্র ক্লান্ত হই নাবাসের আরে শিক্ষার্থী ফাহিম বলেন, হোক ঠাসাঠাসি, তবু তো নিজেদের, আমাদের, বিশ্ববিদ্যালয়ের লাল বাস, প্রিয়প্রজন্মআসন নেই তো কি, বাদুড়ঝোলা হতেও আপত্তি নেই

সারা দিনের ক্লাস শেষে ক্লান্তি নিয়ে ঘরে ফেরার পথে বছরের পর বছর তবু এই প্রজন্ম বাসই হয়ে থেকেছে নতুন স্বপ্নের অনুপ্রেরণাসাধারণের কাছে এই বাস হয়ত কেবলই শিক্ষার্থী বহনকারী লালরঙা বাহন, কিন্তু জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা জানে এই বাস তাদের কতটা আপন, ঘরে ফেরার কত বড় নির্ভরযোগ্য মাধ্যমদিন শেষে প্রিয় এই প্রজন্ম বাসটি হয়ত আড়ম্বরপূর্ণ কিছুই নয়, এতে নেই এসি, নেই ভাল আসনও, সবার জন্য নির্ধারিত জায়গাও নেই, অনেক সময় হয়ত দাঁড়িয়ে কিংবা ঝুলে যেতে হয়তারপরও অনেকে স্বপ্ন বুনতে থাকে এই বাসের কোলে বসেলাল বাসের জন্য আবেগ সত্যিই বড্ড অদ্ভুত হয়!