ঢাকা, বাংলাদেশ   শুক্রবার ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১০ ফাল্গুন ১৪৩০

উষ্ণ ফ্যাশনে ঐতিহ্য

রেজা ফারুক

প্রকাশিত: ২১:০৮, ২৬ নভেম্বর ২০২৩

উষ্ণ ফ্যাশনে ঐতিহ্য

.

শীতের কবিতার প্রসঙ্গ এলেই আমার মেঘ করে আসা নীলিমার মতো মাফলার, কানটুপি আর ব্লেজারের কথা মনে পড়ে যায়। তাছাড়া শীত ভীষণ ঘরোয়া ঋতু- তা নাহলে সন্ধ্যায় বাড়ির লনে ঝড়ো ্যাকেটের ঝাপটা খেয়ে শাদা ফেদারের ছিন্ন পশমগুলো অমন লুটিয়ে কী পড়ত?’

হ্যাঁÑএভাবেই শীতের ঋতু প্রকৃতির আবছায়া কুয়াশার কুচি হয়ে জমে হিম হয়ে আসে। এখনো জেঁকে বসেনি শীত। আসেনি ঝাপসা ডাউন ট্রেনর ব্যুফেকারে চড়ে শীতের শিশির ভেজা তুষার সামগ্রী। থামেনি হু হু শৈল শহরে ভোরের ফিটন।

মন ছুটি নিয়ে এই শীতেই যায় হিল টাউন ভ্রমণে দল বেঁধে কিংবা পরিবার-পরিজন নিয়ে। কখনো বা বনবনান্তরে লম্বা শীত যাপনে বেরিয়ে পড়ে ভ্রমণপিপাসু মানুষ। পর্যটন ব্যুরোর মনোগ্রামজ্বলা কারে করে ধূসর নৈসর্গিকতার আবহ সরিয়ে ছুটে চলার মধ্যে কী এক অদ্ভুত আনন্দ নিহিত থাকে- তাকে কী বলা যায়! ধবধবে শাদা বকের ওড়াউড়ি। শীতের পাখিরা বাংলাদেশের প্রকৃতিতে সহনীয় পরিবেশে হাজার হাজার মাইল পথ পেরিয়ে এদেশের বিল, হাওড়, জলাশয়ে এসে আশ্রয়লাভ এক বিশেষত্ব অর্জন করেছে ফি বছর। সব থেকে আনন্দের ঘটনা হলো- গত কয়েক দশক ধরে ঢাকার অদূরে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের জলাশয়ে অতিথি পাখিদের স্থায়ী শীতের আবাস গড়ে ওঠার বিষয়টি। জেঁকে না বসলেও শীতÑউষ্ণতার খোঁজে এখনই নেমে পড়েছে অনেকেই। শীত মানেই ফ্যাশনেবল ব্লেজার, স্যুট, সোয়েটার, মাফলার, জাম্পার, কানটুপি, জ্যাকেট, ট্রাকস্যুট, কার্ডিগান, কম্ফোর্টার, হাত-মোজা, পা-মোজা, ফারকোট, পুলওভারের পাশাপাশি শীত পাল্টে দেয় দৈনন্দিন জীবনের পুরো চিত্রটাই। শীতের রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন বৈশিষ্ট্য। শীত সবার মনের মর্মরে এক ঝরাপাতার গুঞ্জরণশীল অন্তমিলহীন প্রতিচ্ছবিকে ফ্রেমবন্দি করে মানুষকে করে তোলে নষ্টালজিক।

শীত এলেই নতুন এক অনাস্বাদিত আমেজের গহীনে ডুবে যেতে থাকে রোজকার জীবন-যাপন। এক বৈচিত্র্যময় ইমেজের ক্যানভাসে শীতের ঝাপসা মুখচ্ছবিটা আঁকা হয়ে যায় কখনো অ্যাব্স্ট্রাক্ট, কখনো প্যাস্টেল, কখনো ফুলস্কেপ-লেন্ডস্ক্যাপের মায়াবি জাদুকরী ফর্মেটে। এক চিরায়ত জবুথবু কিশোরীর কিরণাঙ্কিত হাসির মতোই শীতের দিনগুলো রৌদ্রের স্পন্দনে থেমে থেমে পিয়ানোর মতো বাজে। শীতের সিম্ফনি বেজে ওঠে লংড্রাইভে। গাড়ির ওয়াইপারের রাবার সামনের কাঁচের কুয়াশা সরিয়ে ধূলোডোবা ছায়াচ্ছন্ন পথ দেখিয়ে শীতের প্রহরগুলো যায় হারিয়ে। কখনোবা মার্বেলের মতোন গড়িয়ে পড়ে ঘাসে, গাছের পাতার কার্নিশে! এই হলো বাংলার শীত। শীত এলেই নগর জীবনে এক অন্যরকম আমেজের দেখা মেলে। গরম কাপড়ের খোঁজে দলবেঁধে নেমে পড়ে সবাই। বায়তুল মোকাররম থেকে পুরানা পল্টন, মতিঝিল, নিউ মার্কেট, চাদনীচক, মৌচাক, আজিজ সুপার মার্কেট, এলিফ্যান্ট রোডসহ সারা ঢাকার মার্কেটে চলে শীতের কাপড়ের খোঁজ। তরুণ গোয়েন্দার মতো শীতের ফ্যাশনেবল ড্রেসের জন্যও নেমে পড়ে কেউ। তারপর পছন্দের শীতের জামায় চলে জমিয়ে শীত উদযাপন। এই উদযাপনে বড়দের পাশাপাশি চলে ছোটদেরও তুমুল আয়োজন। নগর জীবনে শীতের ধরন যেমন হয়। গ্রামে রয়েছে শীতের ভিন্নতর উদযাপন।

হাইরাইজ ফ্ল্যাটগুলোতে শীত যেন দুরাত্মীয়ের মতো আসে নিঃশব্দে। আবার ফুরোতেও সময় লাগে না। কিন্তু গ্রামের শীতের প্রতিটি স্তবকে থাকে এক অনিন্দ্য অবগাহন। শীতের পিঠা-পুলি তৈরি, ভাতের পুর বানিয়ে চালুনে ডলে ডলে ঝুড়ি নামিয়ে খেজুরের পাটালি অথবা ঝোলা গুড় দিয়ে পাঁক দেওয়া ঝুড়ির কথা হয়তো নতুন প্রজন্ম জানেই না। বড়রা জানলেও এতদিনে হয়তো ভুলেই বসে আছে। নগর জীবনে পিঠা-পুলির জন্য রয়েছে পিঠাঘর। আর ভাঁপা তেলের পিঠা পথের ধারে ফুটপাতেও সারা শীতকালজুড়ে পাওয়া গেলেও গ্রামের সবুজ ধূসর চিরন্তন মনোমুগ্ধতম পরিবেশে প্রকৃতির সান্নিধ্যে বসে আস্বাদনের স্বাদটাই আমাদের সারা বাংলার শীতের রূপটাই দেয় বদলে। কিন্তু এই বদলে যাওয়ার মধ্যে যে ফ্যাশনের গল্পটা এখন চোখে পড়ে তা শীতের আদি ফ্যাশনটা ছিল এখনকার চেয়েও আরও মধুর আর মনোতমা।

এক সময় হাতে বোনা সোয়েটার, মাফলার, কম্ফোর্টার, কার্ডিগান, কানটুপিতে শীত উদযাপনের গল্পটা আজ শুধুই স্মৃতি। মধ্যবিত্ত বাঙালি গৃহিণীরা এক সময় অবসরে কুশিকাঁটায় বুনন করত শীতের জাম্পার, সোয়েটার প্রভৃতি। উলের নানা রঙের বল পায়ের কাছে যেত গড়িয়ে। শীতের নির্জন বিকেলে ব্যালকনিতে বসে কিংবা উঠোনের একপাশে চেয়ার টেবিল কিংবা বিছানা পেতে বসে চলত এই শীতের মধুমাখা হাতে স্বপ্নবুনন। কালের বিবর্তন, ব্যস্ততা এই অমোঘ গল্পের পাতাগুলো ভাঁজ করে ফেলে রেখেছে কুলুঙ্গিতে।

মনে কী পড়ে- ফুলতোলা হাত রুমালের কথা! ছোট গোল ফ্রেমে রুমাল আটকে রুমালের এককোণে হৃদয়ের সবটুকু ভালোবাসা উজার করে দিয়ে ছন্দবদ্ধ কবিতার দুই চারটে শব্দ উৎকীর্ণ করে প্রিয়তম মানুষের জন্য এক-দুটি ফুল ফুটিয়ে তুলে উপহার হিসেবে দেওয়ার পর। তা কেউ বুক পকেটে নিয়ে ঘুরত এক অবিস্মরণীয় আবেগের তাড়নায়। আবার কেউ সেই রুমালটা আয়নায় বাঁধিয়েও রাখত। কিন্তু এখন অতীতের বিষয়। লাল ডাকঘর, লাল ডাকবাক্স, চিঠি, পোস্টকার্ড, অ্যালবামে ছবি সংরক্ষণ, স্ট্যাম্প, রেকর্ড প্লেয়ার, ক্যাসেট, সিডি এর সবই আজ জাদুঘরের ্যাকে ঠাঁই নিয়েছে। এই সকল জীবন্ত প্রাসঙ্গিকতা দৈনন্দিন হারিয়ে যেমন গিয়েছে তেমনি হারিয়ে গিয়েছে শীতের হাতে বোনা পোশাকের পশমি দিনগুলোও। তবে সেইসব ফেলে আসা আনন্দের টুকরো স্মৃতি মনে করে করে এখনো অনেকেই হবেন নষ্টালজিক আর কেউ কেউ যাবেন সেই দেবদারু মাঠের ছায়ায় হারিয়ে!

পোশাক ছবি : ইজি

×