ঢাকা, বাংলাদেশ   রোববার ১৪ এপ্রিল ২০২৪, ১ বৈশাখ ১৪৩১

কম দামে তেল পাবে উত্তরবঙ্গের ১৬ জেলার মানুষ

পাইপলাইনে ভারতীয় তেল আসছে ২০ মার্চ

স্বপ্না চক্রবর্তী ও শ আ ম হায়দার, পার্বতীপুর

প্রকাশিত: ২৩:৩১, ৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৩

পাইপলাইনে ভারতীয় তেল আসছে ২০ মার্চ

ভারতের ঝাড়খন্ড থেকে আদানির বিদ্যুৎ আমদানি নিয়ে নানা মহলে নানা ধরনের আলোচনা-পর্যালোচনা

ভারতের ঝাড়খন্ড থেকে আদানির বিদ্যুৎ আমদানি নিয়ে নানা মহলে নানা ধরনের আলোচনা-পর্যালোচনার মধ্য দিয়েই সুখবর দিয়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। মার্চে দেশটি থেকে পাইপলাইনে বাংলাদেশে পৌঁছবে তেল, যা উত্তরবঙ্গের ১৬ জেলার মানুষের মধ্যে সরবরাহ করা হবে স্বল্প মূল্যে। ইতোমধ্যে ১৩১.৫ কিলোমিটার লাইন তৈরির কাজ শেষ হয়েছে। প্রস্তুত করা হচ্ছে ‘স্টোরেজ ট্যাংক’ও। সব ঠিক থাকলে আগামী মার্চের ২০ তারিখে এই পাইপলাইনের উদ্বোধন হতে পারে বলে জানা গেছে।
প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানান, ৩৭৭ কোটি রুপির বেশি ব্যয়ে নির্মিত বহুল প্রত্যাশিত ১৩১.৫ কিলোমিটার দীর্ঘ ভারত-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ পাইপ লাইনের (আইবিএফপিএল) মাধ্যমে তেল আসবে পার্বতীপুর ডিপোতে। এ উপলক্ষে ভ্রাতৃপ্রতিম দুই দেশ যৌথ অনুষ্ঠান আয়োজনের প্রস্তুতিও নিচ্ছে। তেল গ্রহণ করতে রিসিভ টার্মিনাল সম্পূর্ণ প্রস্তুত জানিয়ে পার্বতীপুরের বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের দায়িত্বপ্রাপ্ত ম্যানেজার মো. নূরউন্নবী জনকণ্ঠকে জানান, এখন শুধু চলছে প্রিকমিশনিং (ট্রায়াল)। 
প্রকল্পের ৮টি ট্যাংক পুরোপুরি তৈরি না হওয়ায় আপাতত রেল হেড ডিপোর ট্যাংকে এই তেল রাখা হবে। এখানকার ১৫ ট্যাংকের মধ্যে ৪টি প্রস্তুত করা হয়েছে। রিসিভ টার্মিনাল থেকে তেল আসবে এই রেল হেড ডিপোর ট্যাংকে।  
প্রকল্প এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, পার্বতীপুর শহরের অদূরে ভারত-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ পাইপলাইন প্রকল্পের আওতায় ৬ দশমিক ৮০ একর জমিতে রিসিপ্ট টার্মিনাল (আর টি) ও অয়েল ডিপো নির্মাণ করা হয়েছে। রিসিপ্ট টার্মিনাল নির্মাণের কাজ করে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স দীপন গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড এবং অয়েল ডিপো নির্মাণের কাজ করে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স পাইপ লাইনার্স লিমিটেড।

নিয়ন্ত্রণ কক্ষ, বিদ্যুৎ সাব-স্টেশন, ২৪টি ট্রান্সফরমার স্থাপন, ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কশপ, ফায়ার ফাইটিং, ফায়ার অ্যালার্ম সিস্টেম স্থাপন, ওয়াচ টাওয়ার ইত্যাদি রিসিপ্ট টার্মিনালের কাজ শেষ হয়েছে। বাকি রয়েছে ৮টি ট্যাংক নির্মাণ। তার মধ্যে ৫ হাজার ৬৯০ টন ধারণ ক্ষমতার ৬টি ফুয়েল ট্যাংক, অগ্নিনির্বাপণের জন্য ৩ হাজার লিটার ধারণক্ষমতার ২টি ওয়াটার ট্যাংক। এগুলোর কাজ চলমান রয়েছে। অয়েল ট্যাংকের আরসিসি ভিত্তির কাজ আগেই শেষ হয়েছে। এখন চলছে ট্যাংক নির্মাণের কাজ। 
জানা যায়, এর প্রধান উপকরণ বিভিন্ন পুরুত্বের ১৩০০ টন স্টিলের পাত চীন থেকে প্রকল্পস্থলে আনা হয়েছে। তার আগে শেষ হয়েছে ভারত ও বাংলাদেশ অংশে ১৩১.৫ কিলোমিটার পাইপলাইনের কাজ, ৫টি এসভি (সেকশনালাইজিং ভালব স্টেশন) স্টেশনের কাজ। প্রতিটি এসভি স্টেশনের মধ্যে দূরত্ব প্রায় ৩০ কিলোমিটার।  
ইন্ডিয়া-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ পাইপলাইন স্থাপন প্রকল্পের পরিচালক (পিডি) টিপু সুলতান জনকণ্ঠকে বলেন, আগে এই প্রকল্পের কাজের মেয়াদ ছিল ২০২২ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত।  তবে করোনাসহ কিছু বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে নির্ধারিত সময়ে প্রকল্পের কাজ শেষ করা সম্ভব হয়নি। সে কারণে ২০২৩ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত প্রকল্পের মেয়াদ আরও এক বছর বাড়ানো হয়েছে। আশা করছি, মেয়াদের মধ্যেই প্রকল্পটি পরিপূর্ণভাবে চালু হবে। 
মার্চেই ভারতের তেল আনার জন্য পূর্ণদ্যোমে কাজ চলছে জানিয়ে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) চেয়ারম্যান এ বি এম আজাদ জনকণ্ঠকে বলেন, নতুন ‘স্টোরেজ ট্যাংকে’র কাজ এখনো চলমান। তাই আমরা আগের ডিপোতেই তেল সংরক্ষণ করব। পাইপলাইনের কাজ শেষ হয়েছে। আশা করছি, মার্চের মধ্যেই আমরা ভারতের তেল দেশে আনতে পারব। 
মার্চেই ভারত থেকে পরীক্ষামূলকভাবে পাইপলাইনের মাধ্যমে ডিজেল আমদানি শুরু হবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদও। জনকণ্ঠকে তিনি বলেন, আমাদের পাইপলাইন তৈরির কাজ শেষ হয়েছে। এই পাইপলাইনে ডিজেল আমদানির প্রিকমিশনিং কার্যক্রম চলমান রয়েছে। আশা করছি, মার্চে তেল আনতে পারব।

আদানির বিদ্যুতের মতো এ ক্ষেত্রে কোনো জটিলতা তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে কি না- এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, দুটি তো আলাদা ইস্যু। ভারতের সঙ্গে আমাদের দীর্ঘ বন্ধুত্বের সম্পর্ক। আদানির যে সমস্যা, তা তাদের দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়। এ ক্ষেত্রে আমাদের বিদ্যুৎ আমদানিতে কোনো প্রভাব পড়বে না। আর তেলের ক্ষেত্রে তো এটি কোনো বিষয়ই না। 
প্রসঙ্গত, ২০২০ সালের মার্চ মাসে পাইপলাইন বসানোর কাজ শুরু হয়। ভারতের রাষ্ট্রীয় মালিকাধীন সংস্থা নুমালিগড় রিফাইনারি লিমিটেড এবং বাংলাদেশের মেঘনা পেট্রোলিয়াম লিমিটেড যৌথভাবে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে। পাইপলাইন নির্মাণের উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ অংশে পঞ্চগড়, নীলফামারী ও দিনাজপুর জেলায় ১৯৯ দশমিক ৩৪ একর জমি অধিগ্রহণ, ১৩৪ দশমিক ১২ একর জমি হুকুমদখল করা হয়েছে।

পাইপলাইনের ভারতের অংশের জন্য ৯১.৮৪ কোটি রুপি বিনিয়োগ করছে এন আর এল। এ ছাড়া পাইপলাইনের বাংলাদেশ অংশের জন্য ২৮৫.২৪ কোটি রুপি ভারত সরকার অনুদান সহায়তা হিসেবে অর্থায়ন করছে। ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে ভারত ও বাংলাদেশের দুই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও নরেন্দ্র মোদির উপস্থিতিতে ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে ১৩০ কিলোমিটার দীর্ঘ আইবিএফপিএল পাইপলাইনের নির্মাণ কাজের উদ্বোধন করা হয়েছিল। 
এর আগে ২০১৭ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মধ্যে এক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ওই বৈঠকে বার্ষিক এক মিলিয়ন মেট্রিক টন জ্বালানি বহনে সক্ষম এই পাইপলাইনের অর্থায়নে রাজি হন ভারতের প্রধানমন্ত্রী। পাইপলাইন চালুর পর বছরে প্রায় ১০ লাখ মেট্রিক টনের মতো ডিজেল ভারত থেকে বাংলাদেশ আমদানি করবে। প্রাথমিকভাবে আড়াই লাখ টন এবং পরের বছরগুলোতে ৪-৫ লাখ টন পর্যন্ত বৃদ্ধি পাবে। চুক্তির অধীনে সরবরাহ শুরু হওয়ার দিন থেকে ১৫ বছরের জন্য বাংলাদেশ ভারত থেকে ডিজেল কিনবে। 
প্রকল্পসূত্রে জানা গেছে, এই পাইপলাইনের মাধ্যমে ভারত থেকে এই ডিপোতে তেল আসতে সময় লাগবে এক ঘণ্টার মতো। এখান থেকে উত্তরের বিভিন্ন জেলায় তেল সরবরাহ করা হবে। পরিবহন ব্যয় ও সিস্টেম লস কমে যাবে। পার্বতীপুর রেল হেড ডিপোর বর্তমান ধারণক্ষমতা ১৮ হাজার মেট্রিক টন থেকে ৪৩ হাজার ৮০০ মেট্রিক টনে উন্নীত করা হবে। বর্তমানে আমদানিকৃত জ্বালানি তেল পার্বতীপুরে পৌঁছতে সময় লাগে প্রায় এক মাস। অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানিতে প্রতিব্যারেলে পরিবহন খরচ হয় তিন ডলারের মতো।

সেই তেল চট্রগ্রাম শোধনাগারে শোধন করে সড়ক, ট্রেন ও নৌপথে পাঠানো হয় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে। এভাবে তেল পরিবহনে খরচ ব্যারেলপ্রতি ৪-৫ ডলার। ফলে পরিবহন ব্যয় দাঁড়ায় সব মিলিয়ে ৭-৮ ডলার। আর ভারত থেকে পাইপলাইনে পরিশোধিত তেল এনে দেশের উত্তরাঞ্চলে সরবরাহ করতে পরিবহন ব্যয় হবে সাড়ে ৫ ডলারের মতো। বর্তমানে নুমালিগড় রিফাইনারি লিমিটেড থেকে পশ্চিমবঙ্গ রেলওয়ের মাধ্যমে প্রতিমাসে প্রায় দুই হাজার ২০০ টন ডিজেল আমদানি করে বিপিসি। ২০১৭ সাল থেকে ট্রেনে করে আসছে এ তেল।
বিশ্ববাজারে চলছে তেলের জন্য হাহাকার। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে চড়া দামে পরিশোধিত-অপরিশোধিত তেল কিনতে হচ্ছে বিশ্ববাসীকে। এমন অবস্থায় দেশের তেলের বাজারে কিছুটা হলেও স্বস্তি আসবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। 
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) বলছে, বর্তমানে জ্বালানি তেল আনার ক্ষেত্রে প্রতিব্যারেলে (১৫৯ লিটার) গড়ে ১০ ডলার প্রিমিয়াম (জাহাজভাড়াসহ অন্য খরচ) দিতে হয় বিপিসিকে। তবে ভারত থেকে আনার ক্ষেত্রে এটি আট ডলার হতে পারে। প্রতিব্যারেলে দুই ডলার কমলে প্রতি এক লাখ টনে প্রায় ১৫ লাখ ডলার সাশ্রয় করা সম্ভব। তাই ভারত থেকে আমদানি হলে বৈদেশিক মুদ্রাও সাশ্রয় হবে।

×