ঢাকা, বাংলাদেশ   শনিবার ২০ এপ্রিল ২০২৪, ৬ বৈশাখ ১৪৩১

প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য ফিজিওথেরাপি

ডা. মোঃ বখতিয়ার

প্রকাশিত: ০০:৪১, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৩

প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য ফিজিওথেরাপি

বিশ্ব ফিজিওথেরাপি দিবস

গত শুক্রবার ৮ সেপ্টেম্বর পালিত হয়ে গেল বিশ্ব ফিজিওথেরাপি দিবস। একজন সুস্থ মা সুস্থ বাচ্চা সবার অঙ্গীকার। একজন শিশু আগামী দিনের দেশ ও জাতীয় ভবিষ্যৎ। ওরা সমাজের অভিশাপ নয় বরং আল্লাহর প্রদত্ত। সবাই চান একজন সুস্থ  বাচ্চার সুন্দর জীবন। আর এই বাচ্চা যখন মায়ের গর্ভে থাকে তখন সুস্থ থাকার সবই পায় মায়ের কাছ থেকে। দীর্ঘ সময় প্রায় ৪০ সপ্তাহ পর একজন বাচ্চার জন্ম হয়। জন্ম হওয়ার পরেই নিজের শ্বাস নিজের নিতে হয়।

এবং এই প্রক্রিয়ায় বহির্প্রকাশ ঘটে জন্মের পরপর কান্নার মাধ্যমে। দিন যায় শিশুর বিকাশ ঘটে এবং নতুন নতুন চেনাজানার অধ্যায় শুরু হয়। সাদা কালোর পরিচয়, শব্দের সঙ্গে মাথা নাড়ানো, মায়ের দুধের গন্ধ ইত্যাদি পরবর্তী পর্যায়ে বাচ্চার সাধারণ বৃদ্ধির গতি অনুযায়ী পায়ে নাড়াচাড়া বৃদ্ধি পায়। বাচ্চা বিছানায় গড়াগড়ি করে বসার চেষ্টা করে তারপর হামাগুড়ি, দাঁড়াতে ও হাঁটতে শিখে।
কি কি কারণে বাচ্চা প্রতিবন্ধী হতে পারে :
১. কিভাবে বুঝবেন বাচ্চার মস্তিষ্কে পক্ষাঘাত বা সেরিব্রাল পলসি বা প্রতিবন্ধী :
২.প্রতিবন্ধি বাচ্চার ফিজিওথেরাপি :
৩. স্ট্রেচিং এক্সারসাইজ :
 কোয়ার্ডিনেটিং বা প্রপিওসেপটিক এক্সারসাইজ :
৪. ব্যালেন্স বা ভারসাম্য অনুশীলন :
৫.হাঁটার প্রশিক্ষণ:
৬.কি কি কারণে বাচ্চা প্রতিবন্ধী হতে পারে :
জন্মের পরপর বাচ্চা কান্না না করলে
জন্মের সময় বাচ্চার অবস্থান উল্টা থাকলে।
জন্মের সময় বাচ্চা মাথায় আঘাত পেলে।
জন্ডিস হলে
দীর্ঘ সময় মা প্রসব বেদনায় ভুগলে
বাচ্চার হঠাৎ অতিরিক্ত জ্বর এবং খিঁচুনি হলে
মাথা স্বাভাবিকের চেয়ে বড় বা ছোট হলে
মাথায় টিউমার বা অন্য কোনো রোগ হলে
বাচ্চার জন্মের আগে ও পরে মায়ের খিঁচুনি হলে
বাচ্চা অবস্থায় পোলিও রোগ হলে
গর্ভকালীন সময়ে মায়ের যেকোনো বড় ধরনের সমস্যা-উচ্চ রক্তচাপ, ওষুধের পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া।
উপরক্ত সকল রোগ বা ঘটনার শেষ অবস্থান হচ্ছে ঈবৎবাবনৎধষ চঁষংু বা মস্তিষ্কের পক্ষাঘাত।
কিভাবে বুঝবেন বাচ্চার মস্তিষ্কে পক্ষাঘাত বা সেরিব্রাল পালসি বা প্রতিবন্ধী :        
শিশু জন্মের পর তাকে স্বাভাবিক দেখাবে না
মুখ দিয়ে লালা ঝরতে থাকবে
হাত পা অতিরিক্ত শক্ত না নরম মনে হবে
মাথা যেকোনো দিকে বেঁকে যাবে
হাত পা শুকনা দেখাবে
স্বাভাবিক ভাবে বসতে, হাঁটতে ও চলতে পারবে না
অনেক সময় কথাবার্তায় স্পষ্টতা থাকবে না
কিছু কিছু বাচ্চা হাঁটার সময় এক পা আরেক পায়ের সঙ্গে জড়িয়ে ফেলব (সিজর গেইট বলে)
কোনো কোনো শিশু হাত ও পায়ে অস্বাভাবিক নাড়াচাড়া দেখা যায় (এথিটয়েড) সিপি
ভারসাম্যহীনতা এসব বাচ্চার একটি উল্লেখযোগ্য চিহ্ন
এছাড়া কারও কারও মানসিক দৃষ্টি ও শ্রবণ প্রতিবন্ধিত্বও থাকতে পারে প্রতিবন্ধী বাচ্চার
ফিজিওথেরাপির গুরুত্ব : সেরিব্রাল পালসি বা প্রতিবন্ধী বাচ্চাদের ক্ষেত্রে ফিজিওথেরাপি বিরাট অর্থবহ ভূমিকা রাখে। বেশিরভাগ বাচ্চার একমাত্র গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা হচ্ছে ফিজিওথেরাপি। ফিজিওথেরাপি মাধ্যমে বাচ্চার শারীরিক ও মানসিক প্রতিবন্ধকতা কমানো সম্ভব। তবে এসব বাচ্চার ফিজিওথেরাপি খুব সতর্কতার সঙ্গে করতে হবে। এজন্য দরকার একজন বিশেষজ্ঞ ফিজিওথেরাপিস্টের সুপরামর্শ।
স্ট্রেচিং এক্সারসাইজ : এই পদ্ধতির মাধ্যমে বাচ্চার হাত ও পায়ের মাংসপেশি ও জয়েন্টকে সচল ও নরম করা হয়। যাতে করে বাচ্চা স্বাভাবিকভাবে হাত পা নাড়াচাড়া করতে পারে।
স্ট্রেচিং এক্সারসাইজ সাধারণ একজন ফিজিওথেরাপিস্ট করে থাকেন। তাছাড়া কিছু যন্ত্রপাতি যেমন- গেইটার, ঝঃধহফরহম ভৎধসব, চযুংরড়নধষষ ইত্যাদির মাধ্যমে স্ট্রেচিং করা হয়। যাদের পা জড়িয়ে যায় তাদের জন্য ব্যবহার করা হয় অফফঁপঃড়ৎ ঃড়ড়ষং।
কোয়ার্ডিনেটিং বা প্রপিওসেপটিক এক্সারসাইজ :
এটি সাধারণত করা হয় মাংসপেশি ও জয়েন্টের সঠিক অবস্থান ও ভারসাম্য ফিরিয়ে আনার জন্য।
ব্যালেন্স বা ভারসাম্য অনুশীলন :
ভারসাম্যহীনতা হচ্ছে একজন প্রতিবন্ধী বা মোরব্রাল পালসি বাচ্চার অন্যতম সমস্যা। যে সমস্যার জন্য বাচ্চারা হাঁটতে ও চলতে কষ্ট হয় এবং হাঁটার সময় বারবার হোঁচট খেয়ে পড়ে যায়। বসে, দাঁড়িয়ে, স্থির ও চলমান অবস্থায় কোনো কিছু ধরে বা একজন ফিজিওথেরাপিস্টের সহযোগিতায় এই ব্যালান্স বা ভারসাম্য অনুশীলন করা সম্ভব। এই প্রক্রিয়া কিছুদিন চলমান থাকলে রোগীকে অন্তত এমন একটা পর্যায়ে নেওয়া সম্ভব, যার দ্বারা রোগী একা একা বা অল্প সাহায্য নিয়ে হাঁটতে পারে।
হাঁটার প্রশিক্ষণ:
যেকোনো সুস্থ বাচ্চা সরাসরি হাঁটতে শিখে না। বসা- হামাগুড়ি—তারপর-হাঁটাহাঁটি। এই প্রক্রিয়াটি একজন শারীরিক প্রতিবন্ধী বাচ্চার ক্ষেত্রেও হয়। কিন্তু এসব বাচ্চার ক্ষেত্রে একটু দেরিতে হয় অথবা প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি হয় যা ফিজিওথেরাপির বিভিন্ন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।
বাড়িতেও এই প্রক্রিয়া চালু রাখার জন্য পাশাপাশি দুটি লম্বা বাঁশ বেঁধে দুদিক থেকে হাত ধরে হাঁটার প্রশিক্ষণ করা যেতে পারে। কিছু কিছু বাচ্চার পা বাঁকা থাকে, যার জন্য ব্যবহার করতে হয় বিভিন্ন ধরনের জুতা। যেখানে একজন ফিজিওথেরাপিস্টের ভূমিকাই মুখ্য।
একজন সেরিব্রাল পালসি বা প্রতিবন্ধী বাচ্চার চিকিৎসার ক্ষেত্রে অবশ্যই সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত। যাদের হাত পা শক্ত তাদের নাড়াচাড়া অবশ্যই আস্তে আস্তে করতে হবে। অনেক বাবা মা আছেন যারা বাঁচ্চাকে তাড়াতাড়ি সুস্থ করার জন্য জোরে জোরে নাড়াচাড়া বা মালিশ করেন। এতে হিতে বিপরীত হতে পারে। হতে পারে মাংসপেশি ইনজুরি অথবা জয়েন্টে ডিসপ্লেসমেন্ট। তাই একজন দক্ষ ফিজিওথেরাপিস্টের দ্বারাই চিকিৎসা নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ।
কিছু কিছু বাচ্চা আছে যাদের কথা বলায় সমস্যা থাকে। এদের দরকার স্পিচ থেরাপি। আর সর্বদিকের সহায়ক পন্থা হচ্ছে পুনর্বাসন বা রিহেবিলেটেশন পদ্ধতিতে পরিপূর্ণ করা। পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে নাই বললেই চলে। তবে কিছু কিছু প্রতিষ্ঠান বর্তমানে এই পদ্ধতি চালু করেছে। যেমন গাজীপুরের কালিয়াকৈরে ‘খাজা বদরুদ্দোজা মডার্ন হাসপাতালেও এর সুবিধা পাওয়া যাবে।
দয়াশীল মন আর একটু সহযোগিতা একজন শিশুকে দিতে পারে সুন্দর ভবিষৎ। এদের নিয়ে  গত শনিবার বি এফডিসিতে অডিটোরিয়ামে  এটিএন নিউজ আয়োজিত   ‘পাওয়ার প্যারেন্টস  অ্যাওয়ার্ডস ২০২৩’ অনুষ্ঠিত হয়। এসময়  উদ্যোক্তা অনেকেই উপস্থিত ছিলেন।  প্রতিবন্ধীরা সমাজের  অভিশাপ নয়; তাই তাদের জন্য এগিয়ে আসতে হবে আমাদের সবারই।

লেখক : জনস্বাস্থ্য বিষয়ক লেখক ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক, খাজা বদরুদদোজা মডার্ন হাসপাতাল। 
সফিপুর, কালিয়াকৈর, জেলা : গাজীপুর।
[email protected]
হটলাইন: ০১৭১১-৩৬০-৯০৭

×