ঢাকা, বাংলাদেশ   বৃহস্পতিবার ৩০ মে ২০২৪, ১৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১

আইসিডিডিআর’বি

লং কোভিডে ভোগা রোগীরা রয়েছেন উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকিতে

প্রকাশিত: ১৯:৩৫, ২১ মার্চ ২০২৩

লং কোভিডে ভোগা রোগীরা রয়েছেন উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকিতে

প্রতীকী ছবি

টানা দুই বছর বিশ্বের অন্যান্য দেশের সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশেও তা-ব চালিয়েছে মহামারী করোনাভাইরাস। এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয়েছে অনেক মানুষের। আর যারা আক্রান্ত হওয়ার পরেও সুস্থ হয়েছেন তারাও ভুগছেন নানা ধরণের স্বাস্থ্য জটিলতায়। আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআর,বি) বলছে, একের অধিক বার কোভিড-১৯ এ ভোগা রোগীদের রয়েছে উচ্ছ রক্তচাপের ঝুঁকি। শুধু তাই নয় লং কোভিডে ভোগা রোগীরা ডায়াবেটিস এবং শ্বাসকষ্টেও ভুগছেন।  

আইসিডিডিআর,বি এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) যৌথভাবে ‘লং টার্ম সিকুয়েল অফ কোভিড-১৯ : অ্যা লংগিটুডিনাল ফলো-আপস্টাডি ইন ঢাকা, বাংলাদেশ’ শীর্ষক এক সেমিনারে এক গবেষণার প্রেক্ষিতে এসব কথা জানানো হয়। এসময় বলা হয়, ৪০ বছরের কম বয়সীদের তুলনায় ৬০ বছরের বেশি বয়সী কোভিড-১৯ থেকে সেরে ওঠা ব্যক্তিদের কার্ডিওভাসকুলার বা হৃদযন্ত্রের জটিলতা এবং স্নায়ুবিক জটিলতা হওয়ার আশঙ্কা দ্বিগুণ।

মঙ্গলবার বিএসএমএমইউ’র ডি-ব্লকের অডিটোরিয়ামে এ সেমিনারের আয়োজন করা হয়। এসময় জানানো হয়, গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের কোভিড-১৯ এ আক্রান্ত হওয়ার প্রথম পাঁচ মাসের ফলোআপের ফলাফল সম্প্রতি গবেষণা সাময়িকী দ্য ল্যানসেট রিজিওনাল হেলথ সাউথ ইস্ট এশিয়ায় প্রকাশিত হয়। ইউএসএআইডি-র অ্যালায়ান্স ফর কমব্যাটিং টিউবার কিউলোসিস ইন বাংলাদেশ (এসিটিবি)  এই গবেষণায় অর্থায়ন করে। এশিয়ার মধ্যে এটি প্রথম গবেষণা যেখানে দেখা যায়, কোভিড-১৯ থেকে সেরে ওঠা রোগীরা পরবর্তীতে বিভিন্ন শারীরিক সমস্যার উচ্চঝুঁকিতে থাকে, যাকে পোস্ট- কোভিড-১৯ সিনড্রোম (পিসিএস) বা লং কোভিড হিসেবেও অভিহিত করা হয়। এই সেমিনারে ‘লং কোভিড ক্লিনিক্যাল ম্যানেজমেন্ট গাইডলাইন ফর ফিজিশিয়ানস’ শীর্ষক একটি নির্দেশিকাও উপস্থাপন করা হয়।
বিএসএমএমইউ-এর ইন্টারনাল মেডিসিন বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা: সোহেল মাহমুদ আরাফাত, কার্ডিওলজি বিভাগের অধ্যাপক ডা: চৌধুরী মেশকাত আহমেদ এবং আইসিডিডিআর,বি-র নিউট্রিশন ও ক্লিনিক্যাল সার্ভিস বিভাগের সহযোগী বিজ্ঞানী এবং প্রধান গবেষক ডা: ফারজানা আফরোজ গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ ফলাফলগুলো উপস্থাপন করেন। তারা জানান, ২০২০ সালের ১৫ ডিসেম্বর থেকে ২০২১ সালের ৩০ অক্টোবরের মধ্যে ঢাকায় অবস্থিত দুটি কোভিড-১৯ বিশেষায়িত হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়া কোভিড-১৯ আক্রান্ত (আরটি-পিসিআর দ্বারা শনাক্ত কৃত) ১৮ বছরের বেশি বয়সী ৩৬২ জন ব্যক্তিকে এই গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। অংশগ্রহণকারীদের কোভিড-পরবর্তী জটিলতা নির্ণয় করার জন্য সেরে ওঠার ১মাস, ৩মাস এবং ৫মাস পর ফলো-আপ করা হয়। তাদের স্নায়বিক, হৃদযন্ত্র, শ্বাসযন্ত্র এবং মানসিক স্বাস্থ্য সংক্রান্ত সমস্যাগুলো এই গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত ছিল। গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের দুই বছর ধরে ফলো আপ করা হবে।

গবেষণা দেখা যায়, ৪০ বছরের কম বয়সীদের তুলনায় ৬০ বছরের বেশি বয়সী কোভিড-১৯ থেকে সেরে ওঠা ব্যক্তিদের কার্ডিও ভাসকুলার বা হৃদযন্ত্রের জটিলতা (উচ্চরক্তচাপ, দ্রুত হৃদকম্পন,  বা পা ফুলে যাওয়া) এবং স্নায়বিক (পেরিফেরাল নিউরোপ্যাথি বা হাত ও পায়ে অসাড়তা, ঝিমঝিম করা ও ব্যথা, স্বাদ ও গন্ধের অস্বাভাবিকতা) জটিলতা হওয়ার সম্ভাবনা দ্বিগুণ। এই রোগের দীর্ঘমেয়াদী প্রভাবগুলো ও নারী-পুরুষ ভেদে পৃথক, পুরুষদের তুলনায় মহিলাদের মধ্যে কোভিড-পরবর্তী জটিলতার প্রকোপ দেড় থেকে চার (১.৫-৪) গুণ পর্যন্ত বেশি দেখা গেছে। হাসপাতালে ভর্তিকৃত এবং নিবিড় পরিচর্যার প্রয়োজন হয়েছিল এমন রোগীদের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদী জটিলতার সম্ভাবনা হাসপাতালে ভর্তি না হওয়া রোগীদের তুলনায় দুই থেকে তিন (২-৩) গুণ পর্যন্ত বেশি পাওয়া গেছে।

ডায়াবেটিসে আক্রান্ত গুরুতর কোভিড-১৯ থেকে সেরে ওঠা ব্যক্তিদের নিয়মিত ডায়াবেটিসের ওষুধ সেবন করা সত্ত্বেও রক্তে অনিয়ন্ত্রিত শর্করার (ব্লাডসুগার) সম্ভাবনা যাদের হাসপাতালে ভর্তির প্রয়োজন হয়নি তাদের তুলনায় ৯ থেকে ১১ গুণ বেশি ছিল এবং তাই যারা হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন তাদের বেশি ইনসুলিন প্রয়োজন হয়। একটি শঙ্কার বিষয় হলো হাসপাতালে ভর্তি না হওয়া রোগীদের তুলনায় হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীদের নতুন করে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার হার ছিল প্রতি ১ হাজার জনে ১০ জন। একইভাবে, কোভিড-১৯ থেকে সেরে ওঠা ব্যক্তিদের মধ্যে নতুন করে কিডনিজনিত জটিলতা (হাইক্রিয়েটিনিন এবং প্রোটিনিউরিয়া) এবং লিভার জনিত জটিলতা (বর্ধিত লিভার এনজাইম) উল্লেখযোগ্য ভাবে বেশি ছিল। আশ্বস্ত করার মতো বিষয় হলো সময়ের সঙ্গে সঙ্গে উভয় গ্রুপের জটিলতা গুলোর বেশির ভাগ হ্রাস পেয়েছে। তবে শ্বাসকষ্ট, দ্রুত হৃদকম্পন, পোস্ট-ট্রমাটিকস্ট্রেসডিস অর্ডার, উদ্বেগ, বিষণœতা ইত্যাদির মতো কিছু সমস্যা রোগমুক্তির ৫ মাস পরে ও মৃদু-কোভিড-১৯ আক্রান্ত রোগীদের উল্লেখযোগ্য ভাবে হ্রাস পায়নি।

এই ফলাফলগুলো কোভিড-১৯ থেকে সেরে ওঠা ব্যক্তিদের ফলোআপ এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা নির্দেশ করে। উচ্চঝুঁকির কারণে বয়স্ক এবং হাসপাতালে ভর্তিকৃত রোগীদের হৃদরোগ সংক্রান্ত জটিলতার জন্য নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা উচিত। হাসপাতালে ভর্তি হয়ে কোভিড-১৯ থেকে সেরে ওঠা ব্যক্তিদের মধ্যে নতুন করে ডায়াবেটিস-এ আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা ও বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। কারণ এটি দেশে ডায়াবেটিসের ঝুঁকিকে উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে তুলতে পারে।

অধ্যাপক ডা. সোহেল মাহমুদ আরাফাত গবেষণালব্ধ ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে চিকিৎসকদের জন্য লং কোভিড ক্লিনিক্যাল ম্যানেজমেন্ট গাইডলাইন উপস্থাপন করেন। তিনি উল্লেখ করেন একটি সুনির্দিষ্ট গাইডলাইনের অনুপস্থিতি প্রায়শই সহজে নির্ণয় করা যায় না এমন কোভিডের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবগুলোর চিকিৎসা এবং পুনর্বাসনে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, প্রস্তাবিত গাইডলাইন চিকিৎসকদের সর্বাধিক সাফল্যের সাথে রোগ সনাক্তকরণ, চিকিৎসা এবং পুনর্বাসনে সহায়তা করবে।

আইসিডিডিআর,বি-র নির্বাহী পরিচালক ড. তাহমিদ আহমেদ গবেষণার ফলাফলের ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেন, ‘কাভিড-১৯ এর দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতিকর প্রভাব এবং তার ধরণ নির্ণয়ে এই গবেষণার ফলাফল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। এটি প্রতীয়মান হয়েছে যে কোভিড-১৯ এ যারা আক্রান্ত হয়েছিলেন তাদের অনেকেরই কিছু স্বাস্থ্যগত সমস্যার ঝুঁকি বেড়ে যায়। তারা যদি নিয়মিত ফলোআপ করেন এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা গ্রহণকরেন তবেই এই গবেষণা সার্থক হবে। সেমিনারে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিএসএমএমইউ-র উপাচার্য অধ্যাপক ড.  মো. শারফুদ্দিন আহমেদ। তিনি দীর্ঘমেয়াদি কোভিড জটিলতা ও তা সমাধানের জন্য আইসিডিডিআর,বি এবং বিএসএমএমইউ-র বিজ্ঞানীদের এই যৌথ প্রচেষ্টার প্রশংসা করেন এবং এ সংক্রান্ত গবেষণার আরো নতুন কিছু ধারণা দেন। তিনি বলেন, আমি আশা করি আইসিডিডিআর,বি ও বিএসএমএমইউ যৌথভাবে আরো নতুন নতুন গবেষণার মাধ্যমে জনস্বাস্থ্য সমস্যা সমাধানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগনিয়ন্ত্রণ শাখার পরিচালক অধ্যাপক ডা: মো. নাজমুল ইসলাম গবেষকদের এবং গবেষণা সংশ্লিষ্ট সকলকে ধন্যবাদ দেন। তিনি গবেষণায় অর্থায়নের জন্য ইউএসএআইডি-কে ধন্যবাদ জানান এবং আশাবাদ ব্যাক্ত করেন যে তাদের সহযোগিতা অব্যাহত রাখবে।

ইউএসএআইডি-র হেলথ এক্সপার্টড. সামিনা চৌধুরী সেমিনারে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। তিনি কোভিড-১৯ মোকাবেলায় বাংলাদেশ সরকারের প্রচেষ্টায় ইউএসএআইডি-র বিভিন্ন সহযোগিতা কার্যক্রমের কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশে ২০ লাখের বেশি মানুষ কোভিড-১৯এআক্রান্ত হয়েছে কিন্তু পরবর্তীতে তাদের কি ধরণের স্বাস্থ্যজটিলতা দেখা দিয়েছে এবং তার ব্যাপ্তি কেমন ছিল তা অজানা ছিল। কিন্তু এই গবেষণা সে বিষয়ে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ধারণা প্রদানকরে। এই উদ্যোগের জন্য আইসিডিডিআর,বি ও বিএসএমএমইউ-কে অনেক ধন্যবাদ।
সেমিনারে বিভিন্ন মেডিকেল কলেজের চিকিৎসক, বিএসএমএমইউ, আইসিডিডিআর,বি ও গণমাধ্যমের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। 

স্বপ্না

×