ঢাকা, বাংলাদেশ   বৃহস্পতিবার ৩০ মে ২০২৪, ১৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১

বার্ধক্যজনিত ব্যথায় করণীয়

ডা. এম ইয়াছিন আলী

প্রকাশিত: ০১:১৯, ৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৩

বার্ধক্যজনিত ব্যথায় করণীয়

বার্ধক্য কোনো রোগ নয়। এটা জীবনের একটি প্রক্রিয়া

বার্ধক্য কোনো রোগ নয়। এটা জীবনের একটি প্রক্রিয়া। জন্মাইলে মরিতে হবে যেমন সত্য, তেমনি বেঁচে থাকলে বার্ধক্য আসবে। এটাই স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। আর বর্তমানে বাংলাদেশে মানুষের গড় আয়ু বেড়েছে যার ফলে বয়স্ক ব্যক্তি বা প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যাও বেড়েছে। আর এই প্রবীণ জনগোষ্ঠীর বেশিরভাগই বয়সজনিত হাড়ের ক্ষয় রোগে আক্রান্ত। বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে যেমন চুল পেকে যায় তেমনি হাড়ের ক্ষয়ও বৃদ্ধি হতে থাকে। বিশেষ করে মহিলাদের মেনোপেজ পরবর্তীতে হাড়ের ক্ষয় দ্রুত হতে থাকে।

এই হাড়ের ক্ষয় ছাড়াও জয়েন্ট বা অস্থি-সন্ধির অভ্যন্তরীণ উপাদান যেমন-সাইনোভিয়াল ফ্লুইড ও কমে, যার ফলে শরীরের জয়েন্টগুলোতে ব্যথা-বেদনা দেখা দেয়। বিশেষ করে মেরুদ-, ঘাড়, কোমর, হাঁটু, কাঁধ ইত্যাদিতে বেশি ব্যথা দেখা যায়। যা মেডিক্যাল পরিভাষায় স্পনডাইলোসিস, অষ্টিওআর্থ্রাইটিস, অষ্টিওপোরোসিস ইত্যাদি কারণে হয়ে থাকে।
স্পনডাইলোসিস : এটি মেরুদ-ের হাড় বা কশেরুকার ক্ষয়জনিত রোগ। আমাদের মেরুদ-ে সবচেয়ে বেশি নড়াচড়া হয়, দুটি অংশে ঘাড় বা সারভাইক্যাল স্পাইন ও কোমর বা লাম্বার স্পাইন। যেহেতু সারভাইক্যাল স্পাইন ও লাম্বার স্পাইন এ মুভমেন্ট বা নড়াচড়া বেশি হয়, এর ফলে মেরুদ-ের এই অংশে হাড়ের ক্ষয়ও বেশি হয়ে থাকে। ঘাড়ের মেরুদ-ের এই ক্ষয় হয়ে যাওয়াকে চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় সারভাইক্যাল স্পনডাইলোসিস বলা হয় ও কোমরের মেরুদ-ের এই ক্ষয় হয়ে যাওয়াকে চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় লাম্বার স্পনডাইলোসিস বলা হয়।
অষ্টিওআর্থ্রাইটিস : ‘অষ্টিওআথ্রাইটিস’ এটি একটি অস্থিসন্ধির ক্ষয়জনিত রোগ। আমাদের অস্থিসন্ধি বা জয়েন্ট এক ধরনের নরম কাভার দ্বারা আবৃত থাকে যাকে মেডিক্যাল ভাষাই কারটিলেজ বলে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ব্যবহারের ফলে কারটিলেজগুলো ক্ষয় হতে থাকে, জয়েন্ট বা অস্থিসন্ধির মার্জিন অমসৃণ হয়ে যায় জয়েন্ট বা অস্থিসন্ধির গ্যাপ কমে যায় যার ফলে জয়েন্ট বা অস্থিসন্ধি নাড়াচাড়া করতে ব্যথা অনুভূত হয়।
‘অষ্টিওআথ্রাইটিস’ বিভিন্ন জয়েন্ট বা অস্থিসন্ধিতে হতে পারে, তার মধ্যে-
- কবজি বা রিস্ট জয়েন্ট
- হিপ জয়েন্ট
- হাটু বা নি জয়েন্ট
- সারভাইক্যাল স্পাইন
- লাম্বার স্পাইন ইত্যাদি 
হাঁটু আমাদের শরীরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ওজন বহনকারী জয়েন্ট বিধায় হাঁটুতে ‘অষ্টিওআথ্রাইটিস’ বেশি হয়ে থাকে, পরিসংখ্যানে দেখা গেছে ৫০ এর অধিক বয়সের বেশিরভাগ মানুষ হাঁটুর ব্যথায় ভুগে থাকেন যার অন্যতম কারণ হলো ‘অষ্টিওআথ্রাইটিস’ 
অষ্টিওপোরোসিস : অষ্টিওপোরোসিস বা অস্থি ক্ষয় বা হাড়ের ক্ষয় রোগ এমন এক্তি অসুখ যার ফলে হারের ঘনত্ব নির্দিষ্ট মাত্রায় কমে যাওয়ায় হাড় দুর্বল ও ভঙ্গুর হয়ে যায়। ২০ থেকে ৩৫ বছর হাড় তার পূর্ণতা লাভ করে, তারপর ৪০ বছরের পর থেকে হাড় তার ক্যালসিয়াম ও ফসফেট হারাতে থাকে, এর ফলে হাড়ের পরিবর্তন হয়, দুর্বল ও ভঙ্গুর হয়ে যায়। ৫০ বছর বয়সে ১৫ ভাগ এবং ৭০-৮০ বছর বয়সে ৩০ ভাগ মহিলার হিপ বোন বা নিতম্বের হাড় ভেঙ্গে যায়। 
তবে পরিসংখ্যানে দেখা গেছে সারাবিশ্বে ৫০ বছরের অধিক বয়সের প্রতি ৩ জন মহিলার মধ্যে ১ জন এবং প্রতি ৫ জন পুরুষের ১ জন অষ্টিওপোরোসিস বা হাড়ের ক্ষয় রোগ হয় এবং এই ব্যথার ফলে রোগীদের ব্যক্তিগত কাজকর্ম যা মেডিক্যাল পরিভাষায় ডেইলি এক্টিভিটিজ গুলিও করতে পারে না।
 যেমন - বসা থেকে উঠতে পারে না, নিচে বসতে পারে না, সিঁড়ি দিয়ে উঠানামা করতে পারেন না, টয়লেটে বসতে পারে না ইত্যাদি বিভিন্ন ধরনের সমস্যায় ভুগে থাকেন। 
এই সমস্যাগুলোর চিকিৎসা হলো ওষুধ যেমন- এনএসআইডিএস, ডায়েটরি সাপ্লিমেন্ট–গ্লুকোসামিন হাইড্রোক্লোরাইড, কন্ড্রোটিন সালফেট, ক্যালসিয়াম, হ্যালুরনিক এসিড ইত্যাদি। বয়স্ক লোকদের যেহেতু এই রোগ বেশি হয় সেহেতু ওষুধের ব্যবহার যত কম করা যায় তত ভালো তাই ওষুধের পাশাপাশি ফিজিওথেরাপি ও থেরাপিউটিক ব্যায়াম যা পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়াহীনভাবে সমস্যাগুলো কমিয়ে এনে রোগীর স্বাভাবিক জীবন-যাপনের উপযোগী করে তোলে এবং রোগীর মাংসপেশীর শক্তি বজায় রাখার জন্য বিশেষজ্ঞ ফিজিওথেরাপি চিকিৎসকের নির্দেশিত ব্যয়ামগুলো নিয়মিত করলে বার্ধক্যজনিত ব্যথা-বেদনা কমিয়ে সুস্থ-স্বাভাবিক জীবন-যাপন সম্ভব।
 
লেখক : বাত, ব্যথা ও প্যারালাইসিস রোগে ফিজিওথেরাপি বিশেষজ্ঞ 
চীফ- কনসালটেন্ড, ঢাকা সিটি ফিজিওথেরাপি হাসপাতাল
ধানমন্ডি, ঢাকা। মোবাঃ ০১৭৮৭১০৬৭০২

×