ঢাকা, বাংলাদেশ   মঙ্গলবার ১৭ মার্চ ২০২৬, ৩ চৈত্র ১৪৩২

ওটিটিতে ঝুঁকছে দর্শক

এক ‘প্যাঁচালেই’ আটকে থাকছে টিভি নাটকের গল্প

গৌতম পাণ্ডে

প্রকাশিত: ০০:১৩, ১৯ অক্টোবর ২০২৫

এক ‘প্যাঁচালেই’ আটকে থাকছে টিভি নাটকের গল্প

এক ‘প্যাঁচালেই’ আটকে থাকছে টিভি নাটকের গল্প

‘অয়োময়’, ‘কোথাও কেউ নেই’, ‘রূপনগর’, ‘আজ রবিবার’, ‘জোনাকী জ্বলে’ ধারাবাহিক নাটকগুলো কোনো এক সময়ে দেখার জন্য বাংলাদেশ টেলিভিশন পর্দায় উন্মুখ হয়ে থাকত দর্শক। নব্বইয়ের দশকেও দর্শকের বিনোদন চাহিদা পূরণ করতে ব্যর্থ হয়নি বিটিভি। নব্বইয়ের দশকের পরবর্তী সময়ে একমাত্র টিরেসস্ট্রিয়াল চ্যানেল একুশে টেলিভিশন নানামাত্রিক নাটক দিয়ে মুগ্ধতায় ভাসিয়েছে পুরো দেশকে।
বর্তমান প্রেক্ষপটে টিভি নাটকে ঘুরেফিরে এক প্যাঁচালেই আটকে থাকছে কাহিনী। দর্শকের বড় একটি অংশ এ ধরনের নাটকে এখন ক্লান্ত। দিন কে দিন বেড়ে চলেছে মানহীন নাটকের সংখ্যা। মাঝেমধ্যে দু’একটি ভালো মানের নাটক সম্প্রচার হলেও লাগামহীন বিজ্ঞাপনের কারণে রিমোট হাতে স্থির থাকছে না দর্শক। চলে যাচ্ছে স্টার প্ল­াস, জি বাংলা, কালারস, সনি বা স্টার জলসাতে। 
বিটিভির ওপর থেকে দর্শক আকর্ষণ হারিয়েছে অনেক আগেই। ভরসা ছিল স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেলগুলোর ওপর। কিন্তু সেখানেও চলছে নাটকের নামে বিরামহীন বিজ্ঞাপনের অত্যাচার।
দর্শকদের চাহিদা পূরণে এগিয়ে এসেছে ওটিটি কনটেন্টগুলো। অ্যাপভিত্তিক বিভিন্ন ওটিটি প্ল্যাটফর্ম ও ইউটিউব প্ল­্যাটফর্মে প্রচারিত কনটেন্টে সবাই এখন গল্পে বৈচিত্র্য আনতে আগ্রহী। সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়েই এসেছে ফরম্যাটের পরিবর্তন। এসব কনটেন্ট দর্শক সাবস্ক্রিপশন অর্থাৎ টাকার বিনিময়ে দেখেন। তাই গল্পের মান, নির্মাণশৈলী, অভিনয়- সবটার মান উন্নয়ন বাধ্যতামূলক। 
তবে টিভি নাটক এখনো শহরের বাইরে, মধ্যবয়সী দর্শকের মধ্যে জনপ্রিয়। কিন্তু নগর ও তরুণ দর্শকের বড় অংশ এখন ওয়েবে যুক্ত। টিভি নাটকের জনপ্রিয়তাকে পাশ কাটিয়ে ওয়েব সিরিজগুলো দর্শক আগ্রহে আসার পেছনে কিছু উল্লেখযোগ্য কারণও রয়েছে। 
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, টিভি নাটকের গল্পে একঘেয়েমি, অল্প সময়ে নির্মাণ, বিজ্ঞাপনের জন্য নাটকে কাটাছেঁড়া- এ সবই মানহীন নাটক বাড়িয়ে দিয়েছে, যা দর্শক বিমুখতার অন্যতম কারণ। পাশাপাশি ওয়েব সিরিজে স্বাধীনভাবে গল্প বলার স্বাধীনতায় দর্শক আগ্রহ বাড়ছে।  
এ প্রসঙ্গে একাধিক নাট্যনির্মাতা জানান, টিভি চ্যানেলকে খুশি করতে গিয়ে অনেক সময় গল্পের মান নষ্ট হয়ে যায়। সময় নেই, বাজেট নেই, তবু নাটক করতে হয়। টিভি নাটকের এ ক্রান্তিকালের মধ্যে ওটিটি যেন নতুন আশা সঞ্চার করছে। ওয়েব সিরিজগুলো যেমন দর্শক টানছে, তেমনি নির্মাতাদেরও দিয়েছে গল্প বলার স্বাধীনতা। ওটিটি প্ল­্যাটফর্ম আসার পর থেকে আরও একটি বিষয় ইতিবাচক সাড়া ফেলেছে। নতুন মুখের আবির্ভাবে প্রাণবন্ত হয়ে উঠছে এ মাধ্যমটি। 
এদিকে ওটিটির সুসময়ের মধ্যে এটি নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। ওয়েব কনটেন্টগুলোতে স্বাধীনতার নামে কিছু কনটেন্টে অশ্লীলতা ও অপ্রয়োজনীয় যৌন ইঙ্গিতের ব্যবহার দর্শকের একাংশের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি করছে। এ নিয়ে তৈরি হয়েছে সেন্সর নীতিমালারও দাবি। বিশ্লেষকরা বলেন, ওয়েব সিরিজ সাহসী হোক, তবে শালীনতার সীমা অতিক্রম না করাই শ্রেয়। সাহসী গল্প বলার স্বাধীনতা থাকা উচিত, তবে তা যেন সমাজের মূল ¯্রােতের সঙ্গে সাংঘর্ষিক না হয়। না হলে এই মাধ্যমও একদিন দর্শক হারাবে।
এ প্রসঙ্গে এ সময়ের জনপ্রিয় নির্মাতা আশফাক নিপুন জনকণ্ঠকে বলেন, টেলিভিশনে ফিকশন দেখা দর্শকের অনেক আগে কমে গেছে। সেটা ইউটিউব আসার আগেই কমে গিয়েছিল। টেলিভিশনের যে ফিকশনগুলো, যেটাকে নাটক বলা হয়, সেগুলো যখন ইউটিউবে আসছে তখন সবাই ইউটিউবেই দেখা শুরু করেছে। ওই আবেদনটা টিভি চ্যানেল তৈরি করতে পারে নাই। বিশ্বব্যাপী টেলিভিশনের কদর বাড়ছে, কিন্তু বাংলাদেশে টেলিভিশনের কদর কমছে। কারণ, যারা টেলিভিশনের প্রোগ্রাম পরিচালনা অথবা মার্কেটিংয়ে আছেন, তাদের ওই প্ল্যানিংটা নেই, টেলিভিশন চ্যানেলটা কেন দেখবে মানুষ। টিভিতে যখন কোনো টক শো অনুষ্ঠান করেন, তখন ওনারা জানেন কাকে হোস্ট করলে অনুষ্ঠানটা মোটামুটি দেখবে দর্শক।

এসব অনুষ্ঠানের জন্য ওনারা যতটুকু প্ল্যান করেন, নাটকের জন্য তা করেন না। যার কারণে টেলিভিশন থেকে দর্শক অনেক আগে থেকেই বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে চলে গেছে। প্রথমে ছিল ইউটিউব এবং পরে আসছে ওটিটি। এখন যেহেতু অধিকাংশ মানুষের হাতের মুঠোয় মোবাইল।  সে জন্য অটোম্যাটিক্যালি দর্শক গ্লোবাল কন্টেন্ট দেখতে পারে। এসব কণ্টেন্ট দেখতে দেখতে দর্শকের একটা চোখ তৈরি হয়ে গেছে। ওরা এখন মাঝারি মানের কোনো অনুষ্ঠান দেখতে চায় না। আর ওটিটিতে যেহেতু সাবস্ক্রাইব করে সিরিজ দেখতে হয় এবং কন্টেন্টের জন্য আলাদা পয়সা দিতে হয়। কাজেই সিরিজের বাজেটও বেশি থাকে। ওটা যেহেতু প্রিমিয়াম কন্টেন্ট, কাজেই ওদের মাথায় থাকে দর্শকের জন্য নতুন কোনো ধরনের কণ্টেন্ট দিতে পারবে। সেভাবেই সিরিজ, ওয়েব ফিল্মগুলো বানানো হয়। যার কারণে মানুষ এখন ওয়েব ফিল্ম, ওয়েব সিরিজ, ওয়েব শোগুলোর দিকে ঝুঁকছে। 
তিনি বলেন, স্যাটেলাইটের কারণে আমরা বিভিন্ন দেশের চ্যানেল দেখতে পাই। স্টার অথবা এইচবিওতে যখন কোনো মুভি দেখেন, সেখানে কিন্তু দুই মিনিট পরপর বিজ্ঞাপন হয় না। ভারতে জি বাংলা, স্টার জলসার কেন অনুষ্ঠান দেখেন, সেখানে কিন্তু বিজ্ঞাপনের সময় নির্ধারণ করা থাকে। ওরা জানে এই জায়গাতে এসে বিজ্ঞাপন দিলে দর্শক আর উঠবে না। বাংলাদেশের টিভি চ্যানেল এ ধরনের কোনো প্ল্যান করে না। এইভাবে দর্শককে অবহেলা করতে করতে টেলিভিশনের সামনে বসে নাটক দেখার আগ্রহ অনেকের কমে গেছে। 
জনপ্রিয় অভিনেত্রী রুনা খান জনকণ্ঠকে বলেন, সময় যত যাবে, নতুন নতুন প্রযুক্তি আসবে এটাই স্বাভাবিক। সেসব প্রযুক্তির ব্যবহার ও এর সঙ্গে মানুষের সখ্য তৈরি হবে। কোনো এক সময়ে যখন শুধু টেলিভিশনে নাটক হতো তখন ওটিটি বা ইউটিউব প্ল্যাটফর্ম ছিল না। তখন টেলিভিশন ছিল ড্রইংরুম মিডিয়া। বাড়ির ড্রইংরুমে অথবা বেডরুমে বসে সবাই মিলে টেলিভিশনে নাটক দেখত। এখন পৃথিবীর যে কোনো প্রান্তে বসে ওটিটি অথবা ইউটিউবে মানুষ নাটক বা সিরিজ দেখতে পারে মোবাইলে। টেলিভিশনের নাটকগুলো একটা নির্র্দিষ্ট সময়ে প্রচার হতো। সেই সময়ের সঙ্গে দর্শককে সময় মেলাতে হতো। ওটিটিতে সুবিধা হচ্ছে কোনো ফিল্ম বা নাটক অথবা সিরিজ ওখানেই থাকে। কেউ যদি সেখানে সাবস্ক্রাইব হন, তাহলে যে কোনো সময়ে সেটা দেখতে পারছেন।

যেহেতু ওটার সঙ্গে এনজয় করার সুবিধাটা বেশি, তাই দর্শক ওই মাধ্যমটাকে বেছে নেয়। ইউটিউব বা ওটিটির আমাদের একটা বড় দর্শক আছেন, যারা প্রবাসে থাকেন, তারাও দেখেন এই কন্টেন্ট। ব্যাসিক বিষয়টা কিন্তু ওটাই। মানুষ যখন সময় পায় তখন সে ওই কন্টেন্টা উপভোগ করে। কাজেই প্রযুক্তির স্বাধীনতা মানুষ নেবে এটাই স্বাভাবিক। আমি মনে করি এই ক্ষেত্রে প্রযুক্তিতে যেমন সুবিধা আছে। কিছু অসুবিধাও আছে। সেই অসুবিধাগুলোকে যদি পাশ কাটিয়ে সুবিধার দিকটাকে সকলে মিলে ফোকাস করি বা ওটার প্রতি গুরুত্ব দেই, তাহলে সেটা মনে হয় সকলের জন্যই ভালো। 
দর্শকের চাহিদা টিভি পূরণ করতে পারছে কি? এমন প্রশ্নের উক্তরে রুনা খান বলেন, আমার তেমন মনে হয় না। কারণ হচ্ছে, আমি যখন পেশাদার অভিনয় শিল্পী হিসেবে কাজ শুরু করি, সে সময় আমাদের দেশে টিভি চ্যানেল ছিল সাত কিংবা আটটি। এখন চ্যানেলের সংখ্যা চল্লিশটা অথবা তার চেয়েও বেশি। আগে অনেক ভালো কাজ হতো এখন হচ্ছে না, আমার কাছে কিন্তু তা মনে হয় না। কাজের সংখ্যা বাড়ার কারণে হয়তো অনেক ভালো কাজের সেভাবে ফোকাস হচ্ছে না। আগেও কাজ হয়েছে, এখনো হচ্ছে এবং প্রচুর ভালো ভালো কাজ হচ্ছে।

প্যানেল হু

×