বাণিজ্য ঘাটতি ১৩.৮ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রকাশিত ব্যালান্স অব পেমেন্ট-এর (বিওপি) সর্বশেষ তথ্যমতে, চলতি অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে আমদানি বেড়ে যাওয়া ও রপ্তানি কমে যাওয়ার কারণে দেশের বাণিজ্য ঘাটতি আরও বেড়েছে। গতকাল বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই-জানুয়ারি সময়ে বাণিজ্য ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১৩.৮০ বিলিয়ন ডলারে। গত অর্থবছরের একই সময়ে এই ঘাটতির পরিমাণ ছিল ১১.৭৫ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে বাণিজ্য ঘাটতি বেড়েছে ২ বিলিয়ন ডলারের বেশি।
তবে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল সংঘাতের প্রভাব এই তথ্যে এখনো প্রতিফলিত হয়নি। অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে বাংলাদেশ থেকে রপ্তানি কমেছে। গত অর্থবছরের জুলাই-জানুয়ারি সময়ে রপ্তানি আয় ছিল ২৬.৩৭ বিলিয়ন ডলার, যা চলতি অর্থবছরের একই সময়ে কমে দাঁড়িয়েছে ২৬.০৯ বিলিয়ন ডলার। একই সময়ে আমদানি ব্যয় ৩৮.১১ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ৩৯.৮৯ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, বাণিজ্য প্রবাহের পরিবর্তনের কারণেই মূলত এই ঘাটতি বাড়ছে। ‘আমদানি বাড়া ও রপ্তানি কমার কারণে মূলত বাণিজ্য ঘাটতি বেড়েছে।
রেমিটেন্সে ভর করে কমেছে চলতি হিসাবে ঘাটতি ॥ বাণিজ্য ঘাটতি বাড়লেও আলোচ্য সময়ে দেশের চলতি হিসাবের (কারেন্ট অ্যাকাউন্ট) ঘাটতি উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে চলতি হিসাবে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৩৮১ মিলিয়ন ডলার। গত অর্থবছরের একই সময়ে এই ঘাটতির পরিমাণ ছিল ১.৩৫ বিলিয়ন ডলার। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, রেমিটেন্সের প্রবাহ বাড়ার কারণে চলতি হিসাবে ঘাটতি আগের চেয়ে কমেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, জুলাই-জানুয়ারি সময়ে দেশে রেমিটেন্স এসেছে ১৯.৪৩ বিলিয়ন ডলার। আগের অর্থবছরের একই সময় এর পরিমাণ ছিল ১৫.৯৬ বিলিয়ন ডলার।
জাহিদ হোসেন বলেন, বাণিজ্য ঘাটতি বাড়ার পরেও শক্তিশালি রেমিটেন্স প্রবাহ চলতি হিসাবের ঘাটতি কমিয়ে এনেছে। চলতি হিসাব বা কারেন্ট অ্যাকাউন্ট হলো একটি দেশের ব্যালান্স অব পেমেন্টের (বিওপি) অন্যতম প্রধান উপাদান। পণ্য ও সেবার নিট বাণিজ্য, বিদেশ থেকে আসা আয় ও রেমিটেন্সের মতো চলতি হস্তান্তর এর অন্তর্ভুক্ত। বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, শক্তিশালী রেমিটেন্স প্রবাহ প্রায়ই চলতি হিসাবকে সুরক্ষা দেয়। তবে বিশাল বাণিজ্য ঘাটতি এই ভারসাম্যকে আরও নেতিবাচক অবস্থার দিকে ঠেলে দিতে পারে।
আর্থিক হিসাবে উদ্বৃত্ত ॥ ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে বাংলাদেশের আর্থিক হিসাবে ২ বিলিয়ন ডলারের উদ্বৃত্ত রেকর্ড করা হয়েছে। গত অর্থবছরের একই সময়ে এই উদ্বৃত্তের পরিমাণ ছিল মাত্র ৩৩১ মিলিয়ন ডলার। অর্থনীতিবিদরা এই উন্নতির জন্য মূলত ট্রেড ক্রেডিট পরিস্থিতির ইতিবাচক পরিবর্তন এবং বিদেশি সহায়তার নিট প্রবাহ বৃদ্ধিকে প্রধান কারণ হিসেবে দেখছেন। এ প্রসঙ্গে অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, ‘মাঝারি ও দীর্ঘমেয়াদি ঋণ ছাড় অনেকটা কমার পরও আর্থিক হিসাবের উদ্বৃত্ত বেড়েছে। এটা সম্ভব হয়েছে ট্রেড ক্রেডিডে বড় ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তনের কারণে।’
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত জুলাই-জানুয়ারি সময়ে ট্রেড ক্রেডিটে ১.০৫ বিলিয়ন ডলারের উদ্বৃত্ত ছিল, যেখানে গত অর্থবছরের একই সময়ে ১.২৯ বিলিয়ন ডলারের ঘাটতি ছিল। ট্রেড ক্রেডিট হচ্ছে পণ্য বা পরিষেবা যা এখনই গ্রহণ করা হলেও মূল্য পরে পরিশোধ করা হয়। একে ব্যালান্স অব পেমেন্টের (বিওপি) স্বল্পমেয়াদি মূলধন প্রবাহ হিসেবে গণ্য করা হয়। কারণ এটি সরাসরি পণ্য আমদানির সঙ্গে অর্থায়নের সম্পর্ক স্থাপন করে। আলোচ্য সময়ে দেশের সার্বিক লেনদেনের ভারসাম্যেও উন্নতি হয়েছে করা গেছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে দেশের সার্বিক লেনদেনের ভারসাম্যে ২.২৮ বিলিয়ন ডলার উদ্বৃত্ত হয়েছে, যেখানে গত বছরের একই সময়ে ১.২২ বিলিয়ন ডলার ঘাটতি ছিল। জাহিদ হোসেন বলেন, ‘প্রথম সাত মাসে সার্বিক লেনদেনের ভারসাম্য স্বস্তিদায়ক অবস্থায় রয়েছে।
রপ্তানি কমা ও আমদানি বাড়ার পরও রেমিটেন্স প্রবাহ শক্তিশালী থাকায় গত বছরের তুলনায় চলতি হিসাবের ঘাটতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।’ তবে চলমান ইরান-ইসরাইল যুদ্ধ আগামী মাসগুলোতে বাংলাদেশের বৈদেশিক লেনদেনের খাতে প্রভাব ফেলতে শুরু করতে পারে। বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হারের ওপর ইতিমধ্যেই চাপের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে ডলারের দাম ৭০ পয়সার বেশি বেড়ে ১২৩ টাকায় ঠেকেছে, যা আগের সপ্তাহে ছিল ১২২.৩০ টাকা।
জাহিদ হোসেন আরও বলেন, ‘চলমান যুদ্ধের প্রভাব মার্চ মাস থেকে দৃশ্যমান হতে পারে, যার ফলে আগামী দিনগুলোতে লেনদেনের ভারসাম্য পরিস্থিতির অবনতি ঘটার আশঙ্কা রয়েছে। এটি বিনিময় হার ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। বিনিময় হারের অস্থিতিশীলতা নিয়ন্ত্রণ ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংরক্ষণে বাংলাদেশ ব্যাংককে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে পদক্ষেপ নিতে হবে।’
প্যানেল হু








