পেঁয়াজ চাষ করে বিপাকে পড়েছেন দেশের লাখ লাখ কৃষক
পেঁয়াজ চাষ করে বিপাকে পড়েছেন দেশের লাখ লাখ কৃষক। প্রতি মণ পেঁয়াজ উৎপাদনে ১৫০০ থেকে ১৬০০ টাকা খরচ হলেও কৃষককে তা বিক্রি করতে হচ্ছে ৮০০ থেকে এক হাজার টাকায়। যদিও খুচরা ক্রেতাদের এখনো ৪০ থেকে ৫০ টাকা কেজি দরে পেঁয়াজ কিনতে হচ্ছে।
কৃষকদের দাবি, বাজারে দাম কম থাকায় উৎপাদিত পণ্য বিক্রি করে খরচের অর্ধেকই উঠছে না। ভরা মৌসুমেও ভারতীয় পেঁয়াজে বাজার সয়লাব জানিয়ে সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন, এভাবে চলতে থাকলে আগামীতে পেঁয়াজ চাষে উৎসাহ হারিয়ে ফেলবেন চাষিরা। এমতাবস্থায় সরকারের নীতিনির্ধাকদের আশু দৃষ্টি কামনা করেন তারা।
রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ বাজারে পেঁয়াজ বিক্রি করতে আসা ষাটোর্ধ্ব কৃষক মো. সেকেন আলী সেক সম্প্রতি সাংবাদিকদের বলেন, বিশ মণ পেঁয়াজ নিয়ে বাজারে এসেছি, কেনার মতো কোনো খদ্দের নেই। ঠিক মতো কেউ জিজ্ঞাসাও করছে না। বাজারে যা দাম, তাতে খরচের সিকি টাকাও উঠবে না। এমন হলে পেঁয়াজ আবাদ করে আমরা বেঁচে থাকব কিভাবে? আমাদের সমস্যা দেখার কেউ নেই। তিনি প্রশ্ন তুলে বলেন, পেঁয়াজের আবাদ করতে গিয়ে সোনালী ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছি। এছাড়া এনজিও থেকেও ঋণ করতে হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে এই ঋণ আমি কিভাবে পরিশোধ করব? আর পরিবার পরিজন নিয়ে চলবই বা কিভাবে?
তিন বিঘা জমিতে পেঁয়াজ চাষ করেছেন জানিয়ে ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলার বালিয়াগট্টি গ্রামের কৃষক জসিমউদ্দিন বলেন, উৎপাদনে প্রতি মণে প্রায় ১৪০০ থেকে ১৫০০ টাকা খরচ পড়ে। যেসব কৃষকের ফলন ভালো হয়েছে তাদের খরচ তুলনামূলক কম পড়েছে, আর যাদের ফলন কম হয়েছে তাদের খরচ বেশি হয়েছে। হ্ন কীটনাশক, সার ও বিভিন্ন ওষুধ বেশি দামে কিনতে হয় জানিয়ে তিনি বলেন, কিন্তু বর্তমানে প্রতিমণ পেঁয়াজ মাত্র ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা দরে লোকসানে বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছি। উৎপাদন খরচের তুলনায় যদি ন্যায্য দাম না পাওয়া যায়, তাহলে কৃষকেরা ভবিষ্যতে পেঁয়াজ চাষে আগ্রহ হারাতে পারেন। এতে দেশে উৎপাদন কমে গেলে বাইরের দেশ থেকে আমদানি করতে হতে পারে।
আওধা গ্রামের কৃষক আব্দুর রহিম বলেন, এত কষ্ট করে এ বছর পেঁয়াজ চাষ করলাম, কিন্তু বাজারে এসে দেখি দাম নেই। খরচের টাকাই উঠছে না। পেঁয়াজের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে সংরক্ষণ ব্যবস্থা বাড়ানো এবং বাজার ব্যবস্থাপনায় কার্যকর উদ্যোগ সরকারকে নিতে হবে। তা না হলে আগামী বছর থেকে আর পেঁয়াজ চাষ করব না।
লাঙ্গলবাঁধ বাজারে পেঁয়াজ বিক্রি করতে আসা কৃষক রমজান আলী বলেন, ‘সার, বীজ, কীটনাশক ও সেচ খরচ মিলিয়ে প্রতিমণ পেঁয়াজে প্রায় ১ হাজার ৫০০ টাকা খরচ হয়েছে। এখন বাজারে এসে বিক্রি করতে হচ্ছে ৯৫০ টাকা থেকে ১ হাজার ১০০ টাকায়। এই লোকসান নিয়ে আমাদের মত কৃষকদের সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়ছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ভারতের সঙ্গে টানাপড়েন সৃষ্টি হলে সেদেশ থেকে পেঁয়াজ আমদানি অনেকটাই বন্ধ হয়ে যায়। তখন সরকারের উৎসাহে পেঁয়াজ চাষে মনোযোগী হন দেশের কৃষকরা। ব্যাপক চাষাবাদের মাধ্যমে পেঁয়াজে ভারতনির্ভরতা অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব হয়। কিন্তু চলতি উৎপাদন মৌসুমে হঠাৎ টানা বৃষ্টিতে পেঁয়াজের বীজতলা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অনেক ক্ষেত্রে দ্বিতীয় দফায় পেঁয়াজ বুনতে গিয়ে বাড়তি খরচের মুখে পড়েন কৃষক। ফলে অন্যান্য বছর যেখানে প্রতি মণ পেঁয়াজ উৎপাদনে ৮০০ থেকে এক হাজার টাকা খরচ পড়ত সেখানে চলতি বছর খরচ হয়েছে অন্তত দেড় হাজার টাকা।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) হিসাবে, বাংলাদেশে বছরে পেঁয়াজের চাহিদা প্রায় ২৮ লাখ টন। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে দুই লাখ ৪৬ হাজার ৭৫২ হেক্টর জমিতে আবাদ করে ৩৪ লাখ ১৬ হাজার ৯৯০ টন পেঁয়াজ উৎপাদন হয়। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দুই লাখ ৫৮ হাজার ৭৯০ হেক্টর জমিতে পেঁয়াজের চাষ হয়েছে। এতে উৎপাদন হয়েছে ৩৭ লাখ ৮৯ হাজার ৮৮৭ টন। গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে চারা, কন্দ ও বীজ মিলিয়ে দুই লাখ ৮০ হাজার ১০০ হেক্টর জমিতে ৪২ লাখ ৫০ হাজার টন পেঁয়াজের উৎপাদন হয়েছে। ধারাবাহিকভাবে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দুই লাখ ৮৬ হাজার ৩০০ হেক্টর জমিতে পেঁয়াজ আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। এতে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৪২ লাখ ৬৪ হাজার ১০০ টন।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাব অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৫০৩ হাজার একর জমিতে পেঁয়াজের উৎপাদন ছিল ২৫ লাখ ৪৭ হাজার টন। কিন্তু দেশে এর বার্ষিক চাহিদা ২৬ লাখ টন। এরপরও প্রতিবছর ৯ থেকে ১১ লাখ টন পেঁয়াজ আমদানি করতে হয়। যার অধিকাংশই আসে প্রতিবেশী দেশ ভারত থেকে। বাংলাদেশের আবহাওয়া পেঁয়াজ চাষের জন্য উপযুক্ত এবং কৃষক পেঁয়াজ চাষে খুবই আগ্রহী। মূলত রবি মৌসুমে পেঁয়াজের ব্যাপক চাষাবাদ হয়ে থাকে। মসলা গবেষণাকেন্দ্র এবং হর্টিকালচার সেন্টার থেকে রবি মৌসুমের পাশাপাশি গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজ চাষের জন্য কৃষকদের বীজ দেওয়া হয়। পাশাপাশি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর থেকে প্রদর্শনী ও প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। ফলে কৃষক গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজ চাষে উদ্বুদ্ধ হচ্ছেন এবং এ সময় চাষ করে অনেকে ভালো ফলন পাচ্ছেন।
অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর এই তিন মাস মানেই পেঁয়াজের বাজারে অস্বস্তি। দশকের পর দশক এমন ঘটনা ঘটে চলেছে। দেশের বাজার ভরে যেত ভারত থেকে আমদানি করা পেঁয়াজে। আর ঠিক সেই সময়েই দেশের কৃষকেরা নিজেদের উৎপাদিত পেঁয়াজের ন্যায্য দাম থেকে বঞ্চিত হতেন। কিন্তু চলতি মৌসুমে দৃশ্যপট অনেকটাই বদলে গেছে।
‘মসলার উন্নত জাত ও প্রযুক্তি সম্প্রসারণ’ প্রকল্পের নিবিড় পরিবীক্ষণ সমীক্ষায় উঠে এসেছে, পেঁয়াজ সংরক্ষণের জন্য পর্যাপ্ত ব্যবস্থার অভাব। এজন্য আলাদা সংরক্ষণাগার নেই। কৃষক জানেন না আধুনিক পদ্ধতিতে কীভাবে সংরক্ষণ করতে হয়। তারা বাড়িতেই প্রাচীন পদ্ধতিতে সংরক্ষণ করেন। এতে অনেক পেঁয়াজ নষ্ট হয়। এছাড়া মাঠ থেকে পেঁয়াজ তোলার ক্ষেত্রেও আধুনিক পদ্ধতির প্রয়োগ হয় না। ফলে এ সময়ও প্রচুর পরিমাণে নষ্ট হয়। সব মিলে বছরে নষ্ট পেঁয়াজের পরিমাণ দাঁড়ায় ১০ লাখ টন।
পরিসংখ্যান বলছে, প্রতিবছর উত্তোলন ও সংরক্ষণের সময়ই নষ্ট হচ্ছে ১০ লাখ টন পেঁয়াজ। ফলে চাহিদা মেটাতে ৯ থেকে ১১ লাখ টন পেঁয়াজ আমদানি করতে হচ্ছে। ক্ষতির পরিমাণ কমানো গেলে আমদানি কমানো সম্ভব। এতে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে। এছাড়া পেঁয়াজ সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্যও কমবে। দেশে পেঁয়াজের চাহিদা ২৬ লাখ টন। উৎপাদন ২৫ লাখ টনের বেশি। নানাভাবে পেঁয়াজ নষ্ট হওয়ায় ঘাটতির পরিমাণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। এমতাবস্থায় পেঁয়াজ সংরক্ষণের ব্যবস্থা উন্নত করা গেলে দেশের মানুষ সারা বছর সাশ্যয়ী দামে পেঁয়াজ খেতে পারবেন এবং কৃষক উপযুক্ত দাম পাবেন বলে বিশেষজ্ঞদের অনুমান।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনটি বড় সমস্যা সমাধানেই এই সাফল্য এসেছে। এগুলো হচ্ছে সংরক্ষণ, বীজ এবং বাজার সিন্ডিকেট। আগে সঠিক সংরক্ষণ না থাকায় উৎপাদিত পেঁয়াজের প্রায় ৩০ শতাংশ নষ্ট হয়ে যেত। ফলে চাহিদার চেয়ে বেশি উৎপাদন হলেও ঘাটতি দেখা দিত। এই জায়গায় বড় পরিবর্তন এনেছে ‘এয়ার-ফ্লো’ প্রযুক্তি। তাপমাত্রা, আর্দ্রতা ও বাতাস নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে এই যন্ত্রে পেঁয়াজ দীর্ঘদিন ভালো রাখা যায়। ২৫ জেলায় প্রায় চার হাজার এয়ার-ফ্লো যন্ত্র বিতরণ করা হয়েছে। প্রতিটিতে ১২ টন পর্যন্ত পেঁয়াজ সংরক্ষণ করা যায়।
২০২০ সাল থেকে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি), বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বায়েক), বিএডিসি ও ডিএই একসঙ্গে কাজ করে উন্নত বীজের উৎপাদন বাড়িয়েছে। দেশে বছরে পেঁয়াজবীজের চাহিদা এক হাজার ১০০ টন। উৎপাদন এখন এক হাজার টনের বেশি। বারি পেঁয়াজ-৫ (গ্রীষ্ম) এবং বারি পেঁয়াজ-৪ ও ৬ (শীত) জাতের কারণে সারাবছর চাষ সম্ভব হচ্ছে।
প্যানেল হু








