আমিরাতের বিশাল তেলভান্ডারে শনিবার হামলা চালায় ইরান। বহু দূর থেকেও আগুনের লেলিহান শিখা দৃশ্যমান হয়
ইরানের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি খারগ দ্বীপে মার্কিন হামলার বদলা নিতে বদ্ধপরিকর তেহরান। শনিবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই দ্বীপে হামলার খবর প্রকাশ্যে আনার পরপরই মধ্যপ্রাচ্যের একাধিক দেশে মুহুর্মুহু হামলা চালায় ইরানের বিপ্লবী বাহিনী আইআরজিসির সদস্যরা। প্রথম হামলা হয় সংযুক্ত আরব আমিরাতের একটি বৃহৎ তেল স্থাপনায়। হামলার পর আমিরাতের ওই তেল স্থাপনায় আগুনের লেলিহান শিক্ষা বহুদূর পর্যন্ত দৃষ্টিগোচর হয়। অনেকে বলেন, শনিবার সকালের ওই হামলায় চারদিকে যেন নরক নেমে আসে।
এরপর আইআরজিসি বাহরাইন, ইরাক, কুয়েত, ইসরাইল ও সৌদি আরবের একাধিক মার্কিন টার্গেটে সফল হামলা করে। সবচেয়ে বেশি হামলা হয় বাগদাদের দুইটি মার্কিন ঘাঁটিতে। ইরানি হামলায় ঘাঁটি দুটিতে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের বহু সমরাস্ত্র ধ্বংস হয়। খারগ দ্বীপে হামলার পর সংযুক্ত আরব আমিরাতে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের সব গোপন আস্তানাকে বৈধ লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করার হুমকি দিয়েছে আইআরজিসি।
শনিবার আমিরাতকে সতর্ক করে দিয়ে আইআরজিসি বলেছে, দ্বীপে হামলার পর আমিরাতে গোপনীয় সব মার্কিন আস্তানা এখন আমাদের বৈধ লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হবে। এক বিবৃতিতে আইআরজিসি বলেছে, ইরানের জাতীয় সার্বভৌমত্ব এবং ভূখ- রক্ষার বৈধ অধিকার হিসেবে সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিভিন্ন শহরে আশ্রয় নেওয়া মার্কিন শত্রু, তাদের ক্ষেপণাস্ত্রের উৎসস্থল, ব্যবহার করা বন্দর ও ডক এবং মার্কিন সৈন্যদের আস্তানাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করবে আইআরজিসি।
আমিরাতের বাসিন্দাদেরও সতর্ক করে দিয়েছে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী। একই সঙ্গে আমিরাতের জনবহুল সব এলাকায় সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে বন্দর, ডক এবং মার্কিন সামরিক স্থাপনা থেকে নিরাপদ দূরত্বে সরে যাওয়ার জন্য বাসিন্দাদের আহ্বান জানানো হয়েছে। খবর আলজাজিরা ও বিবিসি অনলাইনের।
ইসরাইলে ইরানের সফল হামলার একাধিক চিত্র শনিবার প্রকাশ্যে আসে। এতে দেখা যাচ্ছে, রাজধানী তেলআবিব ও বন্দরনগরী হাইফার বহু এলাকা ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের আঘাতে ল-ভ- হয়ে গেছে। বহু ঘরবাড়ি একেবারে মাটির সঙ্গে মিশে গেছে। ইরানের পাশাপাশি ইসরাইলের বিভিন্ন এলাকায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় হিজবুল্লাহ।
আমিরাতের আবুধাবিতে এবং বাহরাইন ও কুয়েতের তিনটি সামরিক ঘাঁটিতে অবস্থানরত মার্কিন বাহিনীর ওপর ‘টানা কয়েক দফায়’ হামলা চালানোর দাবি করেছে ইরানের নৌবাহিনী।
আইআরজিসির নৌপ্রধান অ্যাডমিরাল আলিরেজা তাংসিরি বলেন, শনিবার হামলার লক্ষ্যবস্তু হওয়া ঘাঁটিগুলোর মধ্যে আবুধাবির আল-দাফরা এবং বাহরাইনের শেখ ইসা ঘাঁটি ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়েছে।
আলিরেজা আরও দাবি করেন, এই হামলায় প্যাট্রিয়ট রাডার সিস্টেম, যুদ্ধবিমান এবং যুদ্ধবিমানের জ্বালানি সংরক্ষণের ট্যাঙ্ক নিশানা করা হয়েছিল।
শনিবার ইরানের রাজধানী তেহরান, পশ্চিমাঞ্চলীয় ইলাম প্রদেশের আইভান শহরে হামলা চালায় ইসরাইল-যুক্তরাষ্ট্র। এতে ৬ মাস বয়সী এক শিশুসহ একই পরিবারের ছয় সদস্য নিহত হন।
স্থানীয় এক কর্মকর্তার বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়, একটি আবাসিক ভবনে ওই হামলা চালানো হয়। উদ্ধারকর্মীরা এখনো ঘটনাস্থলে রয়েছেন এবং ধ্বংসস্তূপ সরানোর কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।
ইসরাইলের আপার গ্যালিলি অঞ্চলে হিজবুল্লাহর হামলায় বেশ কিছু ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে। এর আগে দেশটির মধ্য ও দক্ষিণাঞ্চলজুড়েও বেশ কিছু হামলা হয়েছে। দক্ষিণের নেগেভ মরুভূমির একটি বেদুইন গ্রামেও ক্ষয়ক্ষতির তথ্য পাওয়া গেছে।
মধ্য ইসরাইলের বেন গুরিয়েন বিমানবন্দরের কাছের শহর শোহামেও ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে। সেখানে একটি ভবনে আগুন ধরে যাওয়ায় ৩০ বাসিন্দাকে সরিয়ে নিতে হয়।
সৌদি আরবের প্রিন্স সুলতান বিমানঘাঁটিতে অবস্থানকালে মার্কিন বিমান বাহিনীর পাঁচটি রিফুয়েলিং (জ্বালানি সরবরাহকারী) বিমান ইরানি হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সৌদি আরবের ওই ঘাঁটিতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার সময় বিমানগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তবে বিমানগুলো পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যায়নি এবং বর্তমানে সেগুলো মেরামতের কাজ চলছে। এই হামলায় কেউ নিহত হয়নি বলেও জানিয়েছে পত্রিকাটি।
এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্ভবত এক বা দুই সপ্তাহের মধ্যে যুদ্ধ বন্ধের ঘোষণা দেবেন। ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে ভেনিজুয়েলা ও ইরান বিষয়ক বিশেষ দূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করা এলিয়ট আব্রামস শনিবার এই দাবি করেন। সিএনএনের ক্রিশ্চিয়ান আমানপুরকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আব্রামস বলেন, ইরানের যুদ্ধ বন্ধ করার ক্ষেত্রে ট্রাম্পের সামনে দুটি পথ খোলা আছে।
আব্রামস বলেন, ‘হয়ত ইরানে কোনো ধরনের বিদ্রোহ দেখা দেবে, নতুবা সম্ভবত এক বা দুই সপ্তাহের মধ্যে ট্রাম্প যুদ্ধ বন্ধের ঘোষণা দেবেন। তিনি বলবেন যে, আমরা আমাদের পরিকল্পিত সব লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছি এবং এখন এর সমাপ্তি ঘটল।
কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক সাবেক এই সিনিয়র ফেলো আরও বলেন, ‘আমি মনে করি দ্বিতীয় সম্ভাবনাটিই বেশি, অর্থাৎ তিনি স্রেফ যুদ্ধ শেষের ডাক দেবেন। আব্রামসের মতে এটি হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। কারণ তার দাবি ‘ইরানের সাধারণ মানুষ বর্তমান সরকারকে তীব্র ঘৃণা করলেও, সেই সরকার আগামী এক সপ্তাহে পড়বে নাকি পাঁচ বছর পর, তা নিশ্চিত করে বলা যায় না।’
খারগ দ্বীপে মার্কিন সামরিক বাহিনী বড় ধরনের বিমান হামলা চালিয়েছে বলে দাবি করে শনিবার ভোরে সামাজিক মাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প জানান, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে বিঘœ ঘটানো হলে ইরানের তেল স্থাপনাগুলো লক্ষ্যবস্তু করা হতে পারে।
ট্রাম্প বলেন, মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাসে অন্যতম শক্তিশালী বোমা হামলা চালিয়েছে। ইরানের খারগ দ্বীপের প্রতিটি সামরিক লক্ষ্যবস্তু পুরোপুরি ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে।
উল্লেখ্য, ইরানের বিরুদ্ধে ডোনাল্ড ট্রাম্পের তড়িঘড়ি নেওয়া ‘শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের’ পরিকল্পনা এক ভয়াবহ বাস্তবতার মুখে পড়েছে। ২০০৩ সালের ইরাক যুদ্ধের পর মধ্যপ্রাচ্যে এটিই যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সামরিক হস্তক্ষেপ। তবে যুদ্ধের শুরুতেই বিশৃঙ্খলা ও অদূরদর্শিতার চিত্র ফুটে ওঠায় কড়া সমালোচনার মুখে পড়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস করা থেকে শুরু করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা অকেজো করা, যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য বারবার পরিবর্তিত হচ্ছে।
এর ফলে ওয়াশিংটন একটি দীর্ঘমেয়াদি ও অনিয়ন্ত্রিত যুদ্ধের দিকে ধাবিত হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। যুদ্ধের শুরুতেই পেন্টাগনের পুরনো তথ্য ব্যবহারের কারণে একটি মার্কিন টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র গিয়ে পড়ে একটি বালিকা বিদ্যালয়ের ওপর। এতে ১৭৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। অন্যদিকে, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্র শত শত আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করলেও একটি ড্রোন কুয়েতের অস্থায়ী মার্কিন কমান্ড সেন্টারে আঘাত হানে। এতে ৬ মার্কিন সেনা নিহত এবং কয়েক ডজন আহত হয়েছেন।
যুদ্ধ শুরুর পর মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে হাজার হাজার মার্কিন নাগরিক আটকা পড়েছেন। তাদের সরিয়ে নিতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তড়িঘড়ি করে একটি টাস্কফোর্স গঠন করেছে। সমালোচকদের মতে, যুদ্ধ শুরুর আগে এসব নাগরিক ও দূতাবাস কর্মীদের সরিয়ে নেওয়ার কোনো যথাযথ পূর্বপ্রস্তুতি ছিল না।
মার্কিন হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি এবং তার বেশ কয়েক সম্ভাব্য উত্তরসূরি নিহত হয়েছেন। তবে এর পরবর্তী ধাপ কী হবে, তা নিয়ে ট্রাম্পের বক্তব্যে কোনো স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়নি। ট্রাম্প ইরানিদের উদ্দেশে কেবল বলেছেন, ‘আমাদের কাজ শেষ হলে আপনারা আপনাদের সরকারের দায়িত্ব বুঝে নিন।’ কিন্তু এই ক্ষমতা হস্তান্তর কীভাবে হবে, তার কোনো দিকনির্দেশনা নেই।
পেন্টাগনের দেওয়া তথ্যমতে, যুদ্ধের প্রথম ছয় দিনেই যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয় হয়েছে ১১ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার। হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিশ্ববাজারে তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে ট্রাম্প প্রশাসন রাশিয়ার তেলের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে বাধ্য হয়েছে, যা তাদের পূর্ববর্তী নীতির সম্পূর্ণ উল্টো।
বারাক ওবামার সময়কার জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ফিলিপ গর্ডন বলেন, এত অল্প পরিকল্পনায় এ ধরনের যুদ্ধ পরিচালনা করা কঠিন। ট্রাম্প কেন অবাক হচ্ছেন, তা ভেবে আমি অবাক হচ্ছি। আমেরিকান এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ মাইকেল রুবিন বলেন, সামরিক পরিকল্পনা হয়ত নিখুঁত, কিন্তু রাজনৈতিকভাবে এটি একটি চরম বিশৃঙ্খলা হিসেবে দেখা দিচ্ছে। যে কোনো অভিযানের প্রথম ধাপ হলো একটি লক্ষ্য নির্ধারণ করা। পেন্টাগন নয়, এই অস্পষ্টতার দায় ডোনাল্ড ট্রাম্পের।
সমালোচকরা বলছেন, ক্যারিয়ার কূটনীতিক ও অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের ‘ডিপ স্টেট’ আখ্যা দিয়ে ছেঁটে ফেলার কারণেই এই সমন্বয়হীনতা তৈরি হয়েছে। ডিফেন্স প্রায়োরিটিজের সামরিক বিশ্লেষণ বিভাগের পরিচালক জেনিফার কাভানাঘ সতর্ক করে বলেন, এই যুদ্ধের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব হবে ভয়াবহ। এটি যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তিকে নর্দমায় নিক্ষেপ করার শামিল, যার রেশ কয়েক দশক ধরে টানতে হবে।
মোজতবা খামেনিকে ধরিয়ে দিতে কোটি ডলার পুরস্কার ঘোষণা
ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি ও দেশটির ইসলামি বিপ্লবী গার্ডের (আইআরজিসি) সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাকে ধরিয়ে দিতে ১ কোটি ডলার পুরস্কার ঘোষণা করেছে যুক্তরাষ্ট্র।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের ‘রিওয়ার্ডস ফর জাস্টিস প্রোগ্রাম’ থেকে শুক্রবার এ ঘোষণা দেওয়া হয়। প্রকল্পটি ‘ডিপ্লোম্যাটিক সিকিউরিটি সার্ভিস’ পরিচালনা করে।
‘রিওয়ার্ডস ফর জাস্টিস প্রোগ্রাম’ থেকে দেওয়া বিবৃতিতে বলা হয়, ‘এই ব্যক্তিরা ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ডের বিভিন্ন অংশের নেতৃত্ব দেন ও পরিচালনা করেন; যাঁরা বিশ্বজুড়ে সন্ত্রাসী কর্মকা-ের পরিকল্পনা, সংগঠন এবং বাস্তবায়ন করেন। বিবৃতিতে আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনিসহ কয়েক নেতার ছবি প্রকাশ করা হয়। বলা হয়, এই নেতাদের বা আইআরজিসির অন্য গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের বিষয়ে তথ্য দিলে তথ্যদানকারী পুনর্বাসনের সুযোগ পাবেন এবং আর্থিক পুরস্কারও পাবেন।
প্যানেল হু








