প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শনিবার ধর্মীয় গুরুদের সম্মানী প্রদান কার্যক্রমের উদ্বোধন অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন
বর্তমান সরকার দেশের প্রতিটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানকে কেবল উপাসনার স্থান নয়, বরং ধর্মীয়, সামাজিক ও নৈতিক শিক্ষার মূল কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করতে চায় বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেন, সব ধর্মের মানুষকে নিয়ে শান্তিময় বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চাই। শনিবার সকালে রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে ধর্ম মন্ত্রণালয় আয়োজিত মসজিদের ইমাম, মুয়াজ্জিন, খাদেমসহ বিভিন্ন ধর্মীয় গুরুদের মাসিক সম্মানী প্রদানের পাইলট প্রকল্পের উদ্বোধনকালে প্রধানমন্ত্রী এই প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সারাদেশের তালিকাভুক্ত ইমাম, মুয়াজ্জিন, খাদেম, মন্দিরের পুরোহিত, বৌদ্ধ বিহারের অধ্যক্ষ ও উপাধ্যক্ষের মাঝে মাসিক সম্মানী ভাতার চেক তুলে দেন। পরে প্রধানমন্ত্রী আইপাস বাটন চাপ দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের মোবাইলে চলে যায়। পাইলট প্রকল্পের প্রাথমিক পর্যায়ে প্রতিটি মসজিদের জন্য মাসিক ১০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এই অর্থ থেকে ইমাম ৫ হাজার টাকা, মুয়াজ্জিন ৩ হাজার টাকা এবং খাদেম ২ হাজার টাকা করে পাবেন। এছাড়া মন্দির, বৌদ্ধ বিহার ও গির্জার জন্য মাসিক ৮ হাজার টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এক্ষেত্রে প্রধান দায়িত্বশীল ব্যক্তি (পুরোহিত/অধ্যক্ষ/যাজক) পাবেন ৫ হাজার টাকা এবং সহকারী দায়িত্বশীল ব্যক্তি (সেবাইত/উপাধ্যক্ষ/সহকারী পালক) পাবেন ৩ হাজার টাকা। সম্মানীর পাশাপাশি উৎসব বোনাসও প্রদান করা হবে।
ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহায় ১ হাজার টাকা করে বছরে দুবার বোনাস দেওয়া হবে তাদের। তারেক রহমান বলেন, অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া নারী সমাজের জন্য আমরা ইতোমধ্যেই ফ্যামিলি কার্ড চালু করেছি। পর্যায়ক্রমিকভাবে এই কার্ড সারা বাংলাদেশে ৪ কোটি পরিবারের নারী প্রধান তারা প্রত্যেকে ইনশাল্লাহ পাবেন। তিনি বলেন, দেশের প্রতিটি নাগরিকের রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক ক্ষমতা নিশ্চিত করার মাধ্যমে আমরা আমাদের দেশকে একটি শক্তিশালী ভিত্তির ওপরে প্রতিষ্ঠিত করতে চাই। যাতে করে আর কোনো ফ্যাসিবাদ কিংবা তাদের তাবেদার অপশক্তি মানুষের স্বাধীনতা কেড়ে নিতে না পারে, কথা বলার অধিকার কেড়ে নিতে না পারে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, জনগণের রায়ে বিএনপি সরকার গঠনের পর ভোটের কালি নখ থেকে মোচনের আগেই আমরা আমাদের সকল প্রতিশ্রুতি ধারাবাহিকভাবে বাস্তবায়নের কাজ শুরু করেছি। অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করতে নারীদের জন্য ফ্যামিলি কার্ড চালু করা হয়েছে এবং আগামী ১৪ এপ্রিল থেকে ফার্মার্স কার্ড ও ১৬ মার্চ দিনাজপুর থেকে খাল খনন কর্মসূচি শুরু হতে যাচ্ছে। এরই অংশ হিসেবে আজ থেকে ধর্মীয় গুরুদের জন্য আর্থিক সহায়তা কর্মসূচি চালু হলো। দ্রুততম সময়ের মধ্যে একটি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে স্বনির্ভর বাংলাদেশ দেখার আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
তারেক রহমান বলেন, বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষের জন্য সরকারের এইসব অর্থনৈতিক কর্মসূচি উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে, নাগরিকদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করে গড়ে তোলা। সম্মানী গ্রহণ করতে আসা সবার উদ্দেশে তিনি বলেন, আপনাদের কাছে একটি বিনীত আহ্বান, আপনারা কেউ মসজিদে কিংবা যার যার ধর্মীয় উপাসনালয়ে দায়িত্ব কল্যাণের পাশাপাশি নিজেদের বিভিন্ন অর্থনৈতিক সামাজিক কর্মকা-ে সম্পৃক্ত করতে চাইলে আপনাদের সেই উদ্যোগ বাস্তবায়নে সরকারের সর্বোচ্চ চেষ্টা থাকবে সহযোগিতা করা।
তারেক রহমান বলেন, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি হয়তো আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্য দেয়, কিন্তু ধৈর্য, সততা, কৃতজ্ঞতা ও সহনশীলতা ছাড়া একজন ব্যক্তি প্রকৃত মানবিক গুণাবলি সম্পন্ন হয়ে উঠতে পারে না। তিনি পবিত্র হাদিসের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, যার আমানতদারী নেই, সে প্রকৃত ইমানদার নয়। যার ওয়াদা ঠিক নেই, তার কোনো ধর্মই নেই।
তারেক রহমান বলেন, হিংসা ও সহিংসতামুক্ত সমাজ গঠনে ধর্মের এই উদার নৈতিক শিক্ষা অতুলনীয়। তারেক রহমান স্মরণ করিয়ে দেন, স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান দেশে প্রথমবারের মতো ইমাম প্রশিক্ষণ একাডেমি চালু করেছিলেন এবং ১৯৯৩ সালে বেগম খালেদা জিয়া সরকার মসজিদভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষা কার্যক্রম শুরু করেছিলেন। বর্তমান সরকারও সেই ধারাবাহিকতায় সাড়ে তিন লাখ মসজিদকে নৈতিক শিক্ষার মূল কেন্দ্রে রূপান্তরের পরিকল্পনা করছে।
তারেক রহমান বলেন, পাইলটিং স্কিমের আওতায় প্রথম পর্যায়ে ৪ হাজার ৯০৮টি মসজিদ, ৯৯০টি মন্দির এবং ১৪৪টি বৌদ্ধ বিহারের ১৬ হাজার ৯৯২ জন ধর্মীয় গুরুকে মাসিক সম্মানী প্রদান করা হচ্ছে। পর্যায়ক্রমে দেশের প্রতিটি যোগ্য ব্যক্তিকে এই কর্মসূচির আওতায় আনা হবে। তিনি বলেন, প্রতিটি জেলার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মিটিংয়ে একজন ইমাম, খতিব বা ধর্মীয় প্রতিনিধি অন্তর্ভুক্ত করা হবে। এছাড়া ধর্মীয় নেতারা যদি উপাসনার পাশাপাশি অন্য কোনো সামাজিক ও অর্থনৈতিক কর্মকা-ে নিজেদের সম্পৃক্ত করতে চান, তবে সরকার তাতে পূর্ণ সহযোগিতা করবে।
সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা আজ সব ধর্মের মানুষ এক কাতারে বসেছি। এটিই আমাদের আবহমানকালের ঐতিহ্যবাহী বাংলাদেশ। মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ কিংবা খ্রিস্টান; বিশ্বাসী, অবিশ্বাসী কিংবা সংশয়বাদী আমরা সবাই মিলে ভালো থাকব। তিনি বলেন, নাগরিকদের দুর্বল রেখে রাষ্ট্র কখনো শক্তিশালী হতে পারে না। আমরা দেশকে এমন একটি শক্তিশালী ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত করতে চাই, যাতে আর কোনো ফ্যাসিবাদ কিংবা তাঁবেদার অপশক্তি মানুষের স্বাধীনতা কেড়ে নিতে না পারে।
তারেক রহমান বলেন, দুনিয়ার কল্যাণের পাশাপাশি আখেরাতের কল্যাণের জন্য প্রার্থনার কথা পবিত্র কুরআনে কারীমে উল্লেখ রয়েছে। ইহকালীন পরকালীন কল্যাণ বিষয়ক নির্দেশনা নিঃসন্দেহে অন্য ধর্মাবলম্বী ধর্মীয় বিধিবিধান অনুযায়ী নির্দেশিত রয়েছে। সুতরাং ধর্মীয় বিধিবিধানের আলোকেই আপনারা আপনাদের শিক্ষা, দীক্ষা ও যোগ্যতা এবং অভিজ্ঞতাকে কিভাবে আরও বেশি করে দেশ এবং জনগণের কল্যাণে প্রয়োগ করতে পারেন, সেই চিন্তা এবং চেষ্টাও অব্যাহত রাখা অত্যন্ত জরুরি এই দেশের জন্য।
ধর্মমন্ত্রী কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রশাসন বিষয়ক উপদেষ্টা ইসমাইল জবিহউল্লাহ, ইসলামী আন্দোলনের সিনিয়র নায়েবে আমির মুফতি সৈয়দ ফয়জুল করীম, বায়তুল মোকাররম মসজিদের সিনিয়র পেশ ইমাম মহিববুল্লাহিল বাকী, তাকওয়া মসজিদের খতিব মুফতি সাইফুল ইসলাম, ধর্ম সচিব মুন্সি আলাউদ্দিন আল আজাদ প্রমুখ।
প্যানেল হু








