উত্তরাঞ্চলে পাঁচ জেলায় চা উৎপাদনে রেকর্ড
বিগত কয়েক বছরে একের পর এক লোকসানের বোঝা নিয়ে দেশের উত্তরাঞ্চলের ৫ জেলার চা চাষিরা চোখে মুখে অন্ধকার দেখছিলেন। বাগান হতে কাঁচা পাতা তুলে ৮ টাকা কেজি দরেও বিক্রি করতে না পেরে রাস্তায় রাস্তায় ছিটিয়ে দিয়ে অনেকে চা বাগান তুলে ফেলেছিলেন। সেই হতাশা নিয়ে যখন ভুগছিলেন চা চাষিরা ঠিক তখনি ভাগ্যের চাকা ঘুরে পাল্টে দিল নতুন চিত্র।
সকল সংকট কাটিয়ে অবশেষে উত্তরাঞ্চলের পঞ্চগড়, নীলফামারী, ঠাকুরগাঁও, লালমনিরহাট ও দিনাজপুর জেলাসহ এই ৫ জেলার সমতলে চা চাষিরা এবার আনন্দে আতœহারা। কাঁচা পাতা সরকারি দাম ১৮ টাকা কেজি থাকলেও চাহিদা বেড়ে যাওয়ার চাষিরা কেজিপ্রতি ৩৮ টাকা থেকে ৪২ টাকা পর্যন্ত দামে কাঁচা পাতা বিক্রি করতে পেরেছেন। সেই সঙ্গে সমতলের কাঁচা পাতার যেমন মান ভালো হয়েছে তেমনি দামও বেড়ে যায়। পাশাপাশি উৎপাদনেও রেকর্ড গড়তে সক্ষম হয়েছে। দেশের মোট চা উৎপাদনের প্রায় ২১ শতাংশই এখন আসছে উত্তরের এই ৫ জেলা থেকে।
যা এই অঞ্চলে চা উৎপাদনে নতুন রেকর্ড সৃষ্টি করেছে। ২০২৫ সালে মৌসুমের আগের বছরের তুলনায় ৭৩ একরের বেশি জমিতে চা চাষ হয়েছে। মোট আবাদি জমির মধ্যে পঞ্চগড়ে ৯ হাজার ৮১৯ দশমিক ৭৩ একর, ঠাকুরগাঁওয়ে ১ হাজার ৪৫৭ একর, লালমনিরহাটে ১২৪ দশমিক ৮২ একর, দিনাজপুরে ১৩০ একর এবং নীলফামারীতে ৬৭ দশমিক ৯২ একর জমিতে চা চাষ হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, গত বছর (২০২৫) শেষে উত্তরাঞ্চলের পাঁচ জেলায় মোট উৎপাদিত হয়েছে দুই কোটি ২ লাখ ৪২ হাজার ৫২ কেজি, যা আগের (২০২৪) বছরের চেয়ে ৫৮ লাখ ৫১ হাজার ৯০১ কেজি বেশি। এক সময় চট্টগ্রাম ও সিলেট অঞ্চলের পর দেশের উত্তরাঞ্চলের সমতলের এই পাঁচ জেলা দেশের তৃতীয় বৃহত্তম চা অঞ্চল হিসেবে পরিচিতি পায়। তবে বিভিন্ন সংকটের মাঝে চা উৎপাদনের দিক থেকে উত্তরাঞ্চলের দ্বিতীয় অবস্থানে চলে আসে। যা টানা পাঁচবার দ্বিতীয় সর্বোচ্চ চা উৎপাদনের রেকর্ড ধরে রেখেছে উত্তরাঞ্চলের এই পাঁচ জেলা।
চা বোর্ড সূত্রে জানা যায়, সদ্য সমাপ্ত মৌসুমে সারাদেশে জাতীয়ভাবে চা উৎপাদিত হয়েছে প্রায় ৯ কোটি ৪৯ লাখ ১২ হাজার কেজি। সেখানে উত্তরের পাঁচ জেলাতেই উৎপাদিত হয়েছে ২ কোটি কেজির বেশি।
২০১৯ সালে সমতলে চা পাতা উৎপাদন ছিল ৯৬ লাখ কেজি। ২০২১ সালে উত্তরের পাঁচ জেলা মিলে সম্মিলিতভাবে চা উৎপাদনে দ্বিতীয় অবস্থানে ওঠে আসে। এসব জেলার সমতল ভূমিতে ওই বছর ১ কোটি ৪৫ লাখ ৪০ হাজার কেজি চা উৎপাদিত হয়। এরপর ২০২২ সালে ১ কোটি ৭৭ লাখ ৫৯ হাজার ২২৬ কেজি, ২০২৩ সালে ১ কোটি ৭৯ লাখ ৪৭ হাজার ২৩০ কেজি, ২০২৪ সালে ১ কোটি ৪৩ লাখ ৯০ হাজার ১৫১ কেজি চা উৎপাদিত হয়।
চা বোর্ডের পঞ্চগড় আঞ্চলিক কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, ২০০০ সালে বেশ কয়েকটি কোম্পানি পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায় চায়ের বাগান গড়ে তোলে। এর পর থেকে ক্ষুদ্র চাষি পর্যায়ে চা চাষ ছড়িয়ে পড়ে। পঞ্চগড়ের পর ২০০৭ সালে লালমনিরহাট ও ঠাকুরগাঁও এবং ২০১৪ সালে দিনাজপুর ও নীলফামারী জেলায় চা চাষ শুরু হয়।
চা বোর্ডে তথ্য অনুযায়ী, উত্তরাঞ্চলের পাঁচ জেলায় বর্তমানে নিবন্ধিত ১২টি ও অনিবন্ধিত ১৮টি বড় চা-বাগান (২৫ একরের বেশি) রয়েছে। এ ছাড়া ২ হাজার ২২৫টি নিবন্ধিত ও ৬ হাজার ১৪৬টি অনিবন্ধিত ক্ষুদ্রায়তনের চা-বাগান (২৫ একরের কম) আছে। ২০২৪ সালে উত্তরাঞ্চলে প্রায় ১১ হাজার ৫২৭ একর জমিতে চা চাষ হলেও এবার তা বেড়ে ১১ হাজার ৬০০ একরে দাঁড়িয়েছে। ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে চা চাষের জমি বেড়েছে ৭৩ একরের বেশি।
এদিকে উত্তরাঞ্চলের চা চাষের পরিধি ও উৎপাদন বিবেচনায় ২০২৩ সালের ২ সেপ্টেম্বর পঞ্চগড়ে চায়ের তৃতীয় নিলাম কেন্দ্র (অনলাইনভিত্তিক) চালু করা হয়। উত্তরাঞ্চলে এখন পর্যন্ত ৫২টি চা প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা অনুমোদন নিয়েছে। এর মধ্যে পঞ্চগড় জেলায় ৩০টি ও ঠাকুরগাঁও জেলায় ১টি কারখানা চালু রয়েছে। তবে দিনাজপুর ও ঠাকুরগাঁও জেলার মাঝামাঝি এবং নীলফামারী- লালমনিরহাট জেলার মাঝামাঝি নতুন করে আরও দুটি কারখানা স্থাপন করা গেলে সমতলের চা চাষের পরিধি আরও বৃদ্ধি পাবে বলে আশা করছেন চা চাষিরা।
চা বোর্ড আঞ্চলিক কার্যালয়ের মতে, গত বছর চা-চাষিরা কাঁচা চা-পাতার ভালো দাম পাওয়ায় তাঁদের মধ্যে চা চাষে আগ্রহ বেড়ে যায়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চা আবাদের জমির পরিমাণ কখনো বেড়েছে আবার কখনো কমেছে। ২০২৩ সালে ১২ হাজার ১৩২ একর জমিতে চা চাষ হলেও কাঁচা পাতার দাম না পেয়ে চাষিরা লোকসানে পড়েন। ফলে ২০২৪ সালে তা কমে ১১ হাজার ৫২৭ একরে দাঁড়ায়। লোকসান হওয়ায় অনেক কৃষক তাদের চা-বাগান উপড়েও ফেলেছিলেন। ২০২৫ সালে পরিস্থিতির উন্নতি হয়। চা বোর্ড চাষিদের আস্থা ফেরাতে নানা পদক্ষেপ নেওয়ায় আবাদের পরিমাণ বেড়ে প্রায় ১১ হাজার ৬০০ একরে পৌঁছায়।
চা চাষ কমার কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে কর্মকর্তারা দেখেন, অনেক চাষি মৌসুমের অনুমোদিত সর্বোচ্চ তিনবারের জায়গায় সাত-আটবার সার প্রয়োগ করছিলেন। এ ছাড়া প্রক্রিয়াজাতকরণে অদক্ষতার কারণে কারখানাগুলোতে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ খরচ হচ্ছিল। এসব কারণে চাষি ও কারখানা মালিক উভয়েরই উৎপাদন খরচ বেড়ে যায়।
চাষিদের সঠিক সময়ে সার প্রয়োগ এবং নিয়মিত চা-গাছ ছাঁটাইয়ের পরামর্শ দেওয়া হয়, কারণ চার বছরের পুরান পাতা থেকে নতুন কুঁড়ি উৎপাদন কমে যায়। কারখানা পর্যায়ে কর্মকর্তারা দেখেন, কিছু কারখানায় উইদারিং (পাতা শুকানোর প্রাথমিক ধাপ) প্রক্রিয়া এড়িয়ে যাওয়া হচ্ছিল। ফলে মেশিনগুলোকে দিনে ১৭ থেকে ১৮ ঘণ্টা চালাতে হতো। কর্মকর্তারা জানান, কারখানাগুলো পুনরায় সঠিকভাবে উইদারিং শুরু করার পর একই পরিমাণ চা প্রক্রিয়াজাত করতে ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা সময় লাগছে। এতে খরচ যেমন কমেছে, তেমনি চায়ের মানও উন্নত হয়েছে।
সদ্য সমাপ্ত মৌসুমে দেশে প্রায় ৯ কোটি ৪৯ লাখ (৯৪ দশমিক ৯ মিলিয়ন) কেজি চা উৎপাদিত হয়েছে। বাংলাদেশ চা বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, এর মধ্যে পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও, দিনাজপুর, নীলফামারী ও লালমনিরহাট থেকেই এসেছে ২ কোটি (২০ মিলিয়ন) কেজির বেশি চা। এটি সরকারি লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১৫ লাখ ২০ হাজার কেজি বেশি এবং ২০০০ সালে এই অঞ্চলে চা চাষ শুরু হওয়ার পর থেকে সর্বোচ্চ উৎপাদন।
শুধু উৎপাদন বৃদ্ধিই নয়, এবার প্রক্রিয়াজাত চায়ের গড় নিলাম দরও বেড়েছে। সমতলে উৎপাদিত চায়ের মান উন্নত হওয়ার ইঙ্গিত দেয় এটি। নিলাম দর বাড়ার সুফল পেয়েছেন চাষিরাও। কাঁচা চা-পাতার দাম বাড়ায় তাদের আয় বেড়েছে। চাষিরা বলছেন, এই ধারা অব্যাহত থাকলে এ অঞ্চলে চা চাষ আরও সম্প্রসারিত হতে পারে। এর আগের রেকর্ডটি ছিল ২০২৩ সালের। সে বছর ১ কোটি ৭৯ লাখ ৫০ হাজার কেজি চা উৎপাদিত হয়েছিল, যা ছিল জাতীয় উৎপাদনের প্রায় ১৭ শতাংশ।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চা আবাদের জমির পরিমাণ কখনো বেড়েছে আবার কখনো কমেছে। ২০২৩ সালে ১২ হাজার ১৩২ একর জমিতে চা চাষ হলেও কাঁচা পাতার দাম না পেয়ে চাষিরা লোকসানে পড়েন। ফলে ২০২৪ সালে তা কমে ১১ হাজার ৫২৭ একরে দাঁড়ায়। লোকসান হওয়ায় অনেক কৃষক তাদের চা-বাগান উপড়েও ফেলেছিলেন। ২০২৫ সালে পরিস্থিতির উন্নতি হয়। চা বোর্ড চাষিদের আস্থা ফেরাতে নানা পদক্ষেপ নেওয়ায় আবাদের পরিমাণ বেড়ে প্রায় ১১ হাজার ৬০০ একরে পৌঁছায়।
চাষিদের সঠিক সময়ে সার প্রয়োগ এবং নিয়মিত চা-গাছ ছাঁটাইয়ের পরামর্শ দেওয়া হয়, কারণ চার বছরের পুরান পাতা থেকে নতুন কুঁড়ি উৎপাদন কমে যায়। কারখানা পর্যায়ে কর্মকর্তারা দেখেন, কিছু কারখানায় উইদারিং (পাতা শুকানোর প্রাথমিক ধাপ) প্রক্রিয়া এড়িয়ে যাওয়া হচ্ছিল। ফলে মেশিনগুলোকে দিনে ১৭ থেকে ১৮ ঘণ্টা চালাতে হতো। কর্মকর্তারা জানান, কারখানাগুলো পুনরায় সঠিকভাবে উইদারিং শুরু করার পর একই পরিমাণ চা প্রক্রিয়াজাত করতে ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা সময় লাগছে। এতে খরচ যেমন কমেছে, তেমনি চায়ের মানও উন্নত হয়েছে।
পঞ্চগড়ে চা বোর্ডের আঞ্চলিক কার্যালয়ের কর্মকর্তা আমির হোসেন জানান, ২০২৫ সালে নিলামে এই জেলার চায়ের গড় দাম ছিল কেজিপ্রতি ২৪২ টাকা, যা ২০২৪ সালে ছিল ১৬২ টাকা।দাম বেড়েছে কাঁচা পাতারও। ২০২৪ সালে জেলার চা-পাতা মূল্য নির্ধারণ কমিটি কেজিপ্রতি দাম ১৮ টাকা নির্ধারণ করলেও বছরজুড়ে তা ৮ থেকে ১০ টাকায় নেমে এসেছিল।
তবে ২০২৫ সালে সরকারি দাম ১৮ টাকা থাকলেও চাহিদা বাড়ায় চাষিরা কেজিপ্রতি ৩৮ টাকা পর্যন্ত দামে কাঁচা পাতা বিক্রি করতে পেরেছেন। নিলামে বেশি দাম পাওয়া এবং উৎপাদন খরচ কমায় কারখানার মালিকেরা কাঁচা পাতার দাম বাড়িয়ে দেন। এতে চা চাষের প্রতি কৃষকদের আগ্রহ ফিরে আসে। ক্রমবর্ধমান চা শিল্পের প্রসারে ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে পঞ্চগড়ে দেশের তৃতীয় চা নিলাম কেন্দ্র চালু হয়, যা অনলাইন প্ল্যাটফর্মে পরিচালিত হচ্ছে।
প্যানেল হু








