ঢাকা, বাংলাদেশ   রোববার ১৫ মার্চ ২০২৬, ৩০ ফাল্গুন ১৪৩২

বৃষ্টি ছাপিয়ে পাঠকে সরব প্রাণের উৎসব

মনোয়ার হোসেন

প্রকাশিত: ২৩:২৯, ১৪ মার্চ ২০২৬

বৃষ্টি ছাপিয়ে পাঠকে সরব প্রাণের উৎসব

বইমেলায় শনিবার আসা উল্লেখযোগ্য চারটি বইয়ের প্রচ্ছদ

শুক্রবার সন্ধ্যার পর বৃষ্টির জলে ভিজেছিল অমর একুশে বইমেলা। এতে বই বিক্রিতে ভাটার পাশাপাশি গুটিকয়েক প্রকাশনীর বেশ কিছু বই নষ্ট হয়েছে। ফলে শনিবার বিদ্যা প্রকাশ, আদর্শ, পুঁথি নিলয়, আহসান পাবলিকেশন, চারুলিপি, সোলেমানিয়া বুক হাউজসহ কিছু প্রতিষ্ঠানের জলে ভেজে বই খোলা মাঠে শুকাতে দেখা যায়। এমন বাস্তবতায় এদিনের মেলা নিয়ে জেগেছিল শঙ্কা। তবে সেই আশঙ্কা কাটিয়ে রোদ ঝলমলে দিনে পাঠকের আনাগোনায় সরব হয়েছে প্রাণের উৎসব। বিশেষ করে বসন্ত বিকেলে অধিকাংশ প্রকাশনী ঘিরে ছিল বইপ্রেমীদের পদচারণা।

এদিন দর্শনার্থীর চেয়ে গ্রন্থানুরাগীর সংখ্য বেশি হওয়ায় স্টলগুলোতেও দেখা গেছে বইনির্ভর ব্যস্ততার দৃশ্যকল্প। সেই সুবাদে মেলা প্রাঙ্গণে গ্রন্থানুরাগীদের হাতে হাতে ঘুরেছে বইয়ের ব্যাগ। মেলায় নতুন আসা গল্প-কবিতা, উপন্যাস, প্রবন্ধ, রাজনীতি, গবেষণাসহ বিচিত্র বিষয়ে সন্ধান করেছেন বইপ্রেমীরা। অনেকেই আবার আগে পড়া হয়নি অথচ গুরুত্বপূর্ণ এমন পুরনো বইও সংগ্রহ করেছেন। সব মিলিয়ে যেন বৃষ্টির হাতছানি পেরিয়ে পাঠকের সরবতা বিরাজ করেছে প্রাণের উৎসবে। এদিকে এমন ঝলমলে দিনে মেলার মানসম্পন্ন ও শৈল্পিক বিবেচনার বই, নান্দনিক স্টলসজ্জা, সর্বাধিক সংখ্যক শিশুতোষ বই প্রকাশসহ পাঁচটি শাখায় গুণীজন পুরস্কার ঘোষণা করে মেলার আয়োজক বাংলা একাডেমি। 
২০২৫ সালে প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্য থেকে বিষয় ও গুণমানসম্মত সর্বাধিকসংখ্যক গ্রন্থ প্রকাশের জন্য চিত্তরঞ্জন সাহা স্মৃতি পুরস্কার পেয়েছে প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান কথা প্রকাশ। ২০২৫ সালে প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্য থেকে গুণমান ও শৈল্পিক বিচারে সেরা গ্রন্থের জন্য মুনীর চৌধুরী স্মৃতি পুরস্কার পেয়েছে তিন প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান ঐতিহ্য, দি ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড (ইউপিএল) ও প্রথমা। ঐতিহ্য প্রকাশিত গ্রন্থটি হচ্ছে আমিন বাবুর লেখা ‘কালি-কলম আর কাগজের অড রিসার্চ: ফাউন্টেন পেন’। প্রথমা প্রকাশনের বইটি হচ্ছে মুহম্মদ ইউসুফ সিদ্দিকের ‘শিলালিপি : বাংলার আরবি-ফারসি প্রতœলেখমালা’।

ইউপিএলের বইটি হচ্ছে ‘বরিশাল অ্যান্ড বিয়ন্ড : এসেইজ অন বাংলা লিটারেচার।’ ২০২৫ সালে গুণমান বিচারে সর্বাধিক সংখ্যক শিশুতোষ গ্রন্থ প্রকাশের জন্য রোকনুজ্জামান খান দাদাভাই স্মৃতি পুরস্কার পেয়েছে পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স। ২০২৪ ও ২০২৫ সালে মেলায় অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে গুণগতমান বিচারে সর্বাধিক সংখ্যক গ্রন্থ প্রকাশের জন্য সরদার জয়েনউদ্দীন স্মৃতি পুরস্কার পেয়েছে সহজ প্রকাশ। নান্দনিক অঙ্গসজ্জার জন্য সেরা শিল্পী কাইয়ূম চৌধুরী স্মৃতি পুরস্কারপ্রাপ্ত তিন প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান হলো ক্রিয়েটিভ ঢাকা পাবলিকেশন্স, মাত্রা প্রকাশ ও বেঙ্গলবুকস।
শুক্রবার সন্ধ্যার বৃষ্টিতে ভিজেছে বিদ্যা প্রকাশের কিছু বই। শনিবার দুপুরে স্টলটির সামনে রোদের তাপে বই শুকানোর দৃশ্য দেখা যায়। আলাপচারিতায় প্রকাশনা সংস্থাটির স্বত্বাধিকারী মজিবুর রহমান খোকা বলেন, স্টলের সামনে জমে থাকা কাদা পরিষ্কারে বালু দেওয়ার জন্য বাংলা একাডেমির কয়েক কর্মকর্তার কাছে ধরনা দিয়েও শুধু আশ্বাসই মিলেছে। পরে একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম এসে পরিদর্শন করার ঘণ্টাখানের পর ইট বিছিয়ে সমস্যার সমাধান হয়।
তবে এমন দিনেও মেলা প্রাঙ্গণের বইয়ের বিকিকিনির সমান্তরালে লেখকের আড্ডা, পাঠকের সঙ্গে লেখকের মিথস্ক্রিয়ার সুন্দরতম দৃশ্যের দেখা মিলেছে। তাই আগের দিনে বৃষ্টি¯œাত বিদ্যা প্রকাশের গুমটি নামের আড্ডাস্থলে আলাপচারিতায় মেতেছিলেন দুই কথাশিল্পী মোস্তফা কামাল ও মোহিত কামাল। অন্যদিকে সময় প্রকাশনের স্টলের সামনে একঝাঁক তরুণের সঙ্গে গল্প করছিলেন রহস্য-রোমাঞ্চ লেখক দীপু মাহমুদ। 
বিকেলে মেলা মাঠে দেখা হয় ফারিহা ইয়াসমিন নামের এক পাঠকের সঙ্গে। আলাপচারিতায় এই কর্মজীবী নারী বলেন, মেলার প্রথম সপ্তাহের একবার এসেছিলাম। তবে সেদিন কোনো বই কিনিনি। কারণ, অধিকাংশ স্টলে নতুন ছিল না। তাই সুযোগ পেয়ে পুনরায় চলে এসেছি প্রাণের মেলায়। আমি বিচিত্র বিষয়ের বই পড়ি। সে কারণেই ঐতিহ্য থেকে কিনেছি সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর ‘কথাসাহিত্য সমগ্র’, অনন্যা থেকে মহিউদ্দিন আহমেদের দুই বই ‘খালেদা’ এবং লেখকের প্রথম উপন্যাস ‘শেখ মুজিবের লাল ঘোড়া’ এবং পাঠক সমাবেশ থেতে ফয়জুল লতিফ চৌধুরীর ‘জীবনানন্দ দাশ : জীবন ও কীর্তি’। কথা প্রসঙ্গে বলেন, কাল শনিবার অফিস ছুটি থাকায় মেলার শেষ দিনে আবার আসব। আরও কিছু বই কিনব এবং বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের বন্ধুদের সঙ্গে জমিয়ে আড্ডা দেব।  
বইয়ের বিকিকিনি প্রসঙ্গে ঐতিহ্য প্রকাশনীর ব্যবস্থাপক আমজাদ হোসেন কাজল বলেন, রমজান মাসে মেলা হওয়ায় আমাদের প্রত্যাশাটাও খুব বেশি ছিল না। সেই বিবেচনায় বিক্রির হিসাবটা সন্তোষজনক। এ ছাড়া শেষ দিনগুলোয় যারাই মেলা আসছেন তারা সবাই বই সংগ্রহ করছেন। তাই আমাদের ব্যস্ততাও বেড়েছে। মেলার শুরুর দিকে বই বিক্রির এমন চিত্র ছিল না। 
এবার ১৮ দিনব্যাপী বইমেলার ১৭তম দিন ছিল শনিবার। এদিন সকাল থেকেই খুলে যায় মেলার দুয়ার। সকালে শিশুপ্রহর থাকায় অভিভাবকদের সঙ্গী করে হাজির হয়েছিল বেশ কিছু খুদে পাঠক। এসময় মেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় কবিতা আবৃত্তি। কবিতা পাঠে অংশ নেন প্রায় ৩০ জন কবি ও আবৃত্তিশিল্পী এবং দুই আবৃত্তি সংগঠন জাতীয় আবৃত্তি পরিষদ ও শিশুনন্দন। 
নতুন বই : বাংলা একাডেমির জনসংযোগ বিভাগের তথ্যানুযায়ী এদিন প্রকাশিত হয়েছে ১৫৭টি নতুন বই। উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে বাতিঘর এনেছে হারুন রশীদের উপন্যাস ‘টাইগার পাস’। ঐতিহ্য থেকে বেরিয়েছে এবাদুর রহমানের ‘৩৬ জুলাই ঐতিহ্যবাদী বিপ্লব ও বাঙালি মুসলিম ফিউচারিটি’। আগামী এনেছে মোহন রায়হানের পুনঃমুদ্রিত কাব্যগ্রন্থ ‘ফিরিয়ে দাও সেই স্টেনগান’। কথা প্রকাশ এনছে মোশাহিদা সুলতানা ঋতুর গল্পগ্রন্থ ‘তোমাদের শহরে থাকব না’। টাঙ্গন থেকে এসেছে শামসুল হুদা সম্পাদিত ‘ইলা মিত্রের জন্মশতবর্ষ’।

পাঞ্জেরী পাবলিকেশনস এনেছে নাসির আলী মামুনের স্মৃতিচারণমূলক বই ‘যে জীবন যার’ এবং তাশরিক-ই-হাবিবের স্মৃতিচারণমূলক বই ‘কথাশিল্পী শহীদুল জহির’। চন্দ্রবিন্দু এনেছে ময়ুখ চৌধুরীর গবেষণা গ্রন্থ ‘উনিশ শতকের নবচেতনা ও বাংলা কাব্যের গতিপ্রকৃতি’। অনন্যা এনেছে মুহাম্মদ সামাদের কাব্যগ্রন্থ ‘আমার জীবন সংগ্রামমুখর’। পুঁথি নিলয় এনেছে দিদার হাসানের ভ্রমণকথা ‘দেখা অদেখা’।
মেলামঞ্চের আয়োজন : বিকেলে মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় জন্মশতবর্ষ : মুসলিম সাহিত্য সমাজ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন মোরশেদ শফিউল হাসান। আলোচনায় অংশ নেন মমতাজ জাহান। সভাপতিত্ব করেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম।
মোরশেদ শফিউল হাসান বলেন, সাহিত্যিক সংগঠন বা গোষ্ঠী হিসেবে মুসলিম সাহিত্য সমাজের যাত্রা শুরু হয়। বাংলা ভাষায় সাহিত্যচর্চার উদ্দেশ্য নিয়েই ঢাকায় প্রতিষ্ঠিত হয় মুসলিম সাহিত্য সমাজ। মুসলিম সাহিত্য সমাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট লেখকরা মূলত সে সময়কার প্রচলিত সাহিত্যিক বাংলাতেই তাঁদের লেখালেখি করেছেন, যে ভাষাতে হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে সকলেই সাহিত্যচর্চা করতেন। বাঙালি মুসলমানের জন্য বাংলা ভাষা চর্চা কিংবা শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে এ ভাষার অপরিহার্যতার বিষয়টি গোড়া থেকেই মুসলমান সাহিত্য সমাজের সদস্য ও সংশ্লিষ্ট অন্যদের চিন্তায় গুরুত্ব পেয়েছিল। তারা মনে করতেন মাতৃভাষার মধ্য দিয়েই জগতের ভাবধারার সঙ্গে সমাজকে পরিচয় করিয়ে দেওয়া উচিত, তা হলেই আমাদের পক্ষে উন্নতির পথে অগ্রসর হওয়া সহজ হবে। বাঙালি মুসলমানের বৃদ্ধিবৃত্তিক ও আর্থিক দারিদ্র্যের জন্য তারা মাতৃভাষা নিয়ে বাঙালির দ্বিধান্বিত অবস্থান ও হীনম্মন্যতাকে দায়ী করেছিলেন। 
মমতাজ জাহান বলেন, মুসলিম সাহিত্য সমাজ তথা শিখা গোষ্ঠীর সদস্যরা আমাদের চিন্তাচেতনা জগতে বিস্ময়কর প্রভাব রেখে গেছেন। তারা সবাই ছিলেন উচ্চশিক্ষিত, যার ফলে শিখা গোষ্ঠীর মধ্যে আধুনিক চেতনা বিকশিত হওয়ার সুযোগ পেয়েছিল। তারা নারীশিক্ষার ওপরও জোরারোপ করেছিলেন। ভাষার প্রশ্নে তারা দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে মাতৃভাষা তথা বাংলা ভাষাকে সমর্থন দিয়ে গেছেন। 
অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম বলেন, শিখা গোষ্ঠী এর সমসাময়িককালে অসামান্য আধুনিকতা এবং আমাদের জন্য দিগ্দর্শনমূলক ভূমিকা পালন করেছে। এই গোষ্ঠীর লেখকদের রচনাগুলোকে যদি আমরা ঐতিহাসিকভাবে এবং পরিপ্রেক্ষিতের মাঝে স্থাপন করে পাঠ করতে পারি, তাহলে তা আরো ফলপ্রসূ হবে। 
‘লেখক বলছি’ অনুষ্ঠানে আলোচনা করেন কবি জাকির আবু জাফর, কথাসাহিত্যিক ও অনুবাদক শাকির সবুর, প্রাবন্ধিক রাজীব সরকার এবং গবেষক খান মাহবুব। 
সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে সংগীত পরিবেশন করেন অলোক কুমার সেন, দেবিকা রানী পাল, সিনথিয়া, শারমিন সুলতানা। এ ছাড়াও ছিল সাংস্কৃতিক সংগঠন উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর পরিবেশনা। 
আজ সমাপনী অনুষ্ঠান : আজ রবিবার বইমেলার সমাপনী দিন। মেলা শুরু হবে দুপুর ২টায়। চলবে রাত ৯টা পর্যন্ত। বিকেল ৩টায় সমাপনী অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য প্রদান করবেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম। প্রতিবেদন উপস্থাপন করবেন ‘অমর একুশে বইমেলা ২০২৬’-এর সদস্য-সচিব ড. মো. সেলিম রেজা। প্রধান অতিথি থাকবেন সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী। বিশেষ অতিথি থাকবেন সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম। অনুষ্ঠানে চিত্তরঞ্জন সাহা স্মৃতি পুরস্কার, মুনীর চৌধুরী স্মৃতি পুরস্কার, রোকনুজ্জামান খান দাদাভাই স্মৃতি পুরস্কার, সরদার জয়েনউদ্দীন স্মৃতি পুরস্কার এবং শিল্পী কাইয়ূম চৌধুরী স্মৃতি পুরস্কার প্রদান করা হবে। সভাপতিত্ব করবেন একাডেমির সভাপতি অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক।

প্যানেল হু

×