ঢাকা, বাংলাদেশ   রোববার ১৫ মার্চ ২০২৬, ৩০ ফাল্গুন ১৪৩২

ঈদ সামনে রেখে কক্সবাজার জেলে পরিবারে হতাশা

তেল না পেয়ে সাগরে যেতে পারছে না হাজারো ট্রলার

এইচএম এরশাদ, কক্সবাজার

প্রকাশিত: ২৩:৩৭, ১৪ মার্চ ২০২৬

তেল না পেয়ে সাগরে যেতে পারছে না হাজারো ট্রলার

তেল না পেয়ে সাগরে যেতে পারছে না হাজারো ট্রলার

মৎস্যভাণ্ডারখ্যাত বঙ্গোপসাগরের কক্সবাজার অঞ্চলের জেলেরা তেলের অভাবে সাগরে মাছ শিকারে যেতে পারছেন না। তারা এই ঈদ মৌসুমকে সামনে রেখে সাগরে মাছ ধরতে না পারায় বড় আফসোসে পড়ে গেছেন বলে জানা গেছে। মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতের কারণে সৃষ্ট জ্বালানি তেলের তীব্র সংকটে থমকে গেছে দেশের অন্যতম বৃহৎ মৎস্য আহরণ কেন্দ্রগুলোর কার্যক্রম। ডিজেলের অভাবে সাগরে মাছ ধরতে যেতে পারছেন না হাজার হাজার জেলে। এতে লাখো জেলে পরিবার চরম অনিশ্চয়তা ও দুশ্চিন্তার মুখে পড়েছে।
কক্সবাজার মৎস্য ব্যবসায়ী ঐক্য সমবায় সমিতি লিমিটেডের মুখপাত্র মো. আজাদুর রহমান বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে তেলের সংকট তৈরি হয়েছে, যার প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশেও। এতে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন উপকূলের জেলেরা। কক্সবাজারে প্রায় ৬ হাজার মাছ ধরার ট্রলার রয়েছে। কিন্তু তেলের অভাবে সেগুলো সাগরে যেতে পারছে না। তিনি জানান, গত ৩ দিন ধরে বিভিন্ন ঘাটের ২১টি ভাসমান পাম্পে খোঁজ নিয়ে কোথাও তেল পাওযা যায়নি। তেল না থাকলে ট্রলার সাগরে পাঠানোর কোনো উপায় নেই উল্লেখ করে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, দ্রুত তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক করার ব্যবস্থা নেওয়া হোক। নইলে প্রায় এক থেকে দুই লাখ জেলে পরিবার চরম দুর্ভোগে পড়বে।
শহরের বাঁকখালী নদীর তীরবর্তী উপকূলীয় এলাকাগুলোতে এই সংকট চরম আকার ধারণ করেছে। নদীর ভাসমান পেট্রোল পাম্পগুলোতে গত কয়েকদিন ধরে পর্যাপ্ত ডিজেল নেই। ফলে পাম্পগুলোর কার্যক্রম প্রায় বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছেন মালিকরা। জ্বালানির অপেক্ষায় নদীর ঘাটে ঘাটে নোঙর করে আছে অসংখ্য মাছ ধরার ট্রলার। বাঁকখালী নদীর মাঝিরঘাট উপকূলে দেখা যায় ভাসমান পেট্রোল পাম্পগুলোতে গত ৩ দিন ধরে কোনো ডিজেল নেই। তেল না থাকায় পলিথিন মুড়িয়ে পাম্প বন্ধ করে রাখা হয়েছে। তারপরও জ্বালানির অপেক্ষায় প্রহর গুনছেন খুরুশকুল এলাকার তছলিম মাঝির মালিকানাধীন ‘এফবি মায়ের দোয়া’ ট্রলারের জেলে দিদারুল আলম। হতাশা প্রকাশ করে তিনি বলেন, আমরা তো গরিব মানুষ।

পেটের দায়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সাগরে মাছ ধরতে যাই। সাগরে যাওয়া সহজ নয়, সেখানে অনেক ঝুঁকি থাকে। তবুও সংসারের কথা ভেবে, স্ত্রী-সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে আমাদের সাগরে যেতে হয়। কিন্তু এখন সাগরে যাওয়ার জন্য তেলের ঘাটে এসে দেখি তেল নেই, পাম্প বন্ধ। তেল না পেলে আমরা সাগরে যাব কিভাবে? আর সাগরে যেতে না পারলে সংসারইবা চালাব কিভাবে? শুধু আমি একা নই, আমার ওপর নির্ভর করছে বাড়ির অনেক মানুষ। আমরা যদি মাছ ধরতে না পারি, আয় না হয়, তাহলে পরিবারকে কিভাবে খাওয়াব? এখন তেলের আশায় বসে আছি। কবে তেল পাব, কবে সাগরে যেতে পারব, সেটাও জানি না। ‘এফবি মায়ের দোয়া’ ট্রলারের মাঝি নেজাম উদ্দিন বলেন, আমাদের তো সাগরে যেতেই হবে।

সাগরে না গেলে সংসার চলবে কিভাবে? ঘরে স্ত্রী-সন্তান আছে, তাদের খাওয়াব কি দিয়ে? এখন এমন অবস্থা যে কারও কাছে সাহায্য চাইব সেটাও পারছি না। ঈদও সামনে, কিন্তু ঘরে কিছুই দিতে পারছি না। সাগরে যেতে না পারায় আয়- রোজগার বন্ধ। ‘এফবি মরিয়ম’ ট্রলারের জেলে ছৈয়দ নূর বলেন, এখন আমাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে তেল সংকট। সাগরে মাছ ধরতে যেতে হলে অনেক তেলের প্রয়োজন হয়। বর্তমানে তেল পাওয়া যাচ্ছে না। তেল না থাকলে আমরা সাগরে যেতে পারব না। আর সাগরে যেতে না পারলে আমাদের আয়ের পথ বন্ধ হয়ে যাবে। তাই দ্রুত তেলের ব্যবস্থা করা খুব জরুরি।
শুধু বাঁকখালী নদীর মাঝিরঘাট নয়, নদীর উপকূলে থাকা মোট ২১টি ভাসমান পেট্রোল পাম্পের অবস্থাই প্রায় একই। এই পাম্পগুলোতে জ্বালানি তেলের সরবরাহের ওপর নির্ভর করে কক্সবাজারের কয়েক হাজার মাছ ধরার ট্রলার। কিন্তু অনেক পাম্প গত সাতদিন ধরে বন্ধ, আবার কিছু পাম্প তিনদিন ধরে চালু নেই। নদীর তীরে এসে ট্রলারগুলো তেল না পাওয়ায় নদীতে নোঙর করা ট্রলারের দীর্ঘ সারি তৈরি হয়েছে।  নোঙর করা ‘এফবি শাহ মজিদিয়া’ ট্রলারের মাঝি আব্দু শুক্কুর বলেন, আমরা তেল নেওয়ার জন্য পাম্পে এসে খোঁজ নিচ্ছি, কিন্তু এখানে তেল আসেনি।

পাম্পের লোকজনও বলছে তেল না থাকলে তারা দেবে কোথা থেকে। তেল ছাড়া তো সাগরে যাওয়া সম্ভব নয়। তেলের আশায় আমরা দুইদিন ধরে ঘাটে অপেক্ষা করছি। আমাদের ট্রলারের জন্য প্রায় দুই হাজার লিটার তেল প্রয়োজন, কিন্তু তেল না পাওয়ায় সাগরে যেতে পারছি না। নোঙর করে রাখা ট্রলারগুলোতে বসে থাকা জেলে মোহাম্মদ সেলিম বলেন, ঘাটে প্রায় ৫০০ জেলে বেকার বসে আছি। এই ৫০০ জেলের আয়ের ওপর অন্তত ৫ হাজার মানুষের সংসার চলে। কিন্তু ডিজেল সংকটের কারণে গত পাঁচদিন ধরে আমরা ট্রলারে বসে আছি, সাগরে যেতে পারছি না। ট্রলার মালিকরাও কোনো টাকা দিতে পারছেন না। তারা বলছেন, সাগরে গিয়ে মাছ ধরতে না পারলে টাকা দেবেন কিভাবে। এতে আমরা খুবই দুশ্চিন্তার মধ্যে আছি।

প্যানেল হু

×