ঢাকা, বাংলাদেশ   বৃহস্পতিবার ৩০ মে ২০২৪, ১৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১

বাজেট ২০২৩

‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ বিনির্মাণে চ্যালেঞ্জ

রেজাউল করিম খোকন

প্রকাশিত: ০০:১০, ৪ জুন ২০২৩

‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ বিনির্মাণে চ্যালেঞ্জ

গত দেড় দশকে বর্তমান সরকারের তত্ত্বাবধানে দেশের অর্জনগুলো একটি টেকসই ভিত্তিপ্রস্তর তৈরি করে দিয়েছে

গত দেড় দশকে বর্তমান সরকারের তত্ত্বাবধানে দেশের অর্জনগুলো একটি টেকসই ভিত্তিপ্রস্তর তৈরি করে দিয়েছে। আর স্মার্ট বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হবে স্মার্ট নাগরিক, স্মার্ট সরকার, স্মার্ট সমাজ এবং স্মার্ট অর্থনীতিতে চার মূল স্তম্ভের ওপর। এবারের বাজেটে সংগত কারণেই স্বাস্থ্য, কৃষি, খাদ্য উৎপাদন ও ব্যবস্থাপনাকে অধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে । অনেক যোগ-বিয়োগ কষে বাজেট প্রণয়নের শেষ সময়ে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল প্রস্তাবিত বাজেটে নির্বাচনী চমক হিসেবে বড় মাপের ব্যবসায়ীদের খুশি করতে সম্পূর্ণ নতুন পথে হেঁটেছেন। ভর্তুকি নাম দিয়ে বড় অঙ্কের ‘কর ছাড়’ দিয়েছেন। অথচ রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে রাজস্ব জাল বিছিয়ে সাধারণ আয়ের মানুষকে আটকে ফেলেছেন।

দেশের অর্থনীতি রয়েছে নানামুখী চাপে। ডলারের সংকট এখনো প্রকট। পণ্য আমদানির জন্য ঋণপত্র (এলসি) খুলতে গেলে কোনো কোনো ব্যাংক ফিরিয়ে দিচ্ছে। আবার রপ্তানি আয় তুলতে গেলেও সহজে দিচ্ছে না। এমন পরিস্থিতি দেশে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আগে ঘটেনি। শুধু তা-ই নয়, চাল, ডাল, লবণ, ভোজ্যতেল, চিনিসহ প্রায় প্রতিটি জিনিসেরই দাম বাড়তি। গ্যাস, বিদ্যুৎ, জ্বালানি তেল ও সারের দাম কয়েক মাস আগেই বাড়ানো হয়েছে। কমেছে ডলারের তুলনায় টাকার মান। প্রণোদনা দিয়েও প্রবাসী আয় (রেমিটেন্স) ওইভাবে টানতে পারছে না সরকার। রপ্তানি আয়ের প্রবণতাও কমতির দিকে। আর আছে আন্তর্জাতিক মুুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) নানা ধরনের শর্ত পূরণের চাপ। আইএমএফ থেকে ৪৭০ কোটি ডলার চেয়ে সরকার প্রথম কিস্তি মাত্র পেয়েছে। দ্বিতীয় কিস্তি পেতে সময় লাগবে আগামী ডিসেম্বর। তা-ও শর্ত পূরণ করতে পারলেই পাওয়া যাবে সে কিস্তি।

রিজার্ভ সংরক্ষণসহ বড় কিছু শর্ত পূরণ না হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। তবে খরচ করতেই হচ্ছে সরকারকে। এ জন্য ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ঋণ করছে বেশি। এত সব টানাপোড়েন ও বাস্তবতা মাথায় নিয়েই ২০২৩-২৪ অর্থবছরের বাজেট উপস্থাপন করেছেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। এটি তার পঞ্চম বাজেট। তিনি যে বাজেট উপস্থাপন করেছেন, তার নাম দিয়েছেন ‘উন্নয়নের দীর্ঘ অগ্রযাত্রা পেরিয়ে স্মার্ট বাংলাদেশের অভিমুখে’। এটি স্বাধীন বাংলাদেশের ৫২তম বাজেট এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের টানা তৃতীয় মেয়াদের শেষ বাজেট। ২০২৩-২৪ অর্থবছরের বাজেটের মূল দর্শন হচ্ছে ২০৪১ সালের মধ্যে সুখী-সমৃদ্ধ উন্নত স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণ। বাজেটটি স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণের পথে প্রথম বাজেট। গত দেড় দশকে বর্তমান সরকারের তত্ত্বাবধানে দেশের অর্জনগুলো একটি টেকসই ভিত্তিপ্রস্তর তৈরি করে দিয়েছে।

আর স্মার্ট বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হবে স্মার্ট নাগরিক, স্মার্ট সরকার, স্মার্ট সমাজ এবং স্মার্ট অর্থনীতিতে চার মূল স্তম্ভের ওপর। এবারের বাজেটে সংগত কারণেই স্বাস্থ্য, কৃষি, খাদ্য উৎপাদন ও ব্যবস্থাপনাকে অধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে । অনেক যোগ-বিয়োগ কষে বাজেট প্রণয়নের শেষ সময়ে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল প্রস্তাবিত বাজেটে নির্বাচনী চমক হিসেবে বড় মাপের ব্যবসায়ীদের খুশি করতে সম্পূর্ণ নতুন পথে হেঁটেছেন। ভর্তুকি নাম দিয়ে বড় অঙ্কের ‘কর ছাড়’ দিয়েছেন। অথচ রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে রাজস্ব জাল বিছিয়ে সাধারণ আয়ের মানুষকে আটকে ফেলেছেন।
প্রস্তাবিত বাজেটের আকার হচ্ছে ৭ লাখ ৬১ হাজার ৭৮৫ কোটি টাকা। আর অনুদানসহ অর্থবছরের জন্য আয় হিসাব করা হচ্ছে ৫ লাখ ৩ হাজার ৯০০ কোটি টাকা। অনুদান ছাড়া ঘাটতি ধরা হচ্ছে ২ লাখ ৬১ হাজার ৭৮৫ কোটি টাকা। আয় বৃদ্ধির প্রধান উৎস এনবিআর। অথচ ২০২২-২৩ অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে ৩৪ হাজার কোটি টাকা ঘাটতি হয়েছে। ১০ মাস পেরিয়ে গেলেও রাজস্ব আদায়ে প্রবৃদ্ধি মাত্র ৮ দশমিক ৮ শতাংশ। ২০২২-২৩ অর্থবছরের বাজেটের আকার ছিল ৬ লাখ ৭৮ হাজার ৬৪ কোটি টাকা। সংশোধিত বাজেটে তা কমিয়ে করা হয় ৬ লাখ ৬০ হাজার ৫০৭ কোটি টাকা।

সংশোধিত আকারকে ভিত্তি ধরলে প্রস্তাবিত বাজেটের আকার বাড়ছে ১ লাখ ১ হাজার ২৭৮ কোটি টাকা। কিন্তু এ বৃদ্ধির বাস্তবভিত্তিক কোনো কৌশল নেই। অবশ্য ৫ লাখ কোটি টাকা রাজস্ব আয় আসবে বলে সরকার ধরে নিয়েছে। এ আয়ের মধ্যে ৪ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকা হচ্ছে কর। করের মধ্যে এনবিআর নিয়ন্ত্রিত অংশ ৪ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা ও এনবিআরবহির্ভূত অংশ ২০ হাজার কোটি টাকা। এ ছাড়া করবহির্ভূত প্রাপ্তি ৫০ হাজার কোটি টাকা ও অনুদান ৩ হাজার ৯০০ কোটি টাকা। সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরের ১ লাখ ৬ হাজার ৩৩৪ কোটি টাকার তুলনায় নতুন অর্থবছরে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকার ২৬ হাজার বা ২৪ শতাংশ বেশি ঋণ নেবে, যা মূল্যস্ফীতি বাড়াতে পারে। বেশি ব্যাংকঋণ মানে বেশি টাকা ছাপানো।

আর বেশি টাকা ছাপানো মানে মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির আশঙ্কা। সরকার বেশি ব্যাংকঋণ নিলে বেসরকারি খাতের ঋণ পাওয়ার সম্ভাবনা কমে যায় এবং ক্ষতিগ্রস্ত হয় কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টিতে। আইএমএফ বলেছে, আগামী সাড়ে তিন বছর ধরে স্বাভাবিক গতির চেয়ে দশমিক ৫ শতাংশ হারে বাড়তি রাজস্ব সংগ্রহ করতে হবে। আর সেই কৌশল প্রণয়ন করতে হবে এই জুনের মধ্যে। বাজেটে আইএমএফ থেকে ৪৭০ কোটি মার্কিন ডলার ঋণ নেওয়ার শর্ত পূরণের প্রতিফলন থাকছে। অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তব্যে আইএমএফের কথা উল্লেখ না করেই সংস্থাটির দেওয়া শর্তগুলোর বেশির ভাগই বাস্তবায়ন করার ঘোষণা রয়েছে। এনবিআরকে শুল্ক ও ভ্যাট বিভাগে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ইউনিটও করতে হবে আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে।

আয় বৃদ্ধির জন্য ৬০ হাজার ইলেকট্রনিক ফিশক্যাল ডিভাইস (ইএফডি) কেনার পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে সদ্য ঘোষিত অর্থবছরে। ভ্যাট বিভাগের প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনায় সংস্কার আনার পাশাপাশি নতুন ৫টি ভ্যাট কমিশনারেটও তৈরি করবে এনবিআর। এ ছাড়া আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে প্রণয়ন করতে হবে জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয়ের সময়ভিত্তিক সূত্র। প্রস্তাবিত বাজেটে আয়কর রিটার্ন জমাকারীকে ন্যূনতম দুই হাজার টাকা কর দেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। সঞ্চয়পত্র কেনা, ক্রেডিট কার্ড নেওয়াসহ ৪৪ ধরনের সেবা নিতে আয়কর রিটার্ন জমার রসিদ লাগবে। ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের কিছুটা স্বস্তি দিতে বার্ষিক করমুক্ত আয়সীমা পুরুষের জন্য সাড়ে তিন লাখ এবং নারীদের জন্য চার লাখ টাকা করার ঘোষণাও  রয়েছে ।

সিগারেট, কলম, প্লাস্টিকের টেবিলওয়্যার, কিচেনওয়্যার, টিস্যু, ন্যাপকিন, দেশীয় কোম্পানির মুঠোফোন উৎপাদন পর্যায়ে বাড়তি শুল্ক-কর আরোপ হয়েছে। গাড়ি কিনলে কার্বন করের মতো বাড়তি কর দিতে হবে। বর্তমানে তিন কোটি টাকার বেশি সম্পদ থাকলে করের ওপর সারচার্জ দিতে হয়। এই সম্পদের সীমা বাড়িয়ে চার কোটি টাকা করা হয়েছে। এবার প্রথমবারের মতো পরীক্ষামূলকভাবে সর্বজনীন পেনশন চালুর ঘোষণা দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। একদিকে নির্বাচনী বছর, আরেকদিকে অর্থনীতিতে অনেক নেতিবাচক দিক। ব্যয় যেভাবে বাড়ছে, আয় সেভাবে নয়। ফলে, এবারের মতো বহুমুখী চ্যালেঞ্জ পরিস্থিতি দেখা গেছে কমই। ২০২৩-২৪ অর্থবছরের বাজেটে ছোটদের কর পরিশোধে চেপে ধরলেও কৌশলে বড় মাপের ব্যবসায়ীদের ঠিকই খুশি করেছেন অর্থমন্ত্রী।

এ পদক্ষেপের ফলে বাজারে জিনিসপত্রের দাম কমায় খুব বেশি প্রভাব পড়বে এমন আশা করা কঠিন। আইএমএফের কাছ থেকে কর অব্যাহতি ও কর অবকাশ সুবিধা কমানোর চাপ আছে। এ শর্ত না মানলে ঋণের কিস্তি দেওয়া বন্ধ করা হতে পারে। অন্যদিকে নির্বাচনের আগের বাজেট হওয়ায় বড় মাপের ব্যবসায়ীদের বিভিন্ন সুবিধা দেওয়ার চাপ আছে। বিভিন্নমুখী চাপে সরকার সব পক্ষকে খুশি করতেই আগামীতে কৌশলে কর ছাড় রাখছে ভর্তুকির নাম দিয়ে। অন্যদিকে সাধারণ আয়ের মানুষের ওপর কিন্তু ন্যূনতম কর ধার্য করা হয়েছে । অনেক মানুষকে রাজস্বের আওতায় আনা হয়েছে ।

সাধারণ আয়ের অনেক করদাতা বলেছেন, খাবারের খরচ অনেক বেড়েছে। বাসা ভাড়া, যাতায়াত, চিকিৎসা সবই এখন বেশি। এর মধ্যে কর পরিশোধে চাপ দেওয়া হলে ভোগান্তি বাড়বে। সাধারণ মানুষকে কর পরিশোধে বাধ্য করলেও সম্পদশালীদের রাজস্ব ফাঁকি কমাতে, বকেয়া আদায়ে এবং অর্থ পাচার রোধে জোরালো কিছু রাখা হয়নি। এনবিআরের সক্ষমতা বাড়াতেও পুরনো পথেই হেঁটেছেন অর্থমন্ত্রী। আগামী অর্থবছর থেকে রিটার্ন জমা দিতে দেরি হলে বেশি হারে জরিমানা দিতে হবে। এছাড়া অসাধু ব্যবসায়ীদের কারসাজি কমাতেও বাজেটে রাখা হয়নি কিছু।

আন্তর্জাতিক পণ্যের বাজারের অস্থিরতা কবে কমবে তা নিয়ে রয়েছে অশ্চিয়তা। তাই গত মাস ছয়েক থেকে বেশি দামে বিক্রি হওয়া চাল, ডাল, আট, ময়দা, ভোজ্যতেল, লবণ, চিনি, মাছ, মাংসসহ সব ধরনের খাবারের দাম আপাতত কমছে না। চিকিৎসা, যাতায়াত, শিক্ষাসহ খাদ্যবহির্ভূত ব্যয়ও কমবে না। শেষ পর্যন্ত কৌশলে বড় মাপের ব্যবসায়ীদের খুশি করার চেষ্টা করা হয়েছে। সাধারণ মানুষ আশায় ছিলেন এবারের বাজেটে অর্থমন্ত্রী হয়তো জীবনযাত্রার ব্যয় কমাতে সূত্র কষবেন। কিন্তু এ বাজেটে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বড় কোনো রক্ষাকবচ রাখেননি। অর্থমন্ত্রী আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কাছে দেওয়া কথা রেখেছেন। সাধারণ মানুষকে রাজস্ব জালে আটকে ফেলার ছক করেছেন।

মূল বাজেটের আকার বাড়ানোর সঙ্গে সমন্বয় করে সরকারের আয়ের হিসাবও বাড়ানো হয়েছে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, মুুদ্রা বিনিময় হার স্থিতিশীল করা, আয়বৈষম্য রোধ করা এবং রাজস্ব সংগ্রহ বৃদ্ধি করা এগুলো হচ্ছে আগামী বাজেটের মূল চ্যালেঞ্জ। অর্থমন্ত্রী এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য কী পদক্ষেপ নিচ্ছেন, সেটাই হচ্ছে দেখার বিষয়। বেশি ব্যাংকঋণ নিয়ে সরকার মূল্যস্ফীতিকে উসকে দিচ্ছে। এ ঋণ কমাতে হবে। আর ডলারের দাম স্থিতিশীল করতে হবে। রাজস্ব আয় বৃদ্ধিতে প্রত্যক্ষ করে বেশি নজর দিতে হবে। দুই হাজার টাকা করে ন্যূনতম কর নেওয়ার পরিবর্তে বরং নতুন নতুন করদাতার কাছ থেকে কর আদায় করতে হবে। আর আয়বৈষম্য রোধ ও দরিদ্রদের পাশে দাঁড়াতে সামাজিক নিরাপত্তা 
খাতের আওতা বাড়াতে হবে।

×