ঢাকা, বাংলাদেশ   সোমবার ০৩ অক্টোবর ২০২২, ১৮ আশ্বিন ১৪২৯

দৃষ্টিনন্দন নক্সায় হচ্ছে করতোয়া ব্রিজ

সমুদ্র হক

প্রকাশিত: ০০:৪২, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২২; আপডেট: ০১:০১, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২২

দৃষ্টিনন্দন নক্সায় হচ্ছে করতোয়া ব্রিজ

করতোয়া নদীর ব্রিজের নতুন নক্সা

 শেষ পর্যন্ত অনেক চড়াই উতরাই পেরিয়ে বগুড়ার করতোয়া ব্রিজটির নির্মাণ কাজ শুরু হতে যাচ্ছে। প্রায় চার বছর ব্রিজটি পরিত্যক্ত হয়েছিল। নতুন নির্মাণের সব ব্যবস্থ্ইা পাকা হয়েছে।
করতোয়া নদীর তীরে পশ্চিমাংশে প্রায় আড়াই শ’ বছর আগে গঠিত হয় বগুড়া নগরী। এই নগরীর পূর্বাংশের সঙ্গে নগরীর মূল অংশ দ্বিখন্ডিত করে করতোয়া নদী। গত শতকের ১৯৬৪ সালে প্রমত্তা করতোয়ার ওপর নির্মিত হয় স্বল্প চওড়ার একটি সেতু। প্রায় ৬০ বছরের পুরানো এই সেতু যানবাহন চলাচলের অনুপযুক্ত হয়ে পড়ে প্রায় চার বছর আগে। ব্রিজের ওপর মাঝারি যানবাহন উঠলেই কেঁপে ওঠে। কর্তৃপক্ষের দৃষ্টিতে এলে ২০১৯ সালে ব্রিজটি পরিত্যক্ত ঘোষণা করে সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দেয়। বলা হয় শুধু জনচলাচল রিক্সা সাইকেল চলাচল করতে পারে। তারপরও সাধারণের হুঁশ না হলে সড়ক ও জনপথ (স ও জ) কর্তৃপক্ষ ব্রিজের দুই প্রান্তে চারটি করে কংক্রিটের পিলার বেরিয়ার এঁটে দেয়। কথা হয় শীঘ্রই ব্রিজটি নতুন করে নির্মিত হবে। বছর যায় তা আর হয় না। এর মধ্যেই কোভিড-১৯ থাবা দিয়ে বসে। কাজ আটকে যায়। থাম্বার মতো চারটি ছোট বেরিয়ারের ভেতর দিয়ে হালকা যানবাহন ঝুঁকি নিয়েই চলাচল করে। ব্রিজটির পশ্চিমাংশে ফতেহ আলী (র) মাজার শরীফ ও মসজিদ থাকায় অনেকে মুখে মুখে ব্রিজটির নামকরণ করে ফতেহ আলী (র) ব্রিজ।
চলতি বছর (২০২২) সালের মধ্যভাগে পুরানো ব্রিজটি ভেঙ্গে নতুন করে নির্মাণের দৃষ্টিনন্দন এটি নক্সা অনুমোদন হয়ে এসেছে। ব্রিজটি নির্মাণে অর্থ বরাদ্দ হয়েছে ২২ কোটি টাকা। বগুড়া নগরীর সঙ্গে পূর্ব বগুড়ার সংযোগের ব্রিজটি নিয়ে অনেক আশার সঞ্চার করেছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) এক পরিকল্পনায় আছে করতোয়া নদীকে ড্রেজিং করে দুই ধারে নগরীর সৌন্দর্য বর্ধনের সড়ক ও বনায়ন করা হবে। ক্লাস্টার পার্ক নির্মিত হবে। আশা করা হয়েছে শীত মৌসুমে ব্রিজটি ভেঙ্গে পুনর্নির্মাণ শুরু হবে। পুনর্নির্মাণের সময়টুকু সাধারণ মানুষের কিছুটা অসুবিধা সইতে হবে।
বগুড়া শহরের ফতেহ্ আলী (র) মাজারের কাছে শহরেই পূর্ব বগুড়ার সঙ্গে যোগাযোগে করতোয়া নদীর ওপর ষাটের দশকের মধ্যভাগ পর্যন্ত কোন ব্রিজ ছিল না। খেয়া পারপার ছিল শহরের বিচ্ছিন্ন দুই এলাকার মানুষের যোগাযোগের একমাত্র বাহন। পূর্ব বগুড়া এলাকাটি হলো চেলোপাড়া, সাবগ্রাম নারুলী। এই পথ ধরেই বগুড়ার গাবতলি সারিয়াকান্দি সোনাতলা উপজেলার সংযোগ। ১৯৬৪ সালে করতোয়া নদীর ওপর ব্রিজ নির্মাণের সিদ্ধান্ত হয়। এরপর কনস্ট্রাকশন ব্রিজ নির্মাণ শুরু হয়। ১৯৬৫ সালে ব্রিজটির নির্মাণ শেষ হয়ে যান চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করা হয়।
ব্রিজটি নির্মাণের সঙ্গেই শহরের পূর্ব প্রান্তে রাতারাতি পরিবর্তনের পালা শুরু হয়। শহরেরই পূর্বাংশের কাঁচা বাড়িঘর পাকা হতে থাকে। শহরের চাপ কমাতে অনেক লোক চেলোপাড়া এলাকায় সুদূর প্রসারি ভাবনায় ভূমি কিনতে থাকে। এসব আবাদি ভূমিতে নির্মাণ হয় ঘরবাড়ি।
এভাবে শহরের ব্যাপ্তি বেড়ে সম্প্রসারিত হতে থাকে। দোকানপাট ব্যবসা-বাণিজ্যের সকল কার্যক্রম শুরু হয় তখনই। বগুড়ার পূর্বাঞ্চলের গাবতলি, সারিয়াকান্দি, সোনাতলা উপজেলার সঙ্গে বাস সার্ভিস চালু হয়। একটি কনস্ট্রাকশন ব্রিজ শহরের পূর্বাংশের ব্যাপক পরিবর্তন এনে দেয়। বর্তমানে বগুড়ার একমাত্র মধুবন সিনেপ্লেক্স ব্রিজের পূর্বপাশে চেলোপাড়ায় অবস্থিত। পূর্বের এই এলাকাটি পৌরসভার অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়।
মুক্তিযুদ্ধের সময় হানাদার পাকিস্তানী সেনাবাহিনী তাদের স্যাবার জেট যুদ্ধ বিমান দিয়ে বোমা মেরে করতোয়া সড়ক সেতু ও এবং পাশেই করতোয়া রেল সেতু ধ্বংস করে দেয়। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর দেশ মুক্তিযুদ্ধে বিজয় অর্জনের পর বিধ্বস্ত দেশকে পুনর্গঠনের পালায় এই দুই সেতু পুনর্নির্মিত হয়। গত ৬০ বছরে সেতুর দুই প্রান্ত শহরের অংশ হয়ে যায়। ১৪ দশমিক ৭৬ বর্গকিলোমিটার বগুড়া পৌর এলাকা সম্প্রসারিত হয়ে বর্তমানে ৬৯ দশমিক ৫৬ বর্গকিলোমিটারে পরিণত হয়।
চলতি বছর ব্রিজটি নতুন করে নির্মাণের সার্বিক সকল কাজ সম্পন্ন হয়েছে। বিষয়টি জানালেন বগুড়া স ও জ অধিদফতরের নির্বাহী প্রকৌশলী আসাদুজ্জামান। তিনি জানান, ৬৮ মিটারেরও বেশি দীর্ঘ ফতেহ আলী (র) ব্রিজটি দৃষ্টিনন্দন পুনর্নির্মাণে ব্যয় বরাদ্দ হয়েছে ২২ কোটি টাকা। ব্রিজটির ক্যারেজ ওয়ে (যান চলাচল) চওড়া হবে ২৪ ফুট। দুই ধারে ৮ ফুট করে সাধারণের পায়ে চলার পথ থাকবে।
পুনর্নির্মাণের সকল ব্যবস্থা আপডেট করা আছে। পুনর্নির্মাণের সময় সাধারণের পারাপারে কিছুটা বিঘœ ঘটবে। তাদের বিকল্প পথে পারাপার করতে ব্রিজটির কাছে করতোয়ার ওপর এসপি ঘাটের ব্রিজ আছে। ওই পথেও যোগাযোগ করা যেতে পারে। প্রয়োজনে দুই প্রান্তে খেয়া বা ফেরির ব্যবস্থা করা হবে। যত দ্রুত সম্ভব এবারের ব্রিজটি মজবুত করেই নির্মিত হবে। যাতে দীর্ঘসময় ব্রিজটি টিকে থাকে।