রবিবার ৩০ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮, ১৩ জুন ২০২১ ঢাকা, বাংলাদেশ
প্রচ্ছদ
অনলাইন
আজকের পত্রিকা
সর্বশেষ

কৃতী পুরুষ প্রফেসর ড. রশিদুল হক

কৃতী পুরুষ প্রফেসর ড. রশিদুল হক
  • ইলিয়াস উদ্দীন বিশ্বাস

মৃত্যু শাশ্বত সত্য। এ অমোঘ নিয়মেই গত ১৯ মে পরকালে চলে গেছেন এক কীর্তিমান গণিতবিদ ও বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ প্রফেসর ড. রশিদুল হক। লন্ডনের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। প্রফেসর রশিদুল হক ছিলেন প্রচারবিমুখ ও অত্যন্ত বিনয়ী। অথচ কত যে মেধাবী ছাত্র ও শিক্ষক ছিলেন, তা তার জীবন ও কর্মের প্রতি আলোকপাত করলেই বোঝা যায়। যারা তার সান্নিধ্যে এসেছেন তারাই নিজেদের ধন্য মনে করেছেন।

প্রফেসর ড. রশিদুল হক ১৯৩২ সালের ১ ফেব্রæয়ারি তৎকালীন মালদা জেলার চাঁপাইনবাবগঞ্জ থানার নামোসঙ্করবাটী গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। প্রফেসর রশিদুল হক ১৯৪৭ সালে মালদা জেলা স্কুল থেকে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে সম্মিলিত মেধা তালিকায় স্থান করে নিয়ে মালদা জেলায় প্রথম হয়ে প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগ থেকে ১৯৫২ সালে বিএসসি (অনার্স) ও ১৯৫৩ সালে এমএসসি ডিগ্রী অর্জন করেন। উভয় পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হন। বিএসসি পরীক্ষায় রেকর্ড নম্বর পাওয়ায় স্বর্ণপদক পান। তিনি স্বল্প মেয়াদে ঢাকা জগন্নাথ কলেজে গণিতের প্রভাষক ছিলেন। স্কলারশিপ পেয়ে ইংল্যান্ডের ম্যানচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৫৬ সালে এমএসসি (রিসার্চ) ডিগ্রী অর্জন করেন। তিনি ১৯৫৭ সালের প্রথম দিকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে গণিত বিভাগে যোগদান করেন। আমেরিকার নিউ অরলিয়েন্সের টুলেন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৬৩ সালে পিএইচ ডিগ্রী অর্জন করেন। তার গবেষণার বিষয় ছিল ঞড়ঢ়ড়ষড়ম। তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে রিডার (সহযোগী অধ্যাপক) পদে ছিলেন। তিনি মূলত চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম উপাচার্য প্রফেসর আজিজুর রহমান মল্লিকের অনুরোধেই ১৯৬৮ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগে রিডার পদে যোগদান করে প্রতিষ্ঠাতা বিভাগীয় প্রধান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তিনি ১৯৭০ সালে অধ্যাপক পদে পদোন্নতি লাভ করে বিজ্ঞান অনুষদের ডিনের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান (অব.) বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ প্রফেসর সুব্রত মজুমদার বলেন, ‘প্রফেসর রশিদুল হক অত্যন্ত পÐিত ব্যক্তি ছিলেন। তার পাÐিত্য শুধু গণিতেই সীমাবদ্ধ ছিল না, তা ছিল বিভিন্ন বিষয়ে। বিভিন্ন বিষয়ে প্রচুর পড়শোনা করতেন।’ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান অনুষদের সাবেক ডিন ও গণিত বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান বিশিষ্ট গণিতবিদ প্রফেসর আবু সালেহ আব্দুন নূর বলেন, ‘আমি রশিদুল হক স্যারের সরাসরি ছাত্র ছিলাম। গণিত ছাড়াও বিভিন্ন বিষয়ে স্যারের পাÐিত্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের সব শিক্ষকই তাকে সমীহ করতেন। বাংলা ও ইংরেজী সাহিত্যে যেমন তার জ্ঞান ছিল, তেমনি জ্ঞান ছিল সঙ্গীতে বিশেষ করে পাশ্চাত্য সঙ্গীতে। রাকসু আয়োজিত সাহিত্য-সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতায় বিচারকের আসনে বসতেন রশিদুল হক স্যার।’

প্রফেসর রশিদুল হক প্রগতিশীল ও অসা¤প্রদায়িক চিন্তা-চেতনার মানুষ ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি উপাচার্য প্রফেসর এ আর মল্লিক এবং সৈয়দ আলী আহসানের পরিবারের সঙ্গে সপরিবারে রামগড় হয়ে ভারতের সাবরুমে প্রবেশ করে ভারতে অবস্থান নেন। সেখানে তিনি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কাজ করেন। তার বড় ভাই নবাবগঞ্জ কলেজের উপাধ্যক্ষ মুনিমুল হক মহান মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হন। নবাবগঞ্জ সরকারী কলেজে এই শহীদ বুদ্ধিজীবীর নামে আছে শহীদ মুনিমুল হক একাডেমিক ভবন। তার আরেক ভাই সেরাজুল হক (শনি মিঞা) ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক। এ কারণে মুক্তিযুদ্ধের সময় তাদের শহরের বাড়িটি আগুনে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দেয় রাজাকাররা। শনি মিঞা স্বাধীনতার পর চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌরসভার চেয়ারম্যান ছিলেন। তার অন্য ভাইরাও স্ব স্ব ক্ষেত্রে সুপ্রতিষ্ঠিত ছিলেন। স্বাধীনতার পর দেশে ফিরে প্রফেসর রশিদুল হক তার কর্মস্থলে যোগদান করেন। ১৯৭৩ সালে তিনি কমনওয়েলথ বিশ্ববিদ্যালয় কমিশন কর্তৃক ফেলোশিপ পেয়ে যুক্তরাজ্য ওয়ারউইক বিশ্ববিদ্যালয় ‘ভিজিটিং ফেলো’ হিসেবে একবছর কর্মরত ছিলেন। তিনি ১৯৭৪ সালে লিবিয়ার ত্রিপোলী বিশ্ববিদ্যালয়ে (আল ফাতেহ বিশ্ববিদ্যালয়) অধ্যাপক পদে যোগ দেন। সেখানে তিন ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত ছিলেন।

বাংলাদেশ গণিত সমিতির সভাপতি বিশিষ্ট গণিতবিদ প্রফেসর নুরুল আলম খান বলেন, ‘চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ও লিবিয়ার আল ফাতেহ বিশ্ববিদ্যালয় উভয় বিশ্ববিদ্যালয়েই প্রফেসর রশিদুল হক স্যারের সহকর্মী হবার সৌভাগ্য আমার হয়েছিল। তিনি ছিলেন আমার পরম শ্রদ্ধার পাত্র। আমাদের দেশের প্রথিতযশা গণিতবিদদের মধ্যে তিনি ছিলেন অগ্রগণ্য।’ সিলেট এমসি কলেজের উপাধ্যক্ষ (অব.) গণিতবিদ প্রফেসর ঋষিকেশ ঘোষ বলেন, ‘১৯৭২ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্স শেষ পর্বে প্রফেসর রশিদুল হক স্যারের একজন স্নেহভাজন ছাত্র ছিলাম। তিনি স্বল্পভাষী ছিলেন। তার ক্লাসে পিন পতন নীরাবতা বিরাজ করত। অসাধারণ প্রতিভার অধিকারী এই গণিতবিদের কোন তুলনা হয় না। তার নৈতিকতা, দায়িত্ববোধ এবং ছাত্রছাত্রীদের প্রতি স্নেহ-ভালবাসা সবার জন্য অনুকরণীয়। দেশে বিশুদ্ধ গণিতে তার ছিল একচ্ছত্র আধিপাত্য।’

প্রফেসর রশিদুল হক লিবিয়া থেকে লন্ডনে গিয়ে কিছুদিন ছিলেন। তারপর নব্বই দশকের প্রথম দিকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগে সুপারনিউমারারি প্রফেসর হিসেবে যোগদান করেন। সেই সময়ের ছাত্র বর্তমানে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভৌত বিজ্ঞান স্কুলের ডিন প্রফেসর মোঃ রাশেদ তালুকদার বলেন, ‘আমি প্রফেসর রশিদুল হক স্যারের ছাত্র ছিলাম। স্যার আমাদের অফাধহপব অহধষুংরং পড়াতেন। স্যারের উপস্থাপনা, লেখার সৌন্দর্য এবং এরকম একটা কঠিন বিষয়ের বিষয় জ্ঞানে আমি মুগ্ধ ও অভিভ‚ত হতাম। এরকম একজন আদর্শবান ও জ্ঞানী শিক্ষকের ছাত্র হতে পেরে নিজেকে গর্বিত মনে করি।’ প্রফেসর রশিদুল হক ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনার পর ঢাকা এশিয়া-প্যাসিফিক ইউনিভার্সিটিতে ২০০০ সাল পর্যন্ত অধ্যাপনা করেন। শাবিপ্রবির গণিত বিভাগের প্রফেসর সুজয় চক্রবর্ত্তী বলেন, ‘১৯৯৯ সালে এশিয়া-প্যাসিফিক ইউনিভার্সিটিতে যোগদান করে প্রফেসর রশিদুল হক স্যারের সান্নিধ্য লাভ করি। তিনি অনেক টপিক চমৎকার করে বুঝিয়ে দিতেন। এতে স্যারের অপরিসীম জ্ঞানভাÐারের কিছুটা অনুভব করে গর্ববোধ করি।’

আমি ১৯৯৪ সালে প্রফেসর রশিদুল হক স্যারের বাসায় গিয়ে তার ব্যক্তিগত লাইব্রেরি দেখে অবাক! শুধু বই আর বই। তিনি ছিলেন জ্ঞানপিপাসু। বিভিন্ন বিষয়ে তার জ্ঞান ছিল অপরিসীম। তিনি ছিলেন এক জীবন্ত বিশ্বকোষ স্বরূপ। আওয়ামী লীগ ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় এসে প্রফেসর শামসুল হকের নেতৃত্বাধীন যে শিক্ষা কমিশন গঠন করে, তিনি ছিলেন তার অন্যতম সদস্য। স্যারের সন্তানের ৫ জনই মেয়ে। তাঁর ২য় মেয়ে ঢাকায়, অন্য মেয়েরা ইংল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশে প্রবাসী। তিনি ২০১২ সালে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সাধারণ পাঠাগারে সাত হাজার বই দান করেন। এই খ্যাতিমান গণিতবিদের সঙ্গে বন্ধুত্ব ছিল জাতীয় অধ্যাপক আনিসুজ্জামান, অধ্যাপক জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী, ইতিহাসবিদ সালাহ উদ্দিন প্রমুখ দেশবরেণ্য ব্যক্তিদের। কতজন কতভাবে পুরস্কার পেয়ে জাতীয়ভাবে স্বীকৃতি পেলেন, অথচ দেশের একজন শ্রেষ্ঠ গণিতবিদ, যিনি সপরিবারে মহান মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় ছিলেন, তিনি কোন পুরস্কারে ভ‚ষিত হননি। স্যারের বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করি।

লেখক : উপাচার্য, নর্থ ইস্ট ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশ; শিক্ষাবিদ ও গবেষক

শীর্ষ সংবাদ:
বিদেশ নির্ভর বিএনপির রাজনীতি এখন শেকড় থেকে বিচ্ছিন্ন         “এমন কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে না যাতে শিক্ষার্থীদের ক্ষতি হয়”         ‘মির্জা ফখরুল হয়তো বলবেন খালেদার করোনার জন্যও আ.লীগ দায়ী’         লাইকি-বিগো লাইভের মাধ্যমে মাসে কোটি কোটি টাকা পাচার         মেজর সিনহা হত্যা ॥ সাবেক ওসি প্রদীপের জামিন শুনানি ২৭ জুন         খালেদার জন্মদিন সংক্রান্ত সব ধরনের নথি চেয়েছেন হাইকোর্ট         রাজশাহীতে করোনায় আরও ১৩ মৃত্যু         নাইজেরিয়ায় সন্ত্রাসী হামলায় নিহত ৫৩         কণ্ঠশিল্পী-প্রচ্ছদ ডিজাইনার বৃহান আর নেই         সিরিয়ার আফরিনে গোলাবর্ষণের ঘটনায় ১৩ জন নিহত         চীনের ৬ লাখ টিকা দেশে আসছে আজ         গত ২৪ ঘণ্টায় করোনায় ভারতে মারা গেছেন ৩ হাজার ৩০৩ জন         রাশিয়ার বিরুদ্ধে ৩-০ গোলে জিতেছে বেলজিয়াম         বিদেশী গরু নয় ॥ দেশী গরুতেই এবার কোরবানি