ঢাকা, বাংলাদেশ   রোববার ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১০ আশ্বিন ১৪২৯

নাটক সিনেমাসহ জনপ্রিয় অনুষ্ঠান এখন বিভিন্ন এ্যাপে ঢুকে পড়েছে

পরিবারের সবাই মিলে টিভি দেখার দিন শেষ

প্রকাশিত: ২১:৪৯, ১ নভেম্বর ২০২০

পরিবারের সবাই মিলে টিভি দেখার দিন শেষ

সমুদ্র হক ॥ বাড়ির ছাদে, বাঁশের ডগার এ্যান্টেনা টানা-হ্যাঁচড়ার দিন উধাও হয়ে জাদুঘরে। ক্যাবল লাইনে দেশী-বিদেশী টিভি দেখা, তাও গেল বলে। হালে আকাশ টাটার মিনি এ্যান্টেনায় হাজারো চ্যানেল চলছে যুগের তালে। একুশ শতকের এলইডি মনিটরের টিভি সেটে ইউটিউব, গ্রামীণফোনের বায়োস্কোপ, বাংলালিংকের বিফ্লিক্স আমাজান, ডিজনিপ্লাস, নেটফ্লিক্সসহ টিভি অনুষ্ঠান, নাটক, সিনেমা দেখার বিভিন্ন এ্যাপ ঢুকে পড়েছে। পারিবারিক বন্ধনে টেলিভিশন (টিভি) অনুষ্ঠান দেখার দিন ফুরিয়েই গেছে। চিত্র-১ : ছাদের ওপর উঠে একজন বাঁশের ডগায় আঁটানো এ্যালমুনিয়ামের কয়েককাঠির এ্যান্টেনা এদিক- ওদিক করে চিৎকার করে বলছে- দেখা যায়! নিচে দাঁড়িয়ে থাকা এক বা একাধিকজন টিভির পর্দায় উঁকি দিয়ে কখনও বলছে ঝিরিঝিরি, কখনও ডানদিকে, কখনও বামদিকে ঘুরিয়ে দিতে বলে একসময় বলে ওঠেÑ ঠিক আছে, নেমে আয়। এই হলো সত্তর দশকের টেলিভিশন দেখা। উল্লেখ্য, ১৯৭৩ সাল পর্যন্ত বিটিভি শুধু ঢাকা কেন্দ্র ছিল। ১৯৭৪ সালে দেশে প্রথম বিটিভির নাটোর উপকেন্দ্র চালু হয়। কয়েকদিন নাটোর থেকে নিজস্ব অনুষ্ঠান প্রচারের পর ঢাকার অনুষ্ঠান সম্প্রচার শুরু হয়। এর পর দেশে কয়েকটি টিভি উপকেন্দ্র চালু হওয়ার পর সারাদেশের মানুষ টেরেস্ট্রিয়াল বিটিভি দেখার স্বাদ পায়। চিত্র-২ : নব্বইয়ের দশকের শুরুতে দেশে ক্যাবল টিভির যাত্রা শুরু। কয়েকটি বিদেশী টিভি চ্যানেল উপভোগ করার সুযোগ পায় এই দেশের মানুষ। ১৯৯৪ সালে ভারতীয় জি টিভি সপ্তাহে পাঁ দিন সন্ধ্যা সাতটা থেকে রাত ৮ টা পর্যন্ত এক ঘণ্টার পরীক্ষামূলক বাংলা অনুষ্ঠান প্রচার শুরু করে। এর পর জি টিভি বাংলা ও ইংরেজী ভাষায় অনুষ্ঠানসহ ভারতীয় সকল ভাষীর অনুষ্ঠান প্রচারের আলাদা চ্যানেল চালু করে। বাংলাদেশের দর্শক জি বাংলা ও জি সিনেমা অনুষ্ঠান বেশি দেখে। দিনে দিনে অনেক বিদেশী টিভি চ্যানেল জড়ো হয় ক্যাবলওয়ালাদের ভা-ারে। স্টার জলসা, স্টার সিনেমাসহ টিভি দর্শকরা দেশী-বিদেশী টিভির প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ে। বিশেষ করে সিরিয়াল। যার বেশিরভাগ দর্শক নারী। চিত্র-৩ : বিদেশী টিভির অগ্রযাত্রার সঙ্গে নব্বই দশকের শেষদিকে দেশে একুশে টিভির মাধ্যমে প্রাইভেট টিভির যাত্রা শুরু হয়। এক পর্যায়ে একুশে টিভি সকল দর্শকের কাছে পৌঁছে যায় বিটিভির উপকেন্দ্রগুলোর টেরেস্ট্রিয়াল ব্যবহার করে। এক পর্যায়ে একুশে টিভির টেরেস্ট্রিয়াল আর থাকেনি। চিত্র-৪ : একুশ শতকের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত বিটিভির চারটি (বিটিভি, বিটিভি ওয়ার্ল্ড, বিটিভি সংসদ ও বিটিভি চট্টগ্রাম) এবং ৩৮ টি প্রাইভেট টিভি চালু হয়েছে। এখনও অনেক টিভি কেন্দ্র চালুর অপেক্ষায়। এর সঙ্গে ক্যাবলওয়ালা ও আকাশ এ্যান্টেনাওয়ালাদের ভা-ারে কত যে বিদেশী টিভি আছে তার ইয়ত্তা নেই। এত যে টিভি চ্যানেল তার দর্শক সংখ্যা কত! এ ধরনের জরিপ কোন প্রতিষ্ঠান করেনি। শুধু ধারণার ওপর ভিত্তি করে বলা হয়, দর্শক কমে যাচ্ছে। তবে এই ধারণা একেবারে অমূলকও নয়। আপনি নিজের কাছে প্রশ্ন করতে পারেন, এখন কতটা সময় টিভি দেখেন। আগে কতটা সময় দেখতেন। বিদেশী চ্যানেলগুলো প্রতিযোগীদের অংশগ্রহণে নানা স্বাদেও, নানা বৈচিত্র্যের প্রতিযোগিতামূলক অনুষ্ঠান প্রচার করছে। এর মধ্যে সঙ্গীত, নৃত্যকলা, বিনোদনসহ নানা ধরনের ম্যাগাজিন অনুষ্ঠানের পাশাপাশি মেধা বিকাশের অনুষ্ঠান আছে। তারা প্রতিনিয়ত দর্শক জরিপ করে অনুষ্ঠান নির্মাণ করে। সিরিয়ালগুলোকে তারা জরিপ করে। হিসাব-নিকাশ করে দর্শক কি দেখতে চায়। তার পরও তারা লক্ষ্য করছে অনুষ্ঠানগুলো পারিবারিক বন্ধনে দেখার পর্যায়ে নেই। সবই এখন দর্শকদের হাতের মুঠোয় একান্ত আপনে চলে গেছে। ঘরে-বাইরে যখন সুযোগ পায় তখন দেখে ওয়াইফাই ও সেল ফোনের ডেটা কিনে। এ কালের টিভি দর্শক জরিপ করলে দেখা যাবে বেশিরভাগই হাতের মুঠোর টিভি দর্শক। নিকট অতীতে পারিবারিক বন্ধনে টিভি অনুষ্ঠান দেখার দিন ফুরিয়েই এলো। বাড়ির টিভি সেট বসার ঘর (ড্রইং রুম) থেকে শোবার ঘরে (লিভিং রুম) প্রবেশ করেছে অনেক আগে। টিভি সেট এখন বাড়ির শোভা বর্ধন। এই সৌন্দর্যের সবচেয়ে জনপ্রিয় অনুষ্ঠান হলো শুধুই খবর। তাও স্পর্শকাতর খবর। টক ঝাল মিষ্ট শো এখন তেঁতো। ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান নাটক-সঙ্গীত চলে ধীরলয়ে। বিদেশী টিভির সিরিয়ালগুলো কিছুদিন খুব চলল। একই ফর্মুলায় তৈরি এই সিরিয়ালও এখন স্রোতৃহীন মরাগাঙের পথে। মরুপথের যাত্রী। বিনোদনের সিনেমা হল ডুবেছে আগেই। টেনেও তোলা যাচ্ছে না। সিনেপ্লেক্স (অল্প আসনের ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম) কতদিন চলবে তাও অনিশ্চিত। সিনেমাগুলোও ঢুকেছে স্মার্ট ফোন, ট্যাব, ল্যাপটপে। প্রজন্মের বা আগামী পৃথিবীর মানুষের মিষ্টি বিনোদনের পালা শুরু হয়েছে ছোট্ট শব্দ ওটিটি (ওভার দ্যা টপ) প্ল্যাটফর্মে। এ নিয়ে নানা যুক্তি, নানা তর্ক শুরু হয়েছে। নাটকের অভিনেতা-অভিনেত্রীর অনেকে বলছেন,ঘরে বসে পারিবারিক বন্ধনের টিভি দর্শক এবং সিনেমা হলে বা সিনেপ্লেক্সে গিয়ে সিনেমা দেখার দিনও যখন ফুরিয়ে যাচ্ছে তখন ওটিটি প্ল্যাটফর্মে (হোক তা ছোট পর্দার) দর্শক তো আছে। যে দর্শক ভাল গল্পের নাটক ও ভাল মানের অনুষ্ঠান গ্রহণ করছে। ভাল সিনেমা দেখছে। এই দর্শক সংখ্যা তো কম নয়। আরেক পক্ষের মন্তব্য : হলে গিয়ে সিনেমা দেখা, ঘরে বসে বড় পর্দার টিভিতে অনুষ্ঠান দেখার স্বাদ কি দিতে পারবে ওটিটি। পাল্টা মন্তব্য : আগামীর পৃথিবীর মানুষের কাছে প্রতিটি সেকেন্ড মূল্যবান। সুষ্ঠু বিনোদনের সময় বের করে যার যেটা পছন্দ তা অল্প সময়ে দেখে নেবে হাতের মুঠোর মনিটরে। বর্তমানে স্মার্ট ফোন কোম্পানিগুলো লাইভ অনুষ্ঠান দেখার জন্য মনিটর বড় করছে। দ্রুত অনুষ্ঠান গ্রহণের রেন্ডম এ্যাকসেস মেমোরি (র‌্যাম) বেড়েছে। অনুষ্ঠান সংগ্রহ করে রাখার ডিভাইস স্টোরেজ ক্যাপাসিটি বাড়ানো হয়েছে। বর্তমান প্রজন্ম মোবাইল ফোন কেনার সময় প্রসেসর র‌্যাম, রোম, ডিভাইস এগুলো ভাল করে দেখে কেনে। স্থিরচিত্র ও ভিডিও চিত্র ধারণ করলে কত বেশি রেজুলেশন পাওয়া যাবে তাও দেখে নেয়। বিনোদনের সব কিছুই খুঁজে পায় তারা অন্তর্জালে (ইন্টারনেট)। তাদের কাছে ঘরে বসে টিভি অনুষ্ঠান দেখা এখন অতীত দিন। বিশে^র সকল দেশেই বিনোদনে লেগেছে পরিবর্তনের হাওয়া। করোনা প্যানডেমিকের সময়ও দেখা যাচ্ছে টেলিভিশন দর্শকরা মুঠোফোনের দিকে বেশি ঝুঁকেছে।