সোমবার ৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯, ২৩ মে ২০২২ ঢাকা, বাংলাদেশ
প্রচ্ছদ
অনলাইন
আজকের পত্রিকা
সর্বশেষ

হাই আমেরিকা হায় আমেরিকা

  • অজয় দাশগুপ্ত

‘আমি শ্বাস নিতে পারছি না।’ জর্জ ফ্লয়েডের এই কান্নার রং কি কালো? এই কান্না কি ভেসে আসছে আফ্রিকার অন্তঃস্তল থেকে? সেই যখন গাম্বিয়ার কিশোর কুন্তা কিন্তেকে পশুর মতো খাঁচায় বন্দী করে নিয়ে আসা হয়েছিল তার জন্মভূমির উদার প্রান্তর ও সবুজ শস্যক্ষেত থেকে। স্বাধীন মানুষকে অপহরণ, তাকে শিকলে বেঁধে জাহাজবোঝাই করে ভেড়ার পালের মতো নিয়ে আসা হয় এক নতুন দেশে। সেখানে তার একটাই পরিচয় ব্রতী দাস। পালটে ফেলা হয় তার নাম। সে আর গ্রামের প্রাণবন্ত ছেলে কুন্তা কিন্তে নয়। তার নাম টোবি। সে একজন ক্রীতদাস। মালিক বদল হলে কিংবা চাইলে আবারও বদলে যেতে পারে তার নাম। তাকে যে কোন শ্রমে বাধ্য করা যায়। রাজি না হলে বা মালিকের ইচ্ছা হলে অনায়াসে উপড়ে নেয়া যায় তার চোখ, ফুটন্ত তেলে জীবন্ত সিদ্ধ করা যায় তাকে, তার দেহে গরম লোহা দিয়ে চিহ্ন এঁকে দেয়া হয়। তার স্ত্রী, সন্তান বলে কিছু নেই। স্টাড হর্সের মতো তাকে বাধ্য করা হয় তারই মতো অন্য এক কৃষ্ণাঙ্গ নারীর সঙ্গে সঙ্গমে। সেই নারীরও একটিই পরিচয় ‘ক্রীতদাসী’। আর তাদের জন্ম নেয়া সন্তানগুলোকে পশুর মতোই বিক্রি করে দেয়া হয় দাসহাটে। এই হচ্ছে বর্ণবাদের আসল চেহারা। যেখানে একজন মানুষ শুধুমাত্র তার গায়ের রঙের জন্য পশু এবং প্রয়োজনে পশুর চেয়ে অনেক বেশি ঘৃণ্য হিসেবে বিবেচিত।

আমেরিকা আজ বিপন্ন এক দেশ। মানুষের এক সময়ের স্বপ্ন আর নির্ভরতার দেশ এখন বিপদের মুখে। একজন শ্বেতাঙ্গ পুলিশ ৪৬ বছর বয়স্ক জর্জ ফ্লয়েডকে গ্রেফতারের সময় তার ঘাড়ে হাঁটু দিয়ে জোরে চেপে বসে আছেন আর মি. ফ্লয়েডকে হাসফাঁস করে বলতে শোনা যাচ্ছে, ‘আমি নিশ্বাস নিতে পারছি না’। এমন একটি ভিডিও প্রকাশিত হওয়ার পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র জুড়ে সহিংস বিক্ষোভ শুরু হয়েছে, যা অনেক দূর গড়িয়েছে। ৪০টি শহরে বিক্ষোভকারীদের দমাতে কার্ফু জারি ছিল। নিউইয়র্ক শহরে মঙ্গলবার স্থানীয় সময় সকাল পাঁচটা পর্যন্ত লকডাউন জারি রয়েছে। ওয়াশিংটনে আরও দুই রাতের জন্য কার্ফু বাড়ানো হয়েছে। বড় বড় শহরগুলোতে কার্ফু জারি থাকা সত্ত্বেও দমানো যাচ্ছে না বিক্ষোভ। বিক্ষোভ দমাতে চাপের মুখে রয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। এমন পটভূমিতে বিক্ষোভকারীদের হটাতে সেনা পাঠানোর হুমকি দিয়েছেন তিনি।

একদা মসি ছিল অসির চেয়ে ঢের বেশি শক্তিশালী। আর এই উত্তরাধুনিক দুনিয়ায়, এই ‘ডিজিটাল ডাইন্যাসটি’র আমলে কলমের চেয়ে অনেক বেশি প্রভাবশালী হলো ক্যামেরা। গোটা পৃথিবী সবিস্ময়ে তার প্রামাণ্য ভিডিও দেখল সম্প্রতি মিনেসোটা প্রদেশের মিনিয়াপোলিস শহরে।

স্রেফ একটা ছবি রীতিমতো একটা সামাজিক বিপ্লব ঘটিয়ে দিল মার্কিন মুলুকে। ইতিহাস বলছে, গত শতকের ছয়ের দশকের মাঝপর্বে বর্ণবৈষম্য ও সামাজিক অসাম্যের বিরুদ্ধে মার্টিন লুথার কিংয়ের সেই গণআন্দোলনের পর এমনটা আর কখনও দেখেনি আমেরিকা। এটা যে ঘটল তার কারণ, মার্টিন লুথার যে সুসম সমাজের স্বপ্ন দেখেছিলেন, সেটা এখনও বাস্তবায়িত হয়নি সুসভ্য এবং সমৃদ্ধ আমেরিকায়। বরং বাস্তবটা হলো এই যে, ওই ভিডিও ক্লিপিংসটা একটা ‘শোকেস’ মাত্র, যেটা বিব্রত করে। এ রকম আরও আছে। যুগযুগান্তর ধরে ‘সেই ট্র্যাডিশন সমানে চলেছে!’ সেই কৃষ্ণাঙ্গদের ওপর শ্বেতাঙ্গদের ‘গায়ের জোর’! সেই সংখ্যালঘুদের ওপর সংখ্যাগুরুদের ‘বল প্রয়োগ’! সে দিনের মিনিয়াপোলিসের ওই ছবিটা আরও একবার জানান দিল, ‘গভীরে যাও, আরও গভীরে যাও’।

আনন্দবাজারের মতামত পড়ে আমি একটা বিষয় জানলাম। আমেরিকায় আসলে কোনকালেই সাদা-কালোর দ্বন্দ্ব ঘুচে যায়নি। যাবেও না। ট্রাম্প সম্ভবত এমন এক প্রেসিডেন্ট যিনি নিজের দেশকেও এক রাখতে চান না। তা হলে কি চান তিনি? আমার ধারণা তিনি চান তার গদি। আর সেটা থাকতে হবে সাদা সংখ্যাধিক্যের জোরে। এভাবে বল প্রয়োগ কোন দেশকেই নিরাপদ রাখে না। এমন একতরফা এককেন্দ্রিক ধর্মান্ধতা পাকিস্তানের মতো দেশগুলোকে সর্বস্বান্ত করে ছেড়েছে। আবার গণতান্ত্রিক ভারতকে হিন্দুত্বের নামে পাগল করে তুলেছেন মোদি। এসব আরও বড় আকারে বড় আয়তনে দেখছি গণতন্ত্রের সূতিকাগার নামে পরিচিত আমেরিকায়।

ভাবলে বিস্ময় লাগে এদেশেই ছিলেন মার্টিন লুথার কিং। মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র। এদেশের রাষ্ট্রপতি ছিলেন আব্রাহাম লিংকন বা জর্জ ওয়াশিংটন। আজ এক বদ্ধ উন্মাদের হাতে পড়ে আমেরিকা নিজেই দাঁড়িয়েছে আমেরিকার মুখোমুখি। জর্জ ফ্লয়েড যদি মারা না যেতেন, আমরা জানতে পারতাম না, বুঝতে পারতাম না প্রদীপের তলায় কতটা অন্ধকার। করোনা মহামারী আমেরিকার পোশাক খুলে দিলেও এই ঘটনা তার প্রায় অন্তর্বাসও কেড়ে নিয়েছে। কোন সভ্য দেশে সভ্য সমাজে এমন লুটপাট দেখা যায় না। ইরাক সিরিয়া বা আফ্রিকার দেশগুলোর চাইতেও ভয়াবহ এই লুটপাট প্রমাণ করে দিয়েছে আমেরিকায় শ্রেণী বৈষম্য কত প্রকট।

মানুষের এই চলতি আন্দোলন এক সময় থিতিয়ে যাবেই। বরং এই ঘটনার পর থেকে মার্কিন দেশে মানুষে মানুষে সন্দেহ বাড়বে। স্কুল-কলেজ-অফিস-আদালত আর শপিংমলে সাদারা ভ্রু কুঁচকে তাকাবে কালোদের দিকে, স্বভাবের দোষে, ‘জলের গতি যেমন সদা নিম্ন দিকে ধায়’। পাড়া পার্ক আর গির্জায় কালোরা রুষ্ট চোখে তাকাবে সাদাদের দিকে, আক্রোশের অভ্যাসে, ‘আগুনেরই স্বভাব যেমন সব কিছু পোড়ায়’! সংখ্যাগুরুরা সুযোগ পেলেই সংখ্যালঘুদের ঘাড় মটকে দেবে। জাতীয় পতাকা হাতে জাতীয় সঙ্গীত গাওয়ার সময় এক মার্কিন নাগরিক পাশের সহনাগরিকের দিকে আড় চোখে তাকিয়ে তার গায়ের রংটা দেখে নেবে। বোঝার চেষ্টা করবে, তার কথাবার্তায় ‘এ্যাক্সেন্ট’ আছে কিনা। এই বিশ্বাসহীনতার ফিতে কেটে দিয়েছেন আমেরিকার ‘একটু অন্য রকম’ রাষ্ট্রপ্রধান স্বয়ং। তিনি প্রতিবেশী দেশের লাগোয়া সীমান্তে প্রাচীর তুলে দিতে চাইছেন। তিনি পেশাদার অভিবাসীদের আমেরিকা থেকে তাড়িয়ে দিতে চাইছেন। তিনি একটা বিশেষ দেশের পড়ুয়াদের আমেরিকায় ঢোকা বন্ধ করে দিতে চাইছেন। এভাবেই লিঙ্কন আর লুথারের নির্মিত সমতার মানচিত্র থেকে দিনান্তের আলোর মতোই হারিয়ে যাচ্ছে ‘বহুজাতিক’ আমেরিকা। কয়েকটা বছর আগে দেখা আমাদের সেই বহুত্ববাদের আমেরিকা দ্রুত, খুব দ্রুত বদলে যাচ্ছে।

এই ‘নতুন’ আমেরিকাকে আমরা চিনি না। আমাদের মনে হবে এই কি সেই আমেরিকা যেখানে যাওয়ার জন্য বাঙালী ঢাকার রাজপথে রাত জেগে লাইনে দাঁড়াত? এই কি সেই দেশ যেখানে পা রাখার জন্য এককালে তারকারা পাগলের মতো ছুটত? এই কি সেই আমেরিকা যার নামে দুনিয়া এক ঘাটে পানি খেত?

সে আমেরিকা আর আজকের আমেরিকায় বিশাল ফারাক। এই ফারাক পূরণ করা সহজ হবে না। আমাদের অবশ্য খুব বেশি আনন্দিত হওয়ার কারণ নেই। আমরাও নানা ভাবে বিদ্বেষ আর হিংসায় পরিপূর্ণ এক সমাজের মানুষ। ধর্মের নামে সম্প্রদায়ের নামে রাজনীতির নামে লিঙ্গ ভেদে আমরাও বৈষম্যের শিকার। তারপরও সবাইকে ছাড়িয়ে ট্রাম্পের আমেরিকা আজ নেগেটিভ আমেরিকা। তার এই কলঙ্ক সহজে মুছবে বলে মনে করার কোন কারণ নেই।

হায় আমেরিকা! হাউ গড উইল সেভ আমেরিকা?

dasguptaajoy@hotmail.com

শীর্ষ সংবাদ:
কালোবাজারি চলবে না ॥ তালিকা নিয়ে মাঠে নামছে রেল পুলিশ         বুঝেশুনে উন্নয়ন কাজের পরিকল্পনা নিতে হবে         বিএনপিকে নিয়ম মেনেই নির্বাচনে আসতে হবে ॥ কাদের         ঢাকায় আইসিসি প্রধানের ব্যস্ত দিন         দুদুকের মামলায় হাজী সেলিম কারাগারে         সিলেট নগরীর পানি নামছে ॥ সুনামগঞ্জ হাওড়বাসীর দুর্ভোগ         দুই সন্তানসহ স্ত্রী হত্যা ॥ স্বামী আটক         বিশ্বের সবচেয়ে দামী আম চাষ হচ্ছে দেশে         সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন পরিচয়ে প্রতারণা ॥ জামাই-শ্বশুর আটক         দেশে কালো টাকা ৮৯ লাখ কোটি, পাচার ৮ লাখ কোটি         সব ব্যাংকারদের বিদেশ ভ্রমণ বন্ধ করলো বাংলাদেশ ব্যাংক         সরকার পরিবর্তনের একমাত্র উপায় নির্বাচন ॥ কাদের         ভারত থেকে গমের জাহাজ এলো চট্টগ্রাম বন্দরে, কমছে দাম         কারাগারে হাজী সেলিম, প্রথম শ্রেণির মর্যাদা         অর্থনীতি সমিতির ২০ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকার বিকল্প বাজেট পেশ         কোভিড-১৯ : ভারত-ইন্দোনেশিয়াসহ ১৬ দেশের হজযাত্রীদের দুঃসংবাদ         বাইডেনসহ ৯৬৩ মার্কিন নাগরিকের রাশিয়া প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা         পেছাচ্ছে না ৪৪তম বিসিএস প্রিলি         পরিবেশ রক্ষায় যত্রতত্র অবকাঠামো করা যাবে না ॥ প্রধানমন্ত্রী         রাজধানীর গুলশানে দারিদ্র্য কম, বেশি কুড়িগ্রামের চর রাজিবপুরে