মঙ্গলবার ১০ কার্তিক ১৪২৮, ২৬ অক্টোবর ২০২১ ঢাকা, বাংলাদেশ
প্রচ্ছদ
অনলাইন
আজকের পত্রিকা
সর্বশেষ

যার স্কুলে যাওয়ার সুযোগ ছিল না সে এখন কলেজে পড়ছে

 যার স্কুলে যাওয়ার সুযোগ ছিল না সে এখন কলেজে পড়ছে
  • সুউদ্যোগে সুন্দর জীবন

রশিদ মামুন ॥ শহুরে একদল উচ্চ শিক্ষিত তরুণ। যাদের সঙ্গে বস্তি আর রাস্তার মানুষের সম্পর্ক গড়ে ওঠার সম্ভাবনা কম। কিন্তু এরা নিজে যেচে গিয়ে তৈরি করেছেন সম্পর্ক। কেউ শিক্ষার আলো ছড়াচ্ছে তো কেউ আহার তুলে দিচ্ছেন। সুউদ্যোগে সুন্দর জীবন গড়ে তুলতে এই তারুণ্য এখন জনপ্রিয় বস্তিঘরে। বস্তির যে শিশুটির স্কুলের গন্ডি পেরনোর কথা নয় সে আজ কলেজে পড়ছে। এই অদম্য তারুণ্যে পরিবর্তনের ঢেউ লেগেছে অন্ধকারে হারিয়ে যেতে বসা শহরের প্রান্তিক জীবনে।

রাজধানীর তেঁজগাও এর আলকাতরার বস্তি। তেজগাঁও এর রেল রাস্তা ঘেঁষে ছোট ছোট খুপড়ি ঘরে বাস করছেন অসংখ্য মানুষ। এমন তিনটি ঘরে গড়ে তোলা হয়েছে প্রচেষ্টা স্কুল। রাজধানীর একটি বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই তরুণ এখানের শিক্ষক। স্বভাবতই বস্তিতে যাদের যাতায়াত কম হওয়ার কথা। সেই তারাই কেন কিভাবে এখানে। তরুণ দুই শিক্ষক প্রচেষ্টা স্কুলে বসেই শোনাচ্ছিলেন সেই গল্প। বলছিলেন এখানে তাদের মতো আরও তরুণ-তরুণীরা শিক্ষক হিসেবে কাজ করছেন। শুরুতে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে এসে পরে এদের মায়ায় জড়িয়ে যান। তারও একই ভাবে শুরু করেছেন। এখনও কাজ করছেন। হয় তো পড়া শেষে ভাল চাকরি পেলে চলে যাবেন। এরপর কি স্কুলটি পড়ে থাকবে। এমন প্রশ্নের প্রচেষ্টার শিক্ষক সাজ্জাদ হোসেন জানলেন হয় তো নতুন কেউ আসবেন। আরও উদ্যমে নিশ্চয়ই এই উদ্যোগকে অনেক দূর টেনে নিয়ে যাবেন তিনি।

এত গেল স্কুলের কথা। এবার আসা যাক খাবারের বিষয়ে। ছবি এঁকে, গহনা বানিয়ে বা পোশাক বিক্রি করে সেই লাভের টাকা দিয়ে গড়ে তোলা হয়েছে একটি প্রতিষ্ঠান যার নাম এক টাকায় খাবার। কেউ অনুদান দিলে সেদিন ভাল খাবার দেয়া হয়। অন্যদিন সাধারণ মাছ-ভাত নয়তো ডিম-ভাত। প্রতিদিন এক হাজার মানুষের মুখে খাবার তুলে দেয়ার অঙ্গীকার নিয়ে গড়ে তোলা এই প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ক রাফাত নূর বলছিলেন প্রতিদিন হয় তো আমরা এক হাজার মানুষের মুখে খাবার তুলে দিতে পারি না। কিন্তু প্রতিদিন ৪০০ থেকে ৫০০ জন তো হয়ই কোন কোন দিন সেটি এক হাজার হয়ে যায়।

বস্তির এই স্কুলে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে প্রধান যে সমস্যা দেখা গেছে তা হচ্ছে পরিবারের লোক সংখ্যা। এরা আদৌ কোন জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির ধার ধারে না বলেই মনে হয়। এতে করে বছর বছর নতুন অতিথি যোগ হয়। নতুন একটা মুখে খাবার তুলে দিতে গিয়ে হিমশিম খাওয়া জীবন অন্য প্রয়োজন মেটানোর কথা ভাবতে পারে না।

এই স্কুলের শিক্ষার্থী চা বিক্রেতা বাছেদ মিয়ার মেয়ে তানজিনা জানালেন, চার বোন আর দুই ভাইয়ের সংসারে বসবাস তার। সে এখন ৫ম শ্রেণীতে পড়ছে। বস্তির এই স্কুলে ৪র্থ শ্রেণী পর্যন্ত পড়ার পর তারাই পাশের আরেকটি স্কুলে ভর্তি করে দিয়েছে। স্কুলে যাতায়াতের জন্য ভ্যানের ব্যবস্থাও করে দেয়া হয়েছে। এই ভ্যানর ভাড়াও পরিশোধ করে প্রচেষ্টা ফাউন্ডেশন। অন্যদের কার ক’জন ভাই বোন খোঁজ নিয়ে দেখা গেল ঠেলাগাড়ি চালক মিতুর রয়েছে তিন বোন। ভ্যান চালক ইদ্রিস মিয়ার মেয়ে ইতিরাও ছয় ভাইবোন। ভিক্ষুক বাতেনের মেয়ে রূপালীরাও ৬ ভাই বোন। এখানের প্রতিটি পরিবারে একদিকে পরিবারে মানুষের সংখ্যা যেমন বেশি অন্যদিকে আয় তেমন কম। আয়-ব্যয়ের হিসেব মেলানো কঠিন হওয়াতে জীবনের বেশিরভাগ অঙ্কই মেলানো কঠিন হয়।

কথা বলে জানা গেল এদের প্রধান প্রাধান্য খাবার এবং পোশাক যোগাড় করা। এরপর বাসস্থান এবং চিকিৎসা। জীবনের পঞ্চম মৌলিক চাহিদা শিক্ষা পর্যন্ত পৌঁছানো কঠিন হয় অনেক ক্ষেত্রে। তাই স্কুলে যাওয়া হয়ে ওঠে না। প্রচেষ্টার নার্সারি থেকে চতুর্থ শ্রেণী পর্যন্ত চারটি ক্লাসে ধারাবাহিকভাবে শিক্ষার্থী সংখ্যা কমার কারণ হিসেবে এখানের শিক্ষক কে এম রেদোয়ানুর রহিম জানালেন, ক্রমান্বয়ে ওপরের দিকে পাঠ্যবই কিছুটা কঠিন করেই প্রণয়ন করা হয়েছে। এখান থেকে যা পড়িয়ে দেয়া হয় তাই শেষ। বাসায় গিয়ে এদের কেউ আর পড়ে না। ফলে এরা অনেকেই তালমেলাতে না পেরে ঝরে পড়ছে। তিনি বলেন, বস্তির বাচ্চাদের জন্য সহজ কোন বই নেই। যা অন্যস্কুলে পড়ানো হয় আমাদের এখানেও সরকারী সেই একই কারিকুলাম অনুসরণ করা হয়। এর বাইরে তিনি মনে করেন, এখানের বেশিরভাগ মানুষ ভাসমান। পরিবারের প্রধানরা কিছুদিন গ্রামে গিয়ে চলার মতো টাকা আয় হলে বস্তি ছেড়ে চলে যান। এরপর আর সে ফিরে এসে স্কুলে ভর্তি হয় না। অর্থাৎ তার শিক্ষা জীবনে ছেদ পড়ে। সেখান থেকে আর বের হতে পারে না।

প্রচেষ্টার এই স্কুলটিতে নার্সারিতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১৯। প্রথম শ্রেণীতে ১৬, দ্বিতীয় শ্রেণীতে ১১, তৃতীয় শ্রেনীতে ১৩ আর চতুর্থ শ্রেনীতে ৯ জন খাতা কলমে থাকলেও স্কুলে আসে ৬ জন। এই স্কুলের ৫ শিক্ষার্থী গত বছর পঞ্চম শ্রেণীর শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষা দিয়েছিল যাদের সবাই কৃতকার্য হয়েছে। কেউ কেউ জিপিএ সাড়ে চার পর্যন্ত পেয়েছে। প্রচেষ্টার স্কুল শেষ করে অনেকনেই এখন মাধ্যমিক এবং উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে পড়া লেখা করছে। তারাও মাঝে মধ্যে স্কুলে আসে। এদের মাধ্যমিকে ভর্তিও করিয়ে দিয়েছে প্রচেষ্টা ফাউন্ডেশন।

প্রচেষ্টার প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য ইকরাম উদ্দিন আবীর জানান, তাদের এখন দুটি স্কুল আছে। সব মিলিয়ে ২২০ শিক্ষার্থীকে তারা পাঠদান করছেন। সরকারী পৃষ্ঠপোষকতা হিসেবে তারা বই নিচ্ছেন সরকারের কাছ থেকে। এছাড়া তাদের ১৯০ ডোনার রয়েছে। যারা প্রতিমাসে একটি বাচ্চার জন্য ৮০০ টাকা করে দিচ্ছেন। এই টাকাতেই চলছে ফাউন্ডেশনের ব্যয়। শুরুর গল্প বলতে গিয়ে আবীর জানান, একটি বস্তিতে আদম শুমারির কাজ করতে গিয়েছিলেন তিনি, সেখানে বহু বিবাহ সমস্যা যেমন প্রকট। তেমনি অনেকগুলো করে ছেলে মেয়ে যাদের কেউ স্কুলে যায় না। অশিক্ষা নিয়ে বড় হওয়ার কারণে এরা ভবিষ্যতে মাদক-সন্ত্রাসের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে। এদের জন্য শিক্ষার ব্যবস্থা করা গেলে ভবিষ্যত সুন্দর হবে এই তাড়না থেকে বন্ধুরা মিলে গড়ে তোলেন প্রচেষ্টা ফাউন্ডেশন।

এই স্কুলে যারা পড়ছেন তাদের সকলের দুপুরের খাবারের আয়োজন করছে এক টাকায় খাবার কর্মসূচী। সব মিলিয়ে ১২৩ জনের এই গ্রুপটি নিজেদের কাজের পাশাপাশি বাড়তি কাজ করে মানুষের মুখে খাবার তুলে দেয়ার কাজ করছেন। প্রচেষ্টার বাইরেও তারা আরও কয়েকটি স্কুল এবং এতিমখানার বাচ্চাদের খাবার দিয়ে থাকেন।

এক টাকায় খাবারের প্রধান সমন্বয়ক রাফাত নূর বলেন, তিনি এক সময় বিশ্বখ্যাত চিত্রশিল্পী এস এম সুলতানের কাছে ছবি আঁকা শিখেছেন। সেখান থেকেই ছবি এঁকে মানুষের মুখে খাবার তুলে দেয়ার অনুপ্রেরণা পেয়েছেন। সুলতান তার আঁকা ছবি বিক্রি করে শিশুদের মুখে খাবার তুলে দিতেন। ২০১১ সালের কথা ঢাকায় বস্তির পাশের চায়ের দোকানে আড্ডা দিতে গিয়ে মনে হয়েছে শহরের অনেক মানুষই খাবারের কষ্টে আছেন। শুরুতে বন্ধুরা মিলে কয়েকজনের খাবারের ব্যবস্থা করতেন। আস্তে আস্তে সেই উদ্যোগ সম্প্রসারিত হয়েছে। অনেক মানুষ যোগ দিয়েছে এই সুউদ্যোগের সঙ্গে। এখন ঢাকা এবং বরিশাল মিলিয়ে কয়েকটি জায়গাতে খাবার দেয়া হয়। তিনি জানান, একটু বাড়তি কাজ করে উদ্যোগের সঙ্গে সম্পৃক্ত মানুষ অর্থের যোগান দেন। এরপর যেখানে খাবার দেয়া হবে সেখানের আশপাশের কোন বাড়িতে কোন স্বেচ্ছাসেবক সংগ্রহ করা হয়। তার বাড়ির রান্নাঘর বা বাড়ির ছাদ, সামনের খোলা জায়গাতে খাবার রান্না করে প্যাকেট করে বিতরণ করা হয়। রাফাত জানান, প্রতিমাসে তারা ছবি একে ৪ থেকে ৫ লাখ টাকা আয় করেন। এমন ২৮ চিত্র শিল্পী রয়েছেন। তবে ৫ থেকে ৬ জন নিয়োমিত ছবি আঁকছেন। যারা প্রতিমাসে আয়ের পুরোটাই দিয়ে থাকেন এই কাজে।

রাফাতের সঙ্গে ছবি এঁকে মহৎ উদ্যোগকে এগিয়ে নিতে হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের ছাত্রী রিয়াজাতুন নেসা। তিনি চট্টগ্রামে বসবাস করলেও তিনি এই উদ্যোগের সম্পৃক্ত হয়ে নিয়মিতই ছবি আঁকছেন। ¯্রফে নিজের ভাল কাজের তাড়না থেকে এই কাজটি করছেন। পড়া লেখার পাশাপাশি মানবতার জন্য কাজ করতে গিয়ে আনন্দ খুঁজে পান বলে জানান তিনি।

ঢাকার একটি বেসরকারী প্রতিষ্ঠানে কাজ করার পাশাপাশি এক টাকায় খাবার কর্মসূচীর জন্য ছবি আঁকছেন ইশতিয়াক মাহমুদ। তিনি জানালেন, রাতে সব কাজ শেষ করে ছবি আঁকতে বসেন। সারাদিন কাজের চাপ থাকে। কিন্তু তারপরও রাতে ছবি আঁকেন নিয়মিত।

এদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল কোন কোন ছবি তারা ৫০ হাজার টাকায়ও বিক্রি করেন। কিন্তু ক্রেতারা কখনোই জানতে পারেন না তাদের এই অর্থ ব্যয় হয় মানবতার সেবা। কেন জানলে তো ক্রেতারা বেশি টাকাও দিতে পারতেন এমন প্রশ্নে এদের একজন জানালেন, তাহলে শিল্পর গুণগত মান নিয়ে প্রশ্ন তুলত। মনে করত এটা একটি দান। কিন্তু আমরা দান হিসেবে কোন কিছুই নিতে চায়নি। এরা জানালেন কারও বিশেষ দিনে কেউ কেউ খাবারের টাকা দিলে আমরা নিয়ে থাকি। ওই মানুষটিকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। কোন কোন ক্ষেত্রে এরা আসেন। নিজের হাতে অসহায় এসব মানুষদের খাইয়ে তাদের ভাল লাগে বলেই আরও মানুষকে বলেন। এভাবে এগিয়ে চলে এক টাকায় খাবার।

শীর্ষ সংবাদ:
গার্মেন্টসে প্রচুর অর্ডার ॥ কর্মসংস্থানের বিরাট সুযোগ         দারিদ্র্য বিমোচনে দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর কাজ করা উচিত         শেয়ারবাজারে বড় দরপতন বিনিয়োগকারীরা রাস্তায়         সাম্প্রদায়িক হামলায় জড়িতদের কঠোর শাস্তি দাবি         প্রশাসনে পদোন্নতি পেতে তদবিরের ছড়াছড়ি         ছোট অপারেশন হয়েছে খালেদা জিয়ার         সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষায় ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধের বিকল্প নেই         রূপপুর পরমাণু বিদ্যুত কেন্দ্রের সঞ্চালন লাইন নিয়ে শঙ্কা         ইলিশ ধরতে জেলেরা আবার নদীতে ॥ উঠে গেল নিষেধাজ্ঞা         সিডিউলবিহীন বিমানেই চোরাচালান         রবির অভিযুক্ত শিক্ষকের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়ার সুপারিশ         সিনহাকে হত্যা করতে ওসি প্রদীপের নির্দেশে সড়কে ব্যারিকেড         তুচ্ছ ঘটনায় টেকনাফে বৌদ্ধ বিহারে হামলা, অগ্নিসংযোগ         বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে আগ্রহী পাকিস্তান         করোনা : গত ২৪ ঘন্টায় ৫ জনের মৃত্যু, শনাক্ত ২৮৯         আবাসিক এলাকায় নতুন গ্যাস সংযোগ কেন নয়, হাইকোর্টের রুল         বিতর্কিতদের নয়, ত্যাগীদের নাম কেন্দ্রে পাঠানোর নির্দেশনা         অনিবন্ধিত ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান বন্ধ হবে : বাণিজ্যমন্ত্রী         তদন্তের সময় অনৈতিক সুবিধা দাবি ॥ দুদকের কর্মকর্তাকে হাইকোর্টে তলব         বাংলাদেশকে স্বর্ণ চোরাচালানের রুট বানিয়েছে পার্শ্ববর্তী দেশ