ঢাকা, বাংলাদেশ   সোমবার ০৩ অক্টোবর ২০২২, ১৮ আশ্বিন ১৪২৯

শংকর লাল দাশ

সাগরপারের তরমুজ চাষীদের সফলতা

প্রকাশিত: ০৭:১৮, ২৪ জুন ২০১৮

সাগরপারের তরমুজ চাষীদের সফলতা

তরমুজ চাষে সচ্ছলতা কিংবা বাণিজ্যিক ভিত্তিতে তরমুজ চাষ, এক-দেড় দশক আগেও সাগরপারের চাষীদের কাছে ছিল অকল্পনীয় বিষয়, এখন তা শুধু বাস্তবই নয়। তরমুজ চাষে অসংখ্য চাষী এরইমধ্যে পাল্টে ফেলেছে নিজেদের ভাগ্য। বহু চাষী পেয়েছে আশাতীত অর্থনৈতিক সাফল্য। এর পাশাপাশি স্বাদ, গন্ধ, আকারে উপকূলের তরমুজ গোটা দেশের মানুষের মন জয় করে নিয়েছে। এমনকি বিদেশেও যাচ্ছে সাগরপারের তরমুজ। আর অভাবনীয় এ সাফল্যে নেপথ্যে রয়েছে চাষীদের নিরলস চেষ্টা-পরিশ্রম, কৃষি বিজ্ঞানীদের একের পর এক উদ্ভাবন, কৃষি বিভাগীয় কর্মকর্তাদের তৎপরতা, সর্বোপরি সরকারের কৃষিবান্ধব নীতির বাস্তবায়নসহ নানামুখী উদ্যোগ-আয়োজন। বর্তমানে তরমুজ চাষ এতটাই সম্প্রসারিত হয়েছে যে, তা চাষীদের কাছে উৎপাদিত অন্যতম কৃষিপণ্য হয়ে উঠেছে। তরমুজের চাষ সাগরপারের উপকূলীয় অঞ্চলে নতুন নয়। বিশেষ করে বৃহত্তর বরিশাল অঞ্চলে বহু আগ থেকেই হতো। তবে এর চাহিদা ছিল সীমিত। স্থানীয় জাতের হওয়ায় এর ফলন হতো কম। বাণিজ্যিক মূল্য তেমন ছিল না। কিন্তু গত এক-দেড় দশকে এ চিত্রের ব্যাপক পরিবর্তন ঘটেছে। একের পর এক হাইব্রিড জাতের বীজের আগমন আর কৃষি বিজ্ঞানীদের উদ্ভাবন, তরমুজ চাষের খোলনলছে পাল্টে দিয়েছে। যতদুর সম্ভব খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শুরুটা হয়েছিল পটুয়াখালীর উপকূলীয় চরাঞ্চলে। প্রথমে কয়েক চাষী হাইব্রিড জাতের বীজ সংগ্রহ করে পরীক্ষামূলক তরমুজ চাষ করেছিল। শুরুতেই বাজিমাত হওয়ায় এগিয়ে আসে ব্যাপক সংখ্যক চাষী। সাগরপারের চরাঞ্চলের মাটি সাধারণত বেলে-দোআঁশ এবং দোআঁশ ধরনের। একটা সময়ে কেবল আমন ধান উৎপাদিত হতো। বছরের বাকি সময়ে মাইলের পর মাইল জমি ফাঁকা পড়ে থাকত। কৃষকদের পরিশ্রমে ফাঁকা জমি যখন তরমুজ চাষে সাফল্য নিয়ে এলো, তখন তা চারদিকে ছড়িয়ে পড়তে সময় লাগেনি। গত কয়েক বছরে উপকূলের পটুয়াখালী, বরগুনা, ভোলাসহ সাগরপারের জেলাগুলোতে ব্যাপক আকারে তরমুজের চাষ সম্প্রসারিত হয়েছে। এখাতে প্রতি বছর বিনিয়োগ হচ্ছে শত শত কোটি টাকা। খ-কালীন হলেও কর্মসংস্থান হচ্ছে ব্যাপক সংখ্যক মানুষের। কেবল মাঠেই নয়। পরিবহন ও বাজারজাতকরণেও প্রচুর মানুষ দেখছে লাভের মুখ। আর চাষীরা তো লাভবান হচ্ছেই। বরিশাল অঞ্চলে সবচেয়ে বেশি তরমুজের চাষ হয় পটুয়াখালী, বরগুনা ও ভোলা জেলার চরাঞ্চলে। গত কয়েক বছরে তরমুজ চাষের বিস্তৃতি এতটাই হয়েছে, যে এই তিন জেলায় প্রায় ৪০ হাজার হেক্টর জমিতে তরমুজের চাষ হয়েছিল। অকাল বর্ষণের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ না হলে তরমুজ চাষ আরও বেশি সম্প্রসারিত হতো। গত বছর এই তিন জেলায় ৩৫ হাজার ২৯১ হেক্টর জমিতে তরমুজের আবাদ হয়। কিন্তু মার্চ মাসে এক নাগারে ৬-৭ দিনের বর্ষণে ফলন বিপর্যয় ঘটে। যার ফলে এ বছর তরমুজের চাষ অনেক কমে যায়। এরপরেও বরিশাল অঞ্চলে এবার ১৯ হাজার ২৮১ হেক্টর জমিতে তরমুজের চাষ হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি তরমুজের চাষ হয়েছে পটুয়াখালী জেলার চরাঞ্চলে। একমাত্র দুমকি উপজেলা বাদে পটুয়াখালীর অপর সাত উপজেলায় এবার ১৩ হাজার ৭১৮ হেক্টর জমিতে তরমুজের চাষ হয়েছে। এর মধ্যে আবার সাগরপারের রাঙ্গাবালী উপজেলাতেই সর্বাধিক সাড়ে ৮ হাজার হেক্টর, গলাচিপায় ৪ হাজার হেক্টর, কলাপাড়ায় ৫১৫ হেক্টর, দশমিনায় ৪০০ হেক্টর, বাউফলে ২৭৫ হেক্টর, পটুয়াখালী সদরে ১৮ হেক্টর ও মির্জাগঞ্জ উপজেলায় ৫ হেক্টর জমিতে তরমুজের চাষ হয়। গত বছর ভোলা জেলায় সাড়ে ১২ হাজার হেক্টর জমিতে তরমুজের চাষ হলেও এবার তা কমে ৩ হাজার ১৬০ হেক্টর জমিতে দাঁড়িয়েছে। বরগুনা জেলায় এবার চাষ হয়েছে ২ হাজার ৫১৯ হেক্টর জমিতে। কৃষি বিভাগের কর্মকর্তা এবং চাষীরা বলছেন, এবার তরমুজ চাষে জমির পরিমাণ কমলেও উৎপাদন হয়েছে অনেক বেশি। কৃষি বিভাগ হেক্টর প্রতি ৫০ মেট্রিকটন উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করলেও কোথাও কোথাও তা ৬০-৬৫ মেট্রিকটন ছাড়িয়ে গেছে। এবার তরমুজের দামও ছিল বেশি। ফলে অধিকাংশ চাষী আশাতীত লাভের মুখ দেখেছে। তরমুজ চাষে জমির পরিমাণ কমলেও ফলন এবং দামের দিক দিয়ে চাষীরা তা পুষিয়ে নিয়েছে। তরমুজ খাতে চাষীরা প্রতি একরে সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা বিনিয়োগ করেছে। অথচ গড়ে প্রতি একরে ১০ মেট্রিকটন উৎপাদন ধরা হলেও চাষীরা ঘরে লাভ তুলেছে তার কয়েক গুণ বেশি। কেবলমাত্র পটুয়াখালীর গলাচিপা ও রাঙ্গাবালী উপজেলাতেই চাষীরা এবার প্রায় পাঁচ শ’ কোটি টাকার তরমুজ উৎপাদন করেছে। সমগ্র বরিশাল অঞ্চলে যা ৬ থেকে ৭ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা ধারণা করছেন। মাঠ পর্যায়ে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, তরমুজ চাষে এবার চাষীরা যথেষ্ট বৈচিত্র্য এনেছে। বিশেষ করে তরমুজের জাত নির্ধারণে তারা কৌশলী ছিল। অনেক চাষী সরাসরি বিদেশ থেকে হাইব্রিড জাতের বীজ আমদানি করেছে। এরমধ্যে বিগফ্যামিলি, জাগুয়ার প্লাস, মধুবালা ও ইয়োলো বার্ড তরমুজের ফলন ছিল অনেক বেশি। তরমুজ ওজন এবং আকারেও ছিল বড়। ২০-২৫ কেজি ওজনের তরমুজও মাঠে দেখা গেছে। স্বাদ, গন্ধ, আকারসহ বিভিন্ন কারণে চরাঞ্চলে উৎপাদিত গ্রীষ্মের রসালো এ ফল সারাদেশে ব্যাপক চাহিদা সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছে। বরিশালের চরাঞ্চলে এক সময়ে অনাবাদী পড়ে থাকা জমিতে এভাবে তরমুজের চাষ করে কৃষকরা শুধু চমকই দেখাচ্ছে না, একই সঙ্গে রাখছে অর্থনীতিতে অবদান। নিজেরাই নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তনে রাখছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। অনাবাদী পড়ে থাকা জমির পরিমাণ ক্রমে কমে আসছে। তরমুজের মতো নিত্য নতুন ফসল আবাদে কৃষক আগ্রহী হয়ে উঠছে। যা কৃষি অর্থনীতির জন্য নিঃসন্দেহে সুখবর।