ঢাকা, বাংলাদেশ   শনিবার ২০ আগস্ট ২০২২, ৫ ভাদ্র ১৪২৯

পরীক্ষামূলক

পরিবেশ অধিদফতর নিশ্চুপ

ভূমিদস্যুদের কালো হাত- পাহাড়ের পাদদেশ কেটে ভাড়াবাণিজ্য

প্রকাশিত: ০৬:২৩, ১৫ জুন ২০১৭

ভূমিদস্যুদের কালো হাত- পাহাড়ের পাদদেশ কেটে ভাড়াবাণিজ্য

মাকসুদ আহমদ, চট্টগ্রাম অফিস ॥ চট্টগ্রামে পাহাড়ের কোল ঘেঁষে গড়ে ওঠা পাকাঘর ও পাহাড়ের মাটি ধসের নেপথ্যে রয়েছে ভূমিদস্যুদের কালো হাত। ভূমিদস্যুরাই মূলত পাহাড় কেটে স্তরে স্তরে ভাড়াঘর নির্মাণ করছে। এসব ভূমিদস্যু ভাড়া বাণিজ্যকে কেন্দ্র করে প্রতিনিয়ত পাহাড়ের পাদদেশ থেকে চূড়া পর্যন্ত মাটি কেটে গৃহ নির্মাণ অব্যাহত রেখেছে। তবে পাহাড়তলী এলাকায় পাহাড় কেটে কাঁচাঘর নির্মাণ করলেও লালখান বাজার মতিঝর্না ও টাংকির পাহাড় এলাকায় পাহাড় কেটে পাকা গৃহনির্মাণ অব্যাহত রয়েছে। এদিকে, জেলা প্রশাসনের এাণ ও পুনর্বাসন কমিটির গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে থাকা কমিটির সদস্য পরিবেশ অধিদফতর হলেও দেখভাল করার সময় নেই দফতরটি এমন অভিযোগ সচেতনদের। দফতরটির কর্মকর্তারা অবৈধ কর্মকা- নিয়ে ব্যস্ত থাকার কারণে পাহাড় কাটা ও পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণ বসবাস অব্যাহত রয়েছে। এদিকে, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ এসব অবৈধ নির্মাণে বাধা না দেয়ায় ভূমিদস্যুদের অপতৎপরতা বেড়েই চলেছে। প্রতিবছর চট্টগ্রামে ১৩টি ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ের কোল ঘেঁষে গড়ে ওঠা হাজারো পরিবারকে অন্যত্র সরিয়ে নেয়ার বিষয়ে জেলা প্রশাসন ও সিটি কর্পোরেশন তৎপর হলেও শেষ পর্যন্ত সরকারী আমলাদের হস্তক্ষেপ ও সিটি কর্পোরেশনের ওয়ার্ড কাউন্সিলরদের যোগসাজশের কারণে টাংকির পাহাড় ও মতিঝর্না এলাকা থেকে ঝুঁকিপূর্ণদের সরিয়ে নেয়া যাচ্ছে না। ভূমিদস্যুরা ১৩টি পাহাড় এলাকা থেকে প্রতিবছর প্রায় কোটি টাকা ভাড়া আদায় করছে। এর একটি অংশ চলে যাচ্ছে পুলিশ, জেলা প্রশাসন, ওয়াসা, চউক ও ওয়ার্ড কাউন্সিলরদের হাতে। ফলে উৎসাহিত হচ্ছে ভূমিদস্যুরা। অভিযোগ রয়েছে, স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও বিএনপির নেতাকর্মী ও ওয়ার্ড কাউন্সিলররা পাল্লা দিয়ে ভূমিদস্যুদের পাহাড় কর্তনে সহযোগিতা করছে। সে সঙ্গে যুক্ত হয়েছে স্থানীয় থানা-পুলিশসহ বিভিন্ন সংস্থার আমলারা। ঝুঁকিপূর্ণ এ টাংকির পাহাড়ে একের পর এক স্থাপনা গড়ে উঠলেও চউকের অথরাইজেশন বিভাগ ও নির্মাণ কমিটি কোন ধরনের বাধা প্রদান না করায় অবৈধ স্থাপনার সংখ্যা ক্রমশ বেড়েই চলেছে। এদিকে, সিটি কর্পোরেশন ও জেলা প্রশাসন প্রতি বর্ষা মওসুমের শুরুতে মাইকে ঝুঁকিপূর্ণদের সরে যাওয়া ও পুনর্বাসনের ঘোষণা দিলেও শেষ পর্যন্ত প্রভাবশালী নেতাকর্মী ও আমলাদের কারণে থমকে যায়। পরিবেশ অধিদফতর, পুলিশ ও ভূমিদস্যুদের বিরুদ্ধে কোন ধরনের পদক্ষেপ না নেয়ায় পাহাড় কাটার ধুম যেমন বাড়ছে, তেমনি ভূমিদস্যুদের ভাড়া বাণিজ্যও থেমে নেই। জানা গেছে, চট্টগ্রামে ১৩টি পাহাড়ের মধ্যে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে লালখান বাজারস্থ মতিঝর্না ও ওয়াসার টাংকির পাহাড়। সেখানে পাহাড়ের পাদদেশ থেকে শুরু করে চূড়া পর্যন্ত সিঁড়ির মতো পাহাড় কেটে পাকাঘর নির্মাণ করা হয়েছে। এ টাংকির পাহাড়ে রয়েছে দ্বিতল ভবনও। দুই থেকে আড়াই ফুট সরু সুরঙ্গের মতো চলাচলের পথ রেখেই এসব স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে। বাধা দেয়ার কেউ নেই। কারণ যারা বাধা দেয়ার সংস্থা তারাই মাসোয়ারায় ডুবে রয়েছে। ফলে টাংকির পাহাড় দূর থেকে অনেকটা পর্যটন স্পটের মতো দেখা যায়। জিলাপীর প্যাঁচের মতো এ পাহাড়ে গড়ে উঠেছে তিন হাজারেরও বেশি মানুষের আবাসস্থল। বিদ্যুত, গ্যাস, পানির সব ধরনের ৬ উপযোগিতা বিদ্যমান থাকায় এ পাহাড় ছেড়ে কেউ অন্যত্র যেতে চায় না। কম ভাড়ার কারণে এমনকি নগরীর প্রাণকেন্দ্রে এ পাহাড়ের অবস্থান হওয়ায় জনবসতি ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। জনবসতির আধিক্য থাকায় ভূমিদস্যুরাও এ দফাটিকে ভাড়া বাণিজ্যের সর্বোত্তম পন্থা হিসেবে ব্যবহার করছে। মঙ্গলবার সকালে লালখান বাজারের ওয়াসার টাংকির পাহাড়ে গিয়ে দেখা গেছে, স্থানীয় ভূমিদস্যু ও পাহাড় খেকো আকবর পাহাড়ের চূড়ায় সোজাভাবে কেটে সেমিপাকা ঘর নির্মাণ করেছে। কর্তনকৃত পাহাড়ের গা ঘেঁষেই মাত্র ৫ ইঞ্চি গাথুনির প্রায় একশ ফুট লম্বা সীমানা প্রাচীন তৈরি করেছে। এ সীমানা প্রাচীরকে কাজে লাগাতে গিয়ে তৈরি করা হয়েছে সেমিপাকা ঘর। পাহাড়ের মাটির সঙ্গে লাগিয়ে টিনের চাল দিয়ে সেমিপাকা ঘর নির্মাণ করা হলেও মাটি ও দেয়ালের মাঝখানের অংশটুকু ফাঁকা ছিল। এ ঘরের যেসব ভিম দেয়া হয়েছে মাত্র তিন সূতা পরিমাপের চারটি রডের সমন্বয়ে গঠিত ছয় ঘন ইঞ্চি পুরত্বের। যা দেয়ালের চাপে খুব সহজে যে কোন দুমড়ে-মুচড়ে যাবে। এ ব্যাপারে রেলওয়ে ল্যান্ড ও ইভিকশন ম্যাজিস্ট্রেট ও বিভাগীয় ভূ-সম্পত্তি কর্মকর্তা ইশরাত রেজা জনকণ্ঠকে জানান, বিভিন্ন সময়ে পাহাড়ের চূড়ায় ও পাদদেশে থাকাদের ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থান থেকে সরিয়ে নেয়া হয়। কিন্তু অভিযান টিমের সামনে দিয়ে তল্পিতল্পাসহ এসব পরিবার সরে গেলেও শেষ পর্যন্ত কয়েক দিনের মধ্যেই আবার ফিরে আসে। এর কারণ হলোÑ পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে কম ভাড়ায় থাকতে উৎসাহিত করছে ভূমিদস্যুরা। আবার অভিযান টিম তাৎক্ষণিক গ্যাস, বিদ্যুত ও ওয়াসার অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করলেও পরক্ষণে আবারও অবৈধ সংযোগ ঠাঁই পাচ্ছে পাহাড়ে।