ঢাকা, বাংলাদেশ   শুক্রবার ১৯ আগস্ট ২০২২, ৪ ভাদ্র ১৪২৯

পরীক্ষামূলক

ব্যতিক্রমী আয়োজন বিএসএমএমইউতে

শোক নয় শুধু, মুজিব থেকে প্রেরণা

প্রকাশিত: ০৬:০২, ২৯ আগস্ট ২০১৬

শোক নয় শুধু,  মুজিব থেকে প্রেরণা

মোরসালিন মিজান ॥ বিয়োগ ব্যথার আগস্ট। পিতা হারানোর বেদনা বুকে বাজছে। নানা ভাব ভাষায় তা প্রকাশিত। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসেও শোকের আবহ। তবে স্বাধীনতার মহানায়কের নামে যে প্রতিষ্ঠানের নাম, সেখানে শোকই শেষ কথা নয়। প্রেরণার অনন্ত উৎস হিসেবে সামনে রাখা হয়েছে বাঙালীর অবিসংবাদিত নেতাকে। রাজনীতির উত্তম পুরুষ দেশের সেবায় আত্মনিয়োগ করেছিলেন। জনগণের জন্য সপে দিয়েছিলেন নিজেকে। তাঁর আত্মত্যাগ ও সেবার মানসিকতায় উদ্বুদ্ধ হয়ে কাজ করার ওপর জোর দিয়েছেন প্রতিষ্ঠানের চিকিৎসকরা। ‘রোগীর সোবায় হই আরও যতœবান’ সেøাগানে সুচিন্তিত কর্মসূচী পালন করছেন। বঙ্গবন্ধু দ্বারা উদ্বুদ্ধ হওয়ার পূর্ব শর্তÑ তাঁকে ভাল করে জানা। সেই লক্ষ্যে প্রশাসনিক ভবনের নিচতলায় বিশেষ আলোকচিত্র প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়েছে। এখানে একটি দেয়ালে জাতির জনকের স্থায়ী ম্যুরাল। হামিদুজ্জামান খানের অনন্য সাধারণ রিলিফ ওয়ার্ক দেখে মন ভরে যায়। আগস্টের প্রায় প্রতিদিন জনকের প্রতিকৃতির সামনে এসে দাঁড়াচ্ছেন মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। বাকি তিন দেয়ালে টানানো হয়েছে আলোকচিত্র। শতাধিক ছবি। দেখা অদেখা অল্প দেখা। এসব ছবিতে জাতির জনকের বন্ধুর পথচলা। সংগ্রামমুখর জীবন। শেখ মুজিব দেশকে ভালবাসতেন। দেশের মানুষের প্রতি প্রেম ছিল তাঁর। এই প্রেম থেকেই রাজনীতিতে আসা। কেমন ছিল আসার সময়টা? উত্তর দিচ্ছে আলোকচিত্র। একেবারে তৃণমূল থেকে তুলে ধরছে শেখ মুজিবুর রহমানকে। একাধিক ছবিতে কিংবদন্তি নেতাদের সান্নিধ্যে রাজনীতির মনোযোগী ছাত্র। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে পায়ে হেঁটে এগিয়ে চলেছেন। ক্ষণজন্মা নেতার মূল অবদান বাংলাদেশ সৃষ্টিতে। পাকিস্তানের বৈষম্যমূলক নীতির বিরুদ্ধে বাঙালীকে ঐক্যবদ্ধ করেছিলেন তিনি। ধাপে ধাপে এগিয়ে নিয়েছিলেন আন্দোলন সংগ্রাম। প্রদর্শনীর ছবিতে উত্তাল সময়ের খ-চিত্র। বাঙালীর স্বাধিকার আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়ায় বার বার কারাবরণ করতে হয়েছে জাতির জনককে। এমনকি, বহু আগে ১৯৪৯ সালের ২৭ জুলাই তোলা ছবিতে দেখা যায় কারাগার থেকে বের হয়ে আসছেন নেতা। পরবর্তী জীবনেও বহু কারাবাস। তবু মুজিব ছিলেন অপ্রতিরোধ্য। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে বিপুল চমক নিয়ে হাজির হন তিনি। নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে তাঁর দল আওয়ামী লীগ। কিন্তু ক্ষমতা হস্তান্তর করতে রাজি হয় না পাকিস্তানীরা। আলোকচিত্রে দেখা যায়, জুলফিকার আলী ভুট্টোর সঙ্গে বৈঠক করছেন মুজিব। কিন্তু কোন ফল আসে না। উল্টো ২৫ মার্চ রাতে বাঙালী নিধন শুরু করে পাকিস্তানীরা। বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করে নিয়ে যাওয়া হয় পশ্চিম পাকিস্তানে। কোন কিছুই স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্নকে রুখতে পারেনি। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর আসে কাক্সিক্ষত বিজয়। মুক্ত শেখ মুজিব দেশ গড়ার কাজে আত্মনিয়োগ করেন। শুধু তাই নয়, দেশ ও জনগণের জন্য এমনকি নিজের জীবন বিসর্জন দেন। সবই স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে প্রদর্শনী। একটু মনোযোগ দিয়ে দেখলে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালীর নিবেদনটুকু উপলব্ধি করা যায়। চিকিৎসকরা সে চেষ্টা করছেন বলেই মনে হচ্ছে। একই উদ্দেশ্যে বঙ্গবন্ধুর আত্মজীবনী পাঠ ও পর্যালোচনার ওপর জোর দেয়া হয়েছে। অনেকেই অভিযোগ করেন, ডাক্তাররা একাডেমিক বইয়ের বাইরে তেমন যেতে চান না। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শোক দিবসের আয়োজনে দেখা গেল ভিন্ন চিত্র। অনবদ্য গ্রন্থ ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ পুনর্পাঠে শিক্ষার্থীরা মহান নেতাকে আরও নিবিড়ভাবে জানার চেষ্টা করছেন। আবিষ্কারের চেষ্টা করছেন। জানা যায়, স্বতন্ত্র আয়োজন থেকে পাঠ অভিজ্ঞতা তুলে ধরবেন তারা। জাতির জনককে নিয়ে আবেগ অনুভূতির কথা জানাবেন। এভাবে বঙ্গবন্ধুকে জানা এবং জানানোর পাশাপাশি, মহান নেতার জীবন থেকে শিক্ষা নেয়ার একটি চেষ্টা পরিলক্ষিত হচ্ছে বিএসএমএমইউতে। জাতির জনকের দেশপ্রেম মানবপ্রেম দ্বারা উদ্বুদ্ধ হয়ে কাজ করার নতুন শপথ নিচ্ছেন চিকিৎসকরা। চমৎকার উদাহরণ হতে পারে, গত ১৫ আগস্ট পরিচালনা করা ফ্রি মেডিক্যাল ক্যাম্পটি। রোগীর সংখ্যাটা অবাক হওয়ার মতো। ৫ হাজার ৭শ ৭৫ জন। প্রত্যেকে বিনা খরচে চিকিৎসা সেবা পেয়েছেন। সিনিয়র এবং স্বনামখ্যাত ডাক্তাররা বহুবিধ ব্যস্ততায় কাটান। তাদের দেখা সাধারণ রোগীরা পান না। পান না বললেই চলে। অথচ বঙ্গবন্ধুর ভালবাসাবোধ সেবার মানসিকতা নিজেদের মধ্যে ধারণ করতেই কেমন বদলে যায় দৃশ্যটা! সেদিন অন্য ব্যস্ততা ঝেরে ফেলে ক্যাম্পে যোগ দেন সকল ডাক্তার। প্রায় প্রতিটি বিভাগের প্রধান ও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা সশরীরে উপস্থিত থেকে রোগী দেখেন। জাতির জনককে অনুপ্রেরণার উৎস করে আগামী দিনগুলোতে এমন আরও অনেক উদ্যোগ গ্রহণ করার কথা জানান বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ডাঃ কামরুল হাসান খান। জনকণ্ঠকে তিনি বলেন, জাতির জনক আমাদেরকে অনেক দিয়েছেন। দেখিয়েছেন, কীভাবে দেশকে দেশের মানুষকে ভালবাসতে হয়। সেখান থেকে সামান্য অনুপ্রেরণা নেয়া সম্ভব হলে অনেক ভাল ফল আসতে পারে। এ চিন্তা থেকেই বঙ্গবন্ধুকে ভাল করে জানা ও তাঁর দ্বারা অনুপ্রাণিত হওয়ার বিষয়টিকে সামনে এনেছি আমরা। মহান নেতার আত্মত্যাগ, নিজেকে উজার করে দেয়ার শিক্ষা নতুন প্রজন্মের ডাক্তারদের মধ্যে সঞ্চারিত করতে চাই। তাহলে রোগীর সেবার মান আরও অনেক উন্নত হবে। এ লক্ষ্যে আগস্টের পরও বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করার কথা জানান উপাচার্য।