১ এপ্রিল ২০২০, ১৮ চৈত্র ১৪২৬, বুধবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
 

বাংলা ভাষা, বাংলাদেশ ও বাঙালীর ত্রাণকর্তা

প্রকাশিত : ১৫ ফেব্রুয়ারী ২০২০
  • তাপস হালদার

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার ‘সভ্যতার সঙ্কট’ প্রবন্ধে লিখেছেন আজও আশা করে আছি পরিত্রাণ কর্তা আসবে সভ্যতার দৈববাণী নিয়ে চরম আশ্বাসের কথা শোনাবে পূর্ব দিগন্ত থেকে। বাঙালীর ভাগ্যাকাশে সেই ত্রাণকর্তা হয়ে আবির্ভূত হয়েছিলেন হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালী জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠী সচেতনভাবে বাঙালীর অধিকার হরণ করতে চেয়েছিল। তারা চেয়েছিল সংখ্যালঘু জনগণের ভাষা উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে চাপিয়ে দিতে। কিন্তু তাদের সেই অপতৎপরতার বিরুদ্ধে গর্জে উঠেছিলেন বাঙালীর ত্রাণকর্তা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। আজীবন বাঙালীর এই মহান নেতা মাতৃভাষাকে প্রতিষ্ঠিত করতে আন্দোলন, কারাবরণ, পরে আইন সভার সদস্য হিসেবে অসামান্য অবদান রাখেন। রাষ্ট্রভাষা দাবি আদায়ের আন্দোলনে তিনি যেমন ছিলেন একজন সক্রিয় কর্মী তেমনি ছিলেন সাংগঠনিক নেতাও। বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার আন্দোলনের মাধ্যমেই তিনি পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের সঙ্গে প্রথম সম্পৃক্ত হয়েছিলেন।

কিন্তু ১৯৪৭ সালে ভাষা, সংস্কৃতি, ইতিহাস ও ঐতিহ্যে কোন মিল না থাকার পরও শুধু ধর্মের দোহাই দিয়ে বার শ’ মাইল ব্যবধানের দুটি পৃথক ভূখণ্ডকে এক করে পাকিস্তান নামক একটি উদ্ভট রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছিল। সমগ্র পাকিস্তানের ৫৬ শতাংশ মানুষের ভাষা ছিল বাংলা। অন্যদিকে কেবলমাত্র ৭.২ শতাংশ মানুষ কথা বলত উর্দুতে। সেই উর্দুকেই পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী রাষ্ট্রভাষা করার জন্য জোর পাঁয়তারা শুরু করল।

১৯৪৭ সালে পাকিস্তান জন্মের পরপরই কলকাতার সিরাজউদদৌলা হোটেলে পূর্ব পাকিস্তানে একটি অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক আন্দোলন ও সংগঠন করার সিদ্ধান্ত হয়। সে প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তৎকালীন ছাত্রনেতা শেখ মুজিবুর রহমান। ফলে ৬ ও ৭ সেপ্টেম্বর ঢাকায় পূর্ব পাকিস্তানের কর্মী সম্মেলনে গণতান্ত্রিক যুবলীগ গঠিত হয়। সে সম্মেলনে যেসব প্রস্তাব গৃহীত হয় তার মধ্যে অন্যতম ছিল বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি। সেখানে বলা হয়েছিল পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের লেখার বাহন ও আইন-আদালতের ভাষা বাংলা করা হোক। গৃহীত প্রস্তাবনা পাঠ করেন সেদিনের ছাত্রনেতা শেখ মুজিবুর রহমান। বঙ্গবন্ধু কলকাতা থেকে ঢাকায় ফিরে সরাসরি ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে শরিক হয়ে যান। ভাষা আন্দোলনের শুরুতে তমুদ্দীন মজলিসের রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে সরাসরি যুক্ত হন। ১৯৪৭ সালে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ যখন ভাষা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে গণস্বাক্ষর অভিযান শুরু করে তখন থেকেই তিনি এর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ৪৭ সালে ডিসেম্বর মাসে ১৪ জন ভাষা বীর সর্বপ্রথম ২১ দফা দাবি নিয়ে একটি ইশতেহার প্রণয়ন করেছিলেন। ইশতেহারের দ্বিতীয় দাবিটি ছিল রাষ্ট্রভাষা বাংলা সংক্রান্ত। এই ইশতেহার প্রণয়নে শেখ মুজিবুর রহমানের অবদান ছিল অসামান্য। তিনি ছিলেন অন্যতম স্বাক্ষরদাতা। ১৫০ নং মোগলটুলির ‘ওয়ার্কার্স ক্যাম্প’ ছিল সে সময়ের প্রগতিশীল ছাত্র-যুব ও রাজনৈতিক কর্মীদের মিলনকেন্দ্র। ভাষা আন্দোলনের সপক্ষের কর্মীরা নিয়মিত এখানে মিলিত হতো এবং বিভিন্ন কর্মপন্থা নির্ধারণ করত। শেখ মুজিব, শওকত আলী, কামরুদ্দিন আহমেদ প্রমুখ নেতা ছিলেন এই ক্যাম্পের প্রাণশক্তি। ১৯৪৮ সালের ২ মার্চ ফজলুল হক মুসলিম হলের তমুদ্দীন মজলিস ও মুসলিম ছাত্রলীগের যৌথ সভায় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ পুনর্গঠন করা হয়। সভায় উপস্থিত ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান, শামসুল হক, আবুল কাশেম, রণেশ দাশগুপ্ত, অজিত গুহসহ অন্য নেতৃবৃন্দ। সভায় রাষ্ট্রভাষার দাবিতে সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ গঠনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এতে গণআজাদী লীগ, গণতান্ত্রিক যুবলীগ, পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ, তমুদ্দুন মজলিস ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রহলগুলোর ছাত্র সংসদ থেকে দু’জন করে প্রতিনিধি নিয়ে কমিটি গঠন করা হয়।

১ মার্চ প্রচার মাধ্যমে একটি বিবৃতি দেয়া হয় যে, ১১ মার্চ পূর্ব পাকিস্তানে ভাষার দাবিতে হরতাল হবে। বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেন অধ্যাপক আবুল কাশেম (তমুদ্দুন মজলিস সম্পাদক), শেখ মুজিবুর রহমান (পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম লীগ কাউন্সিলের সদস্য), নঈম উদ্দিন আহমেদ (পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের আহ্বায়ক) এবং আব্দুর রহমান চৌধুরী (দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার যুব সম্মেলনে পাকিস্তানী প্রতিনিধি দলের নেতা)। জাতীয় রাজনীতি ও রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে এই বিবৃতির গুরুত্ব অপরিসীম। ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে এক অনন্য অবিস্মরণীয় দিন। এই দিন ভাষার দাবিতে প্রথম হরতাল পালিত হয়। এটাই হলো পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর প্রথম হরতাল। হরতালের নেতৃত্ব দেন শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি পুলিশী নির্যাতনের শিকার হন এবং পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর প্রথম গ্রেফতার হন। ১৬ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলায় ভাষা আন্দোলনকে বেগবান করার জন্য ছাত্র সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সভা শেষে পূর্ববাংলা আইন পরিষদ ভবন (বর্তমান জগন্নাথ হল) অভিমুখে মিছিল বের হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন সদ্য কারামুক্ত নেতা শেখ মুজিবুর রহমান। ভাষা আন্দোলন আস্তে আস্তে গণআন্দোলনে রূপ নিতে থাকে। শহর থেকে আন্দোলন সারা পূর্ব পাকিস্তানে ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে আন্দোলনে ছাত্র-যুবকদের সম্পৃক্ত করতে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তৎকালীন যুবনেতা শেখ মুজিবুর রহমান। সেজন্যই ১৯৪৯ সালের অক্টোবর মাসে তাঁকে আটক করে ১৯৫২ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত একটানা কারাগারে আটক করে রাখা হয়। সঙ্গত কারণেই ২১ ফেব্রুয়ারির রাজপথের মিছিলে সশরীরে হাজির হওয়ার সুযোগ তাঁর ছিল না। ভাষা আন্দোলনে বঙ্গবন্ধুর অবদানকে ছোট করার জন্য এতদিন প্রচার করা হতো তিনি ২১ তারিখের মিছিলে ছিলেন না। তাঁকে যে ভাষা আন্দোলনের জন্যই দু’বছরের বেশি সময় ধরে আটক করে রাখা হয়েছিল সে বিষয়টি সুকৌশলে এড়িয়ে যাওয়া হতো। জেলে বসেও তিনি সার্বক্ষণিক নেতৃবৃন্দকে চিরকুট লিখে পরামর্শ ও দিকনির্দেশনা দিতেন।

এ প্রসঙ্গে ভাষাসৈনিক গাজীউল হক তাঁর স্মৃতিকথায় লিখেছেন, ১৯৪৯ সালে অক্টোবর মাসে গ্রেফতার হওয়ার পর জনাব শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বিভিন্ন জেলে আটক ছিলেন। ফলে স্বাভাবিক কারণেই ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের সক্রিয় অংশগ্রহণ করা শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে সম্ভব ছিল না। তবে জেলে থেকেই তিনি আন্দোলনের নেতৃবৃন্দের সঙ্গে সব সময় যোগাযোগ রক্ষা করে চলতেন এবং দিকনির্দেশনামূলক পরামর্শ দিতেন।

১৯৫২ সালে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ভাষা আন্দোলনের বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে বিবৃতি দেন; কিন্তু শেখ মুজিবুর রহমান সোহরাওয়ার্দী সাহেবের মত পরিবর্তন করে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার সমর্থন আদায় করেন এবং পূর্বের বিবৃতি প্রত্যাহার করে সোহরাওয়ার্দী সাহেব বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবির প্রতি সমর্থন জানিয়ে বিবৃতি দেন ১৯৫২ সালের ২৯ জুন সাপ্তাহিক ইত্তেফাক পত্রিকায়। ১৯৫২ সালের শেষের দিকে মাওলানা ভাসানীর একটি বিবৃতি ইত্তেফাক পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। বিবৃতিতে তিনি বলেন, বাংলা ভাষার পক্ষে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মত পরিবর্তন না হলে শুধু ভাষা আন্দোলনেই নয়, আওয়ামী লীগের ভবিষ্যতও অনিশ্চিত হয়ে পড়ত। আর এই মত পরিবর্তন সম্ভব হয়েছিল একমাত্র শেখ মুজিবের জন্য।

বঙ্গবন্ধু ১৯৫৩ সালের একুশে ফেব্রুয়ারির প্রথম বার্ষিকীতে মিছিল ও আরমানিটোলার সমাবেশের বক্তব্যে একুশে ফেব্রুয়ারিকে শহীদ দিবস ও বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার জোর দাবি জানান। তিনি ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্টের মন্ত্রিসভায় দায়িত্ব পালনকালে বাংলা ভাষার উন্নয়নে বিশেষ অবদান রাখেন। স্বাধীন বাংলাদেশের ১৯৭২ সালের সংবিধানে বাংলাকে রাষ্ট্রের ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়। বাংলা ভাষায় সংবিধান তিনি প্রণয়ন করেন। এটিই একমাত্র সংবিধান যা বাংলা ভাষায় প্রণীত হয়েছে। তিনি স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে ১৯৭৪ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে প্রথম বাংলায় বক্তব্য দিয়ে বিশ্বসভায় বাংলাকে তুলে ধরেন। তাই আজ দেশের গণ্ডি পেরিয়ে সারাবিশ্বে ২১ ফেব্রুয়ারি পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে। ১৯৭৫ সালের ১২ মার্চ রাষ্ট্রপতি থাকাকালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান অফিসের কাজে বাংলা ভাষা প্রচলনের প্রথম সরকারী নির্দেশনা জারি করেন। আদেশে বলা হয় গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের রাষ্ট্রভাষা বাংলা। বাংলা আমাদের জাতীয় ভাষা। তবু অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে লক্ষ্য করছি স্বাধীনতার তিন বছর পরও সরকারী কাজে অধিকাংশ ক্ষেত্রে মাতৃভাষার প্রচলন হয়নি। মাতৃভাষার প্রতি যার ভালবাসা নেই দেশের প্রতি তার ভালবাসা থাকবে বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে। তিনি হৃদয় দিয়ে যেমন ভালবাসতেন এই বাংলাদেশকে তেমনি ভালবাসতেন বাংলা ভাষাকে। যতদিন বাংলা ভাষা ও বাংলাদেশ থাকবে ততদিনই বাঙালীর হৃদয়জুড়ে থাকবেন বঙ্গবন্ধু। বাংলা ভাষা, বাংলাদেশ ও বঙ্গবন্ধু একে অপরের পরিপূরক। তাই বঙ্গবন্ধুর শততম জন্মবার্ষিকীতে জানাচ্ছি বিনম্র শ্রদ্ধা ও নিরন্তর ভালবাসা।

লেখক : সদস্য, সম্প্রীতি বাংলাদেশ

[email protected]

প্রকাশিত : ১৫ ফেব্রুয়ারী ২০২০

১৫/০২/২০২০ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


শীর্ষ সংবাদ: