১৭ ফেব্রুয়ারী ২০২০, ৫ ফাল্গুন ১৪২৬, সোমবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
 

রাখাইনে গণহত্যা ॥ আইসিজেতে বিচারের শুনানির শুরুতে গাম্বিয়া

প্রকাশিত : ১১ ডিসেম্বর ২০১৯
রাখাইনে গণহত্যা ॥ আইসিজেতে বিচারের শুনানির শুরুতে গাম্বিয়া
  • সুচি সরকারের বিদ্বেষমূলক প্রচার রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন উস্কে দিয়েছে
  • গুরুত্বপূর্ণ আলামত ধ্বংস করা হয়েছে
  • সেনাবাহিনী মানবতা বিরোধী অপরাধ করেছে
  • হেগে আদালতের বাইরে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ

মোয়াজ্জেমুল হক/ চঞ্চল ঘোষ/ এইচএম এরশাদ ॥ রোহিঙ্গা গণহত্যার অভিযোগে শুনানি শুরু হয়েছে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে। নেদারল্যান্ডসের হেগের ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিস-এ (আইসিজে) মঙ্গলবার প্রথম দিনের শুনানি শেষ হয়েছে। বাংলাদেশ সময় বিকেল ৩টায় বিচারপূর্ব এই শুনানি কার্যক্রম শুরু হয়। পশ্চিম আফ্রিকার দেশ গাম্বিয়া আইসিজে-তে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে রোহিঙ্গা গণহত্যার অভিযোগ এনেছে। আন্তর্জাতিক এ আদালতে গাম্বিয়ার বিচারমন্ত্রী আবু বাকার তাম্বাদু শুনানিতে অংশ নিয়েছেন। অপরদিকে, মিয়ানমারের পক্ষে যে প্রতিনিধি দল পাঠানো হয়েছে তাতে নেতৃত্ব দিচ্ছেন সে দেশের এনএলডি নেত্রী আউং সান সুচি। খবর রয়টার্স, বিবিসি, সিএনএন, আলজাজিরা, এপি ও এএফপির।

এদিকে, কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফের রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে রোহিঙ্গা গণহত্যার অভিযোগের বিচার শুরু হওয়ায় রীতিমতো উল্লাস শুরু হয়েছে। এ পরিবেশ চলছে গত দু’দিন ধরে। তবে মঙ্গলবার বিচারপূর্ব শুনানির প্রথম দিনে রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে গাম্বিয়ার পক্ষে স্লোগান উঠেছে। পাশাপাশি আউং সান সুচিকে হত্যাকা-ের নায়ক ও খুনী অভিহিত করে স্লোগান দিয়েছে রোহিঙ্গারা। এছাড়া গত আড়াই বছরেরও বেশি সময় ধরে রোহিঙ্গাদের চাপে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত উখিয়া-টেকনাফের জনগণও আশায় বুক বেঁধেছে এ কারণে যে, এবার যদি রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেয়ার কোন ব্যবস্থা হয়। এ মামলার শুনানিতে রোহিঙ্গাদের আশ্রয়দাতা দেশ বাংলাদেশের ১৭ প্রতিনিধি দলও অংশ নিচ্ছে বলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানানো হয়েছে।

মঙ্গলবার শুনানির শুরুতে গাম্বিয়ার বিচারমন্ত্রী বলেন, রোহিঙ্গা মুসলমানদের নির্বিচারে হত্যার প্রশ্নে বিশ^ বিবেককে জাগ্রত করতেই তার দেশ আইসিজে-তে অভিযোগ এনেছে। তিনি বলেন, সারাবিশ^ কেন নীরব দর্শক? কেন আমাদের জীবদ্দশাতে আমরা এটা ঘটতে দিচ্ছি? গাম্বিয়ার মন্ত্রী আরও বলেন, ‘সবাই মনে করে এখানে মিয়ানমারের বিচার হচ্ছে। মূলত, এখানে বিচার চলছে আমাদের সামগ্রিক মানবতার। গণহত্যার অভিযোগে শুনানির প্রথম দিনে যখন রোহিঙ্গাদের ওপর সে দেশের সামরিক বাহিনীর সদস্যদের একের পর এক নৃশংসতার ঘটনা তুলে ধরা হচ্ছিল, তখন সেখানে পাথরের মতো মুখ করে বসেছিলেন মিয়ানমার নেত্রী আউং সান সুচি।

গণহত্যার অভিযোগে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে আইসিজেতে মামলার শুনানির শুরুতে সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা মুসলিমদের নির্বিচারে হত্যাকাণ্ড বন্ধে দেশটির প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন গাম্বিয়ার আইন ও বিচারমন্ত্রী। শুনানির শুরুতে প্রধান বিচারপতির উদ্দেশে তিনি বলেন, গাম্বিয়া যা বলছে তা হলো আপনি মিয়ানমারকে এই নির্বাচার হত্যাকাণ্ড বন্ধ করতে বলুন। বর্বর এবং র্নশংস এসব কাজ; যা আমাদের সবার বিবেককে আঘাত করেছে। এটি এখনও অব্যাহত রয়েছে। নিজ দেশের মানুষকে গণহত্যা বন্ধ করতে হবে। শুনানির শুরুতে এ মামলার প্রধান বিচারপতি আব্দুল কাই আহমেদ ইউসুফ অভিযোগ পড়ে শোনান। সোমালীয় বংশোদ্ভূত এই বিচারপতি পরে গাম্বিয়া ও মিয়ানমারের পক্ষে একজন করে অস্থায়ী বিচারক নিয়োগ দেন। দুই অ্যাডহক বিচারপতি গাম্বিয়ার নাভি পিল্লাই এবং মিয়ানমারের প্রফেসর ক্লাউস ক্রেস। তারা মামলার বিচার প্রক্রিয়ার শুরুতে শপথ নেন।

ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিসের (আন্তর্জাতিক আদালত) ১৫ বিচারকের সঙ্গে প্যানেলে আছেন গাম্বিয়া ও মিয়ানমারের মনোনীত দুই বিচারক। তিন দিনের শুনানি শেষে সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে তারা সিদ্ধান্ত দেবেন।

শুনানিতে গাম্বিয়ার অভিযোগের পক্ষে আরও বলা হয়েছে, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সংখ্যালঘু রোহিঙ্গাদের ওপর যে বর্বরতা চালানো হয়েছে তাতে মিয়ানমার আন্তর্জাতিক আইন ভঙ্গ করেছে কি না তা আইসিজে বিচার করবে। মঙ্গলবার বিকেলে বিচারিক এ আদালতে ওআইসিভুক্ত দেশ গাম্বিয়ার পক্ষে আইনমন্ত্রী আবু বাকার মারি তাম্বাদু প্রতিনিধিত্ব করছেন। তিনি সে দেশের এ্যাটর্নি জেনারেল। ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিসের ১৫ বিচারকের সঙ্গে প্যানেলে গাম্বিয়া ও মিয়ানমারের মনোনীত দুই বিচারকও রয়েছেন। প্রাথমিক শুনানি চলবে কাল বৃহস্পতিবার পর্যন্ত। শুনানি শেষে সংখ্যাগরিষ্ঠতার মতামতের ওপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত প্রদান করা হবে। এ বিচার আদালতে রাখাইনের নিপীড়িত প্রতিনিধিরাও উপস্থিত রয়েছেন। শুনানি শুরু হওয়ার আগে রোহিঙ্গা প্রতিনিধিরা ন্যায়বিচারের জন্য প্রার্থনা করেন। রাত সাড়ে ৯টায় দেড়ঘণ্টার একটি আলোচনায় মিয়ানমারের অংশ নেয়ার কথা রয়েছে। ১৫ সদস্যবিশিষ্ট আন্তর্জাতিক আদালতের প্রেসিডেন্ট সোমালিয়ার আবদুল কায়ী আহমেদ ইউসুফ এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট চীনের শুয়ি হানকিন। অন্য সদস্যরা হলেন স্লোভাকিয়ার বিচারপতি পিটার টনকা, ফ্রান্সের বিচারপতি রনি আব্রাহাম, মরক্কোর বিচারপতি মোহাম্মদ বেনুনা, ব্রাজিলের এন্থেনিও অগাস্তো কানসাদো ত্রিনদাদে, যুক্তরাষ্ট্রের জোয়ান ই ডনোঘুই, ইতালির গর্জিও গাজা, উগান্ডার জুলিয়া সেবুতিন্দে, ভারতের দলবীর ভা-ারি, জ্যামাইকার পেট্রিক লিপটন রবিনসন, অস্ট্রেলিয়ার জেমস রিচার্ড ক্রাফোর্ড, রাশিয়ার কিরিল গিভরিয়ান, লেবাননের নোয়াফ সালাম এবং জাপানের ইউজি ইউয়াসাওয়া।

আইসিজের বিধি অনুসারে, জাতিসংঘের সদস্যভুক্ত যে কোন দেশ অন্য দেশের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আইন ও বিধি বিধান লঙ্ঘনের অভিযোগ উত্থাপন করতে পারে। গণহত্যা প্রতিরোধ ও এর শাস্তি বিধানে ১৯৮৪ সালে স্বাক্ষরিত কনভেনশন লঙ্ঘনের অভিযোগ এনেছে গাম্বিয়া মিয়ানমারের বিরুদ্ধে। উল্লেখ করা যেতে পারে, ১৯৫৬ সালে জেনোসাইড কনভেনশনে স্বাক্ষর করেছে মিয়ানমার। গাম্বিয়াও এ কনভেনশনে স্বাক্ষরকারী একটি দেশ। এ কনভেনশনের আওতায় স্বাক্ষরকারী দেশগুলোই শুধু গণহত্যা থেকে বিরত থাকা নয়, বরং এ ধরনের অপরাধ প্রতিরোধ করা এবং এমন অপরাধের জন্য শাস্তি বিধানেও বাধ্য।

এদিকে, জাতিসংঘের গঠিত স্বাধীন আন্তর্জাতিক ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশন তাদের প্রতিবেদনে বলেছে, রাখাইনে সেনাবাহিনীর অভিযানে যে ধরনের অপরাধ হয়েছে, আর যেভাবে তা ঘটানো হয়েছে এর মাত্রার ধরন এবং বিস্তৃতির দিক দিয়ে গণহত্যার অভিপ্রায়কে অন্য কিছু হিসেবে চালিয়ে দেয়ার সমতুল্য। এতে আরও বলা হয়েছে, মিয়ানমার নেত্রী আউং সান সুচির বেসামরিক সরকার বিদ্বেষমূলক প্রচারকে উস্কে দিয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ আলামত ধংস করেছে এবং সেনাবাহিনীর মানবতাবিরোধী অপরাধ ও যুদ্ধাপরাধ থেকে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষদের রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে মিয়ানমার সরকারও রাখাইনে নৃশংসতায় ভূমিকা রেখেছে।

জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার এমন অভিযোগ বরাবরই অস্বীকার করে মিয়ানমার সরকার বলে আসছে, সে দেশের সেনাবাহিনীর ওই লড়াই হয়েছে সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে, কোন জাতিগোষ্ঠীকে নির্মূল করার উদ্দেশ্যে নয়।

এদিকে, গাম্বিয়া রোহিঙ্গা সঙ্কট সমাধানে অন্তবর্তীকালীন পদক্ষেপ চাইছে বলে জানিয়েছে এ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল।

এদিকে, প্রথম দিনের শুনানি শুরুর পূর্বে প্রধান বিচারক আবদুল কায়ী আহমেদ ইউসুফ রোহিঙ্গা গণহত্যার পুরো অভিযোগ পড়ে শোনান। এরপর রাখাইনে গণহত্যা নিয়ে কথা বলেন অধ্যাপক আয়াম আখাভান। তিনি জানান, কিভাবে মিয়ানমার সেনারা রাখাইনে হত্যা, লুণ্ঠন ও ধর্ষণের মতো মানবতাবিরোধী কাজে লিপ্ত ছিল। এছাড়া রোহিঙ্গাদের পুরো দেশ থেকে কিভাবে বিচ্ছিন্ন করে রাখা হয় ও নিপীড়ন চালানো হয়। জাতিসংঘের অনুসন্ধানের রিপোর্টের বরাতে তার বক্তব্যে উঠে আসে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে রোহিঙ্গাবিরোধী প্রোপাগান্ডার কথাও তুলে ধরেন তিনি। গাম্বিয়ার পক্ষে বক্তব্য দিতে গিয়ে প্রফেসর স্যান্ডিস বলেন, গণহত্যা বিচারের জন্য এ আদালতই সর্বশেষ আশ্রয়স্থল। সারাবিশ^ মামলাটির দিকে তাকিয়ে আছে। মিয়ানমার গণহত্যা বিষয়ে কখনও পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেয়নি। তিনি আরও জানান, গাম্বিয়া এ আদালতের কাছে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে ৬টি অন্তবর্তীকালীন আদেশ চায়, যেগুলোর মধ্যে রয়েছে, আর যেন গণহত্যার মতো ঘটনা মিয়ানমারে না ঘটে তা নিশ্চিত করা। আগের গণহত্যার আলামত নষ্ট না করা, রোহিঙ্গা ও মিয়ানমার সরকার উভয় পক্ষকে শান্ত এবং উত্তেজনা প্রশমনে সাহায্য করা, এছাড়া মিয়ানমার জাতিসংঘের তদন্তের বিষয়ে সাহায্য করবে-এ নিশ্চয়তাও চায় গাম্বিয়া। শুনানিতে বক্তব্য রাখার সময় গাম্বিয়ার নিযুক্ত একজন কৌঁসুলি রাখাইনের মংডু শহরে বেশ কয়েকটি পাইকারি খুনের বিবরণ পেশ করেন। মিয়ানমারের সেনারা ওই শহরের রোহিঙ্গা বেসামরিক পুরুষদের হত্যা করে এবং শত শত নারীকে ধর্ষণ করে। আইসিজে’র ওয়েবসাইট থেকে লাইভ স্ট্রিম করা শুনানিতে এসব বিবরণ পড়ে শোনানোর সময় আউং সান সুচির কোন অভিব্যক্তি লক্ষ্য করা যায়নি। কখনও সোজা সামনে তাকিয়ে, কখনও মাটির দিকে দৃষ্টি দিয়ে গাম্বিয়ার বক্তব্য শুনতে দেখা যায় তাকে।

এদিকে, আজ বুধবার মিয়ানমার গাম্বিয়ার অভিযোগের বিষয়ে তাদের মতামত তুলে ধরবে। এ জন্য ইতোমধ্যেই নোবেলে শান্তি পুরস্কারবিজয়ী মিয়ানমারের এনএলডি নেত্রী আউং সান সুচি আদালতে উপস্থিত হয়েছেন। তিনি একটি প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। এ প্রতিনিধি দলে সে দেশে অবস্থানরত কয়েক রোহিঙ্গাকেও নেয়া হয়েছে।

প্রসঙ্গত, গত ১১ নবেম্বর আন্তর্জাতিক এ আদালতে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে মামলা করে পশ্চিম আফ্রিকার দেশ গাম্বিয়া। গাম্বিয়ার অভিযোগে রাখাইনে রোহিঙ্গা নিধনে জাতিসংঘের ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশনের তদন্তে উঠে আসা ধর্ষণ, হত্যা, অগ্নিকা-সহ মানবতাবিরোধী অপরাধের বিভিন্ন তথ্যও সন্নিবেশিত রয়েছে। উল্লেখ করা যেতে পারে, বিভিন্ন সময়ে জাতিসংঘও রোহিঙ্গা গণহত্যার বিষয়ে মিয়ানমারকে অভিযুক্ত করেছে।

প্রসঙ্গত, মঙ্গলবার থেকে শুরু হওয়া এ শুনানি আগামীকাল বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে চলবে। আজ মিয়ানমারের পক্ষে আউং সান সুচি আইনী মোকাবেলার নেতৃত্বে থাকবেন। উল্লেখ করা যেতে পারে, এর মধ্য দিয়ে এ প্রথমবারের মতো রোহিঙ্গা ইস্যুতে আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য মিয়ানমার কোন গণশুনানিতে অংশ নিচ্ছে। শুনানির দ্বিতীয় দিনে আজ বুধবার অভিযোগের জবাব দেবে মিয়ানমার। কাল বৃহস্পতিবার দু’পক্ষের মধ্যে যুক্তিতর্ক হবে। বিবিসি বলেছে, মিয়ানমারের প্রতিনিধি দলের নেতা হিসেবে সুচি যুক্তি দেখাবেন যে, এ ঘটনা নিয়ে বিচার করার অধিকার আইসিজে’র নেই।

বিভিন্ন আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, কোন মামলার চূড়ান্ত রায়ে পৌঁছুতে কয়েক বছর সময় নেয় ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিস বা আইসিজে। তবে প্রয়োজনে কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই এ আদালত অন্তবর্তী যে কোন আদেশ দিতে পারে। এবার মিয়ানমারের বিরুদ্ধে অনুরূপ কোন অন্তবর্তীকালীন আদেশ আসতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। অপরদিকে, রোহিঙ্গা গণহত্যায় ন্যায়বিচারের দাবিতে হেগের আন্তর্জাতিক এ আদালতের বাইরে সাধারণ মানুষ ও বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার পক্ষে বিক্ষোভ মিছিল হয়েছে। অপরদিকে, রাখাইনে গণহত্যার বিষয়টি স্বীকার করে নিতে আউং সান সুচির প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন বিভিন্ন দেশের সাত নোবেলজয়ী। এসব নোবেলজয়ী একইসঙ্গে ওই গণহত্যার জন্য সুচি ও সেনা কমান্ডারদের জবাবদিহিতার আওতায় আসার আহ্বান জানিয়েছেন।

অন্যদিকে আদালতে সুচির উপস্থিতি নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে রোহিঙ্গারা। সুচিকে গণহত্যার প্রতীক আখ্যা দিয়ে এক সময়কার গণতন্ত্রপন্থী এই নেত্রীর প্রতি তীব্র ঘৃণা প্রকাশ করেছে তারা। মোহাম্মদ জুবায়ের নামে ১৯ বছর বয়সী এক রোহিঙ্গা বলেন, ‘আমরা ধর্ষণ, নিপীড়ন ও হত্যাকাণ্ড দেখেছি। আমাদের চোখের সামনে অনেকে খুন হয়েছে। আমাদের সামনে পালানো ছাড়া কোন পথ ছিল না। এখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এগিয়ে আসতে হবে যেন মিয়ানমার তাদের ঘৃণ্য শাস্তি পায়। রোহিঙ্গাদের ওপর গণহত্যার জন্য তাদের অবশ্যই দায়ী করতে হবে।’ নুর আলম নামে ৬৫ বছর বয়সী এক রোহিঙ্গা জানান, ২০১৭ সালের ওই অভিযানে ছেলেকে হারিয়েছেন তিনি। বলেন, ‘একসময় আউং সান সুচি শান্তির প্রতীক ছিলেন। তাকে নিয়ে আমাদের অনেক আশা ছিল যে, ক্ষমতায় আসলে অনেক পরিবর্তন আসবে। আমরা তার জন্য প্রার্থনা করেছি। আর এখন তিনি গণহত্যার প্রতীক। আমাদের রক্ষা না করে তিনি খুনীদের সঙ্গে হাত মিলিয়েছেন। তিনি তাদের হয়ে লড়াই করবেন। আমরা তাকে ঘৃণা করি। তার লজ্জা হওয়া উচিত।’ ৩৫ বছর বয়সী রশিদ আহমেদ জানান, তার পরিবারের ১২ সদস্যকে হত্যা করেছে মিয়ানমার সেনাবাহিনী। তিনি বলেন, শুধু ন্যায়বিচারই আমাদের ক্ষত শুকাতে পারে। আমি জানি, যাদের হারিয়েছি তাদের কখনই ফিরে পাব না। কিন্তু খুনী সাজা পেলে তারা শান্তিতে থাকবে।

এছাড়া হেগে অবস্থিত জাতিসংঘের সর্বোচ্চ আদালত ‘ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিস’-এ (আইসিজে) রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে করা অপরাধের ব্যাপারে প্রকাশ্যে স্বীকার করার জন্য আউং সান সুচির প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন বিশ্বের সাত নোবেলজয়ী। একইসঙ্গে এই গণহত্যার জন্য সুচি ও মিয়ানমারের সেনা কমান্ডারদের জবাবদিহিতার আহ্বানও জানান তারা। মঙ্গলবার এক যৌথ বিবৃতিতে এই আহ্বান জানানো হয়। বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়, শান্তিতে নোবেল বিজয়ী হিসেবে আমরা রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সংঘটিত হওয়া গণহত্যাসহ অপরাধগুলো প্রকাশ্যে স্বীকার করার জন্য নোবেলজয়ী সুচির প্রতি আহ্বান জানাই। আমরা গভীরভাবে উদ্বিগ্ন যে, এই নৃশসংতায় নিন্দা জানানোর পরিবর্তে সেটা অস্বীকার করেছেন সুচি। এদিকে হেগ থেকে সংবাদদাতা জানান, শুনানি চলাকালে রোহিঙ্গাদের ওপর গণহত্যার অভিযোগে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে ব্যাপক বিক্ষোভ প্রদর্শন করেছে প্রবাসী আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা। তারা বিক্ষোভে অংশ নিতে ইউরোপ থেকে সমবেত হয়।

উল্লেখ করা যেতে পারে, ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট গভীর রাতে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সেনা অভিযান শুরু হয়। এতে গণহত্যা চলে। এর পাশাপাশি ধর্ষণও থামেনি। গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দেয়া হয়। অভিযানের মুখে টিকতে না পেরে সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের ঢল নামে রোহিঙ্গাদের। বাংলাদেশ মানবিক কারণে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিতে শুরু করলে দিনে দিনে এ সংখ্যা বাড়তে থাকে। শেষ পর্যন্ত তা প্রায় ৮ লাখে পৌঁছে যায়, যা নিয়ে পুরনো রোহিঙ্গা মিলিয়ে এ সংখ্যা দাঁড়ায় ১২ লক্ষাধিক। আশ্রয় পাওয়ার পর গত প্রায় দু’বছরের বেশি সময়ে রোহিঙ্গা পরিবারগুলোতে নতুন নতুন শিশু জন্ম নেয়ার পর এ সংখ্যা প্রায় ১৫ লাখে উন্নীত হয়েছে।

উল্লসিত রোহিঙ্গা শিবির

এদিকে, আন্তর্জাতিক আদালতে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগের শুনানি শুরু হওয়ায় উল্লাস সৃষ্টি হয়েছে উখিয়া- টেকনাফের আশ্রয় শিবিরগুলোতে। রোহিঙ্গারা স্লোগানে স্লোগানে সারাদিন মুখর রেখেছে আশ্রয় শিবির এলাকা। রোহিঙ্গারা গাম্বিয়ার পক্ষে স্লোগান দিয়েছে, পাশাপাশি আউং সান সুচিকে গণহত্যার নায়ক হিসেবে তার ফাঁসি দাবি করেছে। আশ্রয় শিবির সূত্রগুলো জানিয়েছে, মিয়ানমারের নেত্রী আউং সান সুচির বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক বিচারিক আদালতে দায়ের হওয়া মামলায় ন্যায়বিচারের আশায় লাখ লাখ রোহিঙ্গা বিভিন্ন সেøাগানে মুখর করেছে আশ্রয় ক্যাম্প। মঙ্গলবার ভোরে ফজরের নামাজের পর প্রতিটি ক্যাম্প মসজিদে দোয়া করা হয়েছে। রোহিঙ্গারা দু’হাত তুলে আউং সান সুচি ও সেনাপ্রধানের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক বিচারিক আদালতে মামলায় দোষী সাব্যস্ত হওয়ার জন্য দোয়া করেছে।

সূত্র জানায়, উখিয়ার বালুখালী ক্যাম্পের নুরুল হক, নুর মোহাম্মদ, কুতুপালং ক্যাম্পের জাফর আলম ও মিয়ানমার জিরো লাইনে অবস্থানরত দিল মোহাম্মদ জানিয়েছেন, রোহিঙ্গা গণহত্যার বিরুদ্ধে সঠিক বিচার প্রত্যাশা করছে রোহিঙ্গারা। এসব রোহিঙ্গা নেতারা আরও জানায়, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সেনাবাহিনীর সদস্যরা ব্রাশফায়ার করে পাখির মতো রোহিঙ্গাদের মেরেছে-এটি দিবালোকের মতো সত্য। শত শত ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দিয়েছে। সেখানে মরেছে বহু গৃহপালিত পশুও। ঘুমের মধ্যে মারা গেছে অনেক নিষ্পাপ শিশু। নিশ্চয় এ কারণে গণহত্যার বিরুদ্ধে ন্যায়বিচার পাবে রোহিঙ্গারা।

মঙ্গলবার সকাল থেকে ‘গাম্বিয়া’- ‘গাম্বিয়া’ সেøাগানে মুখর হয়ে ওঠে উখিয়া টেকনাফে অবস্থিত রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলো। পশ্চিম আফ্রিকার এ দেশটি রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর গণহত্যা চালানোর অভিযোগে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গত ১১ নবেম্বর আন্তর্জাতিক বিচারিক আদালতে মামলা করার প্রেক্ষাপটে মঙ্গলবার সকালে কক্সবাজার রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আইসিজে গণহত্যার বিচারের আগে ‘গাম্বিয়া, গাম্বিয়া!’ সেøাগান উঠে।

উখিয়ার ফালংখালী শফিউল্লাহ কাটা ক্যাম্পে আশ্রিত ও রাখাইনের চাকমাকাটা এলাকার বাসিন্দা হাফেজ মোহাম্মদ এয়াকুব জানান, রোহিঙ্গারা যতই খারাপ হোক, তারাতো নিশ্চয় মিয়ানমারের আদি বাসিন্দা। প্রমাণ আছে, দেশটির পার্লামেন্টেও নেতৃত্ব দিয়েছে রোহিঙ্গারা। বার্মা সরকারের রেকর্ডপত্রেও লিপিবদ্ধ আছে রোহিঙ্গারা দেশটির নাগরিক। সেদেশের ভোটার। ১৯৮২ সালে আইন করে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব বাতিল করেছে মিয়ানমার সামরিক জান্তা। তাই রাখাইন রাজ্য থেকে রোহিঙ্গাদের বিতাড়িত করতে পরিকল্পনা গ্রহণ করে জান্তা সরকার। সেখানে বসবাসরত রাখাইন জাতির আক্রোশের মুখে দেশটির সেনাবাহিনীর সদস্যরা পাখির মতো গুলি করে হত্যা করেছে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর সদস্যদের। ফলে ২০১৭ সালের আগস্ট মাসের শেষ দিক থেকে প্রাণে বাঁচতে লাখ লাখ রোহিঙ্গা পালিয়ে আসে বাংলাদেশে। তিনি আরও জানান, আমরা চাই রোহিঙ্গাদের গণহত্যার বিরুদ্ধে, সঠিক বিচার হোক। ন্যায়বিচার হবে। আন্তর্জাতিক বিচারিক আদালতে অবশ্যই আউং সান সুচি ও তার সরকারের বাহিনীর সদস্যরা দোষী সাব্যস্ত হবেন।

মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর নিষ্ঠুরতার চিত্র, রোহিঙ্গাদের গণকবর দেয়ার বিষয়টি ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রচার হয়েছে। গাম্বিয়ার দায়ের করা মামলায় এসব বিষয় তুলে ধরা হয়েছে, যা মিয়ানমারের অস্বীকার করার জো নেই। তাই আউং সান সুচি ও সেনাবাহিনীর কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে উপযুক্ত বিচার হবে বলে আশা প্রকাশ করেন রোহিঙ্গা নেতারা। তারা বলেন, ওপারে রোহিঙ্গাদের জুলুম করা হয়েছে মর্মে অপরাধ তদন্ত টিমের তদন্তেও উঠে এসেছে।

প্রকাশিত : ১১ ডিসেম্বর ২০১৯

১১/১২/২০১৯ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

প্রথম পাতা



শীর্ষ সংবাদ: