২২ নভেম্বর ২০১৯, ৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৬, শুক্রবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
 
সর্বশেষ

অভিমত ॥ মাদকের কারবার দেশে দেশে

প্রকাশিত : ১৭ অক্টোবর ২০১৯
  • বায়েজিদ দৌলা বিপু

‘চীন কাঁদিয়া কহিল, ‘আমি অহিফেন খাইব না।’ ইংরেজ বণিক কহিল, ‘সে কি হয়?’ চীনের হাত দুটি বাঁধিয়া মুখের মধ্যে রুমাল দিয়া অহিফেন ঠাসিয়া দেয়া হইল; দিয়া কহিল, ‘যে অহিফেন খাইলে তাহার দাম দাও।’ ...১৭৮১ খ্রিস্টাব্দে যে ২৮০০ সিন্ধুক অহিফেন চীনে আসিয়াছিল, দেশে তাহার খরিদ্দার ছিল না। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির একমাত্র ব্রত হইল কিসে এই পাপ চীনের মধ্যে প্রবেশ করে।... ১৮৩৪ খ্রিস্টাব্দে অহিফেন বাণিজ্যের বিরুদ্ধে নতুন শাসন প্রচারিত হইল। ... অবশেষে ইংরেজদের সহিত যুদ্ধ বাধিল।... পরাজিত চীন সন্ধি করিল। ...এবারের সন্ধির পর হইতে অহিফেন বাণিজ্য এমন শ্রীবৃদ্ধি লাভ করিল যে, ১৮৭৫ খ্রিস্টাব্দে ৯০ হাজার বাক্স অহিফেন চীনে আমদানি হইয়াছে।

‘চীনে মরণের ব্যবসায়’ শীর্ষক রচনায় আফিম যুদ্ধের এই বর্ণনা দিতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আক্ষেপের সুরে বলেন, ‘একটি সমগ্র জাতিকে অর্থের লোভে বলপূর্বক বিষপান করানো হইল; এমনতর নিদারুণ ঠগীবৃত্তি কখনও শোনা যায়নি।’

বস্তুত মাদক ‘ঠগীবৃত্তির’ ঐতিহাসিক যাত্রা শুরু আরও পেছনে। মুঘল আমলে। রাজকোষে অর্থ যোগানের অন্যতম উপায় ছিল আফিম চাষ ও ব্যবসা। এর প্রধান ভোক্তা ছিল অভিজাতরা। মুঘল শাসনের অবসান হলে এই ব্যবসা চলে যায় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাতে। ব্রিটিশরাজের নিয়ন্ত্রণ ও পৃষ্ঠপোষকতায় মাদক বাণিজ্যের দ্রুত প্রসার ঘটে এবং অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষদিকে বাংলায়ও আফিম চাষ ব্যাপকভাবে বিস্তার লাভ করে। ব্রিটিশভারতে উৎপাদিত ওই আফিম ব্রিটিশ রাজের রাষ্ট্রীয় মদদে জাহাজের মাধ্যমে চীনে পাচার করা হয়। চীনে তখন আফিম আমদানি নিষিদ্ধ। জোরপূর্বক সেখানে আফিমের বাজার প্রতিষ্ঠা করতে চাইলে চীনের সঙ্গে তাদের দু’দফা যুদ্ধ সংঘটিত হয়। ইংরেজদের সহিংস বল প্রয়োগের মাধ্যমে অপসারিত হন সম্রাট লিন এবং আফিম বাণিজ্যনগরী হিসেবে পরিচিতি পেয়ে যায় বন্দরনগরী হংকং। অনৈতিক ওই যুদ্ধের বিরুদ্ধে জনমত তৈরি হতে থাকলে তাদের বোঝানো হলো যে, মুক্তবিশ্ব ও মুক্ত বাণিজ্যের স্বার্থেই তারা ওই যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছে।

উনিশ শতকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়াতে চীনা অভিবাসীদের সঙ্গে আফিমের অনুপ্রবেশ ঘটে। ফলে মার্কিনীদের মধ্যে আফিম আসক্তি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। বাড়তে থাকে ক্রয়-বিক্রয়-বিতরণের মাত্রা ও পরিধি। ক্যালিফোর্নিয়া শহরজুড়ে গড়ে ওঠে অসংখ্য ‘আফিম গুহা’। নিউইয়র্কসহ অন্যান্য নগরীতেও বিস্তৃত হয় এর বাণিজ্যিক পরিধি।

আফিমজাত মরফিন ও কোডিন বিষয়ে গবেষণা করছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। গৃহযুদ্ধে আহত সৈনিকদের মধ্যে ব্যথা উপশমের জন্য মরফিনের ব্যবহার বাড়তে থাকে এবং একপর্যায়ে এই নেশাজাত দ্রব্যের প্রতি সৈনিকদের আসক্তি ছড়িয়ে পড়ে। ১৯১৪ সালে হ্যারিসন আইনে চিকিৎসাবহির্ভূত উদ্দেশে আফিম ও কোকেনের ব্যবসা নিষিদ্ধ ঘোষিত হলেও এসব অবৈধ মাদকের লাগাম টেনে ধরা সম্ভব হয়নি। ১৯২৫ সালে নিউইয়র্কের চায়না টাউনে আফিমের কালোবাজার চালু হয়। ওই সময় যুক্তরাষ্ট্রে হেরোইন আসক্ত ব্যক্তির সংখ্যা ছিল প্রায় দুই লাখ। বিগত শতাব্দীর ত্রিশ ও চল্লিশের দশকে আফিমজাত নেশা আরও বিস্তৃত হয় এবং বিনোদনমূলক মাদক হিসেবে মারিজুয়ানা বেশ জনপ্রিয়তা লাভ করে।

কার্যত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর মাদক ব্যবসা বৈশ্বিক মাত্রা লাভ করে। ১৯৫০-এর দশকে মাফিয়া পরিবারগুলো তাদের জুয়া ও অন্যান্য অসামাজিক কর্মকা-ের পাশাপাশি উপার্জন বৃদ্ধির লক্ষ্যে অবৈধ মাদক চোরাচালানি ও বিক্রির কাজে জড়িয়ে পড়ে। ভিয়েতনাম যুদ্ধে জড়িয়ে পড়লে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ১৯৬৫-৭০ সালে হেরোইন পাচারের গতি আরও বেড়ে যায়। ভিয়েতনামী সৈন্যদের মধ্যে মাদকের, বিশেষ করে মারিজুয়ানার প্রতি আসক্তি চরম আকার ধারণ করে।

১৯৮০-এর দশকে মাদক ব্যবসা সীমান্তভিত্তিক জটিল চরিত্র ধারণ করলে সংঘটিত অপরাধীগোষ্ঠীগুলো সক্রিয় হতে শুরু করে। মাদক চোরাচালানিরা মেক্সিকোর সীমান্ত এলাকা বেছে নেয়। ১৯৯০-এর দশকে মাদক চোরাচালানি বাজারের আধিপত্য ও নিয়ন্ত্রণ বজায়কে কেন্দ্র করে কলাম্বিয়ায় ঘটে শক্তিশালী মাফিয়াচক্রের লড়াই ও পতন এবং উত্থান ঘটে কতিপয় ক্ষুদে কারবারির। পর্যায়ক্রমে অবৈধ মাদক উৎপাদন ও পরিবহনে অন্যতম ভূমিকা গ্রহণ করে আল কায়েদা ও তালেবানসহ মধ্যপ্রাচ্যের উগ্রবাদী সংগঠনসমূহ। এমনকি মাদক চোরাচালানির সঙ্গে সিআইএরও জড়িয়ে পড়ার অভিযোগ ওঠে সংবাদ মাধ্যমে।

বাংলাদেশে মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার ইদানীং আগ্রাসী রূপ ধারণ করেছে। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে দেশটি এখন মাদক চোরাচালানি ও পাচারের রুট হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। সংঘবদ্ধ চোরাচালানি চক্রের মাধ্যমে প্রতিদিন মিয়ানমার, ভারত ও নেপাল থেকে স্থল ও নৌপথে প্রবেশ করছে অসংখ্য ইয়াবা, ফেনসিডিল, হেরোইন, আফিম, প্যাথেডিনসহ অন্যান্য মাদকদ্রব্য।

মাদকসেবীদের কাছে ‘ডাইল’ হিসেবে পরিচিত ফেনসিডিল নামক কাশির সিরাপ; উৎপাদিত হয় ভারতে। ১৯৮২ সালে বাংলাদেশে নিষিদ্ধ হলেও চোরাকারবারিদের মাধ্যমে সীমান্ত পথে প্রবেশ করছে ফেনসিডিল। একটি আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্যসেবা সংস্থার তথ্যমতে, ভারত থেকে বাংলাদেশে প্রতিদিন ২০ লাখ বোতল ফেনসিডিল পাচার করা হয়।

‘বাবা’ বলে পরিচিত বাংলাদেশে বর্তমানে বহুল ব্যবহৃত মাদক ইয়াবার যাত্রা শুরু ১৯১৯ সালে। জীবন বাঁচাতে জাপানীরা ওষুধ হিসেবে ইয়াবা তৈরির পরিকল্পনা করে। এরপর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে জার্মান চ্যান্সেলর এডলফ হিটলার তার মেডিক্যাল চীফকে আদেশ দিলেন এমন কিছু আবিষ্কার করতে, যাতে সেনারা যুদ্ধক্ষেত্রে ক্লান্তিহীন ও নির্ঘুম উদ্দীপনায় দীর্ঘ সময় যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারে এবং বিমানের পাইলট দীর্ঘ সময় নিদ্রাহীন ও উৎফুল্ল থাকতে পারে। টানা পাঁচ মাস চেষ্টা চালিয়ে জার্মান রসায়নবিদগণ মিথাইল এ্যামফিটামিন ও ক্যাফেইনের সংমিশ্রণে তৈরি করলেন ইয়াবা। ক্যাফেইন সেন্ট্রাল নার্ভাস সিস্টেম বা কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রে উত্তেজনা তৈরির মাধ্যমে তন্দ্রা দূর করে ও কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি করে এবং মিথাইল এ্যামফিটামিন অত্যন্ত শক্তিশালী নেশা সৃষ্টিকারী একটি মস্তিষ্ক উত্তেজক বা উদ্দীপক। হিটলারের উদ্দেশ্য সফল। সেনারা মানসিক শক্তিতে বলিয়ান হলো। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইয়াবার ব্যবহার ও প্রভাব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।

বর্তমানে মিয়ানমারে ওয়া এবং কোকাং নামের আদিবাসী সম্প্রদায় ইয়াবার সবচেয়ে বড় উৎপাদনকারী। টেকনাফ সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে ইয়াবার প্রথম প্রবেশ ১৯৯৭ সালে। ২০০১ সালে স্থান করে নেয় অভিজাত এলাকার তরুণ-তরুণীদের মানিব্যাগে। ক্রমাগতভাবে, এই ভয়ানক নেশাজাত দ্রব্য মহামারীর মতো ছড়িয়ে পড়ছে দেশজুড়ে উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত সব শ্রেণীর মধ্যে। তাদের অর্থবিত্ত লুটে নিচ্ছে মাদককারবারিদের সর্বনাশা ‘মরণ ব্যবসার’ সিন্ডিকেট। রুখতে হবেই এদের যে কোন মূল্যে।

bdawla@gmail.com

প্রকাশিত : ১৭ অক্টোবর ২০১৯

১৭/১০/২০১৯ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


শীর্ষ সংবাদ: