২২ অক্টোবর ২০১৯, ৭ কার্তিক ১৪২৬, মঙ্গলবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
 

বই ॥ একাত্তর এবং মক্তিযোদ্ধা পরিবার

প্রকাশিত : ১১ অক্টোবর ২০১৯
  • আতাতুর্ক কামাল পাশা

প্রথম বিশ^যুদ্ধ ও দ্বিতীয় বিশ^যুদ্ধ নিয়ে অনেক ছায়াছবি, কাহিনী উপন্যাস লেখা হয়েছে, কারণ এর বিস্তৃতি বিশ^ময়। ভিয়েতনামের যুদ্ধ নিয়েও অনেক বইলেখা হয়েছে, ইন্দোচীন, চীন ও হলিউড অনেক সিনেমা করেছে। কিন্তু বাংলাদেশকে স্বাধীন করতে গিয়ে যে মুুক্তিযুদ্ধ করতে হয়েছে তার ধারাবাহিক ইতিহাস এ পঞ্চান্ন হাজার বর্গমাইলে কোথায় কিভাবে ঘটেছে তার সঠিক চিত্র বা লেখা দলিল এখনো পূর্ণাঙ্গ পাওয়া যাচ্ছে না, তা-ই মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে লেখার পট এখনো শেষ হয়ে যায়নি। সবচেয়ে বড় কথা আমাদের ফোর জি অর্থাৎ চতুর্থ প্রজন্ম এতো বেশি প্রযুক্তিনির্ভর ও পাশ্চাত্য সংস্কৃতিমুখীন হচ্ছে যে তাদেরকে দেশমংখীন, স্বাদেশিকতামুখী এবং দেশপ্রেমে সংবদ্ধ রাখতে হলে আমাদের বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাস ও গল্প বার বার পড়াতে হবে এবং তা লিখতে হবে যেমন লিখেছেন আওলিয়া খান একাত্তর এবং মুক্তিযোদ্ধা পরিবার।

চার ফর্মার বই। তাতে বিষয়ের সয়েমড় সম্পর্কিত কিছু ছবিও রয়েছে, সেগুলো ঠিক সে স্থানের ছবি কী না বলা না গেলেও ইতিহাসে সয়েমড় সাযুজ্য রয়েছে। স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় তিনি যে ইতিহাস বর্ণনা করেছেন, তা আমাদের অবরুদ্ধ সাধারণ বাঙালীর ইতিহাসকেই তুলে ধরে। এ ইতিহাস শুরু হয়েছে ১৪ এপ্রিল থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত। ১৪ এপ্রিলে পারিবারিকভাবে লেখক ও অন্যান্যরা ১ বৈশাখ বরণ করার জন্য বিভিন্ন রকম খাবার রান্না করছিলেন, এমন সময় খবর পেলেন পাকিস্তান আর্মি কষবা পার হয়ে তাদের গ্রামমুখে আসছে। তারা সবাই রাঁধা-খাবারের চুলায় পানি ঢেলে দিয়ে আরও গভীর গ্রামের দিকে বোচকাবুচকি নিয়ে ছুটলেন। বলাবাহুল্য গ্রামে পালিয়ে যাবার জন্য তারা আগে থেকেই বাক্স- পেটরা বেঁধে প্রস্তুত ছিলেন। এই হলো স্বাধীনতা যুদ্ধের বাস্তব গল্প শুরু।

লেখক ও তার পরিবারবর্গের সদস্যরা অবশেষে সীমান্ত পেরিয়ে আগরতলায় আশ্রয় নেন। সেখানে তাদের ট্রানজিট ক্যাম্পে আশ্রয় দেয়া হয়। তার ভাইয়েরা কেউ মুক্তিযুদ্ধে চলে যায়, গ্রামের রাজাকারদের হাত থেকে জীবন রক্ষার তাগিয়ে লেখকের বাবা চট্টগ্রামে এসে রেলবিভাগে তার চাকরিতে যোগ দেন। এভাবে নয় মাস পর দেশ স্বাধীন হলে তারা আবার গ্রামের বাড়িতে ফিরে আসেন।

লেখক একবার তিন বোন মিলে নার্সিং ট্রেনিং নিতে আগরতলা জিবি হসপিটালে যান। কিন্তু রক্ত দেখলেই তার মাথা ঘুরে আসে বলে তিনি সেখানে কাজ না করে হাপানিয়া ট্রানজিট ক্যাম্পে ফিরে এসে সেখানেই অসুস্থ মানুষজনদের প্রাথমিক চিকিৎকার কাজ করতে থাকেন আর তার দুই বোন ধ্বজনগর ক্যাম্পে চলে যান আহত ও অসুস্থ মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসার কাজে। তারা সেখানে নবেম্বর পর্যন্ত নার্সের দায়িত্ব পালন করেন। কোন একদিন কোন এক মুক্তিযোদ্ধা এসে কোন এক পরিবারের মাকে একটি আংটি দিয়ে বলেন, আপনার ছেলে তার শেষ ইচ্ছে অনুসারে এ আংটিটি আপনার হাতে তুলে দিতে বলেছিল। আর সঙ্গে সঙ্গে সেই ব্যারাকে আশ্রিত পরিবারের মাঝে জেগে ওঠে ক্রন্দনের রোল। এভাবেই মুক্তিযুদ্ধের দুঃসহ নয় মাস কাটতে থাকে।

লেখক খুব সাধারণ ভাষায়, তখনকার পরিবেশের সঙ্গে সাযুজ্য রেখেই আগরতলার শরণার্থী ব্যারাকের এবং মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলোর কথা তুলে ধরেছেন যা মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলোর ভয়াবহতা ও পরিবেশ এখনকার প্রজন্মের ও পাঠকের সামনে উন্মোচন করতে পারে। তবে সব শরণার্থী ক্যাম্পের ব্যবস্থাপনা এক ছিল না। আমার এক বোন নদীয়া কৃষ্ণপুর শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নিয়েছিলেন। তাদের সপ্তাহে রেশন দেয়া হতো চাল, ডাল, সবজি আর কেরোসিন তেল। এগুলো আমার ভাগনে নিয়ে আসতো এবং তারা নিজেরাই রান্না করে খেতেন। অনেকে ওপারে গিয়ে তাদের আত্মীয়দের বাসাতেও থেকেছিলেন।

এখন মুক্তিযুদ্ধের ওপর যেসব বই লেখা হচ্ছে সেগুলো অধিকাংশই বাস্তবজ্ঞানবর্জিত- শোনা কথা, বইয়ে পড়া, মানুষের মুখ থেকে শুনে তা নিজের মতো করে সাজিয়ে নেয়া। সে হিসেবে আওলিয়া খানমের একাত্তর এবং মুক্তিযোদ্ধা পরিবার বইটি মুক্তিযুদ্ধের সব পটভূমি না হলেও সামান্য খানিকটা বাস্তব ছবি তুলে ধরতে পেরেছে নিসন্দেহে।

একাত্তর এবং মুক্তিযোদ্ধা পরিবার/আওলিয়া খানম, প্রকাশক/ সাহিত্য কথা, প্রচ্ছদ/সৌরভ মাহমুদ, মূল্য/১৫০ টাকা।

প্রকাশিত : ১১ অক্টোবর ২০১৯

১১/১০/২০১৯ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


শীর্ষ সংবাদ: