১৪ নভেম্বর ২০১৯, ৩০ কার্তিক ১৪২৬, বৃহস্পতিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
 
সর্বশেষ

জীবন বাজি রেখে সোনার হরিণের সন্ধানে ছুটছে নর-নারী

প্রকাশিত : ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৯
  • সিলেটে মানব পাচারকারী চক্র সক্রিয়

সালাম মশরুর, সিলেট অফিস ॥ অবৈধ পথে বিদেশ যাত্রায় এখন নিয়মিত বিষয় নিখোঁজ ও মৃত্যু সংবাদ। এমন করুণ পরিণতি স্বজনরাও চোখ বুঝে মেনে নিচ্ছেন। কাউকে দোষ দেয়ার নেই। এ যেন ভাগ্যের নির্মম পরিহাস। সুনামগঞ্জের ঝাউয়া বাজারের সেনিটারি ব্যবসায়ী যুবক রাজিব, ভাল ক্রিকেট খেলোয়াড়। জনকণ্ঠকে জানালেন, এই কিছুদিন আগেও গ্রামে ক্রিকেটের টিম গঠনে ছেলেদের অভাব হতো না। এখন টিম গঠনের জন্য ছেলে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। শুধু ঝাউয়া নয়, এখন এই বিদেশমুখিতার সংবাদ সিলেট অঞ্চল জুড়ে। গ্রীস, ফ্রান্স, ইতালিসহ নানান দেশে দালালের হাত ধরে ছুটে যাচ্ছেন যুবকরা। অবৈধ পথে অনিশ্চিত যাত্রার এই ঝুঁকির খেলা যেন নেশার মতো। অবৈধভাবে দালালের মাধ্যমে গ্রীস থেকে ইতালি যাচ্ছিলেন শাহিন আহমদ। পথিমধ্যে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান তিনি। গত ২৩ আগস্ট এ দুর্ঘটনা ঘটে। মেসিডোনিয়ায় শাহিনের দাফনও সম্পন্ন হয়েছে। এর ২৪ দিন পর শাহিনের পরিবার জানতে পারে তার মৃত্যুর খবর। শাহিন সিলেট সদর উপজেলার হাটখোলা ইউনিয়নের পাগইল গ্রামের বাসিন্দা। গত সোমবার মেসিডোনিয়া থেকে শাহিনের পরিবারকে এই মৃত্যুর খবর জানিয়েছেন একই গ্রামের জহির উদ্দিন। জহিরও ওই দুর্ঘটনায় আহত হন বলে জানা গেছে। জহিরের ভাষ্য মতে, তিনি এখনও মেসিডোনিয়ার একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।

ইউক্রেন থেকে ফ্রান্স যাওয়ার পথে স্লোভাকিয়ার জঙ্গল থেকে নিখোঁজ হয়েছেন সিলেটের বিশ্বনাথের ফরিদ উদ্দিন আহমদ (৩৫) নামের সাবেক ব্যাংক কর্মকর্তা। তিনি উপজেলার সদর ইউনিয়নের কারিকোনা গ্রামের সমশাদ আলীর পুত্র। বিদেশ যাওয়ার আগে ফরিদ ইস্টার্ন ব্যাংক বিশ্বনাথ শাখায় কর্মরত ছিলেন। দালাল ও ফরিদের ৫ সঙ্গী ২ সেপ্টেম্বর ফ্রান্স পৌঁছলেও ফরিদ রয়েছেন নিখোঁজ। তার সঙ্গীরা জানিয়েছেন ফ্রান্স যাওয়ার পথে স্লোভাকিয়ার একটি জঙ্গলে নিখোঁজ হয়ে যান ফরিদ উদ্দিন। ফরিদের পরিবার সূত্রে জানা গেছে, ২০১৮ সালে অনুষ্ঠিত ফুটবল বিশ্বকাপ দেখতে রাশিয়া যান ফরিদ উদ্দিন আহমেদ। খেলা শেষ হওয়ার মাসখানেক পর তিনি রাশিয়া থেকে ইউক্রেন যান এবং সেখানে দীর্ঘ কয়েক মাস অবস্থান করেন। সম্প্রতি ইউক্রেন থেকে ফ্রান্স যাওয়ার জন্য বাংলাদেশে থাকা দালালের সঙ্গে চুক্তি করেন ফরিদের পরিবার। সেই চুক্তি অনুযায়ী মধ্যস্থতাকারী এক ব্যক্তির কাছে ৭ লাখ টাকা জমাও রাখেন ফরিদের পরিবার। চুক্তি অনুযায়ী কথা ছিল গাড়িতে করে ফরিদকে ফ্রান্স পৌঁছানোর পর জমাকৃত ৭ লাখ টাকা হস্তান্তর করা হবে দালালের কাছে। চুক্তি সম্পাদনের পর ইউক্রেনে অবস্থিত দালালের শিবিরে গিয়ে প্রায় ১ মাস সেখানে অবস্থান করেন ফরিদ। সর্বশেষ গত ২৭ আগস্ট পরিবারের সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথা বলেন ফরিদ। এ সময় তিনি জানান, পরদিন ২৮ আগস্ট ফ্রান্সের উদ্দেশ্যে সঙ্গীদের সঙ্গে যাত্রা করবেন ফরিদ। এই কথা বলার পর থেকে পরিবারের সঙ্গে আর কোন যোগাযোগ হয়নি ফরিদের। ২ সেপ্টেম্বর ফরিদের ফ্রান্স যাত্রাপথের এক সঙ্গী ফোন করে যুক্তরাজ্যে অবস্থানরত তার (ফরিদ) ভাই কাওছার আলীকে জানানÑ গত বুধবার একজন দালালের সঙ্গে ফরিদ উদ্দিনসহ তারা ৬ জন ইউক্রেন থেকে ফ্রান্সের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেন। হেঁটে ফ্রান্স পৌঁছতে তাদের ৫ দিন সময় লাগে। কিন্তু তাদের সঙ্গে খাবার ছিল মাত্র দু’দিনের। তাই সঙ্গে থাকা খাবার শেষ হয়ে গেলে তাদেরকে শূকরের মাংস খেতে দেয় দালাল। কিন্তু এই খাবার খেতে অপারগতা জানান ফরিদ। তাই তিনি সঙ্গে থাকা খেজুর খেয়ে আরও একদিন কাটান। দুই দিন হেঁটে তারা পৌঁছেন স্লোভাকিয়ার একটি জঙ্গলে। সেখানে পৌঁছার পর সঙ্গে থাকা খেজুরও শেষ হয়ে গেলে শূকরের মাংস খেতে বাধ্য হন ফরিদ। এই খাবার খাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই অসুস্থ হয়ে পড়েন ফরিদ। নাক ও মুখ দিয়ে রক্ত বের হতে থাকে এবং বমি আর ডায়রিয়া হতে থাকলে একেবারেই দুর্বল হয়ে যান তিনি। ওই জঙ্গলে সেদিন রাতে সবাই ঘুমিয়ে পড়লে একটি বিকট শব্দ পেয়ে সবার ঘুম ভেঙ্গে যায়। এ সময় ঘুম থেকে উঠে ফরিদকে তাদের (সঙ্গীদের) সঙ্গে দেখতে না পেয়ে রাতের অন্ধকারেই খুঁজতে শুরু করেন তারা। কিন্তু কোথাও ফরিদকে খুঁজে না পেয়ে এক পর্যায়ে বাধ্য হয়েই তাকে ছাড়াই ফ্রান্সের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন দালাল ও ফরিদের সঙ্গীয় অন্য ৫ জন। তখন থেকেই নিখোঁজ রয়েছেন ফরিদউদ্দিন। নিখোঁজ ফরিদ উদ্দিন আহমদের ভাই আলা উদ্দিন বলেন, আমরা ধারণা করছি আমার ভাই অসুস্থ হয়ে পড়লে স্লোভাকিয়ার ওই জঙ্গলে তাকে ফেলে রেখে অথবা তাকে হত্যা করে দালাল ও তার সঙ্গীরা ফ্রান্সে চলে গেছেন। মহান আল্লাহ যেন আমার ভাইকে আমাদের মাঝে ফিরিয়ে দেন সকলের কাছে এই দোয়াই কামনা করছি। পাশাপাশি স্লোভাকিয়ার ওই জঙ্গল থেকে তার ভাই ফরিদ উদ্দিনকে উদ্ধারের পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য তিনি সরকারের কাছে আবেদন জানান। ৬ ভাই ও ১ বোনের মধ্যে সবার বড় ফরিদ উদ্দিন। ফরিদ উদ্দিন আহমেদের স্ত্রী সেলিনা সুলতানা উপজেলার রামধানা সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা হিসেবে কর্মরত। ফরিদ-সেলিনা দম্পতির দাম্পত্য জীবনে ইরা তাসফিয়া নামে ৩ বছর বয়সী এক কন্যাসন্তান রয়েছে। শাহিনের পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, প্রায় দুই বছর আগে ইতালি যাওয়ার জন্য দেশ থেকে দালালের মাধ্যমে ইরাক যান শাহিন আহমদ। সেখান থেকে আরেক দালালের মাধ্যমে তুরস্ক হয়ে গ্রীসে যান। গ্রীস থেকে গত ২৩ আগস্ট মেসিডোনিয়া, সার্বিয়া, বসনিয়া হয়ে সড়কপথে ইতালি যাচ্ছিলেন শাহিন। জানা গেছে, ২৩ আগস্ট রাতে গ্রীস থেকে দালাল চক্র প্রায় ১৫ জনকে একটি কাভার্ডভ্যানে ইতালি নিচ্ছিল। ১৫ জনের মধ্যে ছিলেন সিলেটের শাহিন এবং জহির উদ্দিনও। জহিরের বরাত দিয়ে শাহিনের স্বজনরা জানায়, মেসিডোনিয়ার দেবার নামের এলাকায় পৌঁছলে ওই কাভার্ডভ্যানকে পেছন থেকে একটি ট্রাক ধাক্কা দেয়। এতে কাভার্ডভ্যানে আগুন ধরে যায়। ফলে ভ্যানের ভেতরে থাকা ব্যক্তিরা আহত হন। মেসিডোনিয়ার পুলিশ আহতদের উদ্ধার করে। গুরুতর আহতদের মধ্যে শাহিনসহ আরও একজনকে স্কোপজে নামের শহরে উন্নত চিকিৎসার জন্য পাঠায়। তবে অবস্থা গুরুতর না হওয়ায় জহিরসহ অন্যদের দেবারে রাখা হয়। জহিরের ভাষ্য মতে, তিনি মোটামুটি সুস্থ হলে সেখানকার কর্তব্যরত ব্যক্তিদের কাছে শাহিনের খবর জানতে চান। তখন মেসিডোনিয়ার পুলিশ জানায়, স্কোপজে হাসপাতালে নেয়ার পর শাহিনের মৃত্যু হয়েছে। পরে স্কোপজে হাসপাতালের চিকিৎসকরাও মৃত্যুর বিষয়টি জহিরকে নিশ্চিত করেছেন বলে তিনি শাহিনের পরিবারকে জানিয়েছেন। জহির জানিয়েছেন, শাহিনকে মুসলিম রীতিতে মেসিডোনিয়ায় সমাহিত করেছে সেখানকার একটি সংস্থা। সংশ্লিষ্ট হাসপাতাল ওই সংস্থার মাধ্যমে দাফনের ব্যবস্থা করেছে। এর আগে চলতি বছরের মে মাসের প্রথম দিকে তিউনিসিয়া উপকূলে নৌকাডুবিতে সিলেটের ২০ তরুণ নিহতের ঘটনা ঘটেছিল। ২০ তরুণও দালালের মাধ্যমে অবৈধ পথে ইতালি যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন।

প্রবাসী অধ্যুষিত সিলেটে বিদেশ পাড়ি দেবার নামে মানুষের প্রতারণা ও হয়রানির মাত্রা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিদেশ গমনে যুবকদের অতি উৎসাহের বিষয়টিকে সহজেই পুঁজি করে নিচ্ছে একশ্রেণীর দালাল। সময়ের ব্যবধানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশীদের বসবাসের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। তাদের অনেকেই নানানভাবে ঝুঁকি নিয়ে অবৈধ পথে পৌঁছে গিয়ে নিজেকে বসবাসের উপযোগী করে নিচ্ছেন। নিজে মাথা গুজার একটা ঠাঁই করে নিলেই শুরু হয়ে যায় দেশ থেকে সঙ্গী-সাথী, আত্মীয়-পরিজনকে নেয়ার প্রস্তুতি। আর এক্ষেত্রেই দেখা দিচ্ছে নানান বিপত্তি। তাদের কোন ট্রাভেল্স নেই। রিক্রুটিং লাইসেন্সও নেই। শুধু অভিজ্ঞতা রয়েছে চোরাইপথে কিভাবে এক দেশ থেকে অন্য দেশে পাড়ি দেয়া যায়। বৈধ পথে যাবার তেমন সুযোগ না থাকায় শেষ পর্যন্ত ঝুঁকির পথেই পা বাড়াচ্ছেন যুবকরা। প্রতিদিন বিভিন্ন দেশে যাবার উদ্দেশ্যে দালালের পরামর্শে পা বাড়িয়ে ঘরছাড়া হচ্ছেন যুবকরা। সিলেট, সুনামগঞ্জ, মৌলবীবাজার, হবিগঞ্জ জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রতিনিয়ত যুবকদের বিদেশ পাড়ি জমানোর সংবাদ পাওয়া যাচ্ছে।

৬ বছর আগে সিলেটের জকিগঞ্জের ১৫ বছরের এক কিশোরকে শ্রমিকের কাজের কথা বলে সৌদি আরব পাঠায় স্থানীয় এক দালাল। সেখানে নিয়ে তাকে উটের জকির কাজে লাগিয়ে দেয়া হয়। র্দীঘদিন উটের জকি হিসেবে কাজ করে এই কিশোর। একসময় সে অসুস্থ হয়ে পড়ে। এই কষ্ট সহ্য করতে না পেরে কৌশলে সেখান থেকে পালিয়ে আসে। পরে বাংলাদেশ দূতাবাসের মাধ্যমে দেশে ফিরে আসে সে। দেশে আসার পর সেই দালাল ও এজেন্সির ওপর মামলা দায়ের করে কিশোরের বাবা। মামলা এখনও বিচারাধীন সিলেট নারী, শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে। এই কিশোরের বাবা শেষ পর্যন্ত আদালতের আশ্রয় নিলেও সিলেটে এ ধরনের বেশিরভাগ ঘটনা আদালত পর্যন্ত গড়ায় না। স্বজন হারানোর ভয় আর আর্থিক সঙ্কটে পুলিশ-আদালতের দ্বারস্থ হতে চান না না ভুক্তভোগীরা। ফলে সিলেটে মানবপাচার বাড়লেও এ নিয়ে আইনের আশ্রয়ে যেতে আগ্রহী নন ভুক্তভোগীরা। বরং এসব ঘটনায় পুলিশ-আদালত এড়িয়েই চলতে চান তারা। ভুক্তোভোগীদের এই আইন-আদালত এড়িয়ে চলার কারণে মানবপাচারের ঘটনাও বেড়ে চলেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

গত ৯ মে ভূমধ্যসাগরে নৌকাডুবিতে নিহত সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জের আব্দুল আজিজের ভাই মফিজ উদ্দিন মানবপাচার ও মানি লন্ডারিং আইনে ফেঞ্চুগঞ্জ থানায় মামলা করেছেন। মামলায় এনামুল হক নামের এক ট্রাভেলস ব্যবসায়ীকে আসামি করা হয়েছে। ওই দুর্ঘটনায় আজিজসহ এই পরিবারের আরও তিন নিকটাত্মীয় সাগরে ডুবে নিহত হন। সিলেটে মানবপাচারের পৃথক টাইব্যুনাল নেই। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালেই এ সংক্রান্ত মামলার বিচার হয়। এই ট্রাইব্যুনালের হিসাব অনুযায়ী, ২০১২ সাল মানবপাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন প্রণয়নের পর থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত মানবপাচারের মামলা হয়েছে মাত্র ৭৩টি। এর মধ্যে নিষ্পত্তি হয়েছে ২৬টি, বিচারাধীন ৪৭ টি মামলা। চলতি বছরে এ পর্যন্ত মানবপাচারের মামলা হয়েছে দুটি। মানবপাচারের তুলনায় এই মামলার সংখ্যা যৎসামান্য বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. একে আব্দুল মোমেনও মনে করেন, মানবপাচার রোধে দেশে শক্তিশালী আইন থাকলেও তার যথাযথ প্রয়োগ হচ্ছে না। আর এর সুযোগ নিচ্ছে পাচারকারী চক্র। সম্প্রতি সিলেটে নিজ বাড়িতে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, মানবপাচার রোধে ৩৬টি আইন রয়েছে। কিন্তু সেগুলোর যথাযথ প্রয়োগ হচ্ছে না। ভুক্তোভোগীরাও আইনের আশ্রয় নিচ্ছে না। কোন দুর্ঘটনা ঘটলে তখন একটু তোড়জোড় হয়। এবার আশা করছি পাচারকারীদের কঠিন শাস্তি হবে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, পাচারকারীদের শাস্তি না হলে পাচার রোধ করা হঠিন হবে। এ ব্যাপারে বড় ধরনের উদ্যোগ নিতে হবে। কারণ তারা সহজে পার পেয়ে যাচ্ছে।

বিভিন্ন সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, সিলেটে অবৈধপথে বিদেশ যাওয়ার প্রবণতা আগের চাইতে অনেক বেড়েছে। দারিদ্র্যতা, বেকারত্ব, রাজনৈতিক অস্থিরতা, শ্রমের কমমূল্যসহ নানা কারণে তরুণ ও যুবকদের একটি বড় অংশ যে কোন উপায়ে বিদেশে বিশেষত ইউরোপ যেতে মরিয়া হয়ে ওঠে। সিলেট অঞ্চলে এই প্রবণতা একে অপরের যাত্রাকে অনুসরণ করে। গ্রামের একজন যুবক কোথাও যাত্রা করার সংবাদ প্রকাশ হওয়ার পরই শুরু হয়ে যায় অন্যদের খোঁজখবর নেয়া। একজন বিদেশের কোথাও গিয়ে পৌঁছে যাওয়ার সংবাদ পাওয়া গেলে, পাচারকারী দালালের আর পেছনে ফিরে তাকানোর দরকার নেই। এবার তার পেছনেই লাইন দিতে ছুটে আসবেন যাত্রীরা। ঢাকডোল পিটিয়ে লাভ কি। নিজে যেতে পারলেই হয়। তাই এক্ষেত্রে প্রশাসনিক জটিলতার কথা যেমন দালালরা জানেন তেমনি যাত্রিরাও কমবেশী জানেন। সে কারণে অযথা ঝামেলার কথা ভেবে সব কিছু শুরু থেকেই গোপনে রাখার পক্ষে থাকেন দালাল ও যাত্রী পক্ষ। মেট্রিক, ইন্টারমিডিয়েট পাস করে বেকার সময় যাচ্ছে। পরিবারে দু-একজন বিদেশের কোথাও রয়েছেন। মধ্যবিত্ত পরিবার। নিজে কৃষিকাজ করতে আত্মসম্মানে বাধে। আবার চাকরিরও সুযোগ নেই। এই মুহূর্তে সংসারের খরচ না করলেও আগামীতে করতে হবে। এখন নিজের পকেট খরচাও চলছে ভাই বাবার ওপর দিয়ে। পরিবারের এমন যুবকরাই জীবনের ঝুঁকি নিতে পিছপা হচ্ছে না। এক্ষেত্রে মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলেরা যাত্রা পথে ব্যর্থ হলে অনেকাংশে টিকে যাচ্ছে। কিন্তু জমিজমা বিক্রি করে পাল্লা দিয়ে নি¤œবিত্ত পরিবারের ছেলেরা বিদেশ যেতে ব্যর্থ হলে গোটা পরিবার পথে বসে যাচ্ছে। সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার মনিরগিয়াতি গ্রামের শিপন আহমেদ। পেশায় ছিলেন অটোরিক্সা চালক। বিদেশ যাওয়ার ভূত চাপে তার মাথায়। হালের গরু বিক্রি ও জমি বন্ধক করে এবং ধারকর্জ করে দালালের মাধ্যমে শিপনকে ইতালি পাঠানোর ব্যবস্থা করেন তার বাবা। দালালের সঙ্গে চুক্তি বাবদ তাকে আট লাখ টাকা দেয়া হয়। লিবিয়া যাওয়ার পর আরও দুই লাখ টাকা দাবি করে দালালরা। বাধ্য হয়ে সেই টাকাও পরিশোধ করেন শিপনের বাবা হেলাল মিয়া। ইতালি যাওয়ার জন্য অবর্ণনীয় দুর্ভোগ পোহানোর পর গত ২১ জুন তিউনিশিয়া থেকে দেশে ফেরেন শিপন। শিপনের মতো হাজারো তরুণ ভাগ্য বদলের আশায় ইউরোপ যেতে প্রতিনিয়ত অবৈধ পথে পা বাড়াচ্ছেন। আর এই অবৈধ পথে বিদেশগামীদের মধ্যে সিলেট বিভাগের তরুণরাই সবচেয়ে এগিয়ে।

তরুণদের এই বিদেশমুখিতাকে কাজে লাগিয়ে সিলেটে গড়ে উঠেছে কয়েকটি মানবপাচারকারী চক্র। এদের মাধ্যমে নিয়মিতই অবৈধপথে দেশ ছাড়ছে তরুণরা। ইউরোপ ছাড়া ইদানীং মধ্যপ্রাচ্যেও বেড়েছে মানবপাচারের ঘটনা। পুরুষের পাশাপাশি অবৈধ পথে নারীরাও বিদেশ যাচ্ছেন। সিলেটে মানবপাচারের মামলা পরিচালনাকারী স্পেশাল পিপি শাহ মোশাহিদ আলী বলেন, সিলেটে মানবপাচারের ঘটনা দিন দিন বাড়ছে। কিন্তু বেশিরভাগ মানুষই বিদেশ থেকে ফিরে আর মামলা করার সাহস পান না। কারণ, বিদেশে যাওয়া-আসায় তারা আগেই নিঃস্ব হয়ে পড়েন। মামলা পরিচালনার খরচ মেটানোর সামর্থ্য থাকে না তাদের। তাছাড়া নতুন করে তারা ঝামেলায় জড়াতেও চান না। এছাড়া এসব মামলার আসামিরা বিভিন্ন এলাকার অধিবাসী। তাদের ধরে এনে অনেকক্ষেত্রে আদালতে হাজির করা যায় না। পুলিশও ততটা আন্তরিকতা দেখায় না। এতে অপরাধীদের শাস্তির আওতায় আনা কঠিন হয়ে পড়ে। এসব কারণে বেশিরভাগ ভুক্তভোগীই মামলা করতে আসেন না। সিলেট আদালতে চলমান একটি মামলার উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, সুনামগঞ্জের এক নারীকে দালাল ও এজেন্সির লোকজন মিলে গৃহকর্মীর কাজের কথা বলে সৌদি আরব পাঠায়। কিন্তু সেখানে নিয়ে তাকে দেহব্যবসার কাজে লাগানো হয়। পরবর্তিতে দেশে এসে ওই নারী দালাল ও এজেন্সির বিরুদ্ধে মামলা করেন। তবে এমন ক্ষেত্রে মামলা করার নজির খুবই কম বলেও জানান এই আইনজীবী।

ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ৩ মাসে শুধু ইরান থেকে দেশে ফিরেছেন ২৪৫ বাংলাদেশী। এর মধ্যে সিলেট বিভাগের আছেন ১৪১ জন। ইরান থেকে দেশে ফেরা ২৪৫ জনের মধ্যে আছেন সুনামগঞ্জের ৮৫ জন, সিলেট ২৮ জন, হবিগঞ্জ ২৮ জন, কুমিল্লা ২১ জন ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ১০ জন। ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের কর্মীরা এই গবেষণার জন্য পাচারের শিকার হয়ে দেশে ফেরা ভুক্তভোগীদের সঙ্গে বিমান বন্দরে উপস্থিত থেকে আলোচনা ও তাদের ডকুমেন্ট সংগ্রহ করেন। এসব পর্যালোচনা করে সবচেয়ে বেশি পাচারের শিকার জেলাসমূহ চিহ্নিত, টার্গেট দেশ, গন্তব্যে পৌঁছানোর রুট ও মাধ্যম এবং বর্তমান সময়ে পাচারের ধরন নিয়ে গবেষণা করেন। গবেষণা থেকে জানা যায়, ২০১২ সাল থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত পাচারের শিকার জনগোষ্ঠীর মধ্যে ৬৮ শতাংশ ছিলেন পুরুষ, ২১ শতাংশ নারী ও ১১ শতাংশ শিশু। ২০১৫ সাল থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত পাচারের ধরন এক থাকলেও এই চার বছরে বদলেছে পাচারের রুট। বর্তমানে পাচারকারীরা ইরাক এবং মালয়েশিয়ার বিভিন্ন রুট ব্যবহার করে অভিবাসন প্রত্যাশীদের ইউরোপ পাঠাচ্ছে।

বিমান বন্দরে ভুক্তভোগীদের মাধ্যমে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী জানা যায়, ইউরোপে যাওয়ার জন্য তিউনিশিয়া, লিবিয়া, ইরান, ইরাক, সিরিয়া ও ইন্দোনেশিয়া এই ৬টি দেশের রুট ব্যবহার করে পাচারকারীরা। মানব পাচারকারীদের সঙ্গে জড়িত আছে বাংলাদেশী, পাকিস্তানী, আফগানিস্তানী এবং ইরানীরা। এই দালালরা বহুদিন ধরে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্নস্থানে অবস্থান করছে। ব্র্যাকের গবেষণায় উঠে আসে ইরানে মানবপাচার প্রক্রিয়া ও ইউরোপে যেতে কিভাবে নিয়ে যাওয়া হয় কর্মীদের। জানা যায়, পাচারকারীদের লক্ষ্য থাকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই এবং ওমানে নতুন আসা বাংলাদেশী তরুণদের ওপর। যারা বিভিন্ন জায়গায় অনিয়মিত চাকরি করেন কিংবা স্বল্প বেতনের চাকরি করে বেশি বেতনের স্বপ্ন দেখেন তাদের। এছাড়া যারা কয়েক বছর ধরে চাকরি করে ভাল সঞ্চয় করেছে তারাও তাদের তালিকায় থাকেন। ইউরোপে অভিবাসন প্রত্যাশীদের সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই এবং ওমান থেকে নিয়ে আসা হয় ওমানের মাসকট বন্দরে। মাসকট বন্দর থেকে স্পীডবোটে ওমান উপসাগর অতিক্রম করে নিয়ে যায় ইরানের বন্দর আব্বাসে। তারপর ইরানের বিভিন্ন শহর ও জঙ্গলে আটক রাখে দালালরা। সেখান থেকে ইরাক ও তুরস্ক। এদিকে অবৈধ পথে বিদেশ পাড়ি দেয়ার কারণে প্রবাসী কল্যাণ সেলের কাছেও কোন তালিকা নেই। যারা মধ্যপ্রাচ্য থেকে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে যাচ্ছে বা ধরা পড়ে ফিরে আসছে এসবের কোন তালিকা নেই প্রবাসী কল্যাণ সেলে।

প্রকাশিত : ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৯

২১/০৯/২০১৯ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

শেষের পাতা



শীর্ষ সংবাদ: