মেঘলা, তাপমাত্রা ৩১.১ °C
 
২৪ জুলাই ২০১৭, ৯ শ্রাবণ ১৪২৪, সোমবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
সর্বশেষ

সকালের আলো ঢেকে দেয়া কালো এক দিন

প্রকাশিত : ১৬ জুলাই ২০১৭
  • এম নজরুল ইসলাম

আজ ১৬ জুলাই। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক কালোদিন। ২০০৭ সালের এই দিনে বাংলাদেশের রাজনৈতিক আকাশ সত্যিকার অর্থেই কালো মেঘে ঢেকে গিয়েছিল। সময়টা ভাল ছিল না। চেপে বসা শাসকদের চাপে রাজনীতি তখন অন্তরালে। অসাংবিধানিক শাসকদের আমলে যেমনটি হয়, তার কোন ব্যতিক্রম ২০০৭ সালেও ঘটেনি। রাজনীতিবিদদের চরিত্র হননের চেষ্টা বাংলাদেশে সব অবাঞ্ছিত শাসকই করেছে। ২০০৭ সালের শাসকরাও সেই ধারাবাহিকতার বাইরে ছিল না। সুযোগটা করে দিয়েছিল জামায়াত-বিএনপি জোটের পাঁচ বছরের অপশাসন।

রাজনীতির ইতিহাসে কিছু কিছু ঘটনা ঘুরে ঘুরে আসে। যদি বলা হয়, ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি, খুব একটা বাড়িয়ে বলা হবে না। বাংলাদেশের রাজনীতি থেকে বঙ্গবন্ধুকে কোনদিন মুছে ফেলা যাবে না। যদিও তাঁকে হেয় প্রতিপন্ন করার বহু চেষ্টা হয়েছে। বঙ্গবন্ধুকে তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে অনেক চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে আসতে হয়েছে। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার রাজনীতিতে অভিষেক যেমন তাঁর জন্য সুখকর অভিজ্ঞতা ছিল না, তেমনি মসৃণও নয় তাঁর রাজনৈতিক চলার পথটিও। পায়ে পায়ে পাথর ঠেলে শেখ হাসিনাকে আজকের অবস্থানে আসতে হয়েছে। জীবনের ঝুঁকি নিতে হয়েছে। কিন্তু জনগণকে আস্থায় নিয়ে রাজনৈতিক কল্যাণের যে যাত্রা শুরু হয়েছিল তাঁর, তা থেকে তাঁকে বিচ্যুত করা যায়নি। দীর্ঘ রাজনৈতিক যাত্রায় কণ্টকাকীর্ণ দীর্ঘপথ পাড়ি দিয়েছেন তিনি। বাবার মতোই অনেক চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে এসেছেন। দীর্ঘদিন কাটাতে হয়েছে নিঃসঙ্গ পরবাস। স্বামী-সন্তান নিয়েও গভীর বেদনার দিন পার করতে হয়েছে তাঁকে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট পরিবারের অন্য সদস্যদের হারিয়ে স্বদেশে ফিরতে পারেননি তিনি। দেশের মানুষের ভালবাসায় সিক্ত হয়ে ১৯৮১ সালে দেশে ফিরে আসার পরও ছায়ার মতো তাঁকে অনুসরণ করেছে ঘাতক। একাধিকবার হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে। এক সময় রাজনীতি থেকে তাঁকে নির্বাসনে পাঠানোর অপচেষ্টা করা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ২০০৭ সালের ১৬ জুলাই গ্রেফতার করা হয় তাঁকে।

সে এক দুঃসহ দিন। বাংলাদেশে তখন চলছে ‘তত্ত্বাবধায়ক’ নামে চেপে বসা অপশক্তির দুঃশাসন। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভাগ্যাকাশে সত্যিকার অর্থেই দুর্যোগের মেঘে আচ্ছন্ন করেছিল তখন। গণতন্ত্র নির্বাসনে পাঠিয়ে চেপে বসা শাসকগোষ্ঠী তখন রাজনীতিবিদদের চরিত্র হননে ব্যস্ত। রাজনীতি তখন যেন গর্হিত অপরাধ। রাজনীতিক পরিচয়টিও যেন হানিকর। শাসনের নামে ত্রাসের রাজত্ব। ওয়ান-ইলেভেন নামের পটপরিবর্তনের পর চেপে বসা তত্ত্বাবধায়ক নামের অপব্যবস্থায় জনজীবনে নাভিশ্বাস।

১৬ জুলাই সূর্য ওঠার আগে যে নাটকটি মঞ্চস্থ হয়, টেলিভিশনের পর্দায় তার লাইভ সম্প্রচারও দেখেছে দেশের মানুষ। ঢাকায় তখন রাত পৌনে ৪টা। যৌথ বাহিনী ঘিরে ফেলল সুধাসদনÑ শেখ হাসিনার বাসভবন। তাঁকে গ্রেফতার করে নিয়ে গেল। অস্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনায় তখন মধ্যরাত। সেলফোনে খবরটা জানালেন ড. হাছান মাহমুদ। সঙ্গে সঙ্গে অস্ট্রিয়ায় বসবাসরত বঙ্গবন্ধুর আদর্শের সৈনিক ও অনুসারীদের ফোন করে ঘুম থেকে জাগিয়ে নেত্রীর গ্রেফতারের খবর দিই এবং সকাল ৮টায় অস্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনায় স্টার্ড পার্কে শেখ হাসিনার গ্রেফতারের প্রতিবাদ ও মুক্তির দাবিতে বিক্ষোভ সমাবেশ আহ্বান করি আমরা। ফোন করি লন্ডনে অবস্থানরত বঙ্গবন্ধুর কনিষ্ঠ কন্যা শেখ রেহানাকে। ফোনের ওপারে তাঁর কণ্ঠেও হতাশা। আমি আমাদের সিদ্ধান্তের কথা জানাই তাঁকে। তিনি আমাদের উৎসাহ দেন। তাৎক্ষণিকভাবে ‘শেখ হাসিনা মুক্তি সংগ্রাম পরিষদ’ গঠনের পরামর্শ দেন। ইউরোপের বিভিন্ন দেশের নেতৃবৃন্দের সঙ্গে যোগাযোগ হয়। পরদিন অস্ট্রিয়া সময় সকাল ৮টায় বিপুলসংখ্যক বাঙালী নারী-পুরুষ উপস্থিত হন বিক্ষোভ সমাবেশে। অস্ট্রিয়া প্রবাসী সর্বস্তরের বাঙালীদের নিয়ে ‘শেখ হাসিনা মুক্তি সংগ্রাম পরিষদ’ গঠিত হয়। নেত্রী গ্রেফতারের পর থেকে তাঁর মুক্তির দাবিতে প্রতিমাসে ভিয়েনায় চারটি করে বিক্ষোভ সমাবেশ হয়ে আসছিল। আমরা গণস্বাক্ষর, অস্ট্রিয়ান পার্লামেন্টের সামনে মানববন্ধন, গণ-অনশন কর্মসূচীও পালন করেছি।

শেখ হাসিনাকে গ্রেফতারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ গড়ে তুলে মুক্ত করতে তাঁর যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় এবং যুক্তরাজ্য প্রবাসী ছোট বোন শেখ রেহানা টেলিফোনে সব সময় আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। বিভিন্ন নির্দেশনা ও উপদেশ দিয়েছেন। তাঁরা ছিলেন প্রত্যয়দৃপ্ত। তাঁরা জানতেন সব ষড়যন্ত্রের জাল ভেদ করে বাংলার মানুষের ভালবাসায় সিক্ত শেখ হাসিনা একদিন ঠিকই ফিরে আসবেন তাঁর বিশ্বাসের মানুষের কাছে। ২০০৮ সালের জুন মাসে তিনি মুক্তি পেলেন। আর, একই বছর নির্বাচন অনুষ্ঠানের ভেতর দিয়ে তো পাল্টে গেল পুরো চালচিত্র।

বঙ্গবন্ধুকন্যা ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা এ দেশের দুঃখী মানুষের নেতা; তাঁর পরিবারকে সমূলে উৎপাটনের ষড়যন্ত্র আজকের নয়, দীর্ঘ কয়েক যুগ থেকেই চলছে। সাহসী রাজনীতির পারিবারিক ঐতিহ্য ও সংগ্রামের ইতিহাসকে মুছে ফেলে দেয়ার কি কুৎসিত-নির্মম ও ভয়াবহ চক্রান্তই না করেছিল প্রতিক্রিয়াশীল চক্রÑ রাজনৈতিক নিষ্ঠুর প্রতিহিংসাপরায়ণতার সেই চক্রান্তের জাল ক্রমেই বিছিয়েছে গোপনে! শুধু কি তাই, হীন চক্রান্তকারীরা চেষ্টা করেছে সংকীর্ণ রাজনীতির হীনম্মন্যতার ছদ্মাবরণে তাঁর ভাবমূর্তিকে নস্যাত করতে। সেই চক্রান্ত কি আজও চলছে? আমাদের প্রিয় মাতৃভূমির বিরুদ্ধে কি নিরন্তর ষড়যন্ত্র করছে কোন গণবিরোধী চক্র?

দেশ আমাদের। জনগণই দেশের প্রাণশক্তি। সেই জনগণকে রক্ষা ও সুসংহত করেই রাষ্ট্রীয় অখ-তা ও স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব আমাদেরই রক্ষা করতে হবে। দেশটিকে অন্ধকারের দিকে নিয়ে যেতে প্রতিক্রিয়াশীল চক্র তৎপর। ঘাপটি মেরে আছে রাজনৈতিক অপশক্তিও। এই অবস্থা থেকে উত্তরণের একমাত্র পথ প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক শক্তির ঐক্য ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষশক্তির সম্মিলিত প্রয়াস।

জনগণের জয় হোকÑ সকালের আলো ঢেকে দেয়া কালো দিন ১৬ জুলাই এই মন্ত্রে নতুন করে উজ্জীবিত হই আমরা।

লেখক : অস্ট্রিয়া প্রবাসী মানবাধিকারকর্মী ও সাংবাদিক

nayrul@gmx.at

প্রকাশিত : ১৬ জুলাই ২০১৭

১৬/০৭/২০১৭ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


শীর্ষ সংবাদ: