২০ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট ৪ ঘন্টা পূর্বে  
Login   Register        
ADS

স্বাধীনতা সংগ্রামের দিনগুলো


বাংলাদেশের জাতীয় ইতিহাসের শ্রেষ্ঠতম অধ্যায় হলো একাত্তরের সশস্ত্র যুদ্ধ। স্বাধীনতা যুদ্ধ ছিল ১৯৭১ সালে সংঘটিত তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানের বিরুদ্ধে পূর্ব পাকিস্তানের সশস্ত্র সংগ্রাম। বাংলাদেশকে পাকিস্তান থেকে স্বাধীন করার উদ্দেশ্যেই শুরু হয় স্বাধীনতা সংগ্রাম। পশ্চিম পাকিস্তানের পরাক্রমশালী সেনাবাহিনীর অত্যাচার, শোষণ ও নির্যাতন থেকে বাঁচতে ‘বাংলাদেশ’ নামে স্বাধীন দেশ হিসেবে পৃথিবীর মানচিত্রে আত্মপ্রকাশ করাই ছিল এই স্বাধীনতা যুদ্ধের মূল কারণ। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ ১৯৭১ সালে সংঘটিত একটি মুক্তি সংগ্রাম। যার ব্যাপ্তি ছিল ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত। রক্তক্ষয়ী সশস্ত্র যুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা এবং সশস্ত্র যুদ্ধ প্রসঙ্গে দুয়েকটি কথা বলে কিছুই জানা সম্ভব নয়। লক্ষণীয় রূপে স্বাধীনতা যুদ্ধ ছিল সবলের বিরুদ্ধে দুর্বলের যুদ্ধ। বাঙালী জাতির মুক্তির যুদ্ধ। ১৯৭১ সালের আগে বাংলাদেশ নামে কোন দেশের অস্তিত্ব ছিল না। কারণ, তখন বাংলাদেশ ছিল পাকিস্তানের একটি প্রদেশ। সেই প্রদেশটির নাম ছিল পূর্ব পাকিস্তান আর বর্তমান পাকিস্তান ছিল পশ্চিম পাকিস্তান। ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগ হওয়ার সময় মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর ‘দ্বিজাতিতত্ত্ব’ মতবাদের পরিপ্রেক্ষিতে ভারত উপমহাদেশের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি হলে বারো শ’ মাইলের দূরত্ব সত্ত্বেও শুধুমাত্র ধর্মের ভিত্তিতে ইসলামী রাষ্ট্র পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা করা হয়। সে সময় পূর্ব পাকিস্তানের যাবতীয় শাসন কার্য পরিচালিত হতো পশ্চিম পাকিস্তান থেকে। আসলে তখন থেকেই পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠীর একচোখা নীতি প্রকাশ পেতে থাকে চরমভাবে। সেসব ছিল অসামান্য এক ইতিহাস। তখন আমরা পরাধীন ছিলাম। চরম নৈরাজ্যের ওই ক্রান্তিলগ্নে পরাধীনতার শেকল ভাঙতে চেয়েছি প্রাণপণ। শোষণের নাগপাশ থেকে মুক্ত হতে চেয়েছি বার বার। সে কারণেই আমরা বেছে নেই আন্দোলন, সংগ্রাম আর সশস্ত্র যুদ্ধের পথ।

আমার এ ক্ষুদ্র সংগ্রামী জীবন ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের উদ্দেশ্যে নিবেদিত। আমি ছিলাম ছাত্রলীগের আদর্শে অনুপ্রাণিত। তখন আমার সামনে দৃষ্টান্ত হয়েছিল বঙ্গবন্ধুর ত্যাগ ও তিতিক্ষার সংগ্রামী জীবনাদর্শ। বঙ্গবন্ধু ছিলেন আমার কাছে অফুরন্ত প্রেরণার উৎস। তাঁর কারণেই আমি জীবনকে তুচ্ছ জ্ঞান করে বারবার মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়ে প্রতিবাদ, প্রতিরোধ ও আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েছি। তবে প্রতিবারই আমি বিস্ময়করভাবে নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা পেয়েছি এবং তা পেরেছি শুধু আমার অদম্য সাহস, অনমনীয়তা, ক্ষিপ্রতা আর অটল মনোভাব দ্বারা সৃষ্ট উপস্থিত বুদ্ধি প্রয়োগের মাধ্যমে। অনেক সময় দৈব সত্তারও সাহায্য পেয়েছি। এসব ঘটনা ছিল অত্যন্ত রোমহর্ষক, দুঃসাহসিক, রোমাঞ্চ আর উত্তেজনায় ভরপুর। মাঝে মাঝে মনে হয়েছে এক জীবনে যেমন অসংখ্যবার আমার মৃত্যু হয়েছে, ঠিক তেমনই আবার বার বার নবজন্ম লাভ করেছি। নিশ্চিত মৃত্যুর দুয়ার থেকে বার বার ফিরে আসার ভয়ঙ্কর সেই দিনগুলোর ঘটনা আমার মনকে এখনও প্রচ- রকম বিচলিত করে। সে বিভীষিকাময় দুঃস্বপ্নের মুহূর্ত আজও আমার স্মৃতিতে জ্বলজ্বল করে। স্বাধীনতা ও সশস্ত্র যুদ্ধের সেসব দুঃসাহসিক অভিযান থেকেই আজ আমার জীবনের একটি বীরত্বপূর্ণ ঘটনা দেশ ও জাতির সামনে তুলে ধরার উদ্দেশ্যে লিখে জানাব, যা প্রজন্মের পাশাপাশি অনুসন্ধনিৎসু পাঠকদের মনন ও চিন্তার জগতকে সমৃদ্ধ করবে।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস এক বিশাল ক্যানভাসের মতো। যার পূর্ণাঙ্গতা ছিল ব্যাপক। চিত্রকর্মের ক্যানভাসে যেমন নানা রঙের ছোপ থাকে, ঠিক তেমনই ছিল একাত্তরের স্বাধীনতা সংগ্রাম। ’৪০-এর মার্চে লাহোর প্রস্তাব, ’৫২-এর ফেব্রুয়ারিতে বাংলা ভাষা আন্দোলন, ’৬৯-এর জানুয়ারিতে গণঅভ্যুত্থান, ’৭০-এর ডিসেম্বরে সাধারণ নির্বাচন, ’৬৬-’৭১-এর স্বায়ত্তশাসন আন্দোলন, ’৭১-এর সশস্ত্র যুদ্ধÑএসবই হলো সে বিশাল ক্যানভাসে একেকটি রঙের ছোপ। রঙের ব্যবহার যেমন টেক্সচার তৈরির মাধ্যমে ক্যানভাসে সৃষ্টি করে বৈচিত্র্য, এসব আন্দোলন-সংগ্রামও ছিল তেমনি স্বাধীনতা যুদ্ধের বিশাল ক্যানভাসে ছোপ-ছোপ রঙের সমবেত কম্পোজিশনে বৈপ্লবিক পরিবর্তনের প্রতিকৃতি। যদিও সশস্ত্র সংগ্রামের ইতিহাসকে বিবেচনা করা হয় মাত্র ৯ মাস সময়কালের মাধ্যমে। সশস্ত্র যুদ্ধ নিয়ে যদি যথার্থ রূপে কথা বলতে চাই, তবে তার প্রেক্ষাপট ও ঐতিহাসিক বাস্তবতা সম্পর্কিত বিস্তারিত বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। কিন্তু তা এত স্বল্প পরিসরে করা সম্ভব নয়। তবে অন্তত এটুকু বলা বিশেষ প্রয়োজন যে, সশস্ত্র যুদ্ধের ইতিহাস কেবল ৯ মাসের সংগ্রামের ইতিহাস নয়। সশস্ত্র সংগ্রামের পটভূমি রচনা করতে এবং সংগ্রামের ক্ষেত্র প্রস্তুত করতে আরও বহু অপ্রকাশ্য-প্রকাশ্য নানামাত্রিক সংগ্রামের প্রয়োজন হয়েছে। এদেশের শোষিত, বঞ্চিত মানুষও সংগ্রাম করেছে নিজেদের অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক মুক্তির তাগিদে। মূলত সশস্ত্র যুদ্ধের ভ্রƒণ সৃষ্টি হয়েছিল ব্রিটিশ শাসন শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিরোধপর্বের সূচনাকাল থেকে। শতাব্দীর অধিককাল ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে এবং দুই যুগ ধরে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সংগঠিত অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক মুক্তির লড়াইয়ে সেই ভ্রƒণ বিকশিত হয়েছে। আর ৯ মাসের সশস্ত্র যুদ্ধে তা পেয়েছে পূর্ণাঙ্গ আকার-আকৃতি এবং ভূমিষ্ঠ হয়েছে ‘বাংলাদেশ’ নামক বাঙালীর জাতীয় রাষ্ট্র। তবে এটাও ঠিক যে, স্বাধীনতার লক্ষ্যে শুরুতে ‘গেরিলা যুদ্ধ’ এবং পরে মুখোমুখি যুদ্ধের স্থায়িত্বকাল ছিল ৯ মাস। কিন্তু পাকিস্তানীদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক লড়াইটা শুরু হয়েছিল গত শতকের পঞ্চাশ দশক থেকে। আর পরোক্ষভাবে সশস্ত্র লড়াই শুরু হয়েছিল সেই ’৬২ সাল থেকে। আমরা প্রথমে সামরিক সরকার সমর্থিত ন্যাশনাল স্টুডেন্টস ফেডারেশন (এনএসএফ)-এর সশস্ত্র কর্মীদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্ছেদ করি। তারপর আমাদের সামনে আবির্ভূত হয় প্রবল পরাক্রমশালী পাকিস্তানী সেনাবাহিনী। তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করে জিততে হলে আমাদের প্রয়োজন দীর্ঘসময়, বিপুল জনশক্তি, উন্নত প্রশিক্ষণ এবং আধুনিক অস্ত্রশস্ত্র। কোন ছোটখাট পিস্তল-বন্দুক-হাতবোমা নয়। সে কারণেই আমরা সারাদেশ থেকে সাহসী তরুণ সংগ্রহের পাশাপাশি অস্ত্র সংগ্রহের জন্য ঝাঁপিয়ে পড়ি। প্রথমে দেশের অভ্যন্তরে নানা সূত্র থেকে সাধারণ অস্ত্র সংগ্রহ শুরু করি। পরবর্তীতে প্রতিবেশী দেশ ভারতে গিয়েও অস্ত্র সংগ্রহের চেষ্টা করি। আর ভারত থেকে অস্ত্র সংগ্রহ করতে গিয়েই আমি একবার মৃত্যুর মুখোমুখি হই। তবে সে যাত্রায় রক্ষা পাই, কিছুটা ভাগ্যের সহায়তায় আর কিছুটা বুদ্ধি প্রয়োগ করে।

ভারত থেকে অস্ত্র সংগ্রহের বিষয়টি আমার মাথায় আসে জগন্নাথ হলে রাত কাটাতে গিয়ে। ছাত্রলীগের বিশিষ্ট নেতা শহীদ মৃণাল বোস ও সুজিত চক্রবর্তী থাকতেন জগন্নাথ হলের দক্ষিণ বাড়িতে। জগন্নাথ হলে গেলে আমি তাঁদের রুমেই রাত কাটাতাম। মৃণালের সাথে আমাকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল ছাত্রলীগের আরেক বিশিষ্ট নেতা স্বপন চৌধুরী (প্রয়াত)। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে যার অবদানকে অস্বীকার করা যাবে না। কিন্তু অভ্যন্তরীণ কোন্দলে পড়ে তাঁকে অকালে জীবন দিতে হয়েছে। সে সময় ছাত্রলীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দল কী যে ভয়াবহ ছিল, ভবিষ্যতে যদি কখনও সুযোগ পাই, তবে তা লিখে পাঠককে জানাব। জগন্নাথ হলে যাওয়ার কারণ ছিল, ছাত্র ইউনিয়নের ছেলেরা প্রায়ই ছাত্রলীগের ছেলেদের মেরে হল থেকে বের করে দিত। আর আমি তখন ছাত্রলীগের ছেলেদের ডেকে হলে যার যার কক্ষে তুলে দিতাম। আমি সেখানে গেলে ছাত্র ইউনিয়নের ছেলেরা আমার সঙ্গে লড়াই করার সাহস দেখাত না। কারণ আমি ছিলাম একজন চৌকস ছাত্রলীগ কর্মী। কুস্তি, জুডো, মুষ্টিযুদ্ধ, লাঠিখেলা ও শিকারে বিশেষ পারদর্শী। ১৯৬৬ সালের জানুয়ারি মাসে পূর্ব পাকিস্তান স্পোর্ট ফেডারেশন কর্তৃক আয়োজিত ঢাকা স্টেডিয়ামে প্রাদেশিক কুস্তি প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে লাইটওয়েট গ্রুপে আমি প্রথম স্থান অধিকার করি এবং একই বছর পশ্চিম পাকিস্তানের লাহোরে অনুষ্ঠিত পঞ্চদশ জাতীয় কুস্তি প্রতিযোগিতায় নিখিল পাকিস্তান লাইটওয়েট গ্রুপে চ্যাম্পিয়ন হই।

চলবে...