২৫ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট ৬ ঘন্টা পূর্বে  
Login   Register        
ADS

কোয়ান্টাম প্রযুক্তি আসছে অপার সম্ভাবনা নিয়ে


প্রায় এক শতাব্দী পাঠ্যবইয়ে আবদ্ধ থাকা এবং কয়েক দশক ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা-নিরীক্ষার বিষয় হিসেবে গণ্য হওয়ার পর কোয়ান্টাম প্রযুক্তি আজ বিস্ময়কর ফল এনে দিতে শুরু করেছে। নতুন নতুন অভাবনীয় সব আবিষ্কারের পথ উন্মোচন করে দিচ্ছে। এই কোয়ান্টাম প্রযুক্তির বদৌলতেই আজ প্রতিটি নিউরনকে দেখা যায় এমন এক বিশেষ ধরনের বাথিং ক্যাপ পরা মানুষের মনের ভেতর কি চলছে অন্যরা তা জানতে পারছে। এই প্রযুক্তির সুযোগেই বিশেষ ধরনের সেন্সর দিয়ে সন্ধান বের করা যাচ্ছে লুকিয়ে থাকা সাবমেরিনের। এই প্রযুক্তির কম্পিউটার দিয়ে আবিষ্কার করা যেতে পারছে নতুন ওষুধ। কোয়ান্টাম সূত্রের ভিত্তিতে গড়ে তোলা যাচ্ছে এমন যোগাযোগ যা হ্যাক করা বা ভেদ করা কিছুতেই সম্ভব নয়। সোজা কথায় কোয়ান্টাম প্রযুক্তি আমাদের ভবিষ্যতকে অচিন্তনীয়ভাবে বদলে দেয়া এবং বৈপ্লবিক রূপান্তর ঘটিয়ে দেয়ার প্রতিশ্রুতি নিয়ে এসেছে।

এখন কোয়ান্টাম প্রযুক্তি বা কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞান সম্পর্কে এখানে দুটি কথা বলে নেয়া ভাল। কোয়ান্টাম তত্ত্ব হলো পদার্থবিজ্ঞানের সেই অংশ যা থেকে আমরা এটম যেসব জিনিস দিয়ে তৈরি সেই প্রোটন নিউট্রন ও ইলেক্ট্রন কিভাবে কাজ করে তা জানতে পারি। শুধু তাই নয়, ইলেকট্রোম্যাগনিটিভ ওয়েভ যেমন আলো কিভাবে কাজ করে তাও জানতে পারি। দ্বিতীয়ত ক্লাসিক্যাল মেকানিক্স বা চিরায়ত বলবিদ্যায় সেখানে বলা হয় যে বস্তু একটি নির্দিষ্ট সময়ের একটি নির্দিষ্ট স্থান বা অবস্থায় থাকে, সেখানে কোয়ান্টাম মেকানিক্স বলে যে বস্তুর একটি নির্দিষ্ট সময়ে নানা ধরনের স্থান বা অবস্থান থাকার সম্ভাবনা থাকে। যেমন একই সময় ‘ক’ বিন্দুতে থাকার নির্দিষ্ট সম্ভাবনা থাকে আবার ‘খ’ বিন্দুতে থাকারও আরেক সম্ভাবনা থাকে। অর্থাৎ বস্তু বা বস্তুকণাগুলো হয় এখানে বা সেখানে নয় বরং একই সঙ্গে এখানেও আছে ওখানেও আছে এবং বড়ই অদ্ভুতভাবে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে আছে। এর ফলে বস্তুকণার কোন একটির ক্ষেত্রে কিছু করা হলে অন্যটি নিমেষের মধ্যে সেই পরিবর্তন অনুভব করতে পারে। এমনকি বিশাল স্থানের (ঝঢ়ধপব) এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তেও পারে। বস্তুকণার এই পারস্পরিক যুক্ততা কোয়ান্টাম তত্ত্বের উদ্ভাবকদের পর্যন্ত হতবুদ্ধি করে দিয়েছে।

বস্তুকণার এই অদ্ভুত বৈশিষ্ট্যগুলো বিশেষ করে এর আরোপণ ও পরস্পর যুক্ততাকে কাজে লাগিয়ে আজ কোয়ান্টাম সূত্র বিস্ময়ের পর বিস্ময় সৃষ্টি করে চলেছে। মানুষের কল্যাণে এই সূত্র ব্যবহারের অপার সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে। কোয়ান্টাম প্রযুক্তি প্রচলিত প্রযুক্তিকে ছাড়িয়ে বিশাল ব্যবধানে এগিয়ে যেতে পারে এবং এমন সব অসাধ্য সাধন করতে পারে যা আগে কল্পনা করতে পারাও ছিল অসম্ভব।

প্রাকৃতিক জগতের সবকিছুই কোয়ান্টাম তত্ত্বে ব্যাখ্যা করা সম্ভব। এটম বা অণু পরিসরে কি ঘটছে কোয়ান্টাম তত্ত্ব হলো তারই মৌলিক সূত্র। এই সূত্র লেজার থেকে শুরু করে এমআরআই মেশিন পর্যন্ত দৈনন্দিন প্রযুক্তিগুলোর উন্নয়নের পথনির্দেশনা যুগিয়েছে। ব্ল্যাক হোল বা কৃষ্ণগহ্বরের অভ্যন্তরভাগ কেমন এবং মহাবিশ্বের উষালগ্ন কি রকম ছিল এমনি অজ্ঞেয় বিষয়গুলো জানার দৃঢ় ভিত্তি রচনা করেছে কোয়ান্টাম তত্ত্ব। এটম বিভিন্ন সাইজের প্যাকেটেই কেবল এনার্জি ‘শুষে নেয় ও বিকীরণ করে’ এবং আলো ও পদার্থ কণা এবং তরঙ্গ এই উভয়রূপেই কাজ করতে পারে- কোয়ান্টাম তত্ত্বের বদৌলতে এমনি গুটিকয়েক নতুন আবিষ্কার আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের সবচেয়ে বড় সাফল্য।

আণবিক ঘড়ি

সবচেয়ে বড় কথা গত কয়েক দশকে কোয়ান্টাম প্রযুক্তির ক্ষেত্রে যে বিশেষজ্ঞ জ্ঞান অর্জিত হয়েছে এখন তার সুফল পাওয়া যেতে শুরু করেছে। তারই একটি হচ্ছে এটমিক ওয়াচ বা আণবিক ঘড়ি। কোয়ান্টাম প্রযুক্তির প্রথম যে পণ্যটা বাজারের মুখ দেখেছে তা হলো আণবিক ঘড়ি। পরস্পর যুক্ততাকে (ঊহঃধহমষবসবহঃ) কাজে লাগিয়ে আজ এটমিক ক্লক বা আণবিক ঘড়ির এমন উৎকর্ষ সাধন করা হয়েছে যে, সেগুলো আজ স্যাটেলাইট পজিশনিংয়ে ব্যবহৃত ঘড়ির চেয়ে অনেকগুণ বেশি উন্নত ও নিখুঁত।

আধুনিক ঘড়ির মৌলিক ইউনিট হলো সেকেন্ড। সেই সেকেন্ডের সঠিক দৈর্ঘ্য পরিমাপ করার লক্ষ্য নিয়েই আণবিক ঘড়ি উদ্ভাবিত। কেসিয়াম-১৩৩-এর একটি এটম সুনির্দিষ্ট অবস্থায় এক পাক ঘুরে আসতে যে সময়টা নেয় ঠিক সেটাই হলো সেকেন্ডের দৈর্ঘ্য।

এটমিক ঘড়ির সাহায্যে নেভিগেশনের কাজটা অনেক নিখুঁত হয়ে উঠেছে। যার ফলে স্বয়ংচালিত গাড়ি আরও নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য হয়ে উঠবে। এই ঘড়ি আরও অনেক কিছু করতে পারে। স্থানীয় মাধ্যাকর্ষণ শক্তির প্রভাব ও সময়ের প্রভাবের বদৌলতে এই ঘড়ি মাধ্যাকর্ষণের ক্ষেত্রে অতি সামান্য তারতম্যও পরিমাপ করতে পারে। তার ফলে এই ঘড়ি সাগরতরঙ্গের নিচে থাকা সাবমেরিনের সন্ধান বের করতে পারবে। ভূগর্ভের পাইপের হদিস বের করার জন্যও এই ঘড়ি কাজে লাগানো যেতে পারে। ফলে রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ির প্রয়োজন হবে না।

তবে এটমিক ঘড়ির নির্ভুলতার ক্ষেত্রে কিছু তারতম্য লক্ষ্য করা গেছে এবং সেজন্য এর সর্বক্ষণ উৎকর্ষ ঘটে চলেছে। এর প্রত্যাশিত ভ্রান্তির মাত্রা প্রায় ১০ কোটি বছরে এক সেকেন্ড। যুক্তরাষ্ট্রের কলরাডোর বোল্ডারে মার্কিন জাতীয় মেট্রোলজি স্থাপনা এনআইএসটির এফ-১ ঘড়িটি বিশ্বের সবচেয়ে নিখুঁত সময় দেয়া ঘড়িগুলোর অন্যতম। প্রতিষ্ঠানটির ডেভিড ওয়াইনল্যান্ড এই ঘড়ি আবিষ্কার করে ২০১২ সালে নোবেল পুরস্কার পান। তার এই ঘড়ি যদি ১৩৮০ কোটি বছর আগে বিগব্যাংয়ের সময় চালু করে দেয়া যেত তাহলে আজ অবধি সেকেন্ডের কাঁটায় কাঁটায় ওটা সঠিক সময় দিয়ে চলত।

শুধু নিখুঁত সময় দেয়া নয়, আণবিক ঘড়ির আরও নানাবিধ ব্যবহার আছে এবং সেটা কোয়ান্টাম প্রযুক্তির অতি ‘স্পর্শকাতরতার’ কারণ। গ্লোবাল পজিশনিং সিস্টেমে এর প্রয়োজন আছে। ফ্রিকোয়েন্সি ও সময়ের আদর্শ মানের ওপর দারুণভাবে নির্ভরশীল ইন্টারনেটের জন্যও এই ঘড়ি প্রয়োজন।

আর হ্যাকিং নয়

কোয়ান্টাম প্রযুক্তি যোগাযোগ নেটওয়ার্কেও বিপ্লব আনছে। ২০০৪ সালে ব্যাংক অব অস্ট্রিয়া ও ভিয়েনা সিটি হলের মধ্যে প্রথম কোয়ান্টাম সাঙ্কেতিক ভাষায় ব্যাংকিং লেনদেন বা অর্থের স্থানান্তর ঘটে। পরে এই প্রযুক্তি আরও অনেক ক্ষেত্রেও উৎকর্ষের সঙ্গে ব্যবহার করা হয়। কোয়ান্টাম প্রযুক্তি ব্যবহারকারীরা দাবি করেন যে, যোগাযোগের ক্ষেত্রে কোয়ান্টাম সঙ্কেতের ব্যবহার অতি নিরাপদ। কেউ এতে আড়ি পাততে পারবে না। পাঠোদ্ধার করতে পারবে না। সঙ্কেত ভাঙতে পারবে না। কোয়ান্টাম ক্রিপটোগ্রাফি ইদানীং ব্যাপক পরিসরে ব্যবহার হচ্ছে। তবে এর ভবিষ্যতটা কোয়ান্টাম নেটওয়ার্কের মধ্যে নিহিত। কোয়ান্টাম নেটওয়ার্কের জন্য বহু প্রেরক ও গ্রাহকের মধ্যে সংযোগ সাধন করা প্রয়োজন। বিশ্বের বড় বড় মেট্রোপলিটান এলাকায় এমন নেটওয়ার্ক গড়ে উঠছে। তবে গত বছরের শেষদিকে চীনে যে কোয়ান্টাম নেটওয়ার্কের কাজ সম্পন্ন হয়েছে সেটির মতো উচ্চাভিলাষী নেটওয়ার্ক আর কোনটাই নয়। এই নেটওয়ার্কের গ্রাহকদের মধ্যে আছে চায়না ইন্ডাস্ট্রিয়াল এ্যান্ড কমার্শিয়াল ব্যাংক, চায়না ব্যাংকিং রেগুলেটরি কমিশন এবং সিনহুয়া নিউজ এজেন্সি।

গত বছরের ১৭ আগস্ট চীন বিশ্বের প্রথম কোয়ান্টাম যোগাযোগ স্যাটেলাইট মহাশূন্যে ছেড়েছে। মিসিয়াস নামের এই কৃত্রিম উপগ্রহটির সাহায্যে চীন হ্যাক-প্রুফ কোয়ান্টাম যোগাযোগের বিষয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাবে। প্রযুক্তিটা এখন শেষাবস্থায় এবং এ মুহূর্তে যথেষ্ট ব্যয়বহুলও বটে। তবে দীর্ঘমেয়াদী বিচারে কোয়ান্টাম যোগাযোগ ব্যবস্থার মাধ্যমে দীর্ঘ দূরত্ব জুড়ে বর্তমান ব্যবস্থার চাইতে অনেক বেশি নিরাপদে ড্যাটা বা তথ্য-উপাত্ত পাঠানো যাবে।

কোয়ান্টাম স্যাটেলাইট কিভাবে কাজ করবে? তত্ত্বগতভাবে চীন স্বাভাবিক যোগাযোগ চ্যানেলের মাধ্যমে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে সাঙ্কেতিক বার্তা পাঠাবে। তারপর বার্তাটি পাঠোদ্ধারের জন্য ‘কোয়ান্টাম চাবি’ সুনির্দিষ্ট কোয়ান্টাম পরিবেশে স্থাপিত ফোটনের আকারে স্যাটেলাইটে পাঠাবে। স্যাটেলাইট তখন সেই কোয়ান্টাম চাবি বার্তা গ্রাহকের কাছে দেবে। এর ফলে চাবিটি দেখতে পাওয়া, ট্যাগ করা বা হ্যাক করা কোয়ান্টাম মেকানিক্সে ফোটনের ধর্মের কারণেই অনেক বেশি কঠিন হয়ে পড়বে। প্রেরণের সময় কোয়ান্টাম ‘কী’ দেখতে পাওয়ার যে কোন চেষ্টা ব্যর্থ হবে অনিশ্চয়তাবাদ সূত্রের কারণে।

চীনের এই কোয়ান্টাম স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণে সাহায্য-সমর্থন দিয়েছে হুয়াওয়েই ও লেনোভোসহ টেক কোম্পাানিগুলো। আপাতত এর লক্ষ্য বেজিং সাংহাই নেটওয়ার্কের প্রায় ৩ হাজার কিলোমিটার দূরে জিনজিয়াং প্রদেশের উরুমুকির সঙ্গে যুক্ত করা। কোয়ান্টাম স্যাটেলাইট যোগাযোগ স্থাপনের চেষ্টা আমেরিকা, কানাডা, জাপান, ইতালি ও সিঙ্গাপুরেও চলছে। কোয়ান্টাম সিগন্যালগুলো ঝঞ্ঝাময় বায়ু, মেঘমালা ইত্যাদির মধ্য দিয়ে মহাকাশে পৌঁছানোর চ্যালেঞ্জগুলো কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হলে বিশ্বব্যাপী কোয়ান্টাম যোগাযোগ নেটওয়ার্ক সহজেই গড়ে উঠতে পারবে। আর দেশে দেশে এমনি কোয়ান্টাম যোগাযোগ স্যাটেলাইট সংযোগ থাকলে গ্লোবাল কোয়ান্টাম ইন্টারনেট গড়ে ওঠাও সহজ হবে, যেখানে বাড়তি নিরাপত্তা ও গোপনীয়তা রক্ষার ব্যবস্থা থাকবে।

কোয়ান্টাম কম্পিউটার

কোয়ান্টাম প্রযুক্তি আরেক বিশাল সম্ভাবনা হাজির করেছে আমাদের সামনে। সেটা হলো কোয়ান্টাম কম্পিউটার। প্রচলিত কম্পিউটার আর কোয়ান্টাম কম্পিউটারের মধ্যে বিশাল ব্যবধান। প্রচলিত কম্পিউটার হলো এমন এক গ্যাজেট যার দ্বারা কম্পিউটারের বিবিধ কাজ করা ছাড়াও ই-মেইল পাঠানো, অনলাইন শপিং করা, বন্ধুদের সঙ্গে চ্যাট করা ও গেম খেলা যায়। এটা এমন এক মেশিন, যা দিয়ে আপনার পছন্দমতো প্রায় সব কাজই করা যায়। কিন্তু অন্তর্নিহিতভাবে এটা একটা মৌলিক ক্যালকুলেটারের চাইতে খুব বেশি কিছু নয়। এতে আগে থেকে বিন্যস্ত এক সেট নির্দেশাবলী থাকে, যাকে বলে প্রোগ্রাম। প্রচলিত কম্পিউটার দুটো কাজ বেশ ভালভাবে পারেÑ সংখ্যাকে স্মৃতিতে সংরক্ষণ করতে পারে এবং মজুত সংখ্যাকে যোগ-বিয়োগের মতো সহজ গাণিতিক ক্রিয়ায় প্রসেস করতে পারে। সংখ্যাকে সংরক্ষণের সময় বাইনারির ভিত্তিতে একটি কোড ব্যবহার করে করা হয়। প্রতিটি ‘শূন্য’ ‘১’ কে বলা হয় বাইনারি ডিজিট বা বাইট এবং আটটি বাইটের একটি সুতায় ২৫৫টি ভিন্ন ভিন্ন ক্যারেকটার মজুত করা যায়। কম্পিউটার লজিক গেট নামে সার্কিট ব্যবহার করে হিসাব করে। সার্কিটগুলো পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত বেশ কিছু ট্রানজিস্টার দিয়ে তৈরি। আপনার যত বেশি তথ্য মজুত করা প্রয়োজন তত বেশি বাইনারি ‘১’ ও ‘০’ এবং ট্রানজিস্টারের ব্যবস্থা আপনার থাকতে হবে। বেশিরভাগ প্রচলিত কম্পিউটার যেহেতু একই সময় একটা কাজই কেবল করতে পারে, তাই যত বেশি জটিল সমস্যার আপনি সমাধান করতে চাইবেন তত বেশি পদক্ষেপ কম্পিউটারকে নিতে হবে এবং তত বেশি সময়ও কম্পিউটারের দরকার হবে। কিছু কিছু সমস্যা এত বেশি জটিল যে, সেগুলো সমাধানের জন্য আরও অনেক বেশি কম্পিউটিং ক্ষমতা ও সময় কম্পিউটারের থাকা দরকার, যা আধুনিক অনেক মেশিনেরই নেই। কম্পিউটার বিজ্ঞানীদের ভাষায় এগুলো হলো বাগ মানানো যায় না এমন সমস্যা।

এমন সমস্যা সমাধানের জন্য বিজ্ঞানীরা কোয়ান্টাম কম্পিউটারের দিকে ঝুঁকেছেন। সাধারণ কম্পিউটারের যেমন বাইট, রেজিস্টার, লজিগ গেট, এলগোরিদম প্রভৃতি আছে তেমনি কোয়ান্টাম কম্পিউটারেরও সদৃশ বৈশিষ্ট্য আছে। তবে বাইটের পরিবর্তে কোয়ান্টাম কম্পিউটারের আছে কোয়ান্টাম বাইট বা কিউবাইট, যা বিচিত্র উপায়ে কাজ করে। সাধারণ কম্পিউটারে যেখানে একটা বাইট হয় একটা ‘শূন্য’ নয়ত একটা ‘১’ সংরক্ষণ করতে পারে, সেখানে একটা কিউবাইট একটা শূন্য, একটা ১, শূন্য ও ১ উভয়েই এবং এর মাঝামাঝি অসীম সংখ্যক মূল্য সংরক্ষণ করতে পারে এবং একই সময় একাধিক অবস্থায় থাকতে পারে।

যেহেতু একটা কোয়ান্টাম কম্পিউটার একই সঙ্গে একাধিক বা বহু সংখ্যাকে সংরক্ষণ করতে পারে, তাই সেটি একই সঙ্গে সেই সংখ্যাগুলোকে প্রসেসও করতে পারে। অনুক্রমিকভাবে অর্থাৎ একটা পরম্পরায় একই সময়ে একটা করে বেশ কিছু কাজ করার পরিবর্তে এটি সমান্তরালভাবে কাজ করতে বা একই সময় বহু কিছু করতে পারে। হিসাব করে দেখা গেছে যে, একটা কোয়ান্টাম কম্পিউটারের সমান্তরালভাবে কাজ করার ক্ষমতা থাকার কারণে সেটি প্রচলিত কম্পিউটারের তুলনায় কয়েক মিলিয়ন গুণ বেশি গতিসম্পন্ন হবে। শুধু যদি সেটা তৈরি করতে পারা যায়। এই কম্পিউটার এমন সব বিশাল বিশাল ও জটিল ধরনের ক্যালকুলেশন করতে পারবে, যা করতে আজকের সেরা সুপার কম্পিউটারের সহস্র বছর লাগার কথা। তবে এর সঙ্গে একটা উদ্বেগজনক ব্যাপারও আছে। কোয়ান্টাম কম্পিউটার আজকের কঠিন গাণিতিক সমস্যার ওপর প্রতিষ্ঠিত ক্রিপটোগ্রাফিক কৌশলকে শেষ পর্যন্ত সেকেলে হিসেবে বাতিল করে ফেলবে।

সেটা ঘটবার আগেই অবশ্য অপেক্ষাকৃত ছোটখাটো কোয়ান্টাম কম্পিউটার জ্বালানি খাত থেকে শুরু করে লজিস্টিক্স, ওষুধের পরিকল্পনা ও অর্থলগ্নি পর্যন্ত শিল্পক্ষেত্রে অনন্য অবদান রাখবে। এমনকি সহজ-সরল ধরনের কোয়ান্টাম কম্পিউটারেরও বিভিন্ন ধরনের সমস্যার সমাধান করার কথা, যেগুলো সাধারণ কম্পিউটার করতে পারছে না। গুগল জানিয়েছে যে, এ ধরনের কম্পিউটার বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহারযোগ্য হতে আর মাত্র পাঁচ বছর বাকি। হিউলেট প্যাকার্ড তাদের নিজস্ব কোয়ান্টাম কম্পিউটার বের করার চেষ্টা করছে। ইন্টেল তার বিনিয়োগের একটা অংশ কোয়ান্টাম কম্পিউটারের পেছনে ব্যয় করছে। মাইক্রোসফটের টপোলজিক্যাল কোয়ান্টাম কৌশল যদি কাজ করে তাহলে সেটা অনেক কম ত্রুটিপূর্ণ হবে। কোয়ান্টাম কম্পিউটিং অনেক স্টার্টআপও এগিয়ে আসছে। কানাডার কোম্পানি ‘ডি-ওয়েভ সিস্টেমস্্’ তো সেই ২০১১ সাল থেকে বাণিজ্যিকভাবে প্রথম কোয়ান্টাম কম্পিউটার বিক্রি শুরু করেছে। এই কম্পিউটার অবশ্য সর্বজনীন নয়, বরং বিশেষ উদ্দেশ্য সাধনে বিশেষ ধরনের কাজে সক্ষম। একে বলে কোয়ান্টাম এপিলার। এই কোম্পানির খদ্দেরদের মধ্যে আছে লকহিড মার্টিন, গুগল ও নাসা।

বিস্ময়কর সফটওয়্যার আসবে

কোয়ান্টাম প্রযুক্তি বিস্ময়কর সব সফটওয়্যার আগমনের ক্ষেত্র প্রস্তুত করছে, যার ফল হবে অভাবনীয়। কোয়ান্টাম কম্পিউটার তৈরি হয়ে বাজারে এলেই তো হবে না, সেটা যদি প্রোগ্রাম করতে পারা না যায় তাহলে তো কোন লাভ নেই। গত দুই দশক ধরে কোয়ান্টাম কম্পিউটার হার্ডওয়্যার তৈরির জোর উদ্যোগ চললেও মেশিন চালানোর জন্য যে সফটওয়্যারটি দরকার, সেটি তৈরির চেষ্টাটা তুলনামূলকভাবে কম ছিল। তবে সেই দৃশ্যপট বদলে যাচ্ছে। কোয়ান্টাম কম্পিউটার আসতে আর বেশি দেরি নেই এটা স্পষ্ট হওয়ার পর দুটো উদ্যোগ সমান্তরালভাবে চলছে। একটা হচ্ছে সাধারণভাবে আমরা সফটওয়্যার বলতে যা বুঝি যেমন গ্রাফিক্স ইন্টারফেস, প্রোগ্রামিং ল্যাঙ্গুয়েজ ইত্যাদি তৈরি, যা হবে কিনা কোয়ান্টাম কম্পিউটারের জানালা। অন্য উদ্যোগটা হলো অভিনব এলগোরিদম তৈরি, যেখানে কোয়ান্টাম কম্পিউটিংয়ের উপযোগী করে সমস্যাগুলোকে বিভিন্ন অংশে ভাগ করে ফেলার জন্য ধাপে ধাপে নির্দেশাবলী থাকবে।

দুটো ক্ষেত্রেই উদ্ভাবনী মেধা ও উদ্যোগের অভাব নেই। এর মধ্যে বড় বড় ফার্ম যেমন আছে, তেমনি আছে স্টার্টআপ।

কোয়ান্টাম প্রযুক্তি কি আনতে পারে

প্রথম যখন আণবিক ঘড়ি তৈরি ও বাণিজ্যিকীকরণ হলো তখন কেউ কোয়ান্টাম প্রযুক্তি কথাটা ব্যবহার করেনি। এই ঘড়ি উন্নততর ফলাফল লাভের জন্য কোয়ান্টাম মোকানিক্সের শক্তিকেই স্রেফ কাজে লাগিয়েছিল। সে সময় কোয়ান্টাম মেকানিক্সের ব্যবহারিক প্রয়োগ কি হতে পারে, সে সম্পর্কে অন্য আর কোন দৃষ্টান্ত ছিল না।

বর্তমানে কোয়ান্টাম প্রযুক্তি যে বেগ সৃষ্টি করেছে তা ব্যাপক। জাতীয় সরকার ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো এ সংক্রান্ত নানা গবেষণা উদ্যোগের পেছনে অর্থায়ন করছে। কোয়ান্টাম প্রযুক্তির অনেক সুবিধা আছে, যা বর্তমান ডিভাইসগুলোকে উন্নততর স্তরে নিয়ে যেতে পারে। এর গুটিকয়েক গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োগের ক্ষেত্র হলো :

সাব সার্ফেস ইমেজিং ॥ কোয়ান্টাম প্রযুক্তি দ্রুত ও নিখুঁতভাবে মাধ্যাকর্ষণের পরিমাপ করতে পারে বলে আপনার নিচের মাটির ঘনত্বের ছবি নেয়া সহজ। বড় বড় নির্মাণ প্রকল্পের জন্য এটা জরুরী ও গুরুত্বপূর্ণ। তা ছাড়া এই প্রযুক্তির ইমেজিং দিয়ে তেল, গ্যাস ও খনিজ সম্পদের মজুতের ওপর নজরদারি এবং মাটির নিচে বিস্মৃত হয়ে যাওয়া অবকাঠামো বা প্রতœতাত্ত্বিক ধ্বংসাবশেষ চিহ্নিত করা সহজ।

নেভিগেশন ॥ কোয়ান্টাম ডিভাইস স্যাটেলাইট ছাড়াই পানির নিচে বা অন্য কোন বৈরী পরিবেশে ভালভাবে চলাচল সক্ষম করে তোলে।

কোয়ান্টাম প্রযুক্তি প্রতিরক্ষা, এরোস্পেস, এনার্জি, স্বাস্থ্যখাত, টেলিকমিউনিকেশন ও অর্থলগ্নি খাতের ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে। কম্পিউটার চালিত অস্ত্র ব্যবস্থা উত্তরোত্তর জটিল হয়ে উঠছে। যেমন এফ-৩৫ জয়েন্ট স্ট্রাইক ফাইটার বিমানের পুরোপুরি পরিচালনযোগ্য হওয়ার জন্য এখন ২ কোটিরও বেশি কোডলাইন প্রয়োজন। কোয়ান্টাম কম্পিউটারের প্রচ- শক্তি কোড ভ্যালিডেশনের দক্ষতা বাড়িয়ে স্ট্র্যাটেজিক সুবিধা এনে দিতে পারে।

পুরনো ও ব্যয়বহুল গ্লোবাল পজিশনিং সিস্টেম (জিপিএস) উত্তরোত্তর অনির্ভরযোগ্য ও বিপন্ন হয়ে পড়েছে। এটা সাবোটাজের শিকার হতে পারে। অন্যদিকে কোয়ান্টাম লোকেশন প্রযুক্তি জ্যাম করা প্রায় অসম্ভব বলে ধারণা করা হচ্ছে। এটি জিপিএসের তুলনায় এক হাজার গুণ নির্ভুল। কোয়ান্টাম প্রযুক্তি সবে তো যাত্রা শুরু করেছে। এর অমিত সম্ভাবনার কিছুই এখন উন্মোচিত হয়নি। যখন সেই সম্ভাবনাময় ক্ষমতাগুলোকে কাজে লাগানো যাবে তখন মানবজাতির সামনে কত কি যে বিস্ময় অপেক্ষা করবে, তা আর বলার নয়।

সূত্র : দি ইকোনমিস্ট