মেঘলা, তাপমাত্রা ৩১.১ °C
 
১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৭, ৪ আশ্বিন ১৪২৪, মঙ্গলবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
সর্বশেষ

ময়মনসিংহে ডাকবাংলো ও বাকৃবি রেস্ট হাউস

প্রকাশিত : ২৬ মার্চ ২০১৬

একাত্তরে পাক বাহিনী ও তাদের দোসর রাজাকার-আলবদরদের প্রধান টর্চার সেল ও কিলিং সেন্টার ছিল ব্রহ্মপুত্র পাড়ে জেলা পরিষদের ডাকবাংলো এবং বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের রেস্ট হাউস। প্রত্যক্ষদর্শী এ্যাডভোকেট আবুল কাশেম জানান, অবাঙালী কিলার গ্রুপ ও স্থানীয় রাজাকার-আলবদররা শহরের বিভিন্ন স্থান থেকে বাঙালীদের ধরে এনে ডাকবাংলোয় গুলি করে হত্যা করে লাশ ভাসিয়ে দিত ব্রহ্মপুত্র নদে। শিয়াল-কুকুর খেয়ে ফেলার পরও দেশ স্বাধীন হলে ব্রহ্মপুত্র পাড় ও চরজুড়ে পড়েছিল অগণিত লাশ আর কঙ্কাল। গবেষক মুক্তিযোদ্ধা বিমল পাল জানান, একাত্তরের ২২ এপ্রিল ময়মনসিংহ শহরের পতন হলে ২৩ এপ্রিল শুক্রবার পাক সেনারা ঢুকে পড়ে। গঠন করা হয় শান্তি কমিটি। ময়মনসিংহ জেলা পরিষদের ডাকবাংলোর সাইন বোর্ড সরিয়ে সেখানে ঝোলানো হয় জিলা শান্তি কমিটির কার্যালয়, মোমেনশাহীর সাইনবোর্ড। শান্তি কমিটির সাইনবোর্ড ঝোলানো হলেও এর নেপথ্যে ছিল মূলত ইসলামী ছাত্র সংঘের সদস্য নিয়ে গঠিত আলবদর বাহিনীর টর্চার সেল ও কিলিং সেন্টার। তৎকালীন ইসলামী ছাত্র সংঘ বৃহত্তর ময়মনসিংহের সভাপতি আশরাফ হোসেন (যুক্তরাষ্ট্রে পলাতক), সহ-সভাপতি মজিবুর রহমান ঘাটাইল, সাধারণ সম্পাদক শেরপুরের কামারুজ্জান (যুদ্ধাপরাধের দায়ে যার মৃত্যুদ- হয়েছে), গৌরীপুরের এ্যাডভোকেট সারোয়ারসহ ১১ সদস্যের কমিটি ছিল জেলা পর্যায়ে। এই আলবদর বাহিনীর জন্ম হয়েছিল জামালপুরের আরামনগর মাদ্রাসায়। হেড কোয়ার্টার ছিল এই ডাকবাংলোয়।

বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলে আলবদর বাহিনীর অপারেশনাল কমান্ডার ছিল জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল কামারুজ্জামান। শহরের চকবাজার বড় মসজিদ ও সংলগ্ন মাদ্রাসা ছিল রাজাকারদের আস্তানা। বড় মসজিদের ইমাম ও শান্তি কমিটি প্রধান মাওলানা ফয়েজুর রহমানের ছেলে মৃত মফিজুর রহমান তৈয়ব ছিল অস্ত্রধারী রাজাকার কমান্ডার। তার সহযোগী ছিল রাইফেলধারী রফিক ও মানিক। অবাঙালী কিলার ইয়াসিন ও নজর আব্বাসসহ অস্ত্রধারী রাজাকাররা বাঙালীদের ধরে এনে তুলে দিত আলবদর বাহিনীর হাতে। বর্তমান সরকার মেয়াদে ডাকবাংলোর পেছনে এই বধ্যভূমি চিহ্নিত করা হয়েছে।

ডাক বাংলো ছাড়াও একাত্তরে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের রেস্ট হাউস ছিল পাক সেনাদের ৯৩ ব্রিগেড কমান্ডের হেডকোয়ার্টার। এই কমান্ডের চীফ ছিল ব্রিগেডিয়ার আব্দুল কাদির খান। লে. কর্নেল আফতাব আহমদ কোরেশী ছিল তার সহযোগী। এই কমান্ডের অধীন ৩১ বেলুচ জামালপুর ও শেরপুর নিয়ন্ত্রণ করত। আর শহরের সার্কিট হাউজে ছিল জিসিও ৩৩ পাঞ্জাব ব্যাটালিয়ন। ডা. এমএ হাসান সম্পাদিত যুদ্ধাপরাধ গণহত্যা ও বিচারের অন্বেষণ গ্রন্থে এসবের উল্লেখ রয়েছে। একাত্তরে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের এই রেস্ট হাউজে নির্মম নির্যাতনের শিকার ও এখানে বন্দীদশায় অন্তত ১০ হত্যাকা-ের প্রত্যক্ষদর্শী স্থানীয় মুকুল নিকেতন স্কুলের রেক্টর অধ্যাপক আমির আহমদ চৌধুরী রতন জানান, বাঙালীদের ধরে এনে এখানে হাত-পা ও চোখ বেঁধে নির্যাতনের পর কখন বেয়োনেট দিয়ে খুঁচিয়ে, কখন ব্লেড-চাকু দিয়ে কাটাছেড়া করে আধমরা করার পর গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। পরে এসব লাশ ফেলে কিংবা ভাসিয়ে দেয়া হতো রেস্ট হাউসের পেছনে ব্রহ্মপুত্র নদে। চোখের সামনে হাবিলদার আলাউদ্দিন চাকু দিয়ে জবাই করে হত্যা করে ভালুকা থেকে ধরে আনা আব্দুল হেকিমকে। এ রকম ১০টি হত্যাকা- প্রত্যক্ষ করেন রতন। এসব হত্যাকা-ের বাইরে এখানে বন্দী অবস্থায় তিনি অনেক নারীর কান্নার শব্দ শুনেছেন।

Ñবাবুল হোসেন, ময়মনসিংহ থেকে

প্রকাশিত : ২৬ মার্চ ২০১৬

২৬/০৩/২০১৬ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


শীর্ষ সংবাদ: