২১ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

সুপেয় পানির সঙ্কট


বিশ্ব পানি দিবসে এবারের প্রতিপাদ্য ছিল ‘জল ও জীবিকা’। বিশ্বব্যাপী পরিচালিত এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, পৃথিবীতে মোট শ্রমশক্তির প্রায় অর্ধেক জনগোষ্ঠী পানি সংক্রান্ত এবং পানিকে ঘিরে সরাসরি জীবিকা নির্বাহের কাজে জড়িত। এর বাইরেও বাকি সব মানুষ, জীবজন্তু, তরুলতা, গাছগাছালি এমনকি শিল্পকারখানা কোন না কোনভাবে পানির ওপর নির্ভরশীল। যে মরু অঞ্চলের অধিবাসী পানি খেতে হয় তাকে; আবার যে রয়েছে সমুদ্রগামী অভিযাত্রায়, তাকেও পানি পান করে বেঁচে থাকতে হয়। মহাশূন্যে স্পেস স্টেশনে অবস্থানরত নভোচারীদেরও পানি ছাড়া চলে না। তবে পানির অপর নাম জীবন হলেও পানির মাধ্যমে জীবনের সুরক্ষা বুঝি সর্বত্র রক্ষা করা হচ্ছে না। একদিকে ব্যবহার উপযোগী পানির তীব্র সঙ্কট; অন্যদিকে সুপেয় বিশুদ্ধ পানির অভাব বর্তমানে প্রায় বিশ্বব্যাপী মানুষের জীবনকে ব্যতিব্যস্ত করে তুলছে। ইতোমধ্যে কোথাও কোথাও দেখা দিয়েছে পানির জন্য তীব্র হাহাকার। আবার কোথাওবা অতিবৃষ্টি-বন্যা-সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাস ও প্লাবন। পানির জন্য দেশে দেশে টানাপোড়েনসহ ‘যুদ্ধংদেহী’ মনোভাবও লক্ষণীয়। ভারতের মহারাষ্ট্রে খরাপীড়িত লাতুর শহরে সম্প্রতি ইঁদারা, নলকূপ ও জলাধারগুলোর সামনে পানি নিয়ে দাঙ্গার আশঙ্কায় জারি করা হয়েছে ১৪৪ ধারা। অর্থাৎ, সাধারণ মানুষের ব্যবহার্য জলাধারের সামনে একই সঙ্গে পাঁচজনের বেশি মানুষের সমাবেশ নিষিদ্ধ। সেখানে পানির অভাবে ফসল উৎপাদনে ব্যর্থ ও ঋণ পরিশোধে সামর্থ্য হারিয়ে গত বছর প্রায় ১ হাজার ৪০০ কৃষক আত্মহত্যা করেছেন। অথচ বাস্তবে কিন্তু পানির কোন অভাব নেই। পৃথিবীর তিন-চতুর্থাংশ পানি, শতকরা হিসেবে ৭১.৪ শতাংশ। তবে বিশুদ্ধ ও সুপেয় পানির বড়ই অভাব। কেননা, ৭১.৪ শতাংশ পানির মধ্যে ৯৭ শতাংশই লবণাক্ত, ২ ভাগ হলো বরফ এবং বাকি মাত্র ১ ভাগ বিশুদ্ধ পানি। এ থেকেই পানি সমস্যার স্বরূপটি অনুধাবন করা যায়।

বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ হলেও সমূহ ঝুঁকিতে রয়েছে বিশুদ্ধ সুপেয় পানির। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এক হিসেবে দেখা যায়, বাংলাদেশে ১৬ কোটি মানুষের মধ্যে ৯৭ ভাগ মানুষের পানির প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা গেলেও অন্তত সাড়ে ৯ কোটি মানুষ বিশুদ্ধ পানি ব্যবহার করতে পারছে না। মৌসুম ভেদে এই সমস্যা আরও তীব্র হয়ে ওঠে। ফলে মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষাসহ শিল্পায়ন ও কৃষিকাজ ব্যাহত হয়। ফসল উৎপাদনসহ নানা কাজে পানির অপরিকল্পিত ব্যবহারও লক্ষ্য করা যায়। অন্যদিকে গৃহস্থালি কাজে পানি সংগ্রহের জন্য নারীকে পুরুষের তুলনায় অনেক বেশি সময় ব্যয় করতে হয়। ভূগর্ভস্থ পানির মাত্রাতিরিক্ত ও অপরিকল্পিত ব্যবহারও লক্ষণীয়।

সার্বিক অবস্থাদৃষ্টে নিঃসন্দেহে বলা যায়, আগামী দিনগুলোতে বাংলাদেশে পানি সমস্যা ও সঙ্কট আরও ভয়াবহ এবং তীব্র হয়ে উঠবে। সুতরাং জাতীয় পর্যায়ে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদী একটি পানি নীতি প্রণয়ন এখন সময়ের দাবি। সমুদ্রের পানি লবণাক্ত মুক্ত করা ব্যয়বহুল বিধায় মনোনিবেশ করতে হবে নদী ব্যবস্থাপনার দিকে। বৃষ্টিবহুল দেশ বিধায় দেশের নদ-নদীগুলোকে সারা বছর সচল ও নাব্য রাখতে হবে। সুষ্ঠু, পরিমিত ও সমন্বিত করতে হবে পানি ব্যবস্থাপনা। ভারতসহ প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে বিরাজমান পানি সমস্যার জরুরী সমাধানে সবিশেষ গুরুত্বারোপ করতে হবে। সর্বোপরি ভূগর্ভের পানির ব্যবহার কমিয়ে জোর দিতে হবে বৃষ্টির পানি সংগ্রহ ও প্রাকৃতিক জলাধার নির্মাণে।