মেঘলা, তাপমাত্রা ৩১.১ °C
 
২১ সেপ্টেম্বর ২০১৭, ৬ আশ্বিন ১৪২৪, বৃহস্পতিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
সর্বশেষ

আপনার শিশুকে নিয়ে যান স্মৃতিসৌধে

প্রকাশিত : ১৪ ডিসেম্বর ২০১৫
  • আবু সুফিয়ান কবির

যে কোন দেশের স্মৃতিসৌধ সেদেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে লালন করার এক অনন্য স্থাপনা। এই স্মৃতিসৌধগুলোর মাধ্যমে আমরা দেশ সৃষ্টি ও বিকাশের যে ক্রমবর্ধমান ইতিহাস তা জানতে পারি। তাই স্মৃতিসৌধ দেশের প্রতিটি মানুষের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বাংলাদেশের ঐতিহাসিক অনেক স্মৃতিসৌধ আছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য বাংলাদেশের সাভারে অবস্থিত জাতীয় স্মৃতিসৌধ, রায়েরবাজার বধ্যভূমি স্মৃতিসৌধ ও মিরপুর শহীদবুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধ। এই স্মৃতিসৌধগুলো আমাদের মুক্তিযুদ্ধ তথা স্বাধীনতা যুদ্ধকে উপলব্ধি করার এক গর্বিত বেদী।

জাতীয় স্মৃতিসৌধের সাতটি স্তর রয়েছে। স্থাপতি সৈয়দ মাইনুল হোসেনের এটি একটি সফল কর্ম। যার প্রতিটি স্তরের তাৎপর্য আমাদের স্বাধীনতার চূড়ান্ত বিজয়ের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন থেকে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বরের চূড়ান্ত বিজয়ের পথে যে সব আন্দোলন তার প্রতিফলন ঘটিয়েছেন শিল্পী প্রতিটি স্তরে।

১৯৭১-এর ২৬ মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হয়। একই বছর ১৬ ডিসেম্বর বিজয়ের মাধ্যমে এর পরিসমাপ্তি ঘটে। মুক্তিযুদ্ধে প্রায় ৩০ লাখ মানুষের প্রাণহানি হয়। এই স্মৃতিসৌধ বাংলাদেশের জনসাধারণের বীরত্বপূর্ণ লড়াইয়ের স্মরণে নিবেদিত এবং মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের প্রতি জাতির শ্রদ্ধার উজ্জ্বল নিদর্শন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত।

সাভারে স্মৃতিসৌধ প্রাঙ্গণের সর্বমোট আয়তন ৮৪ একর। স্মৃতিস্তম্ভটি পরিবেষ্টন করে রয়েছে ২৪ একর এলাকাব্যাপী বৃক্ষরাজিশোভিত একটি সবুজ বলয়। স্মৃতিসৌধটির উচ্চতা ১৫০ ফুট। সৌধটি সাত জোড়া ত্রিভুজাকৃতির দেয়াল নিয়ে গঠিত। দেয়ালগুলো ছোট থেকে ক্রমশ বড়ক্রমে সাজানো হয়েছে। এই সাত জোড়া দেয়াল বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের সাতটি ধারাবাহিক পার্যায়কে নির্দেশ করে। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৫৪ যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ১৯৫৬ শাসনতন্ত্র আন্দোলন, ১৯৬২ শিক্ষা আন্দোলন, ১৯৬৬ ছয় দফা আন্দোলন, ১৯৭৯-এর গণ-অভ্যুত্থান ও সবচেয়ে বড়টি হচ্ছে আমাদের ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ। এই সাতটি ঘটনাকে স্বাধীনতা আন্দোলনের পরিক্রমা হিসেবে বিবেচনা করে সৌধটি নির্মাণ করা হয়। অতএব আমরা যদি প্রতিবছর এই বিজয়ের মাসে এই স্মৃতিসৌধের স্থাপনার ইতিহাস পর্যালচনা করতে পারি এবং আমাদের নতুন প্রজন্মকে তা জানাতে পারি তাহলে তারা দেশের সৃষ্টির ইতিহাস সম্পর্কে সচেতন হবে। আর স্মৃতিসৌধের স্থাপনায় শুধুমাত্র দেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নয়, এর পাশাপাশি আরও ছয়টি ঐতিহাসিক আন্দোলনের কথা আমরা জানার সুযোগ পাব এই স্মৃতিসৌধের মাধ্যমে। তাই আপনার সন্তানকে আপনি নিজ উদ্যোগে স্মৃতিসৌধে নিয়ে যেতে পারেন। জানাতে পারেন আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের কথা। লেখক ও অধ্যাপক জাফর ইকবাল এক লেখায় লিখেছেন, যে শিশু তার দেশের সত্যিকারের ইতিহাস জানে সে বড় হয়ে কখনও দুর্নীতিগ্রস্ত হতে পারে না। বিষয়টি মাথায় রেখে সব পিতামাতার উচিত শিশুদের স্মৃতিসৌধে নিয়ে যাওয়া এবং তাদের দেশ ও জাতির সত্যিকার ইতিহাস জানানো উচিত।

১৯৯৩ সালের ১৪ ডিসেম্বর রায়েরবাজারের বধ্যভূমি স্মৃতিসৌধের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। ১৯৯৬ সালের ১৪ ডিসেম্বর শেষ হয় এর দ্বিতীয় পর্যায়ের কাজ। ৩ দশমিক ১৫ একর জমির ওপর নির্মিত হয়েছে সৌধটি। আর এর ডিজাইন করেছেন দুই স্থপতি ফরিদউদ্দিন আহমেদ এবং মোহাম্মদ জামি আল শাফি।

প্রতিটি শিশুর জানা উচিত এদেশের স্বাধীনতার ইতিহাস। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চের বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণ, ২৬ মার্চের বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণার পর থেকে যে মুক্তিযুদ্ধের সমাপ্তি পর্যন্ত। এখানে বাংলাদেশের নয় মাসে মুক্তিযুদ্ধের সংগ্রাম এবং যৌথবাহিনীর যে ভূমিকা তার সব কিছুই জানাতে হবে আপনার সন্তানক। জানতে হবে ১৪ ডিসেম্বর পাক হানাদার বাহিনী ও এদেশের ঘাতক আলবদরদের আত্মঘাতী হয়ে নিষ্ঠুর নির্যাতনে বুদ্ধিজীবীদের হত্যার ঘটনা।

১৯৭৫ সালে ১৫ আগস্ট Ÿঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর স্বাধীনতা বিরোধী ও একটি সুবিধাবাদী মহল দেশের ইতিহাসকে বিকৃত করেছে। তারা জাতির পিতার নামকে মুছে ফেলার প্রয়াস দেখিয়েছে। ঐতিহাসিব ৭ মার্চের ভাষণের স্থানটিকে শিশুপার্ক তৈরি করে শিশুদের মন থেকে মুছে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছে ঐতিহাসিক এই ভাষণের তাৎপর্য। একজন পাঠককে স্বাধীনতার ঘোষণা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধ বিরোধীদের রাজনীতি করার সুযোগ দেয়া হয়েছে। দীর্ঘ দিনের এই প্রয়াসে সুবিধাবাদীদের ছত্রছায়ায় ইতিহাসকে বিকৃত করা হয়েছ। তাই এই গুমোট অবস্থা থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। খুঁজে নিতে হবে দেশের স্বাধীনতার সঠিক ইতিহাস এবং সত্য ন্যায়ের পথে একজন শিশু যেন বড় হয়ে উঠতে পারে সেদিকে আমাদের খেয়াল রাখতে হবে। দল বা মতাদর্শ নিজম্ব বিষয়। তাই বলে দেশের স্বাধীনতার ইতিহাসকে মিথ্যা ভাবে উপস্থাপন করাতে কোন সার্থকতা নেই। প্রতিবছর আমরা দেখি অনেক পিতামাতা তার শিশুকে নিয়ে যান স্মৃতিসৌধে। বিষয়টি আনন্দের তবে তা যেন নিছক একটি স্মৃতিসৌধের সুন্দর স্থাপনা দেখানোর জন্য না হয় সেদিকে খেয়াল রাখা উচিত প্রতিটি অভিভাবকের।

প্রতিবছর ফ্যাশন হাউসগুলো লাল-সবুজের সমারহে তৈরি করে বিজয়য়ের পোশাক। এই প্রসঙ্গে ফ্যাশন হাউস অঞ্জনস্-এর প্রধান শাহীন আহমেদ বলন, ‘এই পোশাকের মাধ্যমে তারা দেশের জাতীয় পতাকা, স্মৃতিসৌধসহ স্বাধীনতা সম্পর্কে অনেক কিছু জানতে পারে। তিনি বলেন, ‘বিজয় দিবসের পোশাক পরিধানের বিষয়টি শুধু একটি ফ্যাশনেবল ড্রেস ক্রয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না, তা হয়ে ওঠে দেশের স্বাধীনতার ইতিহাস জানার একটি সার্থক প্রতীক হিসেবে। তবে অভিভাবকদের বিষয়টি সম্পর্কে সচেতন হতে হবে। পোশাক পরিধানের পাশাপাশি তাদের সন্তানদের দেশের স্বাধীনতার ইতিহাস সম্পর্কে সচেতন করতে হবে।’ আসুন আমরা আমাদের নতুন প্রজন্মকে স্বাধীনতার সঠিক ইতিহাস জানাই। তবেই তারা দেশকে ভালবাসতে শিখবে। অতএব আমরা যে যেখানেই থাকি না কেন বা যে মতাদর্শেই বিশ্বাসী হইনা কেন আমরা নিজ দায়িত্বে স্বাধীনতার সঠিক ইতিহাস পৌঁছে দেব নতুন প্রজন্মের কাছে, এটাই হবে আমাদের অঙ্গীকার।

ছবি : রুদ্র ইউসুফ

মডেল : আবির, আখি ও অহনা, পোশাক : স্টাইলপার্ক

প্রকাশিত : ১৪ ডিসেম্বর ২০১৫

১৪/১২/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


শীর্ষ সংবাদ: